মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ
মাসুদ পারভেজ

‘সিনেমার হিরো’ শব্দদ্বয় উচ্চারিত হলে যে ইমেজ দর্শকের মনে-মগজে ক্রিয়া করে, বিএফডিসির ক্ষেত্রে প্রথম সেই ব্যক্তিটি হলেন নায়ক আব্দুর রহমান (১৯৩৭-২০০৫)। বাংলা চলচ্চিত্র জগতের একেবারে গোড়ার দিকের নায়ক তিনি। যদিও তাঁর শুরু হয় ‘এদেশ তোমার আমার’ (১৯৫৯) চলচ্চিত্রে ‘নেগেটিভ’ চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। এই চলচ্চিত্রের পরিচালক ছিলেন এহতেশাম।
পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬০ সালে ‘রাজধানীর বুকে’ চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে রহমানের অভিষেক হয়। এই যে নায়কের পথে তাঁর যাত্রা শুরু হলো তা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটা ঘটনা বটে! কারণ তাঁর পূর্বে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে হিরোর ইমেজ নিয়ে একক কোনো ব্যক্তির প্রতিমূর্তি গড়ে ওঠেনি।
১৯৫৬ সালে ‘মুখ ও মুখোশ’ সিনেমার পর বাংলা ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণের যে যাত্রা শুরু হয়, ষাটের দশকের আগ পর্যন্ত সেখানে নায়কের একক কোনো নাম সেভাবে পাওয়া যায়নি। কারণ, দর্শক নির্দিষ্ট কোনো চরিত্রের ভেতর দিয়ে সিনেমার কাহিনির মোটিফ ধারণ করতে পারেনি। প্রায় পাঁচ বছর পর ১৯৬০ সালে বাংলাভাষী চলচ্চিত্রের দর্শকেরা সেই নামটি পেয়ে যান ‘রাজধানীর বুকে’ সিনেমা দিয়ে। এই সিনেমায় রহমানকে দর্শক হিরো হিসেবে পেয়ে যায়। ফলে হিরো হওয়ার অন্যতম যে শর্ত দর্শকের মনে ক্রিয়া করে অর্থাৎ হিরোইন থাকবে, সেটাও তারা পায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা সিনেমায় নায়ক রহমান নামটি উচ্চারিত হলে অবধারিতভাবে চলে আসে নায়িকা শবনম। অর্থাৎ রহমান-শবনম জুটির মধ্য দিয়ে বাংলাভাষী দর্শক নায়ক-নায়িকা নির্ভর চলচ্চিত্রের প্রথম পরিপূর্ণ স্বাদ পায়।
এই সিনেমার বিখ্যাত গান ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে’ বাংলা প্লেব্যাকের জগতে কাল্টক্লাসিক হয়। আর এক্ষেত্রে রহমান-শবনম বাংলা সিনেমায় কলকাতার উত্তম-সূচিত্রার একধরনের প্রতিমূর্তি হিসেবে হাজির হন। নায়ক রহমানকে তো বাংলাদেশের উত্তম কুমার হিসেবে তকমা দেওয়া হয়। উত্তম কুমার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্রের প্রায় এক দশক পর রহমানের অভিষেক ঘটে চলচ্চিত্রে। ফলে উত্তমকে অনুকরণ ও অনুসরণ করার প্রবণতা খুবই স্বাভাবিক| কারণ রহমানের আগে বাংলাদেশে নায়ক হিসেবে অন্য কেউ প্রতিষ্ঠিত হননি যাকে ঘিরে হিরোর ইমেজ গড়ে উঠবে। ফলে সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাঙালি তরুণ নায়ক রহমানের মধ্যে উত্তম কুমারের প্রভাব যেমন পড়তেই পারে, তেমনি দর্শকদেরও রহমানের মধ্যে উত্তমের ছায়া খোঁজার আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে।

কারণ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের বাংলা ভাষার চলচ্চিত্রে উত্তম কুমার বিবিধ কারণে প্রভাব বিস্তারী হয়ে ওঠেন। একদিকে যেমন তাঁর অভিনয় গুণ অন্যদিকে তেমনি সময়ের রাজনৈতিক প্রভাব। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, ১৯৪৭ সালে বাংলাবিভাগের পর উদ্বাস্তু মানুষের মনে সৃষ্ট বিরহ, ব্যথা, শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যন্ত্রণা ইত্যাদির যে প্রভাব, তা থেকে কিছুটা ‘রিলিফ’ পাওয়ার ক্ষেত্রে দর্শকের নির্জ্ঞান মন আশ্রয় নিয়েছিল উত্তম কুমারের সিনেমাতে। রহমানের সিনেমার দর্শকের মনে তেমনটি না ঘটলেও তারা পেয়ে যায়, বাংলাদেশের ‘হিরো’কে। সেক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে রহমান অভিনীত সিনেমার কাহিনি ও তার চরিত্র।
১৯৬১ সালে রহমান অভিনীত ‘হারানো দিন’ চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে কিছু বলা যাক। একজন সামন্ত শাসক অর্থাৎ জমিদার, পরিচয়হীন এক নারী আর কলেজপড়ুয়া একজন ছাত্রকে নিয়ে আবর্তিত হয়েছে সিনেমার মূল কাহিনি। জমিদার সেই নারীটিকে এক বেদে সর্দারের জিম্মা থেকে তার মনোরঞ্জনের জন্য অর্থ দিয়ে কিনে নেয়। কিন্তু নারীটি জমিদারের কাছে কিছুতেই পরাভূত হয় না। জমিদার জোর জবরদস্তি করলে সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। ফলে জমিদার তাকে প্রতিশ্রুতি দেয় যে, সে তার প্রতি জবরদস্তি করবে না। পাশাপাশি সে নারীটিকে আধুনিক শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে রুচিবান করে তোলে। সেই গাঁয়ের কলেজপড়ুয়া এক যুবকের সঙ্গে নারীটির প্রেম হয়। জমিদার তা মেনে না-নিয়ে যুবকটিকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করে এবং নারীটিকে ঘরবন্দি রাখে। একদিন সুযোগ বুঝে নারীটি ও যুবকটি পালিয়ে যায়। জমিদার তাদের পিস্তল হাতে ধাওয়া করে। তারা নৌকায় করে পালাতে থাকে, জমিদারও একটি নৌকায় তাদের পিছু নেয়। মাঝনদীতে জমিদারের নৌকায় পানি ওঠে এবং সে নদীতে ডুবে মরে। এই কাহিনিতে জমিদার চরিত্রে গোলাম মুস্তাফা, যুবক চরিত্রে রহমান ও নারী চরিত্রে শবনম অভিনয় করেন।
ষাটের দশকের শুরুর একটি বাংলা চলচ্চিত্রের কাহিনি এটি। এই কাহিনি একই সঙ্গে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ উভয়কে সমানতালে উপস্থাপন করেছে। জমিদারের আর্থিক ও সামাজিক ক্ষমতা থাকার পরেও একটি নারী তাকে পাত্তা দিচ্ছে না। এটা সামন্ত শাসন কিংবা জমিদারের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবকে গুড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এর বিপরীতে নারীটি বেছে নিয়েছে কলেজপড়ুয়া জমিদারের সাধারণ প্রজাকে। ফলে ব্যক্তি স্বাধীনতার এক চরমতম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে নারীটির এই সিদ্ধান্তে| স্বাভাবিকভাবে জমিদার তা মানতে পারেনি। কিন্তু জমিদারের সৃষ্ট ভয়ভীতিকেও তারা মানে প্রেমিকযুগল পাত্তা দেয়নি। জমিদারের আশ্রিতা, যার প্রতি সে প্রেম কামনা করে তাকে নিয়ে তারই এক প্রজা প্রেম করছে, রাত-বিরাতে গোপনে অভিসারে সময় কাটাচ্ছে এবং পরিশেষে পালিয়ে যাচ্ছে—এটা তো একধরনের বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত।
অর্থাৎ সামন্ত শাসন ব্যবস্থাকে সরাসরি গুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা। জমিদারকে গুড়িয়ে দেওয়ার কাজটি যে ব্যক্তি পর্দায় করলেন তিনি নায়ক রহমান। ফলে নায়কোচিত ঘটনার সঙ্গে বাঙালি দর্শকের পরিচয় ঘটে গেল। যে সিনেমায় কোনো অ্যাকশন দৃশ্য নেই, সেই সিনেমাই সবচেয়ে বড়ো বিপ্লবের চিত্রটা দর্শকের মনে গেঁথে দিল। নায়ক রহমান প্রজা হয়েও জমিদারের আকাঙ্ক্ষার প্রেমিকাকে নিয়ে পালিয়ে গেল। এর চেয়ে সিনেম্যাটিক ও রোমাঞ্চকর অনুভূতি দর্শকের কাছে আর কি-বা হতে পারে! ফলে দর্শকের জ্ঞান ও নির্জ্ঞান মনের উভয় স্তরে নায়ক রহমান তো সত্যিকারের ‘হিরো’ হয়েই টিকে গেল। আর সেই সঙ্গে জুটি হিসেবে যুক্ত হয়ে গেল নায়িকা শবনম।

এই জুটি উপহার দিল অন্যতম হিট সিনেমা তালাশ (১৯৬৩)। এই সিনেমায় নায়ক রহমান আবারও নিম্নজীবী ও মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি হিসেবে পর্দায় রূপদান করেন। চলচ্চিত্রের কাহিনিতে সে থাকে এক রিকশাওয়ালার পুত্র। বাল্যকালে ঢাকা শহরে পিতাকে হারিয়ে তার মাসহ আশ্রয় পায় এক জর্জ সাহেবের বাসায়। আর সেই জর্জ সাহেবের নাতি পরিচয়ে প্রাচুর্যের মধ্যে বড়ো হতে থাকে সে। কলেজে তার সহপাঠী, ধনবানের কন্যা শবনমের সঙ্গে তার প্রেম হয়। যখন তাদের বিয়ে পাকাপাকি তখন তার প্রকৃত পৈতৃক পরিচয় ফাঁস হয়। রিকশাওয়ালার ছেলের সঙ্গে শবনমের পিতা মেয়ের বিয়েতে অসম্মতি জানায়। পরিশেষে তাদের মিলন হয়। এই চলচ্চিত্রে লক্ষ করা যায় যে, রহমান দ্বৈত আত্মপরিচয় নিয়ে থাকে। যেটি তার প্রকৃত পরিচয় সেটি সে জানে না, আর যেটি সে জানে সেটি প্রকৃত পরিচয় না। কিন্তু দর্শক দুটো পরিচয়ই জানে। নিম্নজীবী দর্শক যখন দেখছে, একজন রিকশাওয়ালার ছেলে হয়েও বড়লোকের ঘরে অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা পেয়ে প্রতিপালিত হওয়ার কারণে নায়ক চরিত্রটি সমাজের উচ্চবিত্ত ঘরের সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছে, কলেজে পড়ালেখা করেছ, বন্ধুদের সঙ্গে গাড়ি নিয়ে পিকনিক করছে তখন ওই দর্শক শ্রেণির মনে আশা সঞ্চারিত হয়। এবং তাদের না-পাওয়ার শূন্যতা চলচ্চিত্রের ওই চরিত্রটির মধ্য দিয়ে পুষিয়ে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়। কিন্তু যখন নায়ক চরিত্রটির প্রকৃত পরিচয় অর্থাৎ রিকশাওয়ালার ছেলে জানার পর নায়িকা শবনমের ধনবান পিতা বিয়েতে অসম্মতি জানায় তখন ওই নিম্নজীবী দর্শক শ্রেণিটি এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। যাকে বলা হয়, আইডেনটিটি ক্রাইসিস। যদি নায়ক তার হারানো পিতার পরিচয় অস্বীকার করে তাহলে সে বড়লোকের মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে, সবকিছু আগের মতোই চলবে, আর যদি সে তার জন্মদাতা পিতা অর্থাৎ রিকশাওয়ালার পুত্র পরিচয় গ্রহণ করে তবে সে তার প্রেমিকা ও সামাজিক অবস্থান হারাবে। এই যে সংকট, এটা দর্শককে এক ধরনের ক্যাথারসিসের সম্মুখীন করে। মানুষ তো শেষ পর্যন্ত আত্মপরিচয়েরই সন্ধান করে। আর চলচ্চিত্রের তালাশ নামকরণে সেটারই প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। এই সিনেমায় নায়ক রহমান যে চরিত্রটিতে অভিনয় করলেন, তা একই সঙ্গে সমাজের মধ্যবিত্ত ও নিম্নজীবী উভয়কেই ধারণ করল। ফলে রহমানের ‘হিরো’ ইমেজ আরও সম্প্রসারিত হলো।
রহমানের এই হিরো ইমেজের প্রচার ও প্রসার বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষার চলচ্চিত্রের দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়। ফলে নায়ক রহমান ষাটের দশকে বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষার চলচ্চিত্রের হিট নায়কে পরিণত হন। বাংলার মতো উর্দু চলচ্চিত্রেও তাঁর সঙ্গে জুটিবদ্ধ হলেন নায়িকা শবনম। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ১৯৬৫ সালে জহির রায়হান পরিচালিত উর্দু চলচ্চিত্র ‘বাহানা’তে অভিনয় করেন। খেয়াল করা দরকার যে, তখনও বাংলা চলচ্চিত্রে নায়ক রাজ্জাকের আবির্ভাব ঘটেনি। ফলে নায়ক রহমানই ছিলেন ইন্ডাস্ট্রির একমাত্র হিরো। ফলে ষাটের দশকে শবনম কিংবা কবরী সবাই নায়ক রহমানের সহশিল্পী হয়েছেন।

এবার রহমান অভিনীত ও খান আতা নির্মিত ষাটের দশকের আরেকটি চলচ্চিত্র ‘জোয়ার ভাটা’ (১৯৬৯) সম্পর্কে একটু আলোকপাত করা যাক। পূর্বের দুই চলচ্চিত্রে রহমানকে আমরা নির্দিষ্ট শ্রেণিভিত্তিক প্রতিনিধির চরিত্রে আত্মপরিচয়জনিত সংকট ও তার সমাধানের প্রেক্ষাপটে পেয়েছি। তবে তা কোনো অ্যাকশন ঘরানার মারমার কাটকাট দৃশ্য সংবলিত অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নয়। বরং উভয় চলচ্চিত্রে একজন প্রেমিকসত্তার সরব উপস্থিতির মধ্য দিয়ে সামাজিক বিভাজনকে ভাঙার চিত্র লক্ষ করা গেছে। ফলে যে দর্শক নিজেও সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে ফায়দা নেয়, সেও এই সিনেমায় নায়িকার সঙ্গে রহমানের সামাজিক-বন্ধন চায়। তো ‘জোয়ার ভাটা’ সিনেমায় রহমান উঠে এলেন শহর থেকে গ্রামে সেবাদানকারী একজন তরুণ চিকিৎসকের ভূমিকা নিয়ে। যে গ্রামে মানুষ চিকিৎসা বলতে হোমিওপ্যাথিকে বোঝে। ফলে সামাজিক সংস্কারের চিত্র ফুটিয়ে তোলার দায়িত্ব পেলেন তিনি। এই চলচ্চিত্রেও তার বিপরীতে থাকে নায়িকা শবনম। শবনমের সঙ্গে তরুণ চিকিৎসকের প্রেম আর গ্রামের মাতব্বরের তা মেনে না-নেওয়ার জন্য চালানো কূটকৌশলের বলি হয় সেই চিকিৎসক। এতে সে চাকুরিতে ইস্তফা দিয়ে ভিন্ন গ্রামে চলে যায়।
এখানে চিকিৎসক চরিত্রে রূপদানকারী নায়ক রহমানকে ভিলেজ পলিটিক্সের মুখোমুখি পড়তে হয়। যার একদিকে থাকে গ্রামের মাতব্বর চরিত্রটি, যে নিজের পুত্রের সঙ্গে নায়িকা শবনম চরিত্রটির বিয়ে দিতে চায়। আর অন্যদিকে থাকে তরুণ চিকিৎসক রহমান, যে শবনমের সঙ্গে প্রণয়ে-আবদ্ধ। এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে ষাটের দশকের বাংলার দর্শক কার পক্ষ নেবে? তো তরুণ চিকিৎসক চলচ্চিত্রে যে কিনা বলেছে, গ্রামের মানুষের চিকিৎসার জন্য সে শহর থেকে গ্রামে এসেছে— ফলে তার এই ডায়লগ স্বভাবতই হিরোইজমের সর্বোচ্চ রূপটাকেই দর্শকের মনে উদ্ভাসিত করেছে। বিশেষত যারা চলচ্চিত্রে দেখানো ওই গ্রামীণ পরিকাঠামোর দর্শক।
রহমান ষাটের দশকের যে পর্যায়ে এসব চরিত্র নিয়ে চলচ্চিত্রে নায়কের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছেন, তখনও বাংলা একটি গ্রামীণ জনপদের পরিচয় নিয়ে টিকে ছিল। ফলে সমাজে শ্রেণিগত দ্বন্দ্বের যে রূপ তা গ্রামীণ ও মফস্বলি পরিকাঠামোর কৃষিভিত্তিক সমাজের কৃষক বনাম জোতদার শ্রেণিটির মধ্যে বিদ্যমান ছিল। বাস্তবে বিদ্যমান এই দ্বন্দ্বে নায়ক যখন রিকশাওয়ালার ছেলে, কলেজপড়ুয়া প্রজা কিংবা শহর ছেড়ে গ্রামে আসা তরুণ চিকিৎসকের ভূমিকায় রূপ দান করে, তখন বিকাশমান চলচ্চিত্র সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে দর্শকদের সেই চরিত্রটিকে গ্রহণ না করে উপায় কি? আর বিশেষত বাংলা সিনেমার হিরো নামক সত্তাটির সঙ্গে পরিচয়ের প্রথম প্রহরে যখন তারা চোখ মেলে পর্দায় দেখছে নায়ক রহমানকে অন্তত সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলাই যায়, বিএফডিসির প্রথম হিরো রহমান, যাকে অনুসরণ করেছে পরবর্তী নায়কেরা।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

‘সিনেমার হিরো’ শব্দদ্বয় উচ্চারিত হলে যে ইমেজ দর্শকের মনে-মগজে ক্রিয়া করে, বিএফডিসির ক্ষেত্রে প্রথম সেই ব্যক্তিটি হলেন নায়ক আব্দুর রহমান (১৯৩৭-২০০৫)। বাংলা চলচ্চিত্র জগতের একেবারে গোড়ার দিকের নায়ক তিনি। যদিও তাঁর শুরু হয় ‘এদেশ তোমার আমার’ (১৯৫৯) চলচ্চিত্রে ‘নেগেটিভ’ চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। এই চলচ্চিত্রের পরিচালক ছিলেন এহতেশাম।
পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬০ সালে ‘রাজধানীর বুকে’ চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে রহমানের অভিষেক হয়। এই যে নায়কের পথে তাঁর যাত্রা শুরু হলো তা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটা ঘটনা বটে! কারণ তাঁর পূর্বে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে হিরোর ইমেজ নিয়ে একক কোনো ব্যক্তির প্রতিমূর্তি গড়ে ওঠেনি।
১৯৫৬ সালে ‘মুখ ও মুখোশ’ সিনেমার পর বাংলা ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণের যে যাত্রা শুরু হয়, ষাটের দশকের আগ পর্যন্ত সেখানে নায়কের একক কোনো নাম সেভাবে পাওয়া যায়নি। কারণ, দর্শক নির্দিষ্ট কোনো চরিত্রের ভেতর দিয়ে সিনেমার কাহিনির মোটিফ ধারণ করতে পারেনি। প্রায় পাঁচ বছর পর ১৯৬০ সালে বাংলাভাষী চলচ্চিত্রের দর্শকেরা সেই নামটি পেয়ে যান ‘রাজধানীর বুকে’ সিনেমা দিয়ে। এই সিনেমায় রহমানকে দর্শক হিরো হিসেবে পেয়ে যায়। ফলে হিরো হওয়ার অন্যতম যে শর্ত দর্শকের মনে ক্রিয়া করে অর্থাৎ হিরোইন থাকবে, সেটাও তারা পায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা সিনেমায় নায়ক রহমান নামটি উচ্চারিত হলে অবধারিতভাবে চলে আসে নায়িকা শবনম। অর্থাৎ রহমান-শবনম জুটির মধ্য দিয়ে বাংলাভাষী দর্শক নায়ক-নায়িকা নির্ভর চলচ্চিত্রের প্রথম পরিপূর্ণ স্বাদ পায়।
এই সিনেমার বিখ্যাত গান ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে’ বাংলা প্লেব্যাকের জগতে কাল্টক্লাসিক হয়। আর এক্ষেত্রে রহমান-শবনম বাংলা সিনেমায় কলকাতার উত্তম-সূচিত্রার একধরনের প্রতিমূর্তি হিসেবে হাজির হন। নায়ক রহমানকে তো বাংলাদেশের উত্তম কুমার হিসেবে তকমা দেওয়া হয়। উত্তম কুমার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্রের প্রায় এক দশক পর রহমানের অভিষেক ঘটে চলচ্চিত্রে। ফলে উত্তমকে অনুকরণ ও অনুসরণ করার প্রবণতা খুবই স্বাভাবিক| কারণ রহমানের আগে বাংলাদেশে নায়ক হিসেবে অন্য কেউ প্রতিষ্ঠিত হননি যাকে ঘিরে হিরোর ইমেজ গড়ে উঠবে। ফলে সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাঙালি তরুণ নায়ক রহমানের মধ্যে উত্তম কুমারের প্রভাব যেমন পড়তেই পারে, তেমনি দর্শকদেরও রহমানের মধ্যে উত্তমের ছায়া খোঁজার আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে।

কারণ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের বাংলা ভাষার চলচ্চিত্রে উত্তম কুমার বিবিধ কারণে প্রভাব বিস্তারী হয়ে ওঠেন। একদিকে যেমন তাঁর অভিনয় গুণ অন্যদিকে তেমনি সময়ের রাজনৈতিক প্রভাব। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, ১৯৪৭ সালে বাংলাবিভাগের পর উদ্বাস্তু মানুষের মনে সৃষ্ট বিরহ, ব্যথা, শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যন্ত্রণা ইত্যাদির যে প্রভাব, তা থেকে কিছুটা ‘রিলিফ’ পাওয়ার ক্ষেত্রে দর্শকের নির্জ্ঞান মন আশ্রয় নিয়েছিল উত্তম কুমারের সিনেমাতে। রহমানের সিনেমার দর্শকের মনে তেমনটি না ঘটলেও তারা পেয়ে যায়, বাংলাদেশের ‘হিরো’কে। সেক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে রহমান অভিনীত সিনেমার কাহিনি ও তার চরিত্র।
১৯৬১ সালে রহমান অভিনীত ‘হারানো দিন’ চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে কিছু বলা যাক। একজন সামন্ত শাসক অর্থাৎ জমিদার, পরিচয়হীন এক নারী আর কলেজপড়ুয়া একজন ছাত্রকে নিয়ে আবর্তিত হয়েছে সিনেমার মূল কাহিনি। জমিদার সেই নারীটিকে এক বেদে সর্দারের জিম্মা থেকে তার মনোরঞ্জনের জন্য অর্থ দিয়ে কিনে নেয়। কিন্তু নারীটি জমিদারের কাছে কিছুতেই পরাভূত হয় না। জমিদার জোর জবরদস্তি করলে সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। ফলে জমিদার তাকে প্রতিশ্রুতি দেয় যে, সে তার প্রতি জবরদস্তি করবে না। পাশাপাশি সে নারীটিকে আধুনিক শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে রুচিবান করে তোলে। সেই গাঁয়ের কলেজপড়ুয়া এক যুবকের সঙ্গে নারীটির প্রেম হয়। জমিদার তা মেনে না-নিয়ে যুবকটিকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করে এবং নারীটিকে ঘরবন্দি রাখে। একদিন সুযোগ বুঝে নারীটি ও যুবকটি পালিয়ে যায়। জমিদার তাদের পিস্তল হাতে ধাওয়া করে। তারা নৌকায় করে পালাতে থাকে, জমিদারও একটি নৌকায় তাদের পিছু নেয়। মাঝনদীতে জমিদারের নৌকায় পানি ওঠে এবং সে নদীতে ডুবে মরে। এই কাহিনিতে জমিদার চরিত্রে গোলাম মুস্তাফা, যুবক চরিত্রে রহমান ও নারী চরিত্রে শবনম অভিনয় করেন।
ষাটের দশকের শুরুর একটি বাংলা চলচ্চিত্রের কাহিনি এটি। এই কাহিনি একই সঙ্গে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ উভয়কে সমানতালে উপস্থাপন করেছে। জমিদারের আর্থিক ও সামাজিক ক্ষমতা থাকার পরেও একটি নারী তাকে পাত্তা দিচ্ছে না। এটা সামন্ত শাসন কিংবা জমিদারের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবকে গুড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এর বিপরীতে নারীটি বেছে নিয়েছে কলেজপড়ুয়া জমিদারের সাধারণ প্রজাকে। ফলে ব্যক্তি স্বাধীনতার এক চরমতম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে নারীটির এই সিদ্ধান্তে| স্বাভাবিকভাবে জমিদার তা মানতে পারেনি। কিন্তু জমিদারের সৃষ্ট ভয়ভীতিকেও তারা মানে প্রেমিকযুগল পাত্তা দেয়নি। জমিদারের আশ্রিতা, যার প্রতি সে প্রেম কামনা করে তাকে নিয়ে তারই এক প্রজা প্রেম করছে, রাত-বিরাতে গোপনে অভিসারে সময় কাটাচ্ছে এবং পরিশেষে পালিয়ে যাচ্ছে—এটা তো একধরনের বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত।
অর্থাৎ সামন্ত শাসন ব্যবস্থাকে সরাসরি গুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা। জমিদারকে গুড়িয়ে দেওয়ার কাজটি যে ব্যক্তি পর্দায় করলেন তিনি নায়ক রহমান। ফলে নায়কোচিত ঘটনার সঙ্গে বাঙালি দর্শকের পরিচয় ঘটে গেল। যে সিনেমায় কোনো অ্যাকশন দৃশ্য নেই, সেই সিনেমাই সবচেয়ে বড়ো বিপ্লবের চিত্রটা দর্শকের মনে গেঁথে দিল। নায়ক রহমান প্রজা হয়েও জমিদারের আকাঙ্ক্ষার প্রেমিকাকে নিয়ে পালিয়ে গেল। এর চেয়ে সিনেম্যাটিক ও রোমাঞ্চকর অনুভূতি দর্শকের কাছে আর কি-বা হতে পারে! ফলে দর্শকের জ্ঞান ও নির্জ্ঞান মনের উভয় স্তরে নায়ক রহমান তো সত্যিকারের ‘হিরো’ হয়েই টিকে গেল। আর সেই সঙ্গে জুটি হিসেবে যুক্ত হয়ে গেল নায়িকা শবনম।

এই জুটি উপহার দিল অন্যতম হিট সিনেমা তালাশ (১৯৬৩)। এই সিনেমায় নায়ক রহমান আবারও নিম্নজীবী ও মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি হিসেবে পর্দায় রূপদান করেন। চলচ্চিত্রের কাহিনিতে সে থাকে এক রিকশাওয়ালার পুত্র। বাল্যকালে ঢাকা শহরে পিতাকে হারিয়ে তার মাসহ আশ্রয় পায় এক জর্জ সাহেবের বাসায়। আর সেই জর্জ সাহেবের নাতি পরিচয়ে প্রাচুর্যের মধ্যে বড়ো হতে থাকে সে। কলেজে তার সহপাঠী, ধনবানের কন্যা শবনমের সঙ্গে তার প্রেম হয়। যখন তাদের বিয়ে পাকাপাকি তখন তার প্রকৃত পৈতৃক পরিচয় ফাঁস হয়। রিকশাওয়ালার ছেলের সঙ্গে শবনমের পিতা মেয়ের বিয়েতে অসম্মতি জানায়। পরিশেষে তাদের মিলন হয়। এই চলচ্চিত্রে লক্ষ করা যায় যে, রহমান দ্বৈত আত্মপরিচয় নিয়ে থাকে। যেটি তার প্রকৃত পরিচয় সেটি সে জানে না, আর যেটি সে জানে সেটি প্রকৃত পরিচয় না। কিন্তু দর্শক দুটো পরিচয়ই জানে। নিম্নজীবী দর্শক যখন দেখছে, একজন রিকশাওয়ালার ছেলে হয়েও বড়লোকের ঘরে অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা পেয়ে প্রতিপালিত হওয়ার কারণে নায়ক চরিত্রটি সমাজের উচ্চবিত্ত ঘরের সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছে, কলেজে পড়ালেখা করেছ, বন্ধুদের সঙ্গে গাড়ি নিয়ে পিকনিক করছে তখন ওই দর্শক শ্রেণির মনে আশা সঞ্চারিত হয়। এবং তাদের না-পাওয়ার শূন্যতা চলচ্চিত্রের ওই চরিত্রটির মধ্য দিয়ে পুষিয়ে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়। কিন্তু যখন নায়ক চরিত্রটির প্রকৃত পরিচয় অর্থাৎ রিকশাওয়ালার ছেলে জানার পর নায়িকা শবনমের ধনবান পিতা বিয়েতে অসম্মতি জানায় তখন ওই নিম্নজীবী দর্শক শ্রেণিটি এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। যাকে বলা হয়, আইডেনটিটি ক্রাইসিস। যদি নায়ক তার হারানো পিতার পরিচয় অস্বীকার করে তাহলে সে বড়লোকের মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে, সবকিছু আগের মতোই চলবে, আর যদি সে তার জন্মদাতা পিতা অর্থাৎ রিকশাওয়ালার পুত্র পরিচয় গ্রহণ করে তবে সে তার প্রেমিকা ও সামাজিক অবস্থান হারাবে। এই যে সংকট, এটা দর্শককে এক ধরনের ক্যাথারসিসের সম্মুখীন করে। মানুষ তো শেষ পর্যন্ত আত্মপরিচয়েরই সন্ধান করে। আর চলচ্চিত্রের তালাশ নামকরণে সেটারই প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। এই সিনেমায় নায়ক রহমান যে চরিত্রটিতে অভিনয় করলেন, তা একই সঙ্গে সমাজের মধ্যবিত্ত ও নিম্নজীবী উভয়কেই ধারণ করল। ফলে রহমানের ‘হিরো’ ইমেজ আরও সম্প্রসারিত হলো।
রহমানের এই হিরো ইমেজের প্রচার ও প্রসার বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষার চলচ্চিত্রের দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়। ফলে নায়ক রহমান ষাটের দশকে বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষার চলচ্চিত্রের হিট নায়কে পরিণত হন। বাংলার মতো উর্দু চলচ্চিত্রেও তাঁর সঙ্গে জুটিবদ্ধ হলেন নায়িকা শবনম। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ১৯৬৫ সালে জহির রায়হান পরিচালিত উর্দু চলচ্চিত্র ‘বাহানা’তে অভিনয় করেন। খেয়াল করা দরকার যে, তখনও বাংলা চলচ্চিত্রে নায়ক রাজ্জাকের আবির্ভাব ঘটেনি। ফলে নায়ক রহমানই ছিলেন ইন্ডাস্ট্রির একমাত্র হিরো। ফলে ষাটের দশকে শবনম কিংবা কবরী সবাই নায়ক রহমানের সহশিল্পী হয়েছেন।

এবার রহমান অভিনীত ও খান আতা নির্মিত ষাটের দশকের আরেকটি চলচ্চিত্র ‘জোয়ার ভাটা’ (১৯৬৯) সম্পর্কে একটু আলোকপাত করা যাক। পূর্বের দুই চলচ্চিত্রে রহমানকে আমরা নির্দিষ্ট শ্রেণিভিত্তিক প্রতিনিধির চরিত্রে আত্মপরিচয়জনিত সংকট ও তার সমাধানের প্রেক্ষাপটে পেয়েছি। তবে তা কোনো অ্যাকশন ঘরানার মারমার কাটকাট দৃশ্য সংবলিত অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নয়। বরং উভয় চলচ্চিত্রে একজন প্রেমিকসত্তার সরব উপস্থিতির মধ্য দিয়ে সামাজিক বিভাজনকে ভাঙার চিত্র লক্ষ করা গেছে। ফলে যে দর্শক নিজেও সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে ফায়দা নেয়, সেও এই সিনেমায় নায়িকার সঙ্গে রহমানের সামাজিক-বন্ধন চায়। তো ‘জোয়ার ভাটা’ সিনেমায় রহমান উঠে এলেন শহর থেকে গ্রামে সেবাদানকারী একজন তরুণ চিকিৎসকের ভূমিকা নিয়ে। যে গ্রামে মানুষ চিকিৎসা বলতে হোমিওপ্যাথিকে বোঝে। ফলে সামাজিক সংস্কারের চিত্র ফুটিয়ে তোলার দায়িত্ব পেলেন তিনি। এই চলচ্চিত্রেও তার বিপরীতে থাকে নায়িকা শবনম। শবনমের সঙ্গে তরুণ চিকিৎসকের প্রেম আর গ্রামের মাতব্বরের তা মেনে না-নেওয়ার জন্য চালানো কূটকৌশলের বলি হয় সেই চিকিৎসক। এতে সে চাকুরিতে ইস্তফা দিয়ে ভিন্ন গ্রামে চলে যায়।
এখানে চিকিৎসক চরিত্রে রূপদানকারী নায়ক রহমানকে ভিলেজ পলিটিক্সের মুখোমুখি পড়তে হয়। যার একদিকে থাকে গ্রামের মাতব্বর চরিত্রটি, যে নিজের পুত্রের সঙ্গে নায়িকা শবনম চরিত্রটির বিয়ে দিতে চায়। আর অন্যদিকে থাকে তরুণ চিকিৎসক রহমান, যে শবনমের সঙ্গে প্রণয়ে-আবদ্ধ। এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে ষাটের দশকের বাংলার দর্শক কার পক্ষ নেবে? তো তরুণ চিকিৎসক চলচ্চিত্রে যে কিনা বলেছে, গ্রামের মানুষের চিকিৎসার জন্য সে শহর থেকে গ্রামে এসেছে— ফলে তার এই ডায়লগ স্বভাবতই হিরোইজমের সর্বোচ্চ রূপটাকেই দর্শকের মনে উদ্ভাসিত করেছে। বিশেষত যারা চলচ্চিত্রে দেখানো ওই গ্রামীণ পরিকাঠামোর দর্শক।
রহমান ষাটের দশকের যে পর্যায়ে এসব চরিত্র নিয়ে চলচ্চিত্রে নায়কের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছেন, তখনও বাংলা একটি গ্রামীণ জনপদের পরিচয় নিয়ে টিকে ছিল। ফলে সমাজে শ্রেণিগত দ্বন্দ্বের যে রূপ তা গ্রামীণ ও মফস্বলি পরিকাঠামোর কৃষিভিত্তিক সমাজের কৃষক বনাম জোতদার শ্রেণিটির মধ্যে বিদ্যমান ছিল। বাস্তবে বিদ্যমান এই দ্বন্দ্বে নায়ক যখন রিকশাওয়ালার ছেলে, কলেজপড়ুয়া প্রজা কিংবা শহর ছেড়ে গ্রামে আসা তরুণ চিকিৎসকের ভূমিকায় রূপ দান করে, তখন বিকাশমান চলচ্চিত্র সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে দর্শকদের সেই চরিত্রটিকে গ্রহণ না করে উপায় কি? আর বিশেষত বাংলা সিনেমার হিরো নামক সত্তাটির সঙ্গে পরিচয়ের প্রথম প্রহরে যখন তারা চোখ মেলে পর্দায় দেখছে নায়ক রহমানকে অন্তত সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলাই যায়, বিএফডিসির প্রথম হিরো রহমান, যাকে অনুসরণ করেছে পরবর্তী নায়কেরা।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
.png)

ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আয়োজন ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ। আগে যেখানে ৩২ দেশ অংশ নিত, এবার সেখানে খেলেছে ৪৮ দেশ। স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে দর্শকের সংখ্যাও।
২০ ঘণ্টা আগে
অফিসের বসকে একটা তথ্য জানাতে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করলাম। তিনি কিছু না বলে একটা ‘থাম্বস আপ’ বা লাইক ইমোজি পাঠালেন। ধরে নিলাম, তিনি কাজটি অনুমোদন করেছেন বা সম্মতি জানিয়েছেন। অথচ কিছুদিন আগে এই ‘লাইক’ পাঠানো নিয়েই একচোট ঝগড়া হয়ে গেল বরের সঙ্গে।
১ দিন আগে
গত দুই দশকে চীনা ভাষার ব্যবহারিক গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। চীন আজ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অংশীদার। দুই দেশের সহযোগিতা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে চীনা ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন জনশক্তির চাহিদা। কর্মজীবনে আমি সেই চাহিদা পূরণে সামান্য হলেও ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি।
১৭ জুলাই ২০২৬
ইতিহাস কখনও একটি দৃশ্য থেকেও জন্ম নেয়। ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে আবু সাঈদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার মুহূর্তটি তেমনই এক দৃশ্য। দৃশ্যটি দেখার পর সারা দেশের মানুষ যেন একদিকে হেলে পড়েছিল।
১৭ জুলাই ২০২৬