সায়েন্সের প্রতিবেদন

ইউনিসেফের সতর্কতা সত্ত্বেও হামের টিকা কেনা স্থগিত করেছিল ইউনূস সরকার

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ১৮: ৫০
রাজধানীর একটি হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত ৩২ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং ২৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ছবি: সায়েন্স

ইউনিসেফ সতর্ক করার পরেও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার গ্লোবাল ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের (গ্যাভি) মাধ্যমে হাম-রুবেলার টিকা কেনা স্থগিত করেছিল। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এটি কিনতে চেয়েছিল। কিন্তু তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘সায়েন্স সাময়িকী’ বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পরবর্তীতে টিকার সংকটে বাংলাদেশে হামের বিস্তার ঘটেছে।

বাংলাদেশে ৯ ও ১৫ মাস বয়সে শিশুদের হাম-রুবেলার (এমআর) দুটি ডোজ টিকা দেওয়া হয়। এরপর প্রতি চার বছর অন্তর দেশজুড়ে ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বাদ পড়া শিশুদের টিকা দিয়ে ৯৫ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরের পর বছর ইউনিসেফ এই টিকা সরবরাহ করে আসছিল। বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি এর বড় অংশের অর্থায়ন করত গ্যাভি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করে।

সরকারের এই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছিল ইউনিসেফ। বাংলাদেশে সংস্থাটির প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স সে সময় সতর্ক করেছিলেন, উন্মুক্ত দরপত্রে টিকা পেতে সময় লাগবে। এতে টিকাদান ব্যাহত হলে প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে বারবার সতর্ক করার কথা স্মরণ করে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেছেন, ‘আমি বলেছিলাম– সৃষ্টিকর্তার দোহাই। এই কাজটি করবেন না।’ তিনি বলেন, ‘কেন সে সময় হঠাৎ করে ক্রয় প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা হয়েছিল, তার তদন্ত হওয়া দরকার।’ তবে সায়েন্স যোগাযোগ করলে নূরজাহান বেগম এই ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি।

সায়েন্স বলেছে, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে হাম-রুবেলার (এমআর) টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে পরের বছর দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ওই বছর পুরো টিকাদান বাতিল করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালে ৫৯ শতাংশ শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হলেও, পরে তা সরিয়ে নেওয়া হয়।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে প্রথম হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয় এবং দ্রুত তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে ৫৮ জেলায় হাম ছড়িয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২১ হাজারের বেশি রোগী।

গত ২৩ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে বলেছে, মিয়ানমার এবং ভারতেও এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অন্তর্বর্তী সরকার ছাড়াও ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারকেও বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেছেন।

তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দীন হায়দার জানিয়েছেন, গত এপ্রিলে ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা শুরু হয়েছে। ডব্লিউএইচও এবং গ্যাভির সঙ্গে সমন্বয় করে সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। এরপর ৫ এপ্রিল ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং ২০ এপ্রিল সারা দেশে জরুরি টিকাদান শুরু হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ছিলেন অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। সায়েন্সকে তিনি বলেছেন, আগের ক্রয় ব্যবস্থাটি আইনের জরুরি ধারার ওপর ভিত্তি করে চলত, যা পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্যই সরকার একটি নিয়মভিত্তিক দরপত্র ব্যবস্থায় যেতে চেয়েছিল। তবে কেন এই প্রক্রিয়ায় যাওয়া সম্ভব হয়নি, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি ডা. সায়েদুর রহমান।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত