রাজীব নন্দী

মে দিবস এলেই মনে গুঞ্জরিত হয় এক অদ্ভুত সুর। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কণ্ঠে সেই কালজয়ী গান– জন হেনরি। পশ্চিম ভার্জিনিয়ার পাহাড় কাঁপিয়ে হাতুড়ি চালানো ‘কালো নিগার’ জন হেনরি। যার সামনে বাষ্পচালিত ড্রিল মেশিন, পেছনে দাঁড়িয়ে তার কচি ফুল মেয়েটি। মাঝখানে এক অদৃশ্য প্রশ্ন– হেনরির পেশি আর হাতুড়ি টিকবে, না মেশিন?
সেই লোকগাথা আজকের দিনে এসে যেন নতুন অর্থ খুঁজে পায়। কারণ ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের চারপাশে যে (অতি) বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেখানে প্রতিটি নিউজরুম, প্রতিটি ল্যাপটপ, প্রতিটি ফোনের স্ক্রিনে লুকিয়ে আছে সেই একই প্রতিযোগিতা– মানুষ বনাম মেশিন। সংবাদ সর্দারকে উদ্দেশ করে আজ সংবাদ শ্রমিকদের বলার দিন– মেশিন মেশিন মেশিন, তোমার কি মন নাই, মালিক? মালিক যদি রবীন্দ্রপ্রেমী হন, ভিন্ন কথা। হয়তো বলে উঠবেন– বাঙালির ভাবকাব্যের ডিকশনারি রবিবুড়ো সেই কবে বলেছেন– AI তবে সহচরী, হাতে হাতে ধরি ধরি!
এআই কি সত্যিই সংবাদ শ্রমিকের সহচর! যার হাতে হাতে (পড়ুন মোবাইলে স্ক্রলে স্ক্রলে) ধরাধরি করে চলা যায়? নাকি এআই একটা সময়ের দায়। নিউ মিডিয়ার আলোচনায় ম্যানুয়েল কাস্টেলসের ‘নেটওয়ার্ক সোসাইটি’ এবং হেনরি জেনকিন্সের ‘কনভার্জেন্স কালচার’ ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কাস্টেলস দেখান, তথ্যপ্রবাহ এখন কেন্দ্রীভূত প্রতিষ্ঠান থেকে সরে গিয়ে নেটওয়ার্কভিত্তিক হয়ে উঠেছে– যেখানে ক্ষমতা নির্ধারিত হয় কে তথ্য উৎপাদন ও প্রচারের নেটওয়ার্কে কতটা প্রভাবশালী, তার ওপর। অন্যদিকে জেনকিন্সের মতে, পুরোনো ও নতুন মাধ্যমের মিশ্রণে এমন এক অংশগ্রহণমূলক সংস্কৃতি তৈরি হয়, যেখানে দর্শকও হয়ে ওঠে কনটেন্ট নির্মাতা। বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় এই দুই প্রবণতা একসঙ্গে কাজ করছে– একদিকে প্রচলিত নিউজরুম এখনও তথ্যের প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা ধরে রাখে, অন্যদিকে ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা অনলাইন পোর্টাল নাগরিক সাংবাদিকতা ও তাৎক্ষণিকতা এনে দেয়। এই প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হয়ে তৈরি করছে এক ধরনের ‘দোঁআশলা’ বা হাইব্রিড মিডিয়া বাস্তবতা, যেখানে মানব সাংবাদিকতা, অ্যালগরিদমিক কনটেন্ট উৎপাদন এবং ব্যবহারকারীর অংশগ্রহণ– তিনটিই মিলেমিশে নতুন এক সংবাদ পরিবেশ গড়ে তুলছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ কিংবা সংবাদকক্ষ, ওল্ড মিডিয়া বনাম নিউ মিডিয়ার পরিবর্তনটাকে এখন খুব কাছ থেকে দেখা যায়। ক’বছর আগেও যেখানে রিপোর্ট বা অ্যাসাইনমেন্ট লেখা মানে ছিল তথ্য জোগাড়, ভাষা গঠন, সম্পাদনার ধৈর্য, ভাষার গাঁথুনি—সেখানে এখন কায়দা করে কয়েকটি নির্দেশনা দিলেই কৃত্রিম বুদ্ধির টুল মুহূর্তে তৈরি করে ফেলছে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট। আবার অনুগত ভৃত্যের মতো জিজ্ঞাসা করে, আমি কি আপনাকে এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত বলব? বা তুমি বললেই আমি পরের লেভেলের thesis material বানিয়ে দেব! এমন গতি নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ, কিন্তু সেই চমকের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক ধরনের নীরব অস্বস্তি। কারণ প্রশ্নটা কেবল দক্ষতার নয়– প্রশ্নটা অস্তিত্বের। বলিউডের ‘রোবট’ সিনেমার রজনীকান্তের ‘চিট্টি’ চরিত্রের আত্মবিধ্বংসী রূপ তো দেখেছি; তাই কারখানাপোড়া শ্রমিক, ইঞ্জিন দেখলে ভয় পাই।
গণমাধ্যম এমনিতেই দীর্ঘদিন নানা সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। করপোরেট মালিকানার চাপ, শ্রম শোষণ, স্বল্পমজুরির চাকরি, মজুরিবিহীন চাকরি, অনিশ্চিত পেশাজীবন, ঝুঁকি, রাজনৈতিক চাপ, ক্লিকনির্ভর কনটেন্ট, অ্যালগরিদমের প্রভাব– সব মিলিয়ে ‘গণমাধ্যম’ শব্দটির ভেতরকার ‘গণ’ যেন ক্রমে ক্ষীণ হয়ে এসেছে। তার ওপর যেন হা-রে-রে করে হাজির হওয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘শুভেচ্ছা স্বাগতম’ পর্ব সেই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত আমার একটি মন্তব্য কলামে আশঙ্কা করেছিলাম—এআই সাংবাদিকতাকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা গভীর পর্যবেক্ষণের বিষয় (‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা– নহি যন্ত্র নহি যন্ত্র… আমি সাংবাদিক’; সমকাল, ২৩ জুলাই ২০২৩)। আজ, তিন বছর পর দাঁড়িয়ে মনে হয়, আমরা এখন পরিবর্তনের ভেতরেই বাস করছি। প্রথাগত সাংবাদিকতার বিদায়ক্ষণ যেন ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের শেষে এসে উচ্চারণের মতো– ‘পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে কালের যাত্রায়। হে বন্ধু, বিদায়।’
এআই সংবাদ উপস্থাপকদের আত্মপ্রকাশ সেই বাস্তবতার এক প্রতীকী মুহূর্ত। পর্দায় ভেসে ওঠে একটি নিখুঁত, নির্ভুল, ক্লান্তিহীন কণ্ঠ– যার কোনো আবেগ নেই, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নেই, কিন্তু তথ্য পরিবেশনে কোনো ঘাটতিও নেই। এই দৃশ্য আমাদের একদিকে বিস্মিত করছে, অন্যদিকে অস্বস্তিতে ফেলছে। কারণ, রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়িয়ে আমরা বুঝতে শুরু করেছি– সংবাদ পরিবেশনে মানুষের উপস্থিতি হয়তো আর অপরিহার্য নয়। শ্রেণিকক্ষ বা বার্তাকক্ষে নতুন প্রজন্মের অর্জুন এসে বুড়ো ভীষ্মকে বলছে– ‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও’?
শুনতে পাই বা না শোনার জন্য কান চেপে ধরি– কালে কালে এসে হাজির হয় মে দিবস। মে দিবসে প্রশ্নটি নতুনভাবে সামনে আসে। ঐতিহাসিকভাবে মে দিবস কায়িক শ্রমের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের প্রতীক। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় লড়াইয়ের পরিসর বদলে গেছে। এখন আর শুধু কারখানার শ্রমিক নয়; নিউজরুমের সাংবাদিক, কনটেন্ট নির্মাতা, এমনকি গবেষকরাও এক নতুন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি। যন্ত্র এখন শুধু পেশিশক্তির বিকল্প নয়; এটি বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমেরও অংশীদার এবং কখনো কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী। সংবাদ সর্দার দশজনকে ছাঁটাই করে পত্র ধরিয়ে দেয় হাতে। যাতে লেখা থাকে– ‘তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান; গ্রহণ করেছ যত– ঋণী তত করেছ আমায়। হে বন্ধু, বিদায়’।
বার্তাকক্ষ বা শ্রেণিকক্ষ থেকে যে প্রবীণরা এভাবে ‘অচল’ হয়ে বিদায় নিচ্ছেন, সেটা হঠাৎ নয়। সাংবাদিকতা ও প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণায় এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত অনেক আগেই পাওয়া গিয়েছিল। চার্লি বেকেটের নেতৃত্বে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের ২০১৯ সালের গবেষণা ‘নিউ পাওয়ার্স, নিউ রেসপন্সিবিলিটিস’ দেখিয়েছিল, এআই সাংবাদিকতার কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটাবে। নিক ডায়াকোপোলাস তার ‘অটোমেটিং দি নিউজ’ গ্রন্থে বিশ্লেষণ করেছেন, কীভাবে অ্যালগরিদম সংবাদ তৈরি ও বাছাইয়ের প্রক্রিয়া পুনর্গঠন করছে। একই সঙ্গে শোশানা জুবফের ‘সারভাইল্যান্স ক্যাপিটালিজম বা নজরদারি পুঁজিবাদ’ ধারণা মনে করিয়ে দেয়– এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও ক্ষমতার কাঠামো। অর্থাৎ এআই কেবল প্রযুক্তি নয়; এটি নতুন বাস্তবতা, যেখানে তথ্য, পুঁজি ও অ্যালগরিদম একসঙ্গে কাজ করছে।
কভিড-পরবর্তী সময়ে সংবাদমাধ্যম যখন আর্থিক অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকটে ভুগছে, তখন এআই মালিকপক্ষের জন্য এক আকর্ষণীয় সমাধান হিসেবে হাজির হয়েছে। একটি এআই সিস্টেম নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পারে, বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তার কোনো শ্রমিক অধিকার নেই। এই বাস্তবতা আমাদের আবারও মে দিবসের মূল প্রশ্নে ফিরিয়ে আনে– শ্রমের মূল্য কোথায় নির্ধারিত হবে?
এই প্রেক্ষাপটে জন হেনরির গল্পটি (গান) কেবল লোককাহিনি নয়; একটি প্রতীক। তিনি জানতেন, মেশিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা মানে কেবল জয়-পরাজয়ের প্রশ্ন নয়; এটি আত্মমর্যাদারও প্রশ্ন। আজকের সাংবাদিকতার জগতেও সেই একই প্রশ্ন ফিরে আসে। আমরা কি কেবল দ্রুততার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করব; নাকি অর্থবোধ, প্রেক্ষিত ও মানবিকতার জায়গাটি ধরে রাখব?
নয়া মাধ্যম এই আলোচনায় একটি জটিল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে। হেনরি জেনকিন্সের ‘কনভারজেন্স কালচার’ ধারণা দেখায়, কীভাবে পুরোনো ও নতুন মাধ্যম একত্র হয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক সংস্কৃতি তৈরি করে। কিন্তু এআই এই অংশগ্রহণকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। এখন কনটেন্ট তৈরি করছে মানুষ, মেশিন কিংবা কখনো দুজনের যৌথ প্রচেষ্টা। ফলে প্রশ্নটি আর কেবল ‘কে বলছে’ নয়; বরং ‘কীভাবে বলা হচ্ছে’ এবং ‘কার স্বার্থে বলা হচ্ছে’– এই জায়গায় এসে দাঁড়ায়।
সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ তাই হয়তো একমুখী নয়। এটি পুরোপুরি মানুষকেন্দ্রিক থাকবে না, আবার পুরোপুরি যন্ত্রনির্ভরও হবে না। বরং এক ধরনের হাইব্রিড বা বলাই যায় দোআঁশলা বাস্তবতা তৈরি হবে, যেখানে যন্ত্র তথ্য প্রক্রিয়াজাত করবে আর মানুষ সেই তথ্যের অর্থ নির্মাণ করবে। বিভাজনটি যতটা সহজ শোনায়, বাস্তবে অবশ্য ততটা নয়। কারণ অর্থ নির্মাণের ক্ষমতাও ধীরে ধীরে প্রযুক্তির আওতায় চলে আসছে। তবু এখানেই মানুষের জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ তুলে ধরা– এসব ক্ষেত্র এখনো সম্পূর্ণভাবে অ্যালগরিদমিক হয়ে ওঠেনি। এবং সম্ভবত এগুলোই ভবিষ্যতের সাংবাদিকতার আসল শক্তি হয়ে থাকবে। যখন এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে গাইতে হয়– ‘মোর লাগি করিয়ো না শোক– আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক’।
বিশ্বলোকে ছড়িয়ে পড়া শ্রমসংহতির মে দিবস আমাদের শিখিয়েছে– সংগ্রাম কখনো থামে না; কেবল তার রূপ বদলায়। আজকের সংগ্রামটি হয়তো আর কারখানার মেঝেতে দৃশ্যমান নয়; কিন্তু এটি প্রতিদিনের কাজের ভেতরে, প্রতিটি নিউজ কপির ভেতরে, প্রতিটি অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্তে লুকিয়ে আছে। এই সংগ্রামে জয়ী হতে হলে প্রযুক্তিকে অস্বীকারের সুযোগ নেই; বরং তাকে বোঝা, ব্যবহার করা এবং একই সঙ্গে তার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা জরুরি। প্রযুক্তি হবে আমাদের সহচরী, যাকে রাখা যায় ‘প্রমোদে ভরি দিবানিশি মনপ্রাণ’। তবে সপ্তম সুরে তান বাঁধার বদলে যেন কেবল ‘তৃতীয় সুর আর ষষ্ঠ সুর’ না হয়!
বার্তাকক্ষের ভেতরে এখন যেন এক নতুন চরিত্র ঢুকে পড়েছে– যামিনী চট্টোপাধ্যায়। যার দুটি মুড। যামিনী (জেমিনাই) যেন শান্ত, পর্যবেক্ষক ধরনের– সবকিছু চুপচাপ দেখে, ডেটার ভেতর ডুব দেয়, সময় নিয়ে উত্তর দেয়; যেন পুরোনো দিনের কোনো মনোযোগী গবেষক, সত্যজিতের সিধু জেঠা; যিনি তাড়াহুড়ো করেন না, কিন্তু বিশ্লেষণে গভীর। আর চট্টোপাধ্যায় (চ্যাটজিপিটি) একটু আলাদা– জটায়ুর মতো, তুখোড়, বাকপটু, মুহূর্তে লেখা সাজিয়ে ফেলতে পারে; যেন ব্যস্ত ডেস্কের সেই সাব-এডিটর, যার হাতে কপি দিলে চোখের পলকে তা প্রকাশযোগ্য হয়ে ওঠে, যিনি আবার অতি আত্মবিশ্বাসে ‘উঠের পাকস্থলি’ও করে দেন কখনো কখনো। যামিনী চট্টোপাধ্যায়ের এই উপস্থিতিতে পুরোনো সাংবাদিকদের মনে একটা চাপা প্রশ্ন ঘুরপাক খায়: আমরা কি এখন সহকর্মী, নাকি প্রতিদ্বন্দ্বী? এই যামিনী চট্টোপাধ্যায়ের উপস্থিতিই আসলে আজকের নিউজরুমের দোঁআশলা বাস্তবতার সবচেয়ে জীবন্ত রূপক। প্রযুক্তি নিজেকে হালনাগাদ করেছে; এবার মানুষ নিজেদের নবায়ন না করলে আফসোস করতে হবে ‘কেন যামিনী না যেতে জাগালে না, বেলা হল মরি লাজে’। উপায় না পেয়ে গাইতে হবে ‘শরমে জড়িত চরণে কেমনে চলিব পথেরি মাঝে’।
আজকের বিশ্বায়িত ডিজিটাল যুগে মার্কস ও এঙ্গেলসের শ্রম-পুঁজি দ্বন্দ্ব নতুন রূপে ফিরে এসেছে। সাংবাদিকতায় এখন অ্যালগরিদম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরাসরি শ্রমপ্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে খবর উৎপাদন দ্রুত, সস্তা ও বৈশ্বিক বাজারমুখি। ফলে শ্রমের চরিত্র বদলে গিয়ে ডেটানির্ভর বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমে পরিণত হয়েছে, আর সাংবাদিকরা পড়েছেন প্রযুক্তিনির্ভর পুঁজির চাপের মুখে। এই বাস্তবতায় মে দিবস মনে করিয়ে দেয়– মানুষ ও যন্ত্রের সম্পর্ক এখনও ক্ষমতা, মূল্য ও মর্যাদার প্রশ্নেই নির্ধারিত হয়। এরই বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিশ্বমাধ্যমে; বিবিসি ‘গুরুতর অর্থনৈতিক চাপ’ মোকাবিলায় ১৮০০ থেকে ২০০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছে, অর্থাৎ প্রতি দশজনের একজনের চাকরি ঝুঁকিতে। ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে আগামী দুই বছরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে কোনো চ্যানেল বা একাধিক সার্ভিস বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি। এই সংকোচন কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি দেখায়, বৈশ্বিক মিডিয়া অর্থনীতিতে প্রযুক্তি, পুঁজি ও শ্রমের সম্পর্ক কত দ্রুত ও নির্মমভাবে পুনর্গঠিত হচ্ছে।
বিবিসির এই ছাঁটাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বৈশ্বিক মিডিয়া শিল্পে চলমান বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। গত কয়েক বছরে একের পর এক বড় সংবাদমাধ্যম একই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। ২০২৩ সালে বাজফিড নিউজ পুরো নিউজ ডিভিশন বন্ধ করে দেয়, কারণ ডিজিটাল বিজ্ঞাপননির্ভর ব্যবসায়িক মডেল আর টেকসই থাকেনি। একইভাবে ভাইস মিডিয়া আর্থিক সংকটে পড়ে দেউলিয়া সুরক্ষার আবেদন করে এবং পরে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি তাদের সংবাদ কার্যক্রমও সংকুচিত করে।
প্রচলিত মূলধারার সংবাদমাধ্যমও এই চাপ থেকে মুক্ত নয়। সিএনএন ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে একাধিক ধাপে কর্মী ছাঁটাই করেছে; ডিজিটাল রূপান্তরের অজুহাতে নিউজরুম পুনর্গঠন করেছে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট -এ সাবস্ক্রিপশন প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় কর্মী ছাঁটাই ও বাইআউটের ঘটনা ঘটেছে; আর লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস ২০২৪ সালে একসঙ্গে শতাধিক সাংবাদিককে ছাঁটাই করে আলোচনায় আসে। অন্যদিকে গুগল ও মেটার মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের গণছাঁটাইও মিডিয়া খাতে পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করেছে। কারণ বৈশ্বিক বিজ্ঞাপন আয়ের বড় অংশ এখন এই প্ল্যাটফর্মগুলোর নিয়ন্ত্রণে।
সব মিলিয়ে এ ঘটনাগুলো দেখায়, সংকটটি কেবল সাময়িক অর্থনৈতিক নয়; এটি মিডিয়া অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর। বিজ্ঞাপন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সরে যাচ্ছে, অ্যালগরিদম কনটেন্টের দৃশ্যমানতা নিয়ন্ত্রণ করছে, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কনটেন্ট উৎপাদনকে আরও দ্রুত ও সস্তা করে তুলছে। ফলে খরচ কমানোর সহজতম পথ হিসেবে সংবাদমাধ্যমগুলো মানবশ্রমে কাটছাঁট করছে– যা শেষ পর্যন্ত মে দিবসের শ্রম ও মর্যাদার প্রশ্নকেই নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসে।
ফিরে যাই লেখার শুরুতে উল্লেখ করা জন হেনরির কাছে। ‘আমি মেশিনের হব প্রতিদ্বন্দ্বী’– উচ্চারণটি আজও প্রাসঙ্গিক। তবে এর অর্থ হয়তো বদলে গেছে। এটি আর নিছক প্রতিরোধের আহ্বান নয়; এটি এক ধরনের সচেতন সহাবস্থানের দাবি। যেখানে মানুষ তার সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে সামনে রেখে প্রযুক্তির সঙ্গে একটি নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলে। মে দিবসের এ নতুন পাঠই আমাদের সময়ের সবচেয়ে জরুরি সত্য– প্রযুক্তি বনাম মানুষের যুদ্ধে কেউ হারবে না; একে অপরকে নতুন করে নিজের জায়গা তৈরি করতে হবে।
লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক; নিউ মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ে গবেষক

মে দিবস এলেই মনে গুঞ্জরিত হয় এক অদ্ভুত সুর। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কণ্ঠে সেই কালজয়ী গান– জন হেনরি। পশ্চিম ভার্জিনিয়ার পাহাড় কাঁপিয়ে হাতুড়ি চালানো ‘কালো নিগার’ জন হেনরি। যার সামনে বাষ্পচালিত ড্রিল মেশিন, পেছনে দাঁড়িয়ে তার কচি ফুল মেয়েটি। মাঝখানে এক অদৃশ্য প্রশ্ন– হেনরির পেশি আর হাতুড়ি টিকবে, না মেশিন?
সেই লোকগাথা আজকের দিনে এসে যেন নতুন অর্থ খুঁজে পায়। কারণ ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের চারপাশে যে (অতি) বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেখানে প্রতিটি নিউজরুম, প্রতিটি ল্যাপটপ, প্রতিটি ফোনের স্ক্রিনে লুকিয়ে আছে সেই একই প্রতিযোগিতা– মানুষ বনাম মেশিন। সংবাদ সর্দারকে উদ্দেশ করে আজ সংবাদ শ্রমিকদের বলার দিন– মেশিন মেশিন মেশিন, তোমার কি মন নাই, মালিক? মালিক যদি রবীন্দ্রপ্রেমী হন, ভিন্ন কথা। হয়তো বলে উঠবেন– বাঙালির ভাবকাব্যের ডিকশনারি রবিবুড়ো সেই কবে বলেছেন– AI তবে সহচরী, হাতে হাতে ধরি ধরি!
এআই কি সত্যিই সংবাদ শ্রমিকের সহচর! যার হাতে হাতে (পড়ুন মোবাইলে স্ক্রলে স্ক্রলে) ধরাধরি করে চলা যায়? নাকি এআই একটা সময়ের দায়। নিউ মিডিয়ার আলোচনায় ম্যানুয়েল কাস্টেলসের ‘নেটওয়ার্ক সোসাইটি’ এবং হেনরি জেনকিন্সের ‘কনভার্জেন্স কালচার’ ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কাস্টেলস দেখান, তথ্যপ্রবাহ এখন কেন্দ্রীভূত প্রতিষ্ঠান থেকে সরে গিয়ে নেটওয়ার্কভিত্তিক হয়ে উঠেছে– যেখানে ক্ষমতা নির্ধারিত হয় কে তথ্য উৎপাদন ও প্রচারের নেটওয়ার্কে কতটা প্রভাবশালী, তার ওপর। অন্যদিকে জেনকিন্সের মতে, পুরোনো ও নতুন মাধ্যমের মিশ্রণে এমন এক অংশগ্রহণমূলক সংস্কৃতি তৈরি হয়, যেখানে দর্শকও হয়ে ওঠে কনটেন্ট নির্মাতা। বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় এই দুই প্রবণতা একসঙ্গে কাজ করছে– একদিকে প্রচলিত নিউজরুম এখনও তথ্যের প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা ধরে রাখে, অন্যদিকে ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা অনলাইন পোর্টাল নাগরিক সাংবাদিকতা ও তাৎক্ষণিকতা এনে দেয়। এই প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হয়ে তৈরি করছে এক ধরনের ‘দোঁআশলা’ বা হাইব্রিড মিডিয়া বাস্তবতা, যেখানে মানব সাংবাদিকতা, অ্যালগরিদমিক কনটেন্ট উৎপাদন এবং ব্যবহারকারীর অংশগ্রহণ– তিনটিই মিলেমিশে নতুন এক সংবাদ পরিবেশ গড়ে তুলছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ কিংবা সংবাদকক্ষ, ওল্ড মিডিয়া বনাম নিউ মিডিয়ার পরিবর্তনটাকে এখন খুব কাছ থেকে দেখা যায়। ক’বছর আগেও যেখানে রিপোর্ট বা অ্যাসাইনমেন্ট লেখা মানে ছিল তথ্য জোগাড়, ভাষা গঠন, সম্পাদনার ধৈর্য, ভাষার গাঁথুনি—সেখানে এখন কায়দা করে কয়েকটি নির্দেশনা দিলেই কৃত্রিম বুদ্ধির টুল মুহূর্তে তৈরি করে ফেলছে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট। আবার অনুগত ভৃত্যের মতো জিজ্ঞাসা করে, আমি কি আপনাকে এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত বলব? বা তুমি বললেই আমি পরের লেভেলের thesis material বানিয়ে দেব! এমন গতি নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ, কিন্তু সেই চমকের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক ধরনের নীরব অস্বস্তি। কারণ প্রশ্নটা কেবল দক্ষতার নয়– প্রশ্নটা অস্তিত্বের। বলিউডের ‘রোবট’ সিনেমার রজনীকান্তের ‘চিট্টি’ চরিত্রের আত্মবিধ্বংসী রূপ তো দেখেছি; তাই কারখানাপোড়া শ্রমিক, ইঞ্জিন দেখলে ভয় পাই।
গণমাধ্যম এমনিতেই দীর্ঘদিন নানা সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। করপোরেট মালিকানার চাপ, শ্রম শোষণ, স্বল্পমজুরির চাকরি, মজুরিবিহীন চাকরি, অনিশ্চিত পেশাজীবন, ঝুঁকি, রাজনৈতিক চাপ, ক্লিকনির্ভর কনটেন্ট, অ্যালগরিদমের প্রভাব– সব মিলিয়ে ‘গণমাধ্যম’ শব্দটির ভেতরকার ‘গণ’ যেন ক্রমে ক্ষীণ হয়ে এসেছে। তার ওপর যেন হা-রে-রে করে হাজির হওয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘শুভেচ্ছা স্বাগতম’ পর্ব সেই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত আমার একটি মন্তব্য কলামে আশঙ্কা করেছিলাম—এআই সাংবাদিকতাকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা গভীর পর্যবেক্ষণের বিষয় (‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা– নহি যন্ত্র নহি যন্ত্র… আমি সাংবাদিক’; সমকাল, ২৩ জুলাই ২০২৩)। আজ, তিন বছর পর দাঁড়িয়ে মনে হয়, আমরা এখন পরিবর্তনের ভেতরেই বাস করছি। প্রথাগত সাংবাদিকতার বিদায়ক্ষণ যেন ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের শেষে এসে উচ্চারণের মতো– ‘পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে কালের যাত্রায়। হে বন্ধু, বিদায়।’
এআই সংবাদ উপস্থাপকদের আত্মপ্রকাশ সেই বাস্তবতার এক প্রতীকী মুহূর্ত। পর্দায় ভেসে ওঠে একটি নিখুঁত, নির্ভুল, ক্লান্তিহীন কণ্ঠ– যার কোনো আবেগ নেই, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নেই, কিন্তু তথ্য পরিবেশনে কোনো ঘাটতিও নেই। এই দৃশ্য আমাদের একদিকে বিস্মিত করছে, অন্যদিকে অস্বস্তিতে ফেলছে। কারণ, রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়িয়ে আমরা বুঝতে শুরু করেছি– সংবাদ পরিবেশনে মানুষের উপস্থিতি হয়তো আর অপরিহার্য নয়। শ্রেণিকক্ষ বা বার্তাকক্ষে নতুন প্রজন্মের অর্জুন এসে বুড়ো ভীষ্মকে বলছে– ‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও’?
শুনতে পাই বা না শোনার জন্য কান চেপে ধরি– কালে কালে এসে হাজির হয় মে দিবস। মে দিবসে প্রশ্নটি নতুনভাবে সামনে আসে। ঐতিহাসিকভাবে মে দিবস কায়িক শ্রমের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের প্রতীক। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় লড়াইয়ের পরিসর বদলে গেছে। এখন আর শুধু কারখানার শ্রমিক নয়; নিউজরুমের সাংবাদিক, কনটেন্ট নির্মাতা, এমনকি গবেষকরাও এক নতুন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি। যন্ত্র এখন শুধু পেশিশক্তির বিকল্প নয়; এটি বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমেরও অংশীদার এবং কখনো কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী। সংবাদ সর্দার দশজনকে ছাঁটাই করে পত্র ধরিয়ে দেয় হাতে। যাতে লেখা থাকে– ‘তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান; গ্রহণ করেছ যত– ঋণী তত করেছ আমায়। হে বন্ধু, বিদায়’।
বার্তাকক্ষ বা শ্রেণিকক্ষ থেকে যে প্রবীণরা এভাবে ‘অচল’ হয়ে বিদায় নিচ্ছেন, সেটা হঠাৎ নয়। সাংবাদিকতা ও প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণায় এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত অনেক আগেই পাওয়া গিয়েছিল। চার্লি বেকেটের নেতৃত্বে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের ২০১৯ সালের গবেষণা ‘নিউ পাওয়ার্স, নিউ রেসপন্সিবিলিটিস’ দেখিয়েছিল, এআই সাংবাদিকতার কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটাবে। নিক ডায়াকোপোলাস তার ‘অটোমেটিং দি নিউজ’ গ্রন্থে বিশ্লেষণ করেছেন, কীভাবে অ্যালগরিদম সংবাদ তৈরি ও বাছাইয়ের প্রক্রিয়া পুনর্গঠন করছে। একই সঙ্গে শোশানা জুবফের ‘সারভাইল্যান্স ক্যাপিটালিজম বা নজরদারি পুঁজিবাদ’ ধারণা মনে করিয়ে দেয়– এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও ক্ষমতার কাঠামো। অর্থাৎ এআই কেবল প্রযুক্তি নয়; এটি নতুন বাস্তবতা, যেখানে তথ্য, পুঁজি ও অ্যালগরিদম একসঙ্গে কাজ করছে।
কভিড-পরবর্তী সময়ে সংবাদমাধ্যম যখন আর্থিক অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকটে ভুগছে, তখন এআই মালিকপক্ষের জন্য এক আকর্ষণীয় সমাধান হিসেবে হাজির হয়েছে। একটি এআই সিস্টেম নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পারে, বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তার কোনো শ্রমিক অধিকার নেই। এই বাস্তবতা আমাদের আবারও মে দিবসের মূল প্রশ্নে ফিরিয়ে আনে– শ্রমের মূল্য কোথায় নির্ধারিত হবে?
এই প্রেক্ষাপটে জন হেনরির গল্পটি (গান) কেবল লোককাহিনি নয়; একটি প্রতীক। তিনি জানতেন, মেশিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা মানে কেবল জয়-পরাজয়ের প্রশ্ন নয়; এটি আত্মমর্যাদারও প্রশ্ন। আজকের সাংবাদিকতার জগতেও সেই একই প্রশ্ন ফিরে আসে। আমরা কি কেবল দ্রুততার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করব; নাকি অর্থবোধ, প্রেক্ষিত ও মানবিকতার জায়গাটি ধরে রাখব?
নয়া মাধ্যম এই আলোচনায় একটি জটিল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে। হেনরি জেনকিন্সের ‘কনভারজেন্স কালচার’ ধারণা দেখায়, কীভাবে পুরোনো ও নতুন মাধ্যম একত্র হয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক সংস্কৃতি তৈরি করে। কিন্তু এআই এই অংশগ্রহণকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। এখন কনটেন্ট তৈরি করছে মানুষ, মেশিন কিংবা কখনো দুজনের যৌথ প্রচেষ্টা। ফলে প্রশ্নটি আর কেবল ‘কে বলছে’ নয়; বরং ‘কীভাবে বলা হচ্ছে’ এবং ‘কার স্বার্থে বলা হচ্ছে’– এই জায়গায় এসে দাঁড়ায়।
সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ তাই হয়তো একমুখী নয়। এটি পুরোপুরি মানুষকেন্দ্রিক থাকবে না, আবার পুরোপুরি যন্ত্রনির্ভরও হবে না। বরং এক ধরনের হাইব্রিড বা বলাই যায় দোআঁশলা বাস্তবতা তৈরি হবে, যেখানে যন্ত্র তথ্য প্রক্রিয়াজাত করবে আর মানুষ সেই তথ্যের অর্থ নির্মাণ করবে। বিভাজনটি যতটা সহজ শোনায়, বাস্তবে অবশ্য ততটা নয়। কারণ অর্থ নির্মাণের ক্ষমতাও ধীরে ধীরে প্রযুক্তির আওতায় চলে আসছে। তবু এখানেই মানুষের জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ তুলে ধরা– এসব ক্ষেত্র এখনো সম্পূর্ণভাবে অ্যালগরিদমিক হয়ে ওঠেনি। এবং সম্ভবত এগুলোই ভবিষ্যতের সাংবাদিকতার আসল শক্তি হয়ে থাকবে। যখন এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে গাইতে হয়– ‘মোর লাগি করিয়ো না শোক– আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক’।
বিশ্বলোকে ছড়িয়ে পড়া শ্রমসংহতির মে দিবস আমাদের শিখিয়েছে– সংগ্রাম কখনো থামে না; কেবল তার রূপ বদলায়। আজকের সংগ্রামটি হয়তো আর কারখানার মেঝেতে দৃশ্যমান নয়; কিন্তু এটি প্রতিদিনের কাজের ভেতরে, প্রতিটি নিউজ কপির ভেতরে, প্রতিটি অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্তে লুকিয়ে আছে। এই সংগ্রামে জয়ী হতে হলে প্রযুক্তিকে অস্বীকারের সুযোগ নেই; বরং তাকে বোঝা, ব্যবহার করা এবং একই সঙ্গে তার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা জরুরি। প্রযুক্তি হবে আমাদের সহচরী, যাকে রাখা যায় ‘প্রমোদে ভরি দিবানিশি মনপ্রাণ’। তবে সপ্তম সুরে তান বাঁধার বদলে যেন কেবল ‘তৃতীয় সুর আর ষষ্ঠ সুর’ না হয়!
বার্তাকক্ষের ভেতরে এখন যেন এক নতুন চরিত্র ঢুকে পড়েছে– যামিনী চট্টোপাধ্যায়। যার দুটি মুড। যামিনী (জেমিনাই) যেন শান্ত, পর্যবেক্ষক ধরনের– সবকিছু চুপচাপ দেখে, ডেটার ভেতর ডুব দেয়, সময় নিয়ে উত্তর দেয়; যেন পুরোনো দিনের কোনো মনোযোগী গবেষক, সত্যজিতের সিধু জেঠা; যিনি তাড়াহুড়ো করেন না, কিন্তু বিশ্লেষণে গভীর। আর চট্টোপাধ্যায় (চ্যাটজিপিটি) একটু আলাদা– জটায়ুর মতো, তুখোড়, বাকপটু, মুহূর্তে লেখা সাজিয়ে ফেলতে পারে; যেন ব্যস্ত ডেস্কের সেই সাব-এডিটর, যার হাতে কপি দিলে চোখের পলকে তা প্রকাশযোগ্য হয়ে ওঠে, যিনি আবার অতি আত্মবিশ্বাসে ‘উঠের পাকস্থলি’ও করে দেন কখনো কখনো। যামিনী চট্টোপাধ্যায়ের এই উপস্থিতিতে পুরোনো সাংবাদিকদের মনে একটা চাপা প্রশ্ন ঘুরপাক খায়: আমরা কি এখন সহকর্মী, নাকি প্রতিদ্বন্দ্বী? এই যামিনী চট্টোপাধ্যায়ের উপস্থিতিই আসলে আজকের নিউজরুমের দোঁআশলা বাস্তবতার সবচেয়ে জীবন্ত রূপক। প্রযুক্তি নিজেকে হালনাগাদ করেছে; এবার মানুষ নিজেদের নবায়ন না করলে আফসোস করতে হবে ‘কেন যামিনী না যেতে জাগালে না, বেলা হল মরি লাজে’। উপায় না পেয়ে গাইতে হবে ‘শরমে জড়িত চরণে কেমনে চলিব পথেরি মাঝে’।
আজকের বিশ্বায়িত ডিজিটাল যুগে মার্কস ও এঙ্গেলসের শ্রম-পুঁজি দ্বন্দ্ব নতুন রূপে ফিরে এসেছে। সাংবাদিকতায় এখন অ্যালগরিদম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরাসরি শ্রমপ্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে খবর উৎপাদন দ্রুত, সস্তা ও বৈশ্বিক বাজারমুখি। ফলে শ্রমের চরিত্র বদলে গিয়ে ডেটানির্ভর বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমে পরিণত হয়েছে, আর সাংবাদিকরা পড়েছেন প্রযুক্তিনির্ভর পুঁজির চাপের মুখে। এই বাস্তবতায় মে দিবস মনে করিয়ে দেয়– মানুষ ও যন্ত্রের সম্পর্ক এখনও ক্ষমতা, মূল্য ও মর্যাদার প্রশ্নেই নির্ধারিত হয়। এরই বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিশ্বমাধ্যমে; বিবিসি ‘গুরুতর অর্থনৈতিক চাপ’ মোকাবিলায় ১৮০০ থেকে ২০০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছে, অর্থাৎ প্রতি দশজনের একজনের চাকরি ঝুঁকিতে। ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে আগামী দুই বছরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে কোনো চ্যানেল বা একাধিক সার্ভিস বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি। এই সংকোচন কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি দেখায়, বৈশ্বিক মিডিয়া অর্থনীতিতে প্রযুক্তি, পুঁজি ও শ্রমের সম্পর্ক কত দ্রুত ও নির্মমভাবে পুনর্গঠিত হচ্ছে।
বিবিসির এই ছাঁটাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বৈশ্বিক মিডিয়া শিল্পে চলমান বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। গত কয়েক বছরে একের পর এক বড় সংবাদমাধ্যম একই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। ২০২৩ সালে বাজফিড নিউজ পুরো নিউজ ডিভিশন বন্ধ করে দেয়, কারণ ডিজিটাল বিজ্ঞাপননির্ভর ব্যবসায়িক মডেল আর টেকসই থাকেনি। একইভাবে ভাইস মিডিয়া আর্থিক সংকটে পড়ে দেউলিয়া সুরক্ষার আবেদন করে এবং পরে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি তাদের সংবাদ কার্যক্রমও সংকুচিত করে।
প্রচলিত মূলধারার সংবাদমাধ্যমও এই চাপ থেকে মুক্ত নয়। সিএনএন ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে একাধিক ধাপে কর্মী ছাঁটাই করেছে; ডিজিটাল রূপান্তরের অজুহাতে নিউজরুম পুনর্গঠন করেছে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট -এ সাবস্ক্রিপশন প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় কর্মী ছাঁটাই ও বাইআউটের ঘটনা ঘটেছে; আর লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস ২০২৪ সালে একসঙ্গে শতাধিক সাংবাদিককে ছাঁটাই করে আলোচনায় আসে। অন্যদিকে গুগল ও মেটার মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের গণছাঁটাইও মিডিয়া খাতে পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করেছে। কারণ বৈশ্বিক বিজ্ঞাপন আয়ের বড় অংশ এখন এই প্ল্যাটফর্মগুলোর নিয়ন্ত্রণে।
সব মিলিয়ে এ ঘটনাগুলো দেখায়, সংকটটি কেবল সাময়িক অর্থনৈতিক নয়; এটি মিডিয়া অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর। বিজ্ঞাপন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সরে যাচ্ছে, অ্যালগরিদম কনটেন্টের দৃশ্যমানতা নিয়ন্ত্রণ করছে, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কনটেন্ট উৎপাদনকে আরও দ্রুত ও সস্তা করে তুলছে। ফলে খরচ কমানোর সহজতম পথ হিসেবে সংবাদমাধ্যমগুলো মানবশ্রমে কাটছাঁট করছে– যা শেষ পর্যন্ত মে দিবসের শ্রম ও মর্যাদার প্রশ্নকেই নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসে।
ফিরে যাই লেখার শুরুতে উল্লেখ করা জন হেনরির কাছে। ‘আমি মেশিনের হব প্রতিদ্বন্দ্বী’– উচ্চারণটি আজও প্রাসঙ্গিক। তবে এর অর্থ হয়তো বদলে গেছে। এটি আর নিছক প্রতিরোধের আহ্বান নয়; এটি এক ধরনের সচেতন সহাবস্থানের দাবি। যেখানে মানুষ তার সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে সামনে রেখে প্রযুক্তির সঙ্গে একটি নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলে। মে দিবসের এ নতুন পাঠই আমাদের সময়ের সবচেয়ে জরুরি সত্য– প্রযুক্তি বনাম মানুষের যুদ্ধে কেউ হারবে না; একে অপরকে নতুন করে নিজের জায়গা তৈরি করতে হবে।
লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক; নিউ মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ে গবেষক

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ও অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান। শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনা, অন্তর্বর্তী ও বিএনপি সরকারের বাস্তবায়ন এবং শ্রমিকের অধিকারসহ নানা দিক নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন স্ট্রিমের প্রতিবেদক তৌফিক হাসান
১৪ মিনিট আগে
আনোয়ার হোসেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি। মহান মে দিবস উপলক্ষে দেশের শ্রমবাজারের অস্থিরতা, শ্রমিকদের অধিকার, প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সংকটসহ নিজের সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ ও অন্যান্য বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন স্ট্রিমের রাজনৈতিক প্রতিবেদক মিরহা
২ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের রাজনীতিতে মাঝেমধ্যে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা কেবল একটি বক্তব্য নয়—বরং সময়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে নাহিদ ইসলামের বক্তব্য তেমনই এক মুহূর্ত। এটি শুধু বিরোধী দলের সমালোচনা ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থা, অতীতের ভুল এবং ভবিষ্যতের পথ—এই তিনের একত্রে বিশ্লেষণ।
১৪ ঘণ্টা আগে
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষত হাওরাঞ্চলে যে ভারী বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢল নেমে এসেছে, তা আবারও আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও হাওর ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। প্রতি বছরই বোরো মৌসুমের শেষ দিকে এসে হাওরের কৃষকদের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। এ বছর হাওরের কৃষকরা প্রায়
১৮ ঘণ্টা আগে