ইউক্রেনের রোবট সৈন্য ভবিষ্যৎ যুদ্ধে কী বার্তা দেয়

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ২০: ০৩
রোবট দেখছেন উপস্থিত দর্শকরা। ছবি: সংগৃহীত

একটি ভিডিও গেমের দৃশ্যের মতো—সাদা তুষারের পোশাক পরা তিন ক্লান্ত সৈনিক একটি ধ্বংসস্তূপ থেকে হাত তুলে বেরিয়ে আসে। তারা নির্দেশ শুনে হাঁটু গেড়ে বসে। তাদের মুখে স্পষ্ট ভয় আর হতভম্ব ভাব। কারণ, তাদের সামনে ছিল একটি স্থল-রোবট। যার ওপর বসানো মেশিনগান সরাসরি তাদের দিকে তাক করা।

জানুয়ারিতে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা কোম্পানি ডেভড্রয়েড প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে পরিচালিত একটি রোবট রুশ সৈন্যদের আত্মসমর্পণ করাতে বাধ্য করছে।

এপ্রিলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, যুদ্ধে প্রথমবারের মতো শত্রুর ঘাঁটি পুরোপুরি মানববিহীন প্রযুক্তি (স্থল রোবট ও ড্রোন) ব্যবহার করে দখল করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মাত্র তিন মাসেই এই ধরনের রোবোটিক সিস্টেম ২২ হাজারের বেশি মিশন সম্পন্ন করেছে।

বিশেষজ্ঞদের কাছে এসব ঘটনা অপ্রত্যাশিত নয়। তাঁরা মনে করেন, এটি যুদ্ধের নতুন ধাপের ইঙ্গিত। যা শুধু ইউক্রেনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বড় ধরনের নৈতিক প্রশ্নও। যা নিয়েও আলোচনা চলছে।

ইউএভি, নৌ-ড্রোন এবং রোবট কুকুর

মূলত বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ও নজরদারির জন্য বহু বছর ধরেই সামরিক বাহিনী স্থল রোবট ব্যবহার করছে। কিন্তু ইউক্রেনে এদের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। কিছু ব্রিগেড জানিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রের ৭০ শতাংশ সরবরাহ এখন রোবটের মাধ্যমে পৌঁছানো হচ্ছে।

এই মেশিনগুলো গোলাবারুদ, খাবার ও চিকিৎসা সরঞ্জাম বহন করে এবং বিপজ্জনক স্থান থেকে আহত সৈন্যদের সরিয়ে আনতে পারে।

তবে যুদ্ধক্ষেত্রে রোবোটিক সিস্টেমের উপস্থিতি একটি বৃহৎ পরিবর্তনের অংশ। এটি কয়েক দশক ধরে গড়ে উঠছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর যুদ্ধ নিয়ে আধুনিক বিতর্ক মূলত দুই হাজার দশকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মানববিহীন আকাশযান (ইউএভি) ব্যবহারের মাধ্যমে শুরু হয়। ২০০২ সালে এমকিউ-ওয়ান প্রিডেটর ড্রোন আফগানিস্তানে প্রথম লক্ষ্যভিত্তিক হামলাচালায়। যা দূর থেকে যুদ্ধ পরিচালনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

দুই হাজারের দশক জুড়ে এর ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ২০১০ সালের মাঝামাঝি পাকিস্তান, ইয়েমেন ও সোমালিয়ায় এর ব্যবহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিতর্কটি কেবল দূরনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

এখন মূল আলোচনা হচ্ছে এমন প্রযুক্তি নিয়ে, যা লক্ষ্য চিহ্নিত করতে, আক্রমণের অগ্রাধিকার ঠিক করতে এবং যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এতে প্রশ্ন উঠছে যন্ত্রকে কতটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া উচিত।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যতই আকর্ষণীয় হোক, স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নটি কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবেই থাকতে হবে।

একজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ টবি ওয়ালশ বলেন, এই প্রযুক্তিগুলো এখন স্থায়ী হয়ে গেছে। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর সামরিক কার্যক্রমকে ‘যুদ্ধের তৃতীয় বিপ্লব’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

এই পরিবর্তন স্থলভাগের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে। বিস্ফোরকবাহী নৌ-ড্রোন ইতোমধ্যে কৃষ্ণ সাগর যুদ্ধে বড় পরিবর্তন এনেছে। এখন পানির নিচে নজরদারি, মাইন অপসারণ ও ধ্বংসাত্মক মিশনের জন্য এদের আরও উন্নত করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, রোবট কুকুরগুলো নজরদারি, গোয়েন্দা কার্যক্রম ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণে পরীক্ষা করা হচ্ছে। এমনকি কিছু পরীক্ষামূলক সংস্করণে অস্ত্রও বসানো হয়েছে।

মানব সম্পৃক্ততা

সম্প্রতি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ড্রোন বা ‘কিলার রোবট’ নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তুরস্কে তৈরি কার্গু-২ ড্রোন ২০২০ সালে লিবিয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্য শনাক্ত করে আক্রমণ চালায়।

এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞ, কর্মী ও কূটনীতিকদের মধ্যে এর নৈতিক প্রশ্ন নিয়ে তীব্র আলোচনা সৃষ্টি করে। একটি মেশিন কি মানুষের জীবন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে?

তবে গবেষক আনা নাদিবাইদজে বলেন, আধা-স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থারের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে তা মানুষের ‘নিয়ন্ত্রণে’ থাকে।

তিনি বলেন, বড় প্রশ্ন হলো যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে মানবিক বিচার-বিবেচনার জন্য যথেষ্ট সময় ও সুযোগ রাখা হচ্ছে কি না।

মানব সম্পৃক্ততার পরিমান নিয়ে বাইরের পর্যবেক্ষকদের অনেক সময় সামরিক বাহিনীর কথার ওপর নির্ভর করতে হয়। যা বিশ্বাসের ঘাটতির কারণে কঠিন।

ইউক্রেনে স্থল রোবোটিক সিস্টেমের ক্ষেত্রে এখনো একজন মানব অপারেটর নিয়ন্ত্রণে থাকে। এসব যন্ত্র এখনও অসমতল ভূমি দিয়ে যেতে পারে না।

গাজায় ইসরায়েলের হামলার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে অল্প কিছু সামরিক লক্ষ্যবস্তুর জন্য অনেক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঘটায়।

নাদিবাইদজে বলেন, সমস্যাটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের নিয়ম কার্যকর করা কঠিন। কারণ প্রতিটি সামরিক বাহিনী নিজেই ঠিক করে মানুষকে কতটুকু ভূমিকা দেবে। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যথেষ্ট আলোচনা নেই।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরবরাহ চেইনটি বিচ্ছিন্ন, বৈশ্বিক এবং বেসামরিক প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল। যা এটির ওপর নিয়ন্ত্রণকে আরও জটিল করে তোলে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরও বেসরকারি সফটওয়্যার দিনের পর দিন সামরিক ব্যবস্থায় যুক্ত করছে। ওপেনএআই, এক্সএআই ও এনথ্রোপিকের সঙ্গে শত কোটি ডলারের চুক্তিও হয়েছে।

ওয়ালশ সতর্ক করে বলেন, আমরা সতর্ক না হলে যুদ্ধ আরও ভয়াবহ, আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে। তখন মানুষ আর কার্যত অংশ নিতে পারবে না। কারণ মানুষের গতি, নির্ভুলতা বা প্রতিক্রিয়ার ক্ষমতা যথেষ্ট হবে না।

পরীক্ষাগার হিসেবে ইউক্রেন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে ক্ষতিকর নয়। এগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হয় সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেনে রোবোটিক সিস্টেমগুলো বেসামরিকদের উদ্ধার ও বিপজ্জনক এলাকায় সরবরাহ পৌঁছাতেও ব্যবহৃত হয়েছে।

তবে যুদ্ধক্ষেত্রে যা ঘটছে, তা এক ধরনের পরীক্ষাগার। ভবিষ্যতে এসব প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভাবতে হবে। তবুও কিছু আশা রয়েছে।

ওয়ালশ বলেন, গাজায় নৈতিক ব্যর্থতা হলেও আন্তর্জাতিকভাবে এই বিষয়গুলো সমাধানের প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হয়েছে। প্রাণঘাতী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে জাতিসংঘে বৈঠকও হয়েছে।

জাতিসংঘের একটি গবেষণা সংস্থা জুন মাসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে বৈঠক করতে যাচ্ছে।

ওয়ালশ বলেন, নতুন অস্ত্র প্রযুক্তি এর আগেও বিশ্বব্যবস্থাকে নাড়া দিয়েছে। যেমন রাসায়নিক অস্ত্র। পরে এগুলো নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক চুক্তি হয়েছে। যদিও তা নিখুঁত নয়।

নাদিবাইদজে বলেন, অনেক দেশই এই বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ চায়। তাই আঞ্চলিক পর্যায়ে নতুন উদ্যোগ গড়ে উঠতে পারে। বড় শক্তিগুলো শুরুতে এসব উদ্যোগে না থাকলেও, পরে এগুলো ভবিষ্যতের নিয়ম-কানুন তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সূত্র: আল-জাজিরা

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত