সরদার ফরিদ আহমদ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মাঝেমধ্যে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা কেবল একটি বক্তব্য নয়—বরং সময়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে নাহিদ ইসলামের বক্তব্য তেমনই এক মুহূর্ত। এটি শুধু বিরোধী দলের সমালোচনা ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থা, অতীতের ভুল এবং ভবিষ্যতের পথ—এই তিনের একত্রে বিশ্লেষণ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই বক্তব্যে আবেগ ছিল, কিন্তু তা তথ্যের ওপর দাঁড়ানো। অভিযোগ ছিল, কিন্তু তাতে ছিল যুক্তি। সমালোচনা ছিল, কিন্তু তার সঙ্গে সমাধানের দিকনির্দেশনাও ছিল।
শুরুতেই তিনি যে বাক্যটি উচ্চারণ করেন, সেটি পুরো আলোচনার সুর নির্ধারণ করে: ‘বিএনপির ওপর আর আস্থা রাখতে পারছি না।’ বাক্যটি কেবল রাজনৈতিক অবস্থান নয়। এটি একটি আস্থার সংকটের ঘোষণা।
আর্থিক খাত: আস্থায় ভাঙন
নাহিদ ইসলাম সরাসরি অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করেন। অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, বিএনপির আমলে আর্থিক খাতে কোনো বিশৃঙ্খলা ছিল না। নাহিদ এই দাবিকে খণ্ডন করেছেন তথ্য দিয়ে। তিনি বলেছেন, অর্থমন্ত্রী অস্বীকার করেছেন—বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর একটা রাজনৈতিক নিয়োগ। এরপর তিনি আরও কঠিন তথ্য তুলে ধরেন। টিআইবির প্রতিবেদন উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া সরকারদলীয় প্রার্থীদের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৪১ শতাংশের ঋণ রয়েছে। সংসদে সদস্যদের ১১ হাজার কোটি টাকার ঋণ রয়েছে, যার অধিকাংশই সরকারি দলের। যাদের অধিকাংশই ঋণখেলাপি ছিলেন, নির্বাচনের আগে কিছু টাকা দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করে নিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বিশেষত্ব হচ্ছে ঋণ পুনঃতফসিল করা। এটাতে তিনি অভিজ্ঞ, ফলে তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কেন করা হয়েছে, তা পরিষ্কার। হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ যাতে তিনি পুনঃতফসিল করতে পারেন, সেই সুযোগ-সুবিধা করে দেওয়ার জন্যই দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করা হয়েছে। ফলে আর্থিক খাতের আরও নিয়োগ তারা কী বিবেচনায় দেবেন, তাদের ওপর আর আস্থা রাখতে পারছি না।’ এই বক্তব্য সরাসরি একটি বড় প্রশ্ন তোলে—রাষ্ট্র কি নীতির ভিত্তিতে চলছে, নাকি সুবিধাভোগীদের জন্য পরিচালিত হচ্ছে?
রাষ্ট্রপতি: নৈতিকতার প্রশ্ন
রাষ্ট্রপতি প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলামের বক্তব্য ছিল সবচেয়ে তীব্র। তিনি বলেছেন: ‘রাষ্ট্রপতির বক্তব্য আমি শুনিও নাই, পড়িও নাই। রাষ্ট্রপতির অপসারণ ও গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন।’ এটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যক্তির নৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন। রাষ্ট্রপতির অতীত ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ‘তাকে তিনটি লক্ষ্য দিয়ে দুদকের কমিশনার করা হয়। এর এক নম্বর হচ্ছে, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিশ্চিত করা। দুই নম্বর হচ্ছে, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ থেকে আওয়ামী লীগকে ক্লিনচিট দেওয়া। তিন নম্বর হচ্ছে, ফখরুদ্দিন-মইনউদ্দিন সরকারের সময় শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে হওয়া দুর্নীতির মামলা বাতিল করা।’
নাহিদ আরও বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এস আলমের হাতে ইসলামী ব্যাংককে তুলে দেওয়ার কারিগর। এস আলম দুই কোটি আমানতকারীকে পথে বসিয়েছিল। জুলাই গণহত্যার সময় তার (রাষ্ট্রপতি) ভূমিকা, ফ্যাসিবাদের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা সবকিছু আমরা জানি। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, একজন দুর্নীতিবাজ, অপদার্থ, মিথ্যুক, গণহত্যার দোসর এখনো বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।’ এই বক্তব্য কঠিন, কঠোর। কিন্তু এটিই তার বক্তব্যের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। তিনি ভাষা নরম করেননি।
রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে শপথ নেওয়া প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘তখনকার সময় আর বর্তমান সময় এক নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে আমাদের সামনে দুইটা অপশন ছিল। আমরা বলেছিলাম, জাতীয় সরকার করতে হবে। সেই প্রস্তাব বিএনপি নাকচ করে দিয়েছে। আরেকটা অপশন ছিল ক্ষমতা আর্মির হাতে তুলে দেওয়া। যদি আমরা সেই দিকে এগোতাম, আজকে তারা (সরকারি দল) এখানে বসতে পারত কি না, সেটা সন্দেহ আছে।’ তিনি জানান, দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে তারা তখন সরকারে গিয়েছিলেন। এখানে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন—রাজনীতিতে অনেক সময় আদর্শের চেয়ে বাস্তবতা বড় হয়ে দাঁড়ায়।
নাহিদ ইসলাম বিএনপিকে সরাসরি আক্রমণ না করে তাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ‘চাইলে বিএনপি রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন করতে পারে।’ কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তীব্র ব্যঙ্গ: ‘গাধাকে দিয়ে হাল চাষ করিয়ে কোনো বাহাদুরি নেই—এটা সরকারের দেউলিয়াত্ব।’ এই একটি বাক্যেই তিনি নেতৃত্ব সংকটের চিত্র তুলে ধরেছেন।
সংবিধান: ইতিহাসের পুনর্বিচার
বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে নাহিদ ইসলামের বক্তব্য ছিল গভীর। তিনি বলেছেন, ‘বাহাত্তরের সংবিধানকে ’৭১-এর সঙ্গে বিএনপি কোন বিবেচনায় মেলাচ্ছে?’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘বাহাত্তরের সংবিধানকে একাত্তরের সঙ্গে মিলিয়েছিল তো আওয়ামী লীগ। আমরা এর বিরোধিতা করেছি, বিএনপির বহু নেতাও বিরোধিতা করেছিলেন। মাওলানা ভাসানী, বদরুদ্দীন উমরসহ আরও অনেকে বিরোধিতা করেছিলেন।’
নাহিদ বলেছেন, ’৭২-এর সংবিধান স্বাধীন বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রচনা করেননি। ’৭২-এর সংবিধান রচনা করেছিল ’৭০-এর নির্বাচনে আইয়ুব খানের এলএফওর অধীনে যারা নির্বাচিত হয়েছিল, তারা।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘বাহাত্তারের সংবিধান উত্তরাধিকার সূত্রে অগণতান্ত্রিক… স্বৈরতন্ত্রের বীজ বাংলাদেশে বাহাত্তরের সংবিধানে বপন করা হয়েছিল। এ সংবিধান মুজিববাদী আদর্শে রচিত।’ এখানে তিনি ইতিহাসকে নতুন করে মূল্যায়নের আহ্বান জানান।
জিয়াউর রহমান প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘সিপাহি জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে ’৭২-এর সংবিধান বাতিলের সুযোগ এসেছিল…সম্মান রেখেই বলছি, জিয়াউর রহমান সে ঐতিহাসিক ভুলটি করেছিলেন।’ এটি দেখায়—তিনি একপাক্ষিক নন। সমালোচনা সবার জন্য।
জুলাই সনদ ও গণভোট
জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে সরকারের অবস্থান নিয়ে নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন। জুলাই জাতীয় সনদে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেছেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে সেটাকে কলুষিত করে ফেলা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোর পাশেই নোট লেখা হয়েছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘বল প্রয়োগ করে ঐকমত্য কমিশনকে চাপ দিয়ে জুলাই সনদে নোট অব ডিসেন্ট লেখানো হয়েছে।’
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘সবার সম্মতির ভিত্তিতেই সবাই মিলে গণভোটে অংশগ্রহণ করেছি। নির্বাচনের পর বিএনপি ভিন্ন অবস্থান নেয়। নির্বাচনের আগে পরিষ্কার করা প্রয়োজন ছিল যে, গণভোট আপনারা মানেন না।’ তিনি দাবি করেন, ‘গণভোট অনুসারে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে সঙিবধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা উচিত।’ এখানে তার অবস্থান পরিষ্কার—জনগণের রায়ই চূড়ান্ত।
মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান
নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকে আমরা শ্রদ্ধা করি…জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের নতুন রূপ তৈরি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সাথে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থান নেই।’ তিনি বলেছেন, ‘আমরা কেউ বলি নাই যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধের থেকে বড়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান এক বিশেষ ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ফাউন্ডেশন। এটার ব্যাপারে আমরা আনকমপ্রমাইজড, এটা নিয়ে কোনো বিতর্কের সুযোগ নাই।’ একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘তবে মুক্তিযুদ্ধের নামে যে লুটপাট ও ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছে, তাও ভোলা যাবে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল মুক্তিযুদ্ধেরই নবায়ন। আমাদের উচিত ইতিহাসের এই বিতর্ক এক পাশে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। মুক্তিযুদ্ধের নাম করে বা পক্ষ-বিপক্ষ কার্ড খেলে জনগণকে আর ভাগ করা যাবে না।’ এটি বিভাজন নয়, সমন্বয়ের চেষ্টা।
তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এ দুইয়ের মধ্যে কোনো সাংঘর্ষিক সম্পর্ক নেই। তিনি বিতর্কিত মুজিব বাহিনী প্রসঙ্গও সামনে আনেন। তার মতে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আড়ালে কিছু সংগঠন ও শক্তিকে অপ্রশ্নযোগ্য করে তোলা হয়েছে, যা ইতিহাসের পূর্ণ সত্যকে আড়াল করেছে। তাই তিনি ইঙ্গিত দেন, মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখেই সব বিতর্ক, এমনকি মুজিব বাহিনী নিয়েও খোলামেলা আলোচনা হওয়া জরুরি।
এনসিপি নেতা বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের রাজনীতি গত ৫০ বছর ধরে হয়েছে। আমরা এর সমাধান এখনো কেন করতে পারিনি। এর দায়ভার কে নেবে? বিএনপি কি নেবে না, যারা ২৯ বছর জামায়াতের সঙ্গে রাজনীতি করেছে? একটা কথা তো এখন সবাই বলে—সাথে থাকলে সঙ্গী, না থাকলে জঙ্গি। ফলে এটার দায়িত্ব ছিল তো ওনাদের, এই রিকনসিলিয়েশন তৈরি করা, এই প্রশ্নের সুরাহা করা।’
নাহিদ ইসলাম আরো বেশ কয়েকটি বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। বিচার বিভাগ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তিনি বলেছেন: ‘সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নির্দলীয় হতে হবে।’ আরও গুরুত্বপূর্ণ: ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।’ এটি রাষ্ট্রের মূল কাঠামো নিয়ে কথা বলা।
ভারত প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন: ‘সম্পর্ক উন্নয়ন হতে হবে মর্যাদার ভিত্তিতে, সাম্যের ভিত্তিতে। এবং একটি স্পষ্ট বার্তা: ‘এই দেশকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা—সেই দিনকে কবর দিতে হবে।’ এখানে তিনি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির দাবি তুলেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেছেন, ‘দুই মাসে বিএনপির হাতে খুন হয়েছে ৩১ জন, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৪টি, বিএনপির চাঁদাবাজির খবর এসেছে ৮৩টি। কিন্তু সরকার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘শাহবাগ থানার সামনে…সাংবাদিকদের মারধর করেছে ছাত্রদলের নেতা-কর্মী। এখনো কোনো মামলা নেয়নি। থানার ভেতর প্রবেশ করে ওসি রুমে হামলা করা হয়েছে।’ এটি শুধু সমালোচনা নয়, জবাবদিহির দাবি।
জঙ্গিবাদ নিয়ে সরকারের ভিন্নমুখী বক্তব্যের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন জঙ্গিবাদ নেই, আবার প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বলছেন জঙ্গিবাদ আছে। আপনারা একটু সমন্বয় করে বক্তব্য দিন।’ এটি সরকারের নীতিগত বিভ্রান্তি তুলে ধরে। তিনি আরও বলেছেন, ‘জঙ্গিবাদ বাংলাদেশের সিকিউরিটি প্রশ্ন। এতে জাতীয় ঐক্য লাগবে…তবে বিগত আমলের মতো জঙ্গিবাদকে ওয়ার অন টেরর প্রজেক্ট হিসেবে যাতে না দেখা হয়।’
নাহিদ ইসলামের শেষ বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ: ‘সংসদে সরকারি দলের সদস্যরা যেভাবে স্তুতি করেছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদকে বাতিল, গণভোটকে অস্বীকার—তাতে আমি অনেক হতাশ হয়েছি। আশা করি, আমাদের এই হতাশা অতি দ্রুতই শেষ হবে এবং আমরা যেই কমিটমেন্ট জনগণের কাছে করেছি, সেই সকল প্রতিশ্রুতি আমরা রক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।’ এখানেই তার রাজনৈতিক অবস্থানের সারাংশ—সমালোচনা আছে, কিন্তু ভেঙে পড়া নয়।
কেন নাহিদ ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যকে ইতিবাচকভাবে দেখার কারণ আছে। প্রথমত, তিনি সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছেন। দ্বিতীয়ত, সমস্যার উৎস ব্যাখ্যা করেছেন। তৃতীয়ত, সমাধানের পথ দেখিয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি তরুণদের ভাষায় কথা বলেছেন। এই প্রজন্ম চুপ করে থাকতে চায় না। প্রশ্ন করে। তারা যুক্তি চায়। জবাবদিহি চায়। নাহিদ ইসলাম সেই চাহিদার প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
নাহিদ ইসলামের সংসদীয় বক্তব্য প্রকাশের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এই বক্তব্যকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। ফেসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে তার বক্তব্যের অংশবিশেষ ভাইরাল হয়েছে। অনেকেই লিখেছেন—এটি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং তাদের মনের কথার প্রতিফলন। তরুণরা তথ্যভিত্তিক সমালোচনা, সরাসরি ভাষা এবং স্পষ্ট অবস্থানকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। তারা মনে করছে, দীর্ঘদিন পর কেউ সংসদে তাদের হতাশা, প্রশ্ন ও প্রত্যাশাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। এই আগ্রহকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি ইঙ্গিত দেয়, নতুন প্রজন্ম রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি; তারা সৎ, জবাবদিহিমূলক ও বাস্তবভিত্তিক রাজনীতি চায়। নাহিদ ইসলামের বক্তব্য সেই চাহিদার প্রতিফলন হয়ে উঠেছে।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে বিতর্ক আছে। তীব্রতা আছে। কিন্তু এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। বিরোধী দল যদি সরকারের ভাষায় কথা বলে, তাহলে সংসদের প্রয়োজন কী? নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট করে দিয়েছেন, সমালোচনা অপরাধ নয়। সমালোচনা দায়িত্ব। এখন প্রশ্ন একটাই—সরকার কি এই সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখবে, নাকি সংশোধনের সুযোগ হিসেবে নেবে?
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মাঝেমধ্যে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা কেবল একটি বক্তব্য নয়—বরং সময়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে নাহিদ ইসলামের বক্তব্য তেমনই এক মুহূর্ত। এটি শুধু বিরোধী দলের সমালোচনা ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থা, অতীতের ভুল এবং ভবিষ্যতের পথ—এই তিনের একত্রে বিশ্লেষণ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই বক্তব্যে আবেগ ছিল, কিন্তু তা তথ্যের ওপর দাঁড়ানো। অভিযোগ ছিল, কিন্তু তাতে ছিল যুক্তি। সমালোচনা ছিল, কিন্তু তার সঙ্গে সমাধানের দিকনির্দেশনাও ছিল।
শুরুতেই তিনি যে বাক্যটি উচ্চারণ করেন, সেটি পুরো আলোচনার সুর নির্ধারণ করে: ‘বিএনপির ওপর আর আস্থা রাখতে পারছি না।’ বাক্যটি কেবল রাজনৈতিক অবস্থান নয়। এটি একটি আস্থার সংকটের ঘোষণা।
আর্থিক খাত: আস্থায় ভাঙন
নাহিদ ইসলাম সরাসরি অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করেন। অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, বিএনপির আমলে আর্থিক খাতে কোনো বিশৃঙ্খলা ছিল না। নাহিদ এই দাবিকে খণ্ডন করেছেন তথ্য দিয়ে। তিনি বলেছেন, অর্থমন্ত্রী অস্বীকার করেছেন—বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর একটা রাজনৈতিক নিয়োগ। এরপর তিনি আরও কঠিন তথ্য তুলে ধরেন। টিআইবির প্রতিবেদন উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া সরকারদলীয় প্রার্থীদের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৪১ শতাংশের ঋণ রয়েছে। সংসদে সদস্যদের ১১ হাজার কোটি টাকার ঋণ রয়েছে, যার অধিকাংশই সরকারি দলের। যাদের অধিকাংশই ঋণখেলাপি ছিলেন, নির্বাচনের আগে কিছু টাকা দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করে নিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বিশেষত্ব হচ্ছে ঋণ পুনঃতফসিল করা। এটাতে তিনি অভিজ্ঞ, ফলে তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কেন করা হয়েছে, তা পরিষ্কার। হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ যাতে তিনি পুনঃতফসিল করতে পারেন, সেই সুযোগ-সুবিধা করে দেওয়ার জন্যই দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করা হয়েছে। ফলে আর্থিক খাতের আরও নিয়োগ তারা কী বিবেচনায় দেবেন, তাদের ওপর আর আস্থা রাখতে পারছি না।’ এই বক্তব্য সরাসরি একটি বড় প্রশ্ন তোলে—রাষ্ট্র কি নীতির ভিত্তিতে চলছে, নাকি সুবিধাভোগীদের জন্য পরিচালিত হচ্ছে?
রাষ্ট্রপতি: নৈতিকতার প্রশ্ন
রাষ্ট্রপতি প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলামের বক্তব্য ছিল সবচেয়ে তীব্র। তিনি বলেছেন: ‘রাষ্ট্রপতির বক্তব্য আমি শুনিও নাই, পড়িও নাই। রাষ্ট্রপতির অপসারণ ও গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন।’ এটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যক্তির নৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন। রাষ্ট্রপতির অতীত ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ‘তাকে তিনটি লক্ষ্য দিয়ে দুদকের কমিশনার করা হয়। এর এক নম্বর হচ্ছে, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিশ্চিত করা। দুই নম্বর হচ্ছে, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ থেকে আওয়ামী লীগকে ক্লিনচিট দেওয়া। তিন নম্বর হচ্ছে, ফখরুদ্দিন-মইনউদ্দিন সরকারের সময় শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে হওয়া দুর্নীতির মামলা বাতিল করা।’
নাহিদ আরও বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এস আলমের হাতে ইসলামী ব্যাংককে তুলে দেওয়ার কারিগর। এস আলম দুই কোটি আমানতকারীকে পথে বসিয়েছিল। জুলাই গণহত্যার সময় তার (রাষ্ট্রপতি) ভূমিকা, ফ্যাসিবাদের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা সবকিছু আমরা জানি। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, একজন দুর্নীতিবাজ, অপদার্থ, মিথ্যুক, গণহত্যার দোসর এখনো বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।’ এই বক্তব্য কঠিন, কঠোর। কিন্তু এটিই তার বক্তব্যের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। তিনি ভাষা নরম করেননি।
রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে শপথ নেওয়া প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘তখনকার সময় আর বর্তমান সময় এক নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে আমাদের সামনে দুইটা অপশন ছিল। আমরা বলেছিলাম, জাতীয় সরকার করতে হবে। সেই প্রস্তাব বিএনপি নাকচ করে দিয়েছে। আরেকটা অপশন ছিল ক্ষমতা আর্মির হাতে তুলে দেওয়া। যদি আমরা সেই দিকে এগোতাম, আজকে তারা (সরকারি দল) এখানে বসতে পারত কি না, সেটা সন্দেহ আছে।’ তিনি জানান, দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে তারা তখন সরকারে গিয়েছিলেন। এখানে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন—রাজনীতিতে অনেক সময় আদর্শের চেয়ে বাস্তবতা বড় হয়ে দাঁড়ায়।
নাহিদ ইসলাম বিএনপিকে সরাসরি আক্রমণ না করে তাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ‘চাইলে বিএনপি রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন করতে পারে।’ কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তীব্র ব্যঙ্গ: ‘গাধাকে দিয়ে হাল চাষ করিয়ে কোনো বাহাদুরি নেই—এটা সরকারের দেউলিয়াত্ব।’ এই একটি বাক্যেই তিনি নেতৃত্ব সংকটের চিত্র তুলে ধরেছেন।
সংবিধান: ইতিহাসের পুনর্বিচার
বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে নাহিদ ইসলামের বক্তব্য ছিল গভীর। তিনি বলেছেন, ‘বাহাত্তরের সংবিধানকে ’৭১-এর সঙ্গে বিএনপি কোন বিবেচনায় মেলাচ্ছে?’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘বাহাত্তরের সংবিধানকে একাত্তরের সঙ্গে মিলিয়েছিল তো আওয়ামী লীগ। আমরা এর বিরোধিতা করেছি, বিএনপির বহু নেতাও বিরোধিতা করেছিলেন। মাওলানা ভাসানী, বদরুদ্দীন উমরসহ আরও অনেকে বিরোধিতা করেছিলেন।’
নাহিদ বলেছেন, ’৭২-এর সংবিধান স্বাধীন বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রচনা করেননি। ’৭২-এর সংবিধান রচনা করেছিল ’৭০-এর নির্বাচনে আইয়ুব খানের এলএফওর অধীনে যারা নির্বাচিত হয়েছিল, তারা।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘বাহাত্তারের সংবিধান উত্তরাধিকার সূত্রে অগণতান্ত্রিক… স্বৈরতন্ত্রের বীজ বাংলাদেশে বাহাত্তরের সংবিধানে বপন করা হয়েছিল। এ সংবিধান মুজিববাদী আদর্শে রচিত।’ এখানে তিনি ইতিহাসকে নতুন করে মূল্যায়নের আহ্বান জানান।
জিয়াউর রহমান প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘সিপাহি জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে ’৭২-এর সংবিধান বাতিলের সুযোগ এসেছিল…সম্মান রেখেই বলছি, জিয়াউর রহমান সে ঐতিহাসিক ভুলটি করেছিলেন।’ এটি দেখায়—তিনি একপাক্ষিক নন। সমালোচনা সবার জন্য।
জুলাই সনদ ও গণভোট
জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে সরকারের অবস্থান নিয়ে নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন। জুলাই জাতীয় সনদে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেছেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে সেটাকে কলুষিত করে ফেলা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোর পাশেই নোট লেখা হয়েছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘বল প্রয়োগ করে ঐকমত্য কমিশনকে চাপ দিয়ে জুলাই সনদে নোট অব ডিসেন্ট লেখানো হয়েছে।’
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘সবার সম্মতির ভিত্তিতেই সবাই মিলে গণভোটে অংশগ্রহণ করেছি। নির্বাচনের পর বিএনপি ভিন্ন অবস্থান নেয়। নির্বাচনের আগে পরিষ্কার করা প্রয়োজন ছিল যে, গণভোট আপনারা মানেন না।’ তিনি দাবি করেন, ‘গণভোট অনুসারে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে সঙিবধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা উচিত।’ এখানে তার অবস্থান পরিষ্কার—জনগণের রায়ই চূড়ান্ত।
মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান
নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকে আমরা শ্রদ্ধা করি…জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের নতুন রূপ তৈরি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সাথে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থান নেই।’ তিনি বলেছেন, ‘আমরা কেউ বলি নাই যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধের থেকে বড়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান এক বিশেষ ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ফাউন্ডেশন। এটার ব্যাপারে আমরা আনকমপ্রমাইজড, এটা নিয়ে কোনো বিতর্কের সুযোগ নাই।’ একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘তবে মুক্তিযুদ্ধের নামে যে লুটপাট ও ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছে, তাও ভোলা যাবে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল মুক্তিযুদ্ধেরই নবায়ন। আমাদের উচিত ইতিহাসের এই বিতর্ক এক পাশে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। মুক্তিযুদ্ধের নাম করে বা পক্ষ-বিপক্ষ কার্ড খেলে জনগণকে আর ভাগ করা যাবে না।’ এটি বিভাজন নয়, সমন্বয়ের চেষ্টা।
তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এ দুইয়ের মধ্যে কোনো সাংঘর্ষিক সম্পর্ক নেই। তিনি বিতর্কিত মুজিব বাহিনী প্রসঙ্গও সামনে আনেন। তার মতে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আড়ালে কিছু সংগঠন ও শক্তিকে অপ্রশ্নযোগ্য করে তোলা হয়েছে, যা ইতিহাসের পূর্ণ সত্যকে আড়াল করেছে। তাই তিনি ইঙ্গিত দেন, মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখেই সব বিতর্ক, এমনকি মুজিব বাহিনী নিয়েও খোলামেলা আলোচনা হওয়া জরুরি।
এনসিপি নেতা বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের রাজনীতি গত ৫০ বছর ধরে হয়েছে। আমরা এর সমাধান এখনো কেন করতে পারিনি। এর দায়ভার কে নেবে? বিএনপি কি নেবে না, যারা ২৯ বছর জামায়াতের সঙ্গে রাজনীতি করেছে? একটা কথা তো এখন সবাই বলে—সাথে থাকলে সঙ্গী, না থাকলে জঙ্গি। ফলে এটার দায়িত্ব ছিল তো ওনাদের, এই রিকনসিলিয়েশন তৈরি করা, এই প্রশ্নের সুরাহা করা।’
নাহিদ ইসলাম আরো বেশ কয়েকটি বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। বিচার বিভাগ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তিনি বলেছেন: ‘সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নির্দলীয় হতে হবে।’ আরও গুরুত্বপূর্ণ: ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।’ এটি রাষ্ট্রের মূল কাঠামো নিয়ে কথা বলা।
ভারত প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন: ‘সম্পর্ক উন্নয়ন হতে হবে মর্যাদার ভিত্তিতে, সাম্যের ভিত্তিতে। এবং একটি স্পষ্ট বার্তা: ‘এই দেশকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা—সেই দিনকে কবর দিতে হবে।’ এখানে তিনি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির দাবি তুলেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেছেন, ‘দুই মাসে বিএনপির হাতে খুন হয়েছে ৩১ জন, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৪টি, বিএনপির চাঁদাবাজির খবর এসেছে ৮৩টি। কিন্তু সরকার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘শাহবাগ থানার সামনে…সাংবাদিকদের মারধর করেছে ছাত্রদলের নেতা-কর্মী। এখনো কোনো মামলা নেয়নি। থানার ভেতর প্রবেশ করে ওসি রুমে হামলা করা হয়েছে।’ এটি শুধু সমালোচনা নয়, জবাবদিহির দাবি।
জঙ্গিবাদ নিয়ে সরকারের ভিন্নমুখী বক্তব্যের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন জঙ্গিবাদ নেই, আবার প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বলছেন জঙ্গিবাদ আছে। আপনারা একটু সমন্বয় করে বক্তব্য দিন।’ এটি সরকারের নীতিগত বিভ্রান্তি তুলে ধরে। তিনি আরও বলেছেন, ‘জঙ্গিবাদ বাংলাদেশের সিকিউরিটি প্রশ্ন। এতে জাতীয় ঐক্য লাগবে…তবে বিগত আমলের মতো জঙ্গিবাদকে ওয়ার অন টেরর প্রজেক্ট হিসেবে যাতে না দেখা হয়।’
নাহিদ ইসলামের শেষ বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ: ‘সংসদে সরকারি দলের সদস্যরা যেভাবে স্তুতি করেছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদকে বাতিল, গণভোটকে অস্বীকার—তাতে আমি অনেক হতাশ হয়েছি। আশা করি, আমাদের এই হতাশা অতি দ্রুতই শেষ হবে এবং আমরা যেই কমিটমেন্ট জনগণের কাছে করেছি, সেই সকল প্রতিশ্রুতি আমরা রক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।’ এখানেই তার রাজনৈতিক অবস্থানের সারাংশ—সমালোচনা আছে, কিন্তু ভেঙে পড়া নয়।
কেন নাহিদ ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যকে ইতিবাচকভাবে দেখার কারণ আছে। প্রথমত, তিনি সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছেন। দ্বিতীয়ত, সমস্যার উৎস ব্যাখ্যা করেছেন। তৃতীয়ত, সমাধানের পথ দেখিয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি তরুণদের ভাষায় কথা বলেছেন। এই প্রজন্ম চুপ করে থাকতে চায় না। প্রশ্ন করে। তারা যুক্তি চায়। জবাবদিহি চায়। নাহিদ ইসলাম সেই চাহিদার প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
নাহিদ ইসলামের সংসদীয় বক্তব্য প্রকাশের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এই বক্তব্যকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। ফেসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে তার বক্তব্যের অংশবিশেষ ভাইরাল হয়েছে। অনেকেই লিখেছেন—এটি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং তাদের মনের কথার প্রতিফলন। তরুণরা তথ্যভিত্তিক সমালোচনা, সরাসরি ভাষা এবং স্পষ্ট অবস্থানকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। তারা মনে করছে, দীর্ঘদিন পর কেউ সংসদে তাদের হতাশা, প্রশ্ন ও প্রত্যাশাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। এই আগ্রহকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি ইঙ্গিত দেয়, নতুন প্রজন্ম রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি; তারা সৎ, জবাবদিহিমূলক ও বাস্তবভিত্তিক রাজনীতি চায়। নাহিদ ইসলামের বক্তব্য সেই চাহিদার প্রতিফলন হয়ে উঠেছে।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে বিতর্ক আছে। তীব্রতা আছে। কিন্তু এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। বিরোধী দল যদি সরকারের ভাষায় কথা বলে, তাহলে সংসদের প্রয়োজন কী? নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট করে দিয়েছেন, সমালোচনা অপরাধ নয়। সমালোচনা দায়িত্ব। এখন প্রশ্ন একটাই—সরকার কি এই সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখবে, নাকি সংশোধনের সুযোগ হিসেবে নেবে?
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষত হাওরাঞ্চলে যে ভারী বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢল নেমে এসেছে, তা আবারও আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও হাওর ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। প্রতি বছরই বোরো মৌসুমের শেষ দিকে এসে হাওরের কৃষকদের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। এ বছর হাওরের কৃষকরা প্রায়
৫ ঘণ্টা আগে
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র কেবল সীমানা পরিবর্তনের সাক্ষী নয়, বরং বিশ্ব বাণিজ্যের ধমনি হিসেবে পরিচিত সমুদ্রপথগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েও এক ভয়াবহ লড়াই শুরু হয়েছে। এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, যা এখন কেবল ক্ষেপণাস্ত্রের লড়াইয়ে সীমাবদ
৮ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন ধারার প্রতিশ্রুতি নিয়ে মাঠে নেমেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গত ২৯ মার্চ রাতে পাঁচ সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থী ঘোষণার মধ্য দিয়ে দলটি তাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনী প্রস্তুতির আনুষ্ঠানিক জানান দিয়েছে। সিলেট সিটি করপোরেশনে এনসিপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে লড়বেন অ্যাডভোকেট মো
১ দিন আগে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি দেখে মন বিষাদে ভরে গেল। দেখলাম, কুমিল্লার একটি কেন্দ্রে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা হাঁটুপানিতে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে। হাঁটু সমান নোংরা পানিতে ভিজে বেঞ্চে পা তুলে তারা উত্তরপত্র লিখছে। এই দৃশ্য দেখার পর নিজেকে প্রশ্ন করলাম—সন্তানরা কি এটারই যোগ্য?
১ দিন আগে