leadT1ad

ঢাকার অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ৬২৫, নিরাপত্তায় তৎপর পুলিশ ও গোয়েন্দা

প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩: ৩৮
ঢাকার নির্বাচনী আসন। স্ট্রিম গ্রাফিক

আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোর মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। এখানকার অধিকাংশ নির্বাচনী কেন্দ্রকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ বিবেচনায় নিয়ে নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। ইতোমধ্যে ঢাকার ‘অতি ঝূকিপূর্ণ’ সেন্টারগুলোতে পুলিশ ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। কঠোর নজরদারিতে রয়েছে প্রার্থীদের বাড়ির কাছের সেন্টারগুলো। এছাড়া ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন আসন, প্রার্থী ও ভোটার সংখ্যা হিসাব করে নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য সর্বোচ্চ ফোর্স মোতায়েন করা হচ্ছে।

শনিবার (২৪ জানুয়ারি) ডিএমপির মিডিয়া শাখার উপ-কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান স্ট্রিমকে জানান, প্রার্থী ও ভোটার বিবেচনায় ঢাকা মহনগরীর সংসদীয় আসনগুলোতে তিন ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ডিএমপির প্রায় ৩৪ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে।

তিনি আরও বলেন, ‘টহল ও চেকপোস্ট সংখ্যা আগের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো বন্ধ করার জন্য সাইবার পেট্রোলিং বাড়ানো হয়েছে।’

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএমপির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্ট্রিমকে বলেন, ঢাকার সংসদীয় আসনের প্রার্থী, ভোটার সংখ্যা, অপরাধপ্রবণ এলাকা ও সম্ভাব্য পেশী ও অস্ত্রবাজির শঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে ‘অতি ঝুকিপূর্ণ’ এলাকা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় আগে থেকেই গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। রাজনৈতিক নেতাকর্মী ছাড়াও এসব ঝুকিপূর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণকারী আত্মগোপনে থাকা বা দেশের বাইরে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ড ও যোগাযোগ নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে।

পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, রাজধানীর ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বাসাবো, শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ি, পুরান ঢাকা, সবুজবাগ, তেজগাও, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ভাটারা, গেন্ডারিয়া, শ্যামপুর, পোস্তগলা, মিরপুর, হাজারীবাগ, গুলশান, বনানী, বারিধারার প্রায় অধিকাংশ কেন্দ্রকে অতি ঝুকিপূর্ণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। পুলিশের বিশেষ শাখাসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাঠ পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে পাঠানো প্রতিবেদনের আলোকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ঝুকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রের প্রত্যেকটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক স্তরে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) জানিয়েছেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।

সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ১ লাখ, বাংলাদেশ নৌ-বাহিনী ৫ হাজার, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ৩ হাজার ৭৩০ (স্থলভাগ-১ হাজার ২৫০), বাংলাদেশ পুলিশ ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড ৩ হাজার ৫৮৫, র‍্যাব ৭ হাজার ৭০০, এবং সাপোর্ট সার্ভিস হিসেবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ১৩ হাজার ৩৯০ জন। সবমিলিয়ে মোট ৮ লাখ ৯৬ হাজার ৬১৫ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে।

নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশজুড়ে দুই পর্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হবে। এ ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা থেকে শুরু করে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স পরিচালনা—সবকিছুর সমন্বয় থাকবে রিটার্নিং কর্মকর্তার অধীন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৪২ হাজার ৭৬১টি। এর মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ৮ হাজার ৭৮০টি, গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ১৬ হাজার ৫৪৮টি ও সাধারণ ভোট কেন্দ্র ১৭ হাজার ৪৩৩টি। এর মধ্যে পুলিশ সদস্য কর্তৃক অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে ২৫ হাজার ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ ব্যবহৃত হবে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপন করা হবে। এবারই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ড্রোনের ব্যবহার হচ্ছে। নির্বাচনে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৪১৮টি ড্রোন ব্যবহার করা হবে। এ ছাড়া নির্বাচনে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা প্রদানের জন্য বিভিন্ন বাহিনী তাদের ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করবে।

নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ-২০২৬’-এর ব্যবহার হচ্ছে। দুর্গম কেন্দ্রসমূহে ব্যালটসহ অন্যান্য নির্বাচনি সামগ্রী এবং নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পরিবহনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী হেলিকপ্টার ব্যবহারের ব্যবস্থা থাকবে। নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত ও প্রভাবিত করতে পারে এমন যেকোন ধরনের অপতৎপরতা ও কার্যক্রম অন্তর্বর্তী সরকার কঠোর হাতে দমনের জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে বলেও জানান পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা জেলায় মোট ২০টি সংসদীয় আসন রয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা মহানগরীতেই রয়েছে ১৫টি আসন। ঢাকা ৪ থেকে ঢাকা ১৮ নং পর্যন্ত সংসদীয় আসনগুলোতে মোট ২ হাজার ১৩১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১ হাজার ১৩৩টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৬২৫টি কেন্দ্রকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সারা দেশের মধ্যে ঢাকা বিভাগেই সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৬৭৫টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিচারে ঢাকার আসনগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ঢাকা-১২ আসনে সর্বোচ্চ ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যাকে হট সিট হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকা-৯ এবং ঢাকা-১৪ আসনে ১২ জন করে এবং ঢাকা-৫, ৭, ৮, ১৬ ও ১৭ আসনে ১১ জন করে প্রার্থী লড়াই করছেন।

ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সদস্যরা বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করবেন এবং সিসিটিভি ক্যামেরা ও ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি চালানো হবে। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণ নেই। তাদের সকল রাজনৈতিক কার্য্ক্রম নিষিদ্ধ। এ কারনেই তাদের কর্মকাণ্ড আরও বেশি নজরদারির আওতায় থাকবে বলেও পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবি প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম আজ শনিবার রাতে স্ট্রিমকে বলেন, অতিঝুকিপূর্ণ দুটি সেন্টার মিলে ডিবি পুলিশেরই একটি করে টিম দায়িত্ব পালন করবেন। আবার প্রার্থীদের বাড়ির কাছে থাকা কেন্দ্রগুলো নিয়েও আমরা স্টাডি করছি। সেই মোতাবেক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা করছি। পলাতক সন্ত্রাসী ও জামিনে বের হওয়া দাগী আসামিসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর নেতকার্মীদের গতিবিধি কঠোর গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এছাড়া ভোট কেন্দ্রের গুরুত্ব বিবেচনায় অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদেরও মোতায়েন করা হচ্ছে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত