তুরাগে মরদেহ: পুলিশের ধাওয়ায় নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন কয়েকজন

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
সাভার

প্রকাশ : ২৯ জুন ২০২৬, ১৪: ৩৯
২২ জুন বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ ছিলেন মো. সুমন। পরে তুরাগ নদে মেলে তাঁর লাশ। ছবি: সংগৃহীত

তুরাগ নদ থেকে গত কয়েক দিনে উদ্ধার হওয়া চারটি মরদেহের অন্তত দুজনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে। এ ছাড়া গত ২২ জুন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে গিয়ে পুলিশের অভিযানের সময় নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করেছেন উদ্ধার হওয়া একজনের পরিবারের সদস্য এবং ঘটনাস্থলে থাকা অন্তত দুই প্রত্যক্ষদর্শী।

এদিকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। একই সঙ্গে ২২ জুনের অভিযানের ঘটনায় পুলিশ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলাও করেছে। তবে দুটি মামলার বিবরণে একই সময় ও স্থান উল্লেখ থাকলেও ঘটনার বর্ণনায় রয়েছে ভিন্নতা।

একদিকে পুলিশের মামলায় বলা হয়েছে, কার্যক্রম আওয়ামী লীগের কর্মীদের অবস্থানের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। স্থান ত্যাগের সময় সাতজনকে আটক করা হয়।

অন্যদিকে একই দিনে নিখোঁজ হওয়া কিশোর সুমনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় করা অপমৃত্যুর মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, নৌভ্রমণে গিয়ে অসাবধানতাবশত সুমনসহ কয়েকজন পানিতে পড়ে যায়। সাঁতার না জানায় সুমন ডুবে যায়। পরে ২৬ জুন তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মরদেহের খবর ২২ জুন থেকেই

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কর্মসূচির দিন, অর্থাৎ ২২ জুন থেকেই দলটির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও আইডিতে পোস্ট দিয়ে দাবি করতে থাকেন, তুরাগ থানা এলাকায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলে বিএনপি নেতা-কর্মী ও পুলিশের হামলার পর সাত নেতা-কর্মী নিখোঁজ হয়েছেন এবং চারজনের মরদেহ তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

এই তথ্যের সূত্র ধরে তুরাগ নদ-সংলগ্ন এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ফায়ার সার্ভিস, ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক থানা এবং নৌ-পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২২ জুন থেকে শনিবার (২৭ জুন) পর্যন্ত তুরাগ নদ থেকে অন্তত চারটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

তুরাগে চার মরদেহ, ২২ জুন থেকে নিখোঁজ দুজন

গত ২৬ জুন দিবাগত রাতে আশুলিয়া থানা-পুলিশ তুরাগ নদ থেকে রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা মো. রানা মিয়ার ছেলে মো. সুমনের (১৭) মরদেহ উদ্ধার করে। আশুলিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (পরিদর্শক) মাহবুবুর রহমান বলেন, শুক্রবার দিবাগত রাতে আশুলিয়া গরুর হাট-সংলগ্ন নৌকা ঘাট থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভাটিতে ভাসমান অবস্থায় সুমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এর আগে ২৪ জুন সকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের দারুসসালাম থানার তুরাগ নদ থেকে রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা আরিফ হাসান রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আমিনবাজার নৌথানার ওসি হুমায়ুন কবির বলেন, রাকিব ২২ জুন থেকে নিখোঁজ ছিলেন।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, সুমন ও রাকিব—দুজনই ২২ জুন থেকে নিখোঁজ ছিলেন। তাঁদের দাবি, দুজনই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

আরিফ হাসান রাকিবের চাচা আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘এ বিষয়ে কথা বলতে চাই না। সে আওয়ামী লীগের মিছিল করত বলে শুনেছি। যা ঘটেছে, ফেসবুকেই দেখেছেন।’

অন্যদিকে ২৬ জুন দুপুরে রনি মোল্ল্যা নামে আরেকজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি উত্তরা দিয়াবাড়ি ঘাটে কয়েকজনের সঙ্গে গোসল করতে নেমে ডুবে যান। ঘণ্টাখানেক চেষ্টা চালানোর পর তাঁকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সাভার মডেল থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। রনির বাবা কফিল উদ্দিন জানান, গোসল করতে গিয়ে পানিতে ডুবে রনির মৃত্যু হয়েছে।

এ ছাড়া শনিবার নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া মারুফ হাসান (১৫) নামে আরেক কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মারুফের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশের ধাওয়ায় ঝাঁপ দিয়েছিল কয়েকজন, বলছেন স্বজন-প্রত্যক্ষদর্শীরা

উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত সুমনের মৃত্যু। ঘটনার দিন ট্রলারে তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন পরে সুমনের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁদের কাছ থেকেই পরিবার জানতে পারে, পুলিশ ধাওয়া দিলে সুমন নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল। ওই সঙ্গীরা বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন।

সুমনের খালু মো. জুয়েল বাবু বলেন, ২২ জুন সুমন নিখোঁজ হওয়ার পর খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে তার সঙ্গে থাকা কয়েকজনের কাছ থেকে পুরো ঘটনা জানতে পারেন।

তিনি বলেন, ‘সুমনের সঙ্গীরা জানিয়েছে, সুমন ২২ জুন কার্যক্রম আওয়ামী লীগের একটি মিছিলে গিয়েছিল। মিছিল শেষে তুরাগ নদের রোস্তমপুর ঘাট থেকে একটি ট্রলার ভাড়া করে তারা আশুলিয়া ট্রলার ঘাটে যায়। সেখানে পৌঁছানোর পর পুলিশ ধাওয়া করে। সুমনসহ কয়েকজন পানিতে ঝাঁপ দেয়। এ সময় সাতজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।’

যারা এই তথ্য দিয়েছেন, তারা সবাই এখন পলাতক বলে উল্লেখ করেন জুয়েল বাবু। তিনি বলেন, ‘সুমন সাঁতার জানত না। এরপর থেকেই সে নিখোঁজ ছিল। পরে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করি। একবার শুনেছিলাম, সুমনকে আটক করা হয়েছে। পরে নিশ্চিত হই, সে আটক হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ট্রলার নিয়ে তুরাগের বিভিন্ন এলাকায় খুঁজেছি। তুরাগ ও আশুলিয়া থানা-পুলিশের কাছেও গিয়েছি। কিন্তু পুলিশ আমাদের কিছুই জানায়নি। ২৩, ২৪ ও ২৫ জুন—তিন দিন ট্রলার নিয়ে খুঁজেছি। ২৫ তারিখ রাত সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশ জানায়, জেলেরা একটি লাশ ভাসতে দেখেছে। পরে মরদেহ উদ্ধার হলে সেটি সুমনের বলে নিশ্চিত হয়।’

ঘটনাস্থল আশুলিয়া বাজারের বাঁশপট্টি এলাকায় গিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি জানান, সেদিন পুলিশ এই দিক দিয়েই যায়। পুলিশ দেখে ওরা ঝাঁপ দেয়। আনুমানিক বেলা সোয়া ২টার দিকে পাঁচ-সাতজন তিনি দৌড়ে যেতেও দেখেন। একজনকে জিজ্ঞেস করলে বলে, মিছিলে গিয়েছিল। ট্রলারের কাছে আসতেই পুলিশ ধাওয়া করেছে।

ওই ব্যক্তি আরও বলেন, ঠিক কতজন ঝাঁপ দিয়েছিল বলতে পারবেন না। তবে তিনজনকে উঠতে দেখেছেন। পুলিশ সম্ভবত সাতজনকে আটক করেছিল। এখানে কাউকে কিছু বলেনি। পরে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে গেছে।

পাশেই বসে থাকা আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পর পুলিশ ওই ট্রলার নিয়ে কিছু দূর এগিয়েছিল, পরে আবার ফিরে আসে।

অভিযানে গ্রেপ্তার ও অপমৃত্যুর মামলা, ঘটনার বর্ণনায় ভিন্নতা

২২ জুন আশুলিয়া ট্রলার ঘাটে অভিযান চালিয়ে সাতজনকে আটকের ঘটনায় পরদিন আশুলিয়া থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়। মামলায় ঘটনার তারিখ ২২ জুন এবং স্থান হিসেবে আশুলিয়া গরুর হাট ট্রলার ঘাট উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে ২৬ জুন সুমনের মরদেহ উদ্ধারের পর তাঁর বড় ভাই মো. সালাউদ্দিন অপমৃত্যুর মামলা করেন। এই মামলায়ও ঘটনার সময় ২২ জুন বিকেল এবং স্থান হিসেবে আশুলিয়া গরুর হাট ট্রলার ঘাটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

একই সময় ও স্থান উল্লেখ থাকলেও দুটি মামলায় ঘটনার বর্ণনা ভিন্ন।

২২ জুন দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলার এজাহারে বলা হয়, ওই দিন বেলা ৩টার দিকে আশুলিয়া গরুর হাট ট্রলার ঘাটে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের এবং নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ ৬০–৬৫ জন নেতা-কর্মী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং দেশের অভ্যন্তরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছিলেন বলে পুলিশ জানতে পারে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের প্রতিহত করে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আন্দোলনকারীরা দ্রুত স্থান ত্যাগের চেষ্টা করলে সাতজনকে আটক করা হয়।

অন্যদিকে সুমনের মৃত্যুর ঘটনায় করা অপমৃত্যুর মামলার এজাহারে বলা হয়, ২২ জুন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বন্ধুবান্ধবসহ ২০–২২ জন তুরাগ নদে নৌভ্রমণের উদ্দেশ্যে ধৌড় ব্রিজ ঘাট এলাকা থেকে নৌকায় ওঠেন সুমন। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে আশুলিয়া গরুর হাট ঘাটে তাড়াহুড়া করে নৌকা থেকে নামতে গিয়ে অসাবধানতাবশত সুমনসহ পাঁচ-ছয়জন নদীতে পড়ে যায়। সাঁতার না জানার কারণে সুমন নদীর স্রোতে ডুবে যায়। তার সঙ্গে থাকা লোকজন অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পায়নি। পরে ২৬ জুন নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

২২ জুন করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলার আসামিদের আইনজীবী আরিফ সরকার পাভেল বলেন, সুমনের মৃত্যুর ঘটনায় হওয়া অপমৃত্যুর মামলা এবং গ্রেপ্তার সাতজনের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার সময় ও স্থান প্রায় একই।

তিনি বলেন, ‘আসামিদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, তারা ২২ জুন মিছিল করে। তুরাগ এলাকায় মিছিলের সময় তুরাগ থানা-পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীরা ধাওয়া দিলে তারা ট্রলারে করে আশুলিয়া ট্রলার ঘাটে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ ও বিএনপির নেতা-কর্মীরা সেখানে গিয়ে তাদের ওপর হামলা করলে অনেকে নদীতে লাফ দেয়। নদীতে লাফিয়ে পড়াদের লক্ষ্য করেও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। সেখান থেকে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত