থামছে না মাজারে সহিংসতা, প্রশাসনের গাফিলতির অভিযোগ

প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১৯: ৫৬
দৌলতপুরের ফিলিপনগরে শনিবার পীর শামীমের দরবারে হামলা। স্ট্রিম ছবি

দেশে সুফি ঐতিহ্য ও মাজার সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও এসব স্থাপনায় হামলায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে এখন পর্যন্ত অন্তত ৯৭টি মাজার ও দরবারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পরেও সেই হামলা বন্ধ হচ্ছে না।

এমন ঘটনায় ‘নিরাপত্তাহীনতা বোধ’ করার কথা জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পীর ও আশেকানরা। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ‘বর্তমান সরকারও মাজার-দরবারের মতো জায়গাগুলোতে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।’ তবে সরকার থেকে বলা হয়েছে, ‘এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে গতকাল শনিবার (১১ এপ্রিল) শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর পীরকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই সময়ে তাঁর দরবারে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের ফিলিপনগর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১৮ মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, গ্রামের পাকা সড়কে শতাধিক মানুষ স্লোগান দিয়ে শামীমের দরবারের দিকে যায়। মিছিলে থাকা লোকজনের একটি অংশ তাঁর দরবারের একতলা দুটি পাকা ভবন ও একটি টিনশেড ঘরে ঢুকে পড়ে। তারা ভবনের ছাদসহ ঘরগুলোতে ভাঙচুর চালায় ও আগুন ধরিয়ে দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, হামলার সময় ওই দরবারের ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচ থেকে সাতজন আহত হয়েছেন। অন্যরা দৌড়ে চলে যান। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে আগুন নেভান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রোববার (১২ এপ্রিল) দুপুরে দৌলতপুর থানার ওসি আরিফুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘গতকাল সকাল থেকে একটি নিউজ ভাইরাল হয়েছে। আমরা এটার পোস্টগুলো মনিটরিংয়ে ছিলাম। পুলিশ মোতায়েন করেছিলাম। সতর্কও ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে মাজারের একদম পেছনে একটি ফাঁকা জায়গা থেকে অতর্কিত হামলা হয়েছে। একেবারে কিছু বুঝে ওঠার আগেই এই হামলাটা হয়ে যায়।’

হামলার সঙ্গে কারা জড়িত—জানতে পেরেছেন কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা তদন্ত করছি। ওই বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর মতো এখনো সময় হয়নি।’

এ ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলেও জানান পুলিশের ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ঘটনাটা কী, স্থানীয় কারা এতে জড়িত, কারও কোনো প্রভাব আছে কিনা—সবকিছুই আমরা তদন্ত করছি।

মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয় নুরাল পাগলার

এর আগে গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার দরবার শরিফে হামলা-ভাঙচুর এবং তাঁর মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। সেদিন জুমার নামাজের পর বেলা তিনটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত দফায় দফায় দরবারে হামলা করে একদল লোক। তাঁরা ‘শরিয়ত-পরিপন্থীভাবে দাফনের’ অভিযোগ তুলে নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেন। এ ঘটনায় রাসেল মোল্লা (২৮) নামে এক ব্যক্তি নিহত হন।

‘উপজেলা ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটি’র পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে একদল লোকের এই হামলায় পুলিশ সদস্যসহ অন্তত অর্ধশত ব্যক্তি আহত হন। সেখানে পুলিশের দুটি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।

আরও যত মাজারে ভাঙচুর

২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে তোলা বুরহান উদ্দিন (রহ.) নামের মাজার ভেঙে দেন এলাকাবাসী। ২৬ নভেম্বর শেরপুরের খাজা বদরুদ্দোজা হায়দার ওরফে দোজা পীরের দরবারে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এতে একজন নিহত ও ১২ জন আহত হন।

গত বছরের জানুয়ারিতে ময়মনসিংহে হজরত শাহ সুফি সৈয়দ কালু শাহ (রহ.)-এর মিলাদ মাহফিল, দোয়া ও সামা-কাওয়ালি অনুষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর করা হয়।

এছাড়া একই বছরের ২৮ জানুয়ারি রাজধানীর তেজগাঁওয়ে কুতুববাগ দরবার শরিফের ওরস বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন করেন একদল ব্যক্তি। এ সময় কিছু মানুষ ওরসের জন্য তৈরি করা প্যান্ডেল ভাঙচুরের চেষ্টা করেন।

গত বছরের ৪ মার্চ নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় ওরস আয়োজনের প্রস্তুতির মধ্যে একটি মাজারে হামলা হয়। হামলাকারীরা তোরণ, প্যান্ডেল ও আলোকসজ্জা ভেঙে দেয়। ওই রাতে উপজেলার মাসকা বাজারসংলগ্ন হজরত শাহ নেওয়াজ ফকিরের (ল্যাংটা পাগলা) মাজারে এ ঘটনা ঘটে।

গত বছরের ১৭ মার্চ বরগুনার আমতলী উপজেলায় ইসমাইল শাহ মাজারে বার্ষিক ওরস চলাকালে হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

একই বছরের ২০ এপ্রিল চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে হজরত খাজা কালু (রহ.) মাজার, মসজিদ ও এতিমখানার দানবাক্স ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে।

একই বছরের ১৬ এপ্রিল ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার নাওগাঁও ইউনিয়নে পাঁচটি বসতবাড়ি ও একটি মাজারে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

অনিরাপদ মাজার ও দরবার

সুফি সমাজভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মাকামের তথ্যানুসারে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে পরের বছর নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৯৭টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে ঘটেছে ২৮টি—কুমিল্লায় ১৭টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৩টি, নোয়াখালীতে ৩টি, চট্টগ্রামে ৪টি এবং কক্সবাজারে ১টি ঘটনা।

ঢাকা বিভাগে এই সময়ে ৩৬টি, ময়মনসিংহ বিভাগে ৮টি, সিলেট বিভাগে ৯টি, বরিশাল বিভাগে ২টি, খুলনা বিভাগে ৫টি, রংপুর বিভাগে ৩টি এবং রাজশাহী বিভাগে ৬টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

ধর্মীয় মতাদর্শিক বিরোধের কারণেই এসব হামলা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, মাজারকে ‘শিরক-বিদআত’ আখ্যা দিয়ে হামলার পক্ষে বৈধতা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ, মাদক সেবন ও অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ এবং জমিসংক্রান্ত বিরোধও রয়েছে।

হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গাফিলতির অভিযোগ

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুফিবাদ-বিষয়ক গবেষক ও লেখক সৈয়দ তারিক বলেন, বাংলাদেশে ইসলাম এসেছে পীর-ফকিরদের মাধ্যমে। শাহ সুলতান বলখী মাহিসাওয়ার ও শাহ জালালের (রহ.) মাজার এখানে প্রতিষ্ঠিত। এ ধরনের বহু মাজার আছে এবং এই মাজারকে কেন্দ্র করে একটি ভাবধারা এখানে প্রচলিত রয়েছে।

সৈয়দ তারিক বলেন, ‘বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই পারে। কিন্তু তাই বলে এভাবে মাজার ভেঙে ফেলার ধারণা এসেছে আরবের ওহাবি আন্দোলন থেকে। তবে আমরা চাই, যার যার ধারণা ও বিশ্বাস অনুযায়ী সংস্কৃতি পালন করুক।’

এ সময় পীরের আশেকানদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথাও তুলে ধরেন ডা. বাবা জাহাঙ্গীর বা ইমান আল সুরেশ্বরীর এক ভক্ত। তিনি বলেন, ‘আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে তো শঙ্কা রয়েছেই। যেভাবে হামলা করা হচ্ছে, তাতে যে কেউ যেকোনো সময় বিপদের মুখে পড়তে পারে।’

মাকামের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবু সাঈদ বলেন, ‘আমরা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ১২টি রাজনৈতিক দলকে চিঠি পাঠিয়েছিলাম, যাতে তাদের ইশতেহারে মাজারে হামলার বিষয়টি—যে সব মাজারে হামলা হয়েছে, সেগুলোর ক্ষতিপূরণ, পুনর্সংস্কার কার্যক্রম এবং দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধানের কথা উল্লেখ থাকে। তারা সবাই আমাদের চিঠি গ্রহণ করেছে, কিন্তু কেউই সুনির্দিষ্টভাবে এই বিষয়ে তাদের ইশতেহারে উল্লেখ করেনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের পর বিএনপির নতুন সরকার আসার পরও এখনো পর্যন্ত আমরা মাজারে হামলার ফলে যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষতি হচ্ছে, সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ক্ষুণ্ণ হচ্ছে—এসব বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম দেখতে পাইনি। যদি বিএনপি সরকার গঠনের পর আগের হামলার বিচার বা সমস্যার সমাধানে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিত, তাহলে আমার মনে হয় না এ ঘটনা ঘটত।’

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতি ছিল, সদিচ্ছার অভাব ছিল। একইভাবে বিএনপিরও সদিচ্ছার অভাব এবং গাফিলতি দেখা যাচ্ছে। এই গাফিলতির সুযোগেই গতকাল যারা এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে, তারা সাহস পেয়েছে।’

মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান বলেন, মাজারে যাওয়া মানুষের স্বাধীনতা রক্ষা ও তাদের নিরাপত্তা দিতে সরকারের কোনো উদ্যোগ ছিল না, এখনো নেই।

সাইদুর রহমান বলেন, সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হলো, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন—মব সন্ত্রাস বা মব ভায়োলেন্স আর হবে না, বন্ধ থাকবে। কিন্তু এরপরও কুষ্টিয়ায় এই ঘটনা ঘটল।

পহেলা বৈশাখেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে—এই আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘তখন বিভিন্ন জায়গায় হামলা হতে পারে। আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বলতে চাই, অতি দ্রুত যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হোক, বিচারের আওতায় আনা হোক এবং ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা না ঘটে, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’

এ নিয়ে জানতে চাইলে রোববার (১২ এপ্রিল) সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রেস সচিব আবু আব্দুল্লাহ এম ছালেহ (সালেহ শিবলী) স্ট্রিমকে বলেন, ‘সরকার কোনো কারণে কাউকেই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে দেবে না। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে যে হত্যাকাণ্ড হয়েছে, এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সম্পর্কিত