ঠাকুরগাঁও/খোলা আকাশের নিচে নষ্ট হচ্ছে জব্দ করা শত শত যানবাহন
স্ট্রিম সংবাদদাতাঠাকুরগাঁও

আসন নেই, দরজা উধাও, চাকা বসে গেছে। কোনোটির আবার শুধু পড়ে আছে মরচে-ধরা কাঠামো। লতা-গুল্মে ঢেকে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ দেখে বোঝার উপায় নেই এগুলো একসময় রাস্তায় চলত। এখন এগুলো কেবলই মামলার আলামত। ঠাকুরগাঁও আদালত চত্বরে খোলা আকাশের নিচে এভাবেই বছরের পর বছর পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে জব্দকৃত শতাধিক যানবাহন।
মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, ট্রাক, মাইক্রোবাস, পিক-আপ, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন রয়েছে সেখানে। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় অনেকগুলো হারিয়েছে ব্যবহারযোগ্যতা। যন্ত্রাংশও চুরি হয়েছে কোনোটির। ফলে মামলা নিষ্পত্তির পর মালিককে ফেরত দেওয়া বা নিলামে বিক্রির সময় সেগুলো আর আগের অবস্থায় থাকে না।
সরেজমিনে ঠাকুরগাঁও আদালত এলাকায় বিআরটিএ কার্যালয়ের সামনের চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি জব্দকৃত যানবাহন খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে। সংরক্ষণের জন্য নেই পর্যাপ্ত ছাউনি বা অন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা।
আসন নেই, দরজা উধাও, চাকা বসে গেছে কিংবা লতাগুল্মে ঢেকে গেছে ধ্বংসাবশেষ—বোঝার উপায় নেই এগুলো একসময় রাস্তায় চলত। মামলা দীর্ঘসূত্রতার কারণে ঠাকুরগাঁও আদালত চত্বরে খোলা আকাশের নিচে বছরের পর বছর পড়ে থেকে এভাবেই নষ্ট হচ্ছে জব্দ করা শতাধিক যানবাহন।
মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, ট্রাক, মাইক্রোবাস ও পিকআপসহ বিভিন্ন ধরনের যানে ভরা ওই চত্বরে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের কোনো ছাউনি না থাকায় যন্ত্রাংশ চুরি হচ্ছে এবং অনেক যানই ব্যবহারযোগ্যতা হারাচ্ছে। ফলে মামলা নিষ্পত্তির পর মালিককে ফেরত দেওয়া বা নিলামে বিক্রির সময় সেগুলোর আগের অবস্থা আর থাকে না।
সরেজমিনে ঠাকুরগাঁও আদালত এলাকায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কার্যালয়ের সামনের চত্বরে দেখা যায়, সারি সারি জব্দ করা যানবাহন রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে।
আদালতের মালখানা সূত্রে জানা যায়, জেলার সাতটি থানায় বিভিন্ন মামলায় জব্দ করা যানবাহন পরে আদালতে পাঠানো হয়। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক পরিবহন, সড়ক দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন ঘটনায় এসব যানবাহন জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় করা মামলা নিষ্পত্তি হতে অনেক সময় ১০ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত লেগে যায়। এরপর আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোনোটি মালিককে ফেরত দেওয়া হয়, কোনোটি আবার নিলামে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়।
তবে নিলামের প্রক্রিয়াটিও সময়সাপেক্ষ। ফলে সেগুলো ব্যবহার বা পুনরায় চালু করার পরিবর্তে ভাঙারি হিসেবে বিক্রি করা ছাড়া উপায় থাকে না। এতে একদিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পদের মূল্য কমে যায়, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদও নষ্ট হয়।
মালখানা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কোর্ট উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল মালেক বলেন, ‘২০০৪ সাল থেকে বিভিন্ন মামলায় জব্দ করা যানবাহন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পেছনে বিআরটিএ কার্যালয়ের সামনের চত্বরে রাখা হয়েছে। এখানে প্রায় ২০০টি মোটরসাইকেল, একটি ট্রাক, তিনটি কার, একটি পিকআপ ভ্যান ইত্যাদি রয়েছে। ২৮ আগস্ট সর্বশেষ ১৬টি মোটরসাইকেল নিলাম হয়েছে।’
ঠাকুরগাঁও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি আব্দুল লতিফ বলেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত মামলার আলামত হিসেবে এসব যানবাহন সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু সেই সংরক্ষণ যখন বছরের পর বছর খোলা আকাশের নিচে হয়, তখন আলামত রক্ষার উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।’
আদালতের কোর্ট ইন্সপেক্টর বেলাল হোসেন বলেন, ‘জব্দকৃত যানবাহনগুলো রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষায় ছাউনি করা গেলে ভালো হয়। এতে রাষ্ট্রের সম্পদও সুরক্ষিত থাকবে।’
আইনজীবী আশিকুর রহমান বলেন, কোটি কোটি টাকার সম্পদ এভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন খোলা জায়গায় পড়ে থাকায় যানবাহনের মূল্য ও ব্যবহারযোগ্যতা দুটিই কমছে। এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ঠাকুরগাঁও জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. আব্দুল হালিম বলেন, ‘এগুলো রাষ্ট্রের সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যেসব আলামত নিষ্পত্তিযোগ্য, সেগুলোর দ্রুত সুরাহা হওয়া উচিত।’
আদালতের মালখানার দায়িত্বে থাকা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. লুৎফর রহমান বলেন, ‘বিচার শেষ হওয়ার পর আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোনো আলামত ধ্বংস করা হয়, কোনোটি প্রকৃত মালিককে ফেরত দেওয়া হয় অথবা নিলামে বিক্রি করা হয়। মামলা শেষ না হলে সাধারণভাবে নিলামের সুযোগ থাকে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘মালখানার জন্য আদালতের নিজস্ব ভবন নেই। যে জায়গায় জব্দকৃত যানবাহন রাখা হয়েছে, সেটি জেলা প্রশাসনের জায়গা। সেখানে শেড করা যায় কিনা, তা নিয়ে গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে কথা বলতে হবে।’
মো. লুৎফর রহমান জানান, নিলামযোগ্য মালামালের তালিকা করা হয়েছে। পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে বড় পরিসরে একটি নিলামের প্রস্তুতি চলছে। ভাঙারি হিসেবে বিক্রির উপযোগী মালামালও এতে থাকবে। চলতি মাসেই নিলাম হতে পারে। এতে মালখানার প্রায় অর্ধেক জায়গা খালি হয়ে যাবে বলে আশা করেন তিনি।
.png)
-3f0d26.jpeg)



-452e34-256x144.webp)

