কৌশলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব, বদলাবে আবাসিকে বিলের ধাপ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬, ০০: ০৫
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি)। স্ট্রিম গ্রাফিক

ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহকদের বিলের ধাপ বা স্ল্যাব একীভূত করা, বেসরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিক বিলের আওতায় আনাসহ গণশুনানি ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) জমা দেওয়া বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এবং পাঁচটি বিতরণ কোম্পানির প্রস্তাবে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বর্তমানে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো সেবামূলক ট্যারিফে তুলনামূলক কম দামে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে। তবে পিডিবি, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) এবং ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) তাদের প্রস্তাবে এসব প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি বাণিজ্যিক ট্যারিফের আওতায় আনার সুপারিশ করেছে। এ ছাড়া অনুমোদিত সীমার বেশি লোড ব্যবহারে দ্বিগুণ জরিমানা, নির্মাণকাজে দ্বিগুণ বিল এবং প্রিপেইড মিটারে বিদ্যমান ছাড় বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব প্রস্তাবের ওপর আগামী ২০ ও ২১ মে গণশুনানি করবে বিইআরসি।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, 'কারিগরি কমিটি কাজ করছে। তারা প্রতিবেদন দিলে শুনানিতে আলোচনা হবে। ভোক্তাস্বার্থ বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।'

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম স্ট্রিমকে বলেন, 'পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে নিম্নমধ্যবিত্তের ওপর বাড়তি চাপ তৈরির চেষ্টা চলছে। অনেকগুলো অন্যায্য প্রস্তাব আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা দাতব্য প্রতিষ্ঠান থেকে চার্জ বাড়ানো ঠিক হবে না। বেসরকারি হাসপাতাল-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানুষের কাছ থেকে আয় করছে বলে সরকারও সেই পথে হাঁটবে, এটি কাম্য নয়।'

পিডিবি এখন শূন্য থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত একটিমাত্র ধাপ করার প্রস্তাব দিয়েছে। এতে ৭৫ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীরা প্রথম ধাপের কম দামের সুবিধাটি হারাবেন। ডিপিডিসিও বস্তি এলাকার জন্য বিদ্যমান ধাপভিত্তিক ব্যবস্থা তুলে দিয়ে ফ্ল্যাট ট্যারিফ চালুর কথা বলেছে।

পিডিবির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জ্বালানির দাম বাড়লে প্রতি ছয় মাস পরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করতে হবে। সাধারণত আবাসিক গ্রাহকেরা কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন তার ওপর ভিত্তি করে ধাপে ধাপে বিল নির্ধারিত হয়। বর্তমানে প্রথম ৭৫ ইউনিটের দাম সবচেয়ে কম। পিডিবি এখন শূন্য থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত একটিমাত্র ধাপ করার প্রস্তাব দিয়েছে। এতে ৭৫ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীরা প্রথম ধাপের কম দামের সুবিধাটি হারাবেন। বর্তমানে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারী একজন গ্রাহক ধাপে ধাপে ১ হাজার ২৯৪ টাকা ৫০ পয়সা বিল দেন। প্রস্তাব অনুযায়ী শুধু ধাপ বদলের কারণেই এই বিল ১৪৫ টাকা ৫০ পয়সা বেড়ে ১ হাজার ৪৪০ টাকা হবে। এর সাথে পিডিবির প্রস্তাবিত নতুন দর কার্যকর হলে ওই গ্রাহকের বিল ৩৪৫ টাকা ৫০ পয়সা বেড়ে ১ হাজার ৬৪০ টাকা হবে। ডিপিডিসিও বস্তি এলাকার জন্য বিদ্যমান ধাপভিত্তিক ব্যবস্থা তুলে দিয়ে ফ্ল্যাট ট্যারিফ চালুর কথা বলেছে।

ডিপিডিসির প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, নতুন ভবন নির্মাণের জন্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে প্রচলিত বাণিজ্যিক ট্যারিফের দ্বিগুণ হারে বিল দিতে হবে। ওজোপাডিকো বলেছে, ইজিবাইক চার্জিং স্টেশনের আলাদা ট্যারিফ বাতিল করে সরাসরি বাণিজ্যিক রেট বসাতে হবে। বর্তমানে প্রিপেইড মিটারে প্রতি রিচার্জে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়, যা ওজোপাডিকো বাতিল বা কমানোর প্রস্তাব করেছে। ডিপিডিসি প্রিপেইড গ্রাহকদের ক্ষেত্রে নতুন করে জামানত বা সিকিউরিটি চার্জ আরোপের কথা বলেছে। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি), ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (ডেসকো) ও নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো) প্রস্তাবে ‘পাস-থ্রু’ ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে পাইকারি দাম বাড়লে তা সরাসরি গ্রাহকের খুচরা বিলে যুক্ত হবে।

২১ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ভর্তুকি তুলে দেওয়ার প্রস্তাব

পিডিবির প্রস্তাবে আরইবির কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। পিডিবি বলছে, আরইবির আওতাধীন ৮০টি সমিতির মধ্যে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামসহ ২১টি সমিতি মূলত উন্নত শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। এসব সমিতিকে আর ভর্তুকিযুক্ত রেটে পাইকারি বিদ্যুৎ দেওয়া ঠিক হবে না। তাঁদের জন্য শহরের কোম্পানিগুলোর মতো সাধারণ রেট নির্ধারণ করতে হবে।

বর্তমানে গ্রাহক যখন বিদ্যুৎ সংযোগ নেন, তখন তাঁর অনুমোদিত লোডের বিপরীতে প্রতি মাসে ডিমান্ড চার্জ দিতে হয়। আরইবি প্রস্তাব করেছে, কোনো গ্রাহক অনুমোদিত লোডের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে তাঁকে দ্বিগুণ ডিমান্ড চার্জ বা জরিমানা দিতে হবে।

পিজিসিবি তাদের প্রস্তাবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধি এবং ঋণের দায় পরিশোধের কারণ দেখিয়ে সঞ্চালন মাশুল বা হুইলিং চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। সংস্থাটি ৩৩ কেভি লাইনের সঞ্চালন মাশুল বর্তমানের শূন্য দশমিক ৩১৪৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে শূন্য দশমিক ৪৯৬৯ টাকা করার প্রস্তাব করেছে। একইভাবে ১৩২ কেভি ও ২৩০ কেভি লেভেলে মাশুল বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

সম্পর্কিত