জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে নিহত কলেজছাত্র ওয়াসিম আকরাম হত্যা মামলা থেকে আসামিকে ‘খালাস করিয়ে দেওয়ার আশ্বাসে’ কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদার পদত্যাগ করেছেন।
আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের এক আইনজীবীর সঙ্গে তার কথিত দরকষাকষির দুটি অডিও ক্লিপ ফাঁস হওয়ার আগেই সোমবার তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। একই দিনে আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় তার পদত্যাগ করে এবং আদেশ রাজি করেন।
ফাঁস হওয়া অডিও ক্লিপগুলোতে আর্থিক লেনদেনের পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক তদবিরের বিষয়টি উঠে এসেছে।
সংবাদমাধ্যমের কাছে আসা অডিওতে সাইমুম রেজা তালুকদারকে সরাসরি এক কোটি টাকা প্রত্যাশার কথা বলতে শোনা যায়। কথোপকথনে কিস্তিতে টাকা পরিশোধের আলোচনার পাশাপাশি, মামলা থেকে অব্যাহতির নিশ্চয়তা হিসেবে বিএনপির নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরী অথবা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালকে দিয়ে তদবির করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে রিজনেবল উল্লেখ করে তার সমর্থন আদায়ে ওই রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশ কাজে লাগবে বলেও অডিওতে শোনা যায় ।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা আসামি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীকে গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রসিকিউশনের তথ্যমতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে ওয়াসিমসহ ৯ জন নিহত এবং ৪৫৯ জন আহত হওয়ার ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে সংঘটিত গণহত্যার মামলায় গত ১৬ ফেব্রুয়ারি তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
এ বিষয়ে এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবী রেজওয়ানা ইউসুফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি খোলাখুলি কিছু বলতে রাজি হননি।
তবে অডিও রেকর্ডটি বাস্তবসম্মত কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যেহেতু এত বড় ঘটনা, সেখানে কোনো না কোনো সত্য থাকতে পারে।’
অন্যদিকে, ঘুষ দাবির অভিযোগ ও অডিওর সত্যতা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন সাইমুম রেজা তালুকদার। তার দাবি, এটি একটি মহলের অপপ্রচার এবং অডিওগুলো মিথ্যা।
নিজের দাবির সপক্ষে আইনি যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা কয়েকজন প্রসিকিউটরের সমন্বয়ে গঠিত টিমের অধীনে পরিচালিত হয়। তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন ও চিফ প্রসিকিউটরের নেতৃত্বে কয়েকটি স্তর পার হয়ে মামলার নথিপত্র প্রস্তুত হয়। চূড়ান্ত পর্যায়ে শুনানি, সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্ক শেষে আদালত স্বাধীনভাবে রায় দেন। ফলে এককভাবে কোনো প্রসিকিউটরের পক্ষে আসামিকে আইনি প্রক্রিয়ায় বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়া বা খালাস দেওয়া সম্ভব নয়। পদত্যাগের কারণ হিসেবে সাইমুম রেজা তার লিখিত বক্তব্যে পূর্বের কর্মস্থল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় এবং গবেষণায় ফিরে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।
ডিজিটাল প্রমাণের আইনি গ্রহণযোগ্যতা এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের আরেক প্রসিকিউটর ও সাইবার বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, অডিওগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি কি না, তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে পরীক্ষা করা হয়নি। তবে কথোপকথনের শ্বাস নেওয়ার প্রক্রিয়া ও বাচনভঙ্গি বিশ্লেষণে এটি এআই জেনারেটেড না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
তিনি বলেন, একটি পূর্ণাঙ্গ ভয়েস স্যাম্পল, আইপিডিআর এবং সিডিআর বিশ্লেষণের মাধ্যমে ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্ত হলেই কেবল সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবে কথোপকথনটি কাদের মধ্যে এবং কী উদ্দেশ্যে হয়েছিল।
ফাঁস হওয়া অডিওর প্রথমটি ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের মেয়াদের বলে জানা গেছে। তবে সাবেক এই চিফ প্রসিকিউটর বিষয়টি সম্পর্কে আগাম কোনো ধারণা থাকার কথা নাকচ করে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাকে কেউ কোনো রেকর্ডিং দেয়নি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার আগে আমি এসব রেকর্ডিং শুনিনি।’