leadT1ad

হরমুজে আটকা বাংলাদেশি জাহাজের ক্যাপ্টেন

শিগগির বের হতে পারব নিশ্চিত নই

এমভি বাংলার জয়যাত্রায় আটকা পড়া ৩১ নাবিক। ছবি: সংগৃহীত

কথায় আছে, ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে আটকা পড়া বাংলাদেশি জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’র নাবিকদের অবস্থা এখন তেমনই। প্রায় চার মাস পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে হরমুজ খুললেও শিগগির বের হতে পারবেন কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না ৩১ নাবিকের।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) পণ্যবাহী জাহাজটি বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে নোঙর করে আছে। বৃহস্পতিবার ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতা স্মারকে সই করার পর ‘বাংলার জয়যাত্রা’র ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় স্ট্রিমের।

হোয়াটসঅ্যাপে আলাপে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যে শিগগিরই বের হতে পারব, এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। পরিস্থিতি পুরোপুরি আনপ্রেডিক্টেবল। এর আগেও শুনেছি শান্তিচুক্তি হচ্ছে, তবে বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আশ্বস্ত হতে পারছি না। ইরান এখনো ট্রাম্পকে বিশ্বাস করছে না। তাই আমরাও পুরোপুরি কনফিডেন্ট হতে পারছি না।’

বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশি জাহাজটি গত ২৬ জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে। ২৬ ফেব্রুয়ারি কাতার থেকে স্টিল কয়েল নিয়ে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে যায় জাহাজটি। এর দুই দিন পর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলা করলে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এতে আটকা পড়ে বাংলার জয়যাত্রা।

যুদ্ধের মধ্যে গত ৮ এপ্রিল সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে সার নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে যাত্রা করেছিল জাহাজটি। তবে হরমুজ পার হতে পারেনি।

ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম জানান, গত কয়েক মাসে তাঁরা তিনবার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রতিবারই তাঁদের থামার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে—‘স্টপ ইয়োর ভেসেল’। নিরুপায় হয়ে প্রতিবারই জাহাজ ঘুরিয়ে আরব আমিরাতের জলসীমায় ফিরে আসতে হয়েছে।

যুদ্ধের বিভীষিকা নিয়েও কথা বলেন শরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, এই যুদ্ধ আমাদের জীবন পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। মনে হচ্ছে আমরা যেন একটি বদ্ধ জলাশয়ে আটকা পড়ে আছি। পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশির দিকে তাকালে এখন শুধু সমুদ্রের রূপই চোখে পড়ে না, এক অবরুদ্ধ বন্দিশালার কথাও মনে হয়।

যুদ্ধক্ষেত্রের এত কাছাকাছি থাকায় নাবিকরা চরম মানসিক ট্রমার মধ্যে রয়েছে বলে জানান তিনি। শরিফুল বলেন, গত ১ মার্চ রাত আনুমানিক দেড়টায় দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় জাহাজটি মাত্র ২০০ মিটার দূরে নোঙর করা ছিল। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ক্রুরা চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। জাহাজ ছেড়ে চলে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলাম।

‘আমাদের পরবর্তী গন্তব্য সাউথ আফ্রিকা। সেখান থেকে হয়তো ফ্লাইটে দেশে ফিরব। তার আগেও ফিরতে হতে পারে।’

ওই হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ব্যস্ত বন্দরটির অবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, ওই ঘটনার পর বন্দরে কোনো পাইলট, টাগবোট বা বন্দরকর্মী ছিলেন না। পুরো বন্দর জনশূন্য হয়ে পড়েছিল। এরপর আকাশে আগুনের গোলা দেখার সঙ্গে সঙ্গে আমরা জাহাজের ভেতর আশ্রয় খুঁজতাম।

এই চার মাসে হরহামেশা বিস্ফোরণের শব্দের পাশাপাশি জাহাজে কম্পন টের পেয়েছেন বলে জানান এই ক্যাপ্টেন। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রফেশনাল। এর আগেও লম্বা সময় আটকা পড়েছি। অভ্যস্তও। তবে এবারের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। চোখের সামনেই ড্রোন-মিসাইল পড়তে দেখেছি, জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখেছি। সেই ঘটনা মনে পড়লে আত্মা শুকিয়ে যায়। এখনও বুক ধড়ফড় করে।’

এমন অবরুদ্ধ দশার মধ্যেই গত মার্চে ঈদুল ফিতর এবং মে মাসে ঈদুল আজহা পালন করেছেন ৩১ নাবিক। কঠিন এই সময়ে তাদের টিকে থাকার অবলম্বন ছিল পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ। এখন হরমুজ থেকে বের হতে পারলে সেই পরিবারের কাছেই ফিরতে চান তাঁরা।

শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের পরবর্তী গন্তব্য সাউথ আফ্রিকা। সেখান থেকে হয়তো ফ্লাইটে দেশে ফিরব। তার আগেও ফিরতে হতে পারে।’

এদিকে, সমঝোতা স্মারকে সই করার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে খুলে যাওয়ার ঘোষণা দিলেও আন্তর্জাতিক শিপিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি রাতারাতি স্বাভাবিক হবে না।

ব্রিটিশ দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে এক সাক্ষাৎকারে জাপানের অন্যতম বৃহৎ শিপিং কোম্পানি ‘মিতসুই ওএসকে লাইন্স’-এর প্রধান নির্বাহী জোতারো তামুরা বলেন, চুক্তিটিকে অর্থবহ হতে হবে এবং হরমুজ প্রণালির বাস্তব চিত্রে তার প্রতিফলন দেখতে হবে। এই রুট পুরোপুরি সচল হতে অন্তত কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে।

মেরিনট্রাফিকের বরাতে গত ১৭ জুন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে অন্তত ৫৮০টি পণ্যবাহী ও তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি, মাইন ও সম্ভাব্য টোল আদায়ের জটিলতার কারণে চুক্তি সই হওয়ার পরও ক্যাপ্টেনরা এখনই যাত্রার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেকের বক্তব্য পায়নি স্ট্রিম।

বাংলাদেশ ওশান গোয়িং শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিওজিএসওএ) চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি সই হওয়ায় এখন জাহাজটি হয়ত পার হওয়ার সুযোগ পাবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত