তীব্র বিরোধিতার মধ্যেই সংসদে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন পাস

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২: ১৩
জাতীয় সংসদে ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬ উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। ছবি: সংসদ বাংলাদেশ টিভি
জাতীয় সংসদে ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬ উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। ছবি: সংসদ বাংলাদেশ টিভি

জাতীয় সংসদে ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬ পাস হয়েছে। রোববার সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের পঞ্চম দিনে বিলটি পাস হয়। তবে বিলটি পাসের তীব্র বিরোধিতা করে বিরোধীদল। একপর্যায়ে অঘোষিতভাবে ওয়াকআউটও করেন তাঁরা। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ কণ্ঠভোটে দিলে বিলটি সংসদে পাস হয়।

সংসদে আইন প্রণয়ন কার্যাবলির অধিবেশনে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান প্রস্তাব করেন, ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২-এর অধিকতর সংশোধনকল্পে আনীত বিলটি ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬ আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি কর্তৃক সুপারিশকৃত আকারে বিবেচনার জন্য গ্রহণ করা হোক।’

আইনমন্ত্রীর প্রস্তাবের পর স্পিকার বলেন, ‘এই বিলটির ওপর জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়েছে ১৪ জন আর বাছাইয়ের ওপর প্রস্তাব দিয়েছে ১৬ জন।’ এ সময় তিনি জনমত যাচাইয়ের ওপর প্রস্তাব দেওয়া সংসদ সদস্যদের বিলটির ওপর আলোচনার আহ্বান জানান।

জনমত যাচাইয়ের ওপর দেওয়া প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, ‘এই আইনটি কুরআন-সুন্নাহবিরোধী। এই আইনটি যে কুরআন-সুন্নাহবিরোধী সেটি শুধু আমার কথা নয়, এটা দেশের প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরামরাও বলেছেন। এই আইনের বিষয়বস্তু হলো, আজীবন ভোগদখলের বিধান রেখে দান। এটা পরিষ্কারভাবে ইসলামী আইনের বিরোধী।’

নাজিবুর রহমানের পর আইনটিকে সাধুবাদ জানিয়ে কিছু যুক্তি তুলে ধরেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, ‘ভরণ-পোষণের অবহেলায় দান বাতিলের অধিকার এই আইনে দেওয়া হোক। সন্তান পিতামাতাকে অবহেলা কিংবা নির্যাতন করলে দাতা এককভাবে যেন রেজিস্ট্রি দলিল বাতিলে পারিবারিক আদালতে যে আবেদন করতে পারে, সে সুযোগ রাখা হোক।’

রুমিন ফারহানার পর আইনের বিরোধিতা করে সংসদ সদস্য কামরুল হাসান বলেন, ‘১৮৮২ সালের এই আইনটি সংশোধন করতে গিয়ে কৌশলে আমাদের মুসলিম পারিবারিক আইনে হাত দেওয়া হয়েছে। এটা খালি চোখে বা সাধারণভাবে আমাদের নজরে আসবে না। কৌশলে মানবাধিকারের কথা বলে আইনটি পাস করানোর চেষ্টা হচ্ছে। সকল ধর্মের জন্য এই আইন প্রযোজ্য—এটা নিয়ে আমাদের চরম আপত্তি রয়েছে।’

একই কথা জানিয়ে সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম রাশেদ বলেন, ‘আমার বিশ্বাস যে আইনটি পাস হতে যাচ্ছে, সে আইনে অধিকাংশ সংসদ সদস্য হয় বিরোধিতা করবে, নয় চুপ থাকবে। এ বিলের উদ্দেশ্যে বিরোধিতা আমরা করছি না। বয়স্ক বাবা-মায়ের সম্পত্তির নিরাপত্তা এবং পরিবারের সম্পত্তির বিরোধ কমানো অবশ্যই প্রয়োজন। এ সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে যদি ইসলামের স্বীকৃত হেবা এবং উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটি আইনি কাঠামো তৈরি হয়, তাহলে আমরা সেটি কেউ মেনে নিতে পারবো না।’

বিরোধিতায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যদি সিদ্ধান্তই থাকে আজকে পাসই হবে, তাহলে আমাদেরকে শুধু সুযোগ দিয়ে মানুষের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন হচ্ছে—আমরা সেটা মনে করতে চাই না। অতীতের অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের এটি স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহ বলছে, আমি যা নিয়ে এসেছি তা গ্রহণ করো, যার থেকে নিষেধাজ্ঞা আছে তা থেকে বিরত থাকো। আমরা তো মদিনার সনদে দেশ পরিচালনার কথা শুনেছি। সুতরাং এই জায়গাটি আমাদের ধারণ করা উচিত।’

সর্বশেষে আইনটি আজই পাস না করার দাবি জানান বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এই আইনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আনা হয়েছে বলে আমরা মনে করি। এই আইনের ইনটেনশন সম্পর্কে আমার কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু আমাদের আপত্তির জায়গা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার দেওয়া চিরস্থায়ী বিধানের ওপর যারা বিশ্বাস এনেছেন, তাঁরা এই আইনটিকে কীভাবে দেখবেন। এখানে শরিয়তের সঙ্গে কন্ট্রাডিকশন আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখানে হেবা বিষয়টি এসেছে। হেবা বিষয়টি হচ্ছে, যার নামে উইল করা হবে তিনি তখন থেকে এটার মালিক হবেন। পূর্ণ মালিকানা ভোগ করবেন। যদি তিনি মালিকানা ভোগ না করেন, তাহলে উইল কার্যকর হবে না। এই আইনে এ বিষয়গুলো সম্পৃক্ত নেই। ফলে সরাসরি কন্ট্রাডিকশন আছে। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি কুরআনের মূলনীতি রাখবো না বাদ দেবো। বাদ দেওয়ার অধিকার কি আমার আছে। আমি বিশ্বাস করি, এই আইনটি পাসের আগে আরও বিবেচনা ও পরীক্ষা করে তারপর পাসের বিষয় আলোচনা করা হোক।’

বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর আইনটি সম্পর্কে বিরোধী দলের ধারণা ভুল উল্লেখ করে দীর্ঘ আলোচনা করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। প্রায় ৪০ মিনিটের বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘এই ট্রান্সফার যদি হয়, এটা কোনো ক্রমেই হেবা বা সম্পত্তি আইন দ্বারা ব্রেক করবে না। সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে পাঁচ ধরনের বিধান দেওয়া আছে। সেল, মর্গেজ, লিজ, এক্সচেঞ্জ ও গিফট। এই গিফট কিন্তু হেবা নয়। হেবা কোরআনের আইন অনুসারে হবে। এই গিফটটাকে আমরা এক্সপান্ড করে বলছি, বাবা-মা যদি তাঁর সম্পত্তি সন্তানকে হস্তান্তর করে, জীবন শর্তটা রাখা প্রয়োজন। আমাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট। সুতরাং আইনটি পাসের অনুরোধ জানাচ্ছি।’

এরপর বিরোধীদলীয় নেতা কথা বলতে গেলে, আর বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই জানিয়ে দেন স্পিকার। এ সময় স্পিকার কণ্ঠভোটে গেলে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা অঘোষিতভাবে ওয়াকআউট করেন। তবে কিছুক্ষণ পরেই আবার সংসদে ফিরে আসেন তাঁরা। মধ্যবর্তী এ সময়ে আইনটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।

এদিকে, ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিলের প্রতিবাদে সোমবার বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী। বিকেল সাড়ে ৪টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত