ad

মৃত্যুবার্ষিকী/সালমান শাহ ও স্টাইল: স্ক্রিনের ভেতরে-বাইরে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬: ৪৫
সালমান শাহ। স্ট্রিম গ্রাফিক
সালমান শাহ। স্ট্রিম গ্রাফিক

ছোটবেলায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে সিনেমা দেখতে বসলে পর্দায় সালমান শাহ এলেই যেন সবার চোখে মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ত। শুধু অভিনয় নয়, পর্দায় তার উপস্থিতিই ছিল আলাদা এক আকর্ষণ। কখনো টি-শার্টের সঙ্গে কাউবয় হ্যাট, চোখে নীল লেন্স; কখনো একরঙা ঢিলেঢালা শার্টের সঙ্গে ডেনিম জিনস। আবার কখনো মাথায় পলকা-ছাপের ব্যান্ডানা, গলায় রুপালি চেইন, চোখে সানগ্লাস।

নব্বইয়ের দশকে এমন সুদর্শন, স্টাইলিশ নায়ককে পেয়ে বাংলা সিনেমার দর্শকের বড় একটি অংশ দ্রুতই তাঁর ভক্ত হয়ে ওঠেন। পোশাক, চুলের স্টাইল, সানগ্লাস থেকে শুরু করে হাঁটা-চলা—সবকিছুই তরুণদের কাছে হয়ে ওঠে অনুকরণীয়। সময় বদলেছে, ফ্যাশনের ধরন বদলেছে, কিন্তু সালমান শাহকে অনুসরণ করার সেই প্রবণতা যেন বদলায়নি। আজও বাংলাদেশের অনেক তরুণের কাছে ‘স্টাইলিশ নায়ক’ বলতে সবার আগে মনে আসে সালমান শাহর নাম।

পর্দায় সালমান শাহর স্টাইল

পর্দায় সালমান শাহর স্টাইলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য বোধহয় বৈচিত্র্য। তিনি কোনো নির্দিষ্ট পোশাক বা লুকের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখেননি। টিশার্ট-জিনস হোক কিংবা শার্ট, পাঞ্জাবি বা ওয়েস্টকোট, চরিত্র ও দৃশ্যের প্রয়োজনে সেগুলো গায়ে জড়িয়ে সাবলীলভাবে পর্দায় এসেছেন। কখনো ব্যাকব্রাশ চুল ও সানগ্লাসে শহুরে তরুণ, কখনো স্কার্ফ বা ব্যান্ডানায় অ্যাকশন-হিরো, আবার কখনো সাদামাটা পোশাকে প্রেমিক; স্টাইলের এই বৈচিত্র্য তাঁকে সময়ের চেয়েও এগিয়ে রেখেছে সবসময়।

সালমান শাহ। ছবি: সংগৃহীত
সালমান শাহ। ছবি: সংগৃহীত

নব্বই দশকের ছবিগুলো দেখলেও বিষয়টি বোঝা যায়। কখনও গাঢ় পোশাকের সঙ্গে মাথায় বাঁধা কাপড় এবং বড় সানগ্লাস পরে পশ্চিমা লুক নিয়েছেন; যে স্টাইল হয়তো তখনও বাংলাদেশে পরিচিতই হয়নি। কখনও তাঁকে দেখা গেছে গোলাপি শার্টে। খোলা কলার, চেক প্যান্ট, ভারী বুট ও সানগ্লাস মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একেবারে আলাদা ব্যক্তিত্ব। প্রতিটি অংশ যেন আলাদা করে চোখে পড়ে, কিন্তু একসঙ্গে অগোছালো লাগে না।

সালমান শাহর পোশাকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল রং। তিনি সবসময় চোখ ধাঁধানো রং বা অতিরিক্ত নকশার ওপর নির্ভর করতেন না। নিউট্রাল শেড, ডেনিম, সাদামাটা শার্ট—এসবের সঙ্গে ছোট ছোট অনুষঙ্গ যোগ করতেন। ফলে সাধারণ পোশাকেও তাঁকে লাগত দারুণ স্টাইলিশ।

সালমান শাহর চুলের ফ্যাশনও ছিল অন্য সবার থেকে আলাদা। কখনও একই ধরনের হেয়ার স্টাইলে আটকে থাকতেন না। যেমন সিনেমার পর্দায় বিভিন্ন সময় ব্যাকব্রাশ করা চুল নিয়ে হাজির হতেন। সালমান শাহর এই লুক এমন পরিচিত হয়ে যায় যে সেটিই একসময় ‘সালমান শাহ স্টাইল’ নামে পরিচিত হতে থাকে।

পর্দার বাইরে সালমান শাহর স্টাইল

একাধিক নির্মাতার বক্তব্য অনুযায়ী, সিনেমার কস্টিউম নির্বাচনের বড় অংশই সালমানের ওপর ছেড়ে দেওয়া হতো। সিনেমার কোন দৃশ্যে ফরমাল পরতে হবে, কোথায় ক্যাজুয়াল—সেটি প্রায় সময় তিনি নিজেই ঠিক করতেন। এমনকি শুটিংয়ের আগের দিন দোকান ঘুরে কাপড় কেনা, টেইলরের পাশে বসে ডিজাইন বুঝিয়ে দেওয়ার ঘটনাও জানা যায়। অর্থাৎ তিনি কোনো পোশাক পরার আগে সেই পোশাক নিয়ে ভাবতেন। কোন শার্টের সঙ্গে কোন জুতা, কোন লুকের সঙ্গে কী ধরনের চশমা—এসব নিয়ে তাঁর নিজস্ব ধারণা ছিল।

একসঙ্গে শাহরুখ খান ও সালমান শাহ। ফেসবুক থেকে নেওয়া ছবি
একসঙ্গে শাহরুখ খান ও সালমান শাহ। ফেসবুক থেকে নেওয়া ছবি

দেশের বাইরে শুটিংয়ে গেলে একাধিক লাগেজভর্তি পোশাক নিয়ে ফিরতেন। তাঁর জুতার সংগ্রহও ছিল চোখে পড়ার মতো। লোফার, কনভার্স, বুট, স্নিকার্স; নামিদামি ব্র্যান্ডের বিভিন্ন ধরনের জুতা জায়গা পেত সালমান শাহর নিজস্ব সংগ্রহে। শোনা যায়, জুতা পরিবর্তন করতেন সিনেমার প্রতিটি দৃশ্যে। অল্প দিনের ক্যারিয়ারে সালমান সিনেমায় তিন শতাধিক জোড়া জুতা ব্যবহার করেছেন।

সব মিলিয়ে পর্দার বাইরেও তাঁর লুক ছিল নজরকাড়া। পোশাক আর জুতার সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহার করতেন ফ্যাশন অনুষঙ্গও। সবাই যেখানে বাম হাতে ঘড়ি পরতেন, সালমান শাহর ছিল ডান হাতে ঘড়ি পরার অভ্যাস। সবচেয়ে বড় কথা, কখনও ক্যাপ, কখনও কাউবয় হ্যাট, গলায় চেইন কিংবা কানে দুল পরলেও কখনও বাড়াবাড়ি মনে হয়নি। এটাই হয়তো তাঁর স্টাইলের সবচেয়ে আধুনিক দিক।

কেন আজও ফ্যাশন আইকন

ফ্যাশন সাধারণত সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়। কোনো চুলের কাট এক দশকে জনপ্রিয়, পরের দশকে সেকেলে। প্যান্টের কাটও তাই। কিন্তু সালমান শাহর ক্ষেত্রে ব্যাপারটি একটু আলাদা। তাঁর অনেক লুক আজও বর্তমান প্রজন্মের কাছে নতুনের মতো লাগে। কারণ তিনি নিজের ব্যক্তিত্ব আর রুচির সঙ্গে ট্রেন্ড মিশিয়ে নিজের ‘ফ্যাশন-ভাষা’ তৈরি করেছিলেন।

এই কারণেই আজও বাংলাদেশের অনেক তরুণ তাঁকে ফ্যাশন আইকন মনে করেন। ওভারসাইজড শার্ট, ডেনিম, সানগ্লাস, ব্যান্ডানা, বুট, মিনিমাল জুয়েলারি; এই ফ্যাশন অনুষঙ্গগুলো আজও তরুণদের কাছে স্টাইলিশ। কিন্তু সালমান শাহ এগুলো করেছিলেন এমন সময়ে, যখন বাংলাদেশে পুরুষদের স্টাইল অনেক বেশি চেনা ছকের মধ্যে আটকে ছিল। তিনি সেই ছক ভেঙেছিলেন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। চরিত্রের খাতিরে মধ্যবিত্ত তরুণ হোক কিংবা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান; সবকিছুতেই সালমান শাহ এমনভাবে নিজের ফ্যাশন নির্ধারণ করেছেন আর তা কখনোই একঘেয়ে মনে হতো না। বিশেষ করে, গানের দৃশ্যে তাঁর উপস্থিতি আলাদাভাবে চোখে পড়ত।

আজকের ভাষায় বললে, তিনি ছিলেন নিজের স্টাইলের ‘ক্রিয়েটর’। তাই সালমান শাহকে আজও ফ্যাশনে এগিয়ে মনে হওয়ার কারণ শুধু তিনি কী পরতেন, তা নয়। আসল কারণ, তিনি কীভাবে পোশাককে নিজের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিশিয়ে দিতেন। সব মিলিয়ে তৈরি হতো ‘সালমান শাহ’ নামের আলাদা পরিচয়, আলাদা ভিজ্যুয়াল-ভাষা।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত