আউশের মৌসুমে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ধান ক্রয় করা কেন দরকার

এআই জেনারেটেড ছবি
এআই জেনারেটেড ছবি

ধানের দাম, খরচই উঠছে না—এরকম একটি সংবাদ ধানের মৌসুমে প্রায়ই পাওয়া যায়। এবারও এরকম খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে, নওগাঁ অঞ্চলে এরকম ঘটছে বলে গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে। প্রকৃতপক্ষে কৃষকদের ন্যায্য দাম না পাওয়ার ইতিহাস আমাদের দেশে বেশ পুরোনো। তবুও বিগত কয়েকদশক ধরে প্রত্যেকটি সরকার নানান উদ্যোগ নেওয়ার পরও প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকরা নানাভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। যেমন: ন্যায্য দাম না পাওয়া, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া, ঋণনির্ভরতা ইত্যাদি।

যদিও প্রকাশিত খবর কেবল নওগাঁ জেলার আউশ মৌসুমের ধানের ব্যাপারে, এমনকি সারাদেশের চিত্রও না। তবুও আমি আলাদা করে এই প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি। কেননা দেশের চালের বাজারের ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানগত বিবেচনায় নওগাঁকে খুব আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ পুরো দেশের মোট চাহিদার ৪ থেকে ৫% ধান নওগাঁ থেকে সরবরাহ হয়ে থেকে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নওগাঁর মোট উৎপাদিত ধানের পরিমাণ ১৭ লক্ষ টন, জেলার নিজস্ব চাহিদা যদিও ৬ লক্ষ টন এবং দেশের জন্য উদ্বৃত্ত থাকে ১১ লক্ষ টন। কিন্তু নওগাঁয় এখন প্রায় ৭০০ রাইস মিল আছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০টি অটো মিল এবং এসিআই, টিকে-এর মত দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ সেখানে চালের মিল পরিচালনা করে।

প্রায়ই বাৎসরিক চালের চাহিদা মেটাতে সরকার চাল আমদানি করে থাকে। যদি বোরো ও আমনের পাশাপাশি প্রধান চালের তালিকায় আউশ মৌসুমের চালও নিয়মিত মজুত করা হয় তাহলে অর্থনৈতিকভাবে এই মৌসুমের কৃষকরা যেমন উপকৃত হবে এবং আমদানি নির্ভরতা কমবে।

এজন্য শুধু নওগাঁয় কত ধান উৎপাদিত হয় তার সাথে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে দেশের অন্যান্য জায়গা থেকেও ধান যায় এইসব বড় মিলগুলোতে। মোদ্দা কথা আমরা ঢাকায় বসে যে ভাত খাচ্ছি, সেটার একটা বৃহৎ অংশের সাথে নওগাঁ ভিত্তিক চালের ইকোসিস্টেমের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভুমিকা রয়েছে। ফলে যদি নওগাঁকেন্দ্রিক কোনো খবর চাউর হয় তার সরাসরি প্রভাব দেশের চালের বাজারে পড়ে। এই কারণেই এ ব্যাপারে গুরুত্ব সহকারে মতামত দেয়া জরুরি মনে করছি।

আমাদের দেশে প্রধান তিনটি কৃষি মৌসুমের মধ্যে আমন ও বোরো মৌসুমের উৎপাদিত ধান হচ্ছে বাৎসরিক চালের চাহিদার মূল জোগানদাতা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বোরো ও আমন মৌসুম থেকে মোট উৎপাদিত চালের পরিমাণ যথাক্রমে ২২৬.০৮২ লক্ষ মেট্রিক টন এবং ১৬৫.১৪৫ লক্ষ মেট্রিক টন। অন্যদিকে, আউশ মৌসুমে মোট উৎপাদিত চালের পরিমাণ ২৭.৯৩৪ লক্ষ মেট্রিক টন। সাধারণত আউশ মৌসুমের উৎপাদিত চাল পিঠা, পায়েস, মুড়ি, চিড়া ও খিচুড়ি ইত্যাদি শৌখিন খাবারের চাহিদা মেটায়। ফলে, সরকার বোরো ও আমন মৌসুমেই বেশি চাল সংগ্রহ করে প্রধান খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে। যার কারণে এই দুই প্রধান মৌসুমেই সরকার কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার জন্য নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ করে থাকে।

সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশে আউশ মৌসুমে আবাদ বেড়েছে। কৃষকরা ঋণ ও নানান প্রতিকূলতার মধ্যে চাল বাজারে তুললেও ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। বাজারের চাহিদা বিবেচনা করলে এর কারণটি বোঝা যায়। কেননা, আউশ মৌসুমের উৎপাদিত চাল আমাদের প্রধান চাল হিসেবে বিবেচিত না হওয়ায় সরকারও এই চাল মজুত করে না।

অন্যদিকে, এবার তুলনামূলক বেশি উৎপাদন হওয়ায় এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করায় বেসরকারি পর্যায়ে যথেষ্ট পরিমাণ মজুত রয়েছে। ফলে, বড়ো ব্যবসায়ীদের কাছে এ সময়ে চালের চাহিদা কম। যা স্বভাবতই বাজারে প্রভাব ফেলেছ। এই উদ্ভূত সমস্যা মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

সরকারি তথ্যমতে, আমরা দেখতে পাচ্ছি, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত ধান সংগ্রহ ন(বোরো) করা হয়েছে ৫ লাখ ৭৮ হাজার ১৪০ মেট্রিক টন। এ ছাড়া সিদ্ধ চাল সংগ্রহ করা হয়েছে ১১ লাখ ৯১ হাজার ৮৫৬ মেট্রিক টন, আতপ চাল ১ লাখ ৩ হাজার ৪১১ মেট্রিক টন এবং গম ৫২৩ মেট্রিক টন। সব মিলিয়ে মোট সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৭১ হাজার ৫৮১ মেট্রিক টন।

কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে স্বল্পসুদে ঋণ ও ফসলভিত্তিক আর্থিক সহায়তা বাড়ানোও জরুরি। ঋণের চাপ থাকলে কৃষক বাজারদর কম হলেও দ্রুত ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হন। তাই ফসল উৎপাদনের সময় নেওয়া ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে মৌসুমভিত্তিক সময়সীমা ও সহজ শর্ত রাখা যেতে পারে।

সরকারের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী এখনো বোরো চাল সংগ্রহ যেহেতু চলমান, তাই আউশ চালের জন্য সরকারি সংগ্রহব্যবস্থার আওতা বাড়ানো যেতে পারে।

বর্তমানে সরকার প্রধানত আমন ও বোরো মৌসুমকে গুরুত্ব দিয়ে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করে। কিন্তু আউশের আবাদ ও উৎপাদন বাড়লে এই মৌসুমের উৎপাদিত ধানের একটি নির্দিষ্ট অংশ সরকারিভাবে সংগ্রহের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। এতে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের চাপ কমবে এবং কৃষক ন্যূনতম একটি নিরাপদ বাজার পাবেন বলে মনে করি।

কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে স্বল্পসুদে ঋণ ও ফসলভিত্তিক আর্থিক সহায়তা বাড়ানোও জরুরি। ঋণের চাপ থাকলে কৃষক বাজারদর কম হলেও দ্রুত ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হন। তাই ফসল উৎপাদনের সময় নেওয়া ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে মৌসুমভিত্তিক সময়সীমা ও সহজ শর্ত রাখা যেতে পারে।

প্রায়ই বাৎসরিক চালের চাহিদা মেটাতে সরকার চাল আমদানি করে থাকে। যদি বোরো ও আমনের পাশাপাশি প্রধান চালের তালিকায় আউশ মৌসুমের চালও নিয়মিত মজুত করা হয় তাহলে অর্থনৈতিকভাবে এই মৌসুমের কৃষকরা যেমন উপকৃত হবে এবং আমদানি নির্ভরতা কমবে।

বর্তমান বাস্তবতায় আমরা খবরের ভিতরের বিষয়বস্তুর চেয়ে শিরোনাম কেই বেশী গুরুত্ব দেই ফলে যেকোনো আংশিক তথ্য চালের বাজারের ইকোসিস্টেম এ প্রভাব ফেলতে পারে। এখন দেখার বিষয় সরকার উদ্ভুত পরিস্থিতি তে কি ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়।

  • লেখক: মূর্তজা খান লোদী, স্বাধীন কৃষি গবেষক

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত