রাস্তার পাশের চটপটি-ফুচকা

স্বাদের লোভে স্বাস্থ্যের সর্বনাশ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ১৬: ৪৪
সংগৃহীত ছবি

জীবনে রাস্তার পাশের চটপটি-ফুচকা খায়নি এমন মানুষ দেশে পাওয়া দুষ্কর। তবে মুখরোচক ও সহজলভ্য এই খাবারই হতে পারে জীবনঘাতী রোগের কারণ। বিভিন্ন গবেষণায়ও পাওয়া গেছে সেই প্রমাণ।

স্ট্রিটফুড বা সড়কের ধারের দোকানে বিক্রি হওয়া খাবারের স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে এই আলোচনা বেশ পুরোনো। সম্প্রতি কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সার হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর ফের শুরু হয়েছে সেই আলাপ।

কারিনা কায়সারের পরিবার জানিয়েছে, হালকা জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়ে। একসঙ্গে হেপাটাইটিস-এ ও হেপাটাইটিস-ই জটিলতায় কারিনার লিভার কার্যকারিতা হারিয়েছে। এখন ভারতের চেন্নাইয়ে খ্রিষ্টান মেডিকেল কলেজ (সিএমসি) হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন তিনি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁর লিভার প্রতিস্থাপন করতে হবে।

কারিনার হঠাৎ এমন সংকটাপন্ন অবস্থার সঠিক কারণ জানা না গেলেও তাঁর স্ট্রিটফুড প্রীতির বিষয়টি এরপর সামনে আসে। রাস্তার পাশে কারিনার ফুচকা খাওয়ার কিছু ছবি-ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরালও হয়েছে। অনেকেই অসুস্থতার কারণ হিসেবে তাঁর এই অভ্যাসকেই দুষছেন।

কারিনা কায়সারের ফেসবুক পেজেও দেখা গেছে, তিনি রাস্তার দোকান থেকে ফুচকা খেতেন। সেটা ভিডিও করে পোস্ট করতেন।

কারিনার অসুস্থতার বিষয়ে এক চিকিৎসক ফেসবুক ভিডিওতে বলেছেন, লিভার বিকল করা হেপাটাইটিস এ ও ই মানববর্জে্য থাকা জীবাণু। এটি দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে শরীরে ঢুকে। ঢাকার রাস্তার খাবার বিক্রেতারা মোটেই স্বাস্থ্য সচেতন নন। তাদের ব্যবহৃত পানির উৎস কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। কারিনা এভাবে আক্রান্ত হতে পারেন।

চটপটিতে অভাব নেই জীবাণুর

রাজধানীতে ফুটপাতে বিক্রি হওয়া চটপটি নিয়ে এক গবেষণায় মিলেছে বিপজ্জনক সব রোগের ব্যাকটেরিয়া। অ্যাসিনেটোব্যাকটার, ক্লেবসিয়েলা এসপিপি, ই. কোলাই, প্রোটিয়াস এসপিপির মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিও মেলে।

‘ডিটেকশন অব এন্টারিক ব্যাকটেরিয়া ইন দ্য পপুলার স্ট্রিট ফুড চটপটি ইন ঢাকা, বাংলাদেশ’ শীর্ষক ২০১২ সালের ওই গবেষণায় রাজধানীর ১৮টি এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ছিল চটপটি, মরিচের সস ও বাসনপত্র পরিষ্কারের পানি।

এসব নমুনা বিশ্লেষণ করে গবেষকদল জানায়, ১০৮টি নমুনার মধ্যে ৮৪টিই (৭৮ শতাংশ) ব্যাকটেরিয়াঘটিত জীবাণু দূষিত। এর মধ্যে অর্ধেক স্থানের সব নমুনাই ছিল দূষিত।

গবেষক দলের প্রধান ডাক্তার মোহাম্মদ জাকিউল হাসান স্ট্রিমকে বলেন, চটপটিতে পাওয়া ব্যাকটেরিয়াগুলো নানান রোগের কারণ হতে পারে, বিশেষ করে জন্ডিস। এ ছাড়া চটপটিতে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়াও ছিল। শরীরে বেশি পরিমাণে এই ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করলে হেপাটাইটিস-এ সহ নানা সমস্যা হতে পারে।

ফুচকায় ওষুধ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া

ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে আরেক জনপ্রিয় স্ট্রিটফুড হলো ফুচকা। দেশের রাস্তা-ঘাটসহ অনেক রেস্টুরেন্টেও বিক্রি হয় এই খাবার। তবে ফুচকা তৈরি থেকে পরিবেশন পর্যন্ত মানা হয় না স্বাস্থ্যবিধি। ফলে এ থেকে ছড়াচ্ছে বিভিন্ন রোগ।

ফুচকা নিয়ে ‘ব্যাকটেরিয়াল লোড অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড মাল্টি-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া আইসোলেশন ফ্রম ফুচকা ইন ময়মনসিংহ সিটি, বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণা হয় ২০২৩ সালে। এজন্য ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকার রাস্তা, দোকান ও রেস্তোরাঁ থেকে ফুচকা, সালাদ, হাত ও বাসন ধোয়ার পানির নমুনা সংগ্রহ করেন গবেষক দলের সদস্য বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক।

ওই গবেষণার ফলাফলে বলা হয়, সংগৃহীত নমুনায় ১২৩টি ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ২৪ দশমিক ৪ শতাংশতে ছিল ক্লেবসিয়েলা নিউমোনি। এ ছাড়া স্ট্যাফাইলোকক্কাস এসপিপি, এসচেরিকিয়া কোলাই, এন্টারোব্যাকটার এসপিপি ও সিট্রোব্যাকটার ফ্রুন্ডি পাওয়া যায়। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় এসব ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে অনেকগুলোর ওষুধ প্রতিরোধ ক্ষমতা শনাক্ত হয়।

গবেষক দল জানিয়েছে, ফুচকার স্বাদ মূলত নির্ভর করে এর টকের ওপর। কিন্তু রাস্তার পাশের দোকানগুলো টক তৈরিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করে না। এখান থেকে নানা ধরনের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণু সরাসরি মানুষের শরীরে ঢুকে পড়তে পারে। বিশেষ করে হেপাটাইটিস-এ ভাইরাসের অন্যতম বাহক হয়ে উঠতে পারে এই পানি।

আতঙ্কের নাম ফ্যাটি লিভার

অনিরাপদ খাদ্যাভ্যাস ও নিয়ন্ত্রণহীন জীবনযাপন প্রাণঘাতী ফ্যাটি লিভারের (যকৃতে চর্বি জমা) কারণ হতে পারে। মদ্যপান ছাড়া ফ্যাটি লিভার হলে তাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এনএএফএলডি)।

গবেষকরা জানিয়েছেন, পশ্চিমা দেশগুলিতে এনএএফএলডির সামগ্রিক প্রাদুর্ভাব ১৫ থেকে ৪০ শতাংশ। এশিয়ায় ৯ থেকে ৪০ শতাংশ। আর বাংলাদেশে ফ্যাটি লিভারের প্রাদুর্ভাব ৩০ শতাংশের বেশি।

এ বিষয়ে ‘প্রিভ্যালেন্স অব নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ- এ পপুলেশন বেজড স্টাডি’ শীর্ষক একটি গবেষণা হয় ২০১৫ সালে। কুমিল্লার দুটি গ্রামের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত ওই গবেষণায় অংশ নেন ২১৩ পুরুষ ও ৪৫২ নারী। তাদের গড় বয়স ছিল ৪২ বছর ২ মাস।

গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের ৩৩ শতাংশের এনএএফএলডি রোগ শনাক্ত হয়। ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের মধ্যে ৪৮.৭ শতাংশেরই ছিল এই রোগ। গবেষণায় পুরুষের তুলনায় নারীদের ফ্যাটি লিভারে আক্রান্তের হার বেশি পাওয়া যায়। এ ছাড়া এই রোগে আক্রান্তদের উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইড ও কোমরের পরিধি ছিল বেশি।

ওই গবেষণা দলের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইজাজুল হক স্ট্রিমকে বলেন, ‘অতিরিক্ত শর্করা ও চর্বি জাতীয় খাবার খেলে ফ্যাটি লিভারের সম্ভাবনা বাড়ে। কারণ এই খাবার আমাদের দেহ পুরোপুরি শোষণ করতে পারে না। ফলে সেগুলো লিভারের কোষে গিয়ে জমা হতে থাকে। ধারাবাহিকভাবে জমা হতে হতে লিভার কোষকে নষ্ট করে দেয়। একপর্যায়ে লিভার প্রদাহের সৃষ্টি হয়। এই পর্যায়কে ন্যাশ বলে। দীর্ঘমেয়াদি ন্যাশ থেকে লিভার সিরোসিস হতে পারে। পরে তা লিভার ক্যান্সারে রূপ নেয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশে ফ্যাটি লিভারে আক্রান্তদের মধ্যে ৩৬ থেকে ৫৪ শতাংশ মানুষ অস্বাস্থ্যকর খাবারজনিত লিভারের রোগ বা নন-অ্যালকোহলিক স্টিয়েটো হেপাটাইটিসে (ন্যাশ) আক্রান্ত। এখন পর্যন্ত এই রোগ চিকিৎসায় কোনো সঠিক ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। শর্করা জাতীয় খাবার কমিয়ে শাকসবজি বেশি খাওয়াই সমাধান।’

সম্পর্কিত