মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার/কাটেনি অস্পষ্টতা, ঋণে পিষ্ট আটকে পড়া কর্মীরা

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২: ২৪
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছেই না। সবশেষ ২০২৪ সালের ৩১ মে দেশটির শ্রমবাজার বন্ধ হয়। সব প্রক্রিয়া শেষ করেও তখন দেশটিতে যেতে না পারা বাংলাদেশি শ্রমিকদের জীবন এখন চলছে আর্থিক অনটনে। দুই বছরেও তারা রিক্রুটিং এজেন্সিকে দেওয়া টাকার বেশির ভাগ ফেরত পাননি। উল্টো টানতে হচ্ছে ঋণের বোঝা।

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার আটকে পড়া শ্রমিক বাশেদুল ইসলাম এখন জীবিকার জন্য অটোরিকশা চালান। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমার জমি-ফিশারি সব বন্ধকে। প্রতি মাসে ১০টা ঋণের সুদের বোঝা বইতেছি। ৬ লাখ টাকা দিছিলাম; ফেরত পাইছি মাত্র ২ লাখ। এরপর আবারও বোয়েসেলরে (সরকারি রিক্রটিং এজেন্সি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড) দিছি ১ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু মালয়েশিয়ার চেহারা আর দেখলাম না।’

নওগাঁর সাব্বির বলেন, প্রথমবার টাকা দিয়েছিলাম ৫ লাখ ৫০ হাজার। ফেরত দিছে ১ লাখ। বাকি টাকার বিষয়ে কিছুই বলে না। শুধু জানিয়েছে, মালয়েশিয়া লোক নিলে আমাকে পাঠাবে। তিনি আরও বলেন, বাড়ির কাছের একটি জমি ও একটা গরু বিক্রি করে এবং একটা জলা বন্ধক রেখে ওই টাকা জোগাড় করেছিলাম। এখনও সাড়ে চার লাখ টাকা পায়নি। জমি-গরু তো গেছে, জলাটার বন্ধকও তুলতে পারিনি।

১৭ হাজার আটকা, গেছে ১ হাজার

সিন্ডিকেট ও অনিয়মের অভিযোগে ২০২৪ সালের ৩১ মে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধের সময় দেশে আটকে পড়েন ১৭ হাজার ৭৭৭ জন। ওই বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে শ্রমবাজারটি চালু ও আটকে পড়াদের পাঠানোর চেষ্টা চালায়।

এর প্রায় এক বছর পর ২০২৫ সালের ১৫ মে ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় সাবেক প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানান, আটকে পড়া ৭ হাজার ৯২৬ কর্মীকে মালয়েশিয়া পাঠাতে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

এরপর বোয়েসেল ওই কর্মীদের মালয়েশিয়ায় নির্মাণ খাতে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করে। অবশ্য বোয়েসেল জানিয়েছে, তাঁরা ৭ হাজার ৮৭৩ কর্মী নিয়ে কাজ শুরু করলেও ওই সময় দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন পড়ে ৩ হাজার ২০০ কর্মীর। শেষপর্যন্ত ২৫ নভেম্বর প্রথম দফায় ৬০ শ্রমিক মালয়েশিয়া যায়। এরপর গত ১০ মাসে মাত্র ১ হাজার ১১৫ কর্মীকে পাঠানো গেছে।

বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদুল হক স্ট্রিমকে জানান, তিনি আসার পর ৫৬৭ জনের তালিকা করেছেন। সম্প্রতি তাদের মধ্যে ৫৪ জনকে পাঠানো হয়েছে। বাকিদের বিষয়ে প্রক্রিয়া চলছে।

সম্প্রতি মালয়েশিয়া ১০ হাজার কর্মী বিনা খরচে নেবে বলে ঘোষণা দিয়েছে সরকার। আটকে পড়া কর্মীরা ওই তালিকায় থাকবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, এটার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নাই। এরা তো আগের শ্রমিকরা। যারা আটকে পড়েছিলেন, প্রতারিত হয়েছেন বিভিন্নভাবে। এটা সরকারের একটা মানবিক সাপোর্ট।’

তবে বোয়েসেলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্ট্রিমকে বলেন, আটকে পড়া ৭ হাজার ৮৭৩ কর্মীকেই পাঠাতে চায় বিএনপি সরকার। এখন পর্যন্ত বোয়েসেল পাঠাতে পেরেছে মাত্র ১ হাজার ১১৫ জনকে। ফলে বাকি ৬ হাজার কর্মীকে পাঠাতে হলে ১০ হাজার কোটাতেই পাঠাতে হবে। অন্যভাবে পাঠানোর সুযোগ নেই। এ ছাড়া নতুন কর্মী পাঠাতে গেলে নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। সেজন্য ১০ হাজার কর্মীর কোটায় আটকে পড়াদের কথা চিন্তা করছে সরকার।

শ্রমবাজার খোলার তথ্যে গরমিল

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আদৌ কবে চালু হবে তা নিয়েও রয়েছে সংশয়। গত ২৮ আগস্ট প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ১০ হাজার কর্মীর বিশেষ কোটা এবং তাদের পাঠাতে ৩৩৮ এজেন্সিকে অনুমোদন দেওয়ার বাইরে আর কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। এমনকি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও কিছু জানাতে পারেননি।

এ বিষয়ে বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদুল হক স্ট্রিমকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ার বিষয়টা এখনো সুরাহা হয় নাই। কখন শুরু হবে, কী হব– আমরা কিছুই জানি না। শুধু পত্র-পত্রিকায় আপনাদের মতো দেখি এটা হচ্ছে, ওটা হচ্ছে।’

নাম প্রকাশ না করা শর্তে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্ট্রিমকে বলেন, ‘মালয়েশিয়া নিয়ে আমরা পুরা অন্ধকারে। দীর্ঘদিন ধরেই কোনো খবর নেই। স্যাররাও একবারে ঝিম মেরে বসে আছেন।’

এই বাজার নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দেয় গত ২ সেপ্টেম্বর। এর আগে ৩০ আগস্ট মালয়েশিয়ান হাইকমিশনার মোহাম্মদ শুহদা বিন ওসমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে ৬ মাসে মালয়েশিয়া প্রায় দুই লাখ কর্মী নেবে বলে জানান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তবে ২ সেপ্টেম্বর ওই তথ্য নাকচ করে দেন মালয়েশিয়ার তথ্যমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিল।

তিনি বলেন, ‘ছয় মাসের মধ্যে দুই লাখ কর্মী আনা কীভাবে যুক্তিযুক্ত হতে পারে? তার মানে কী আমরা প্রতিদিন এক হাজারের বেশি বাংলাদেশি কর্মী দেশে নিয়ে আসব? এটি অবাস্তব।’

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে একাধিকবার চেষ্টার পর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী গত ৬ সেপ্টেম্বর স্ট্রিমকে বলেন, ‘কে কী বলল তা শুনে লাভ নেই। আমরা তো প্রেস রিলিজের মাধ্যমে ক্লিয়ার বক্তব্য দিছি। বাজারটা উন্মুক্ত হয়েছে। এখন ধারাবাহিকভাবে যেসব ডিমান্ড আসবে, এটা সবাই জানবে। এখন আমাদের কাছে যে ১০ হাজার (চাহিদা) আছে, ওইটা নিয়ে কাজ করছি।’

ফের সিন্ডিকেট ও বাজার বন্ধের শঙ্কা

শ্রমবাজারটি চালুর বিষয়ে এত অনিশ্চয়তা নিয়ে শঙ্কা জানিয়েছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের ভাষ্যে, এই শ্রমবাজার নিয়ে কী হচ্ছে তা পুরোপুরি অস্পষ্ট। মন্ত্রী বলছে চালু হচ্ছে; অন্য কেউ বলতে পারছে না। এতে আগের মতো সিন্ডিকেট তৈরি হতে পারে। সেক্ষেত্রে বাজারটি চালু হলেও দ্রুতই বন্ধ হবে।

জনশক্তি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, মালয়েশিয়ার জাতীয় নির্বাচন সামনে। এখন অস্বচ্ছভাবে শ্রমবাজার চালু হলে পরে একটা হট্টগোল হবে। এতে বাজারটি আবার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। দুই দেশের সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে।

তিনি আরও বলেন, যে প্রক্রিয়া দেখা যাচ্ছে তাতে সিন্ডিকেট তৈরির বিষয়টি অনেকটা নিশ্চিত। আর সিন্ডিকেট হলে অভিবাসন ব্যয় আরও বাড়বে। আগে কর্মীরা ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা দিত, এখন ৬ থেকে ৮ লাখ দিতে হবে।

একই কথা জানিয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, প্রক্রিয়ায় স্পষ্টতা ও স্বচ্ছতা আনতে না পারলে বাজারটিতে আবারও সংকট তৈরি হবে। চালু হলেও বন্ধের শঙ্কা থাকবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত