রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর
ইমরান হোসাইন

পেটে তিন বেলা ভাত না জুটলেও নিয়ম করে অ্যান্টিবায়োটিক গিলতে হয় জেসমিন আক্তারকে। ১৩ বছর আগের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি তাঁর শরীর থেকে শুধু কর্মক্ষমতাই কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে সংসারও। অসুস্থ স্ত্রী ও সন্তানকে ফেলে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে পাওয়া ক্ষতিপূরণের ৯৫ হাজার টাকা নিয়ে তাঁর স্বামী পালিয়েছে প্রায় এক যুগ আগে।
সাভারে মাসে তিন হাজার টাকা ভাড়ার একটি ঘরে ১২ বছরের ছেলেকে নিয়ে মানুষের কাছে হাত পেতে দিন কাটে তাঁর। ফ্যান্টম টেক লিমিটেড-এর পঞ্চম তলার সাবেক এই সুইং অপারেটর আক্ষেপ করে বলেন, ‘বুকে চাপা খেয়ে ভেতরের ইনফেকশনে আমার বাম পাশের ফুসফুস নষ্ট হয়ে গেছে। আমি এখন জিন্দা লাশ। বেশিক্ষণ বসতে পারি না, দাঁড়াতে পারি না।’ বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করে নষ্ট ফুসফুসটি কেটে ফেলতে বলেছেন বলেও জানান তিনি।
জেসমিনের মতো এমন হাজারো শ্রমিকের ‘জিন্দা লাশ’ হয়ে বেঁচে থাকার শুরুটা হয়েছিল ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে। ঘাম আর শ্রমে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরানো এই শ্রমিকদের সেদিন চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল এক নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে। দীর্ঘ ১৩ বছর পেরিয়ে আজও সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন তাঁরা। লড়ছেন পঙ্গুত্ব, চরম দারিদ্র্য, অনুদান নিয়ে প্রতারণা আর বিচারহীনতার সঙ্গে।
ভবন ধসের ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ ২৩ এপ্রিল সকালে রানা প্লাজায় ফাটল দেখা দিয়েছিল। দুপুরে মাইকিং করে শ্রমিকদের ছুটিও দেওয়া হয়। কিন্তু পরদিন ২৪ এপ্রিল সকালে ফাটলের কথা জেনে কোনো শ্রমিকই কারখানায় ঢুকতে চাননি। মালিকপক্ষ ও কারখানার কর্মকর্তাদের জবরদস্তিতে একরকম বাধ্য হয়েই তাঁরা এই মৃত্যুপুরীতে গিয়েছিলেন।

সেদিনের স্মৃতিচারণ করে জেসমিন আক্তার বলেন, ‘মালিকপক্ষ জোর করে আমাদের ঢুকিয়েছে। ভয় দেখানো হয়েছিল—যে কারখানায় ঢুকবে না, তাকে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হবে এবং এক মাসের বেতন ও ওভারটাইমের টাকা দেওয়া হবে না।’
অষ্টম তলার নিউ স্টাইল কারখানার হেল্পার রাশেদা বেগম জানান, ‘ফাটলের জায়গাগুলো দেখতে চাইলে আমাদের দেখতে দেওয়া হয়নি, উল্টো প্লাস্টার করে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। লাইন চিফ ও সুপারভাইজাররা পিঠে চাপড়ে জোর করে আমাদের ভেতরে পাঠান। চার সন্তানের কথা ভেবে কান্নাকাটি করলেও কর্মকর্তারা ধমক দিয়ে আমাকে বলেছিলেন, “উপরে আল্লাহ আছে, কিচ্ছু হবে না।”’
একই তলার আরেক শ্রমিক বগুড়ার মেয়ে বুলবুলি বলেন, ‘সকালে রানা প্লাজার সামনে এসে এক ব্যক্তিকে বলতে শুনি, ‘পাঁচতলা ভবনের ভর কি নয়তলা সইতে পারবে?’ তখন ভেতরটা আচমকা কেঁপে ওঠে। তার পরেও চাকরির কথা ভেবে উঠে যাই।’
জেনারেটর ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিকট শব্দে ফ্লোর নিচে দেবে যায়। এ সময় মেশিনের কাঠ ভেঙে ডান হাতের ভেতর ঢুকে যায় বলে জানান আহত এই নারী শ্রমিক।

বিমর্ষ বর্তমান, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ধ্বংসস্তূপ থেকে যাঁরা জীবিত ফিরেছেন, তাঁদের অনেকেই আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। বরিশালের মেয়ে শিলা আক্তারের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়, ডান হাত পুরোপুরি অবশ হয়ে যায়। পেটের ওপর বিল্ডিংয়ের বিম পড়ে নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসা শিলাকে আজও প্রস্রাবের রাস্তায় পাইপ নিয়ে প্রাকৃতিক কাজ সারতে হয়। জীবনে আর মা হতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। তীব্র গরমে পিঠে বেল্ট বেঁধে আত্মীয়স্বজনদের কাছে চেয়েচিন্তে পাওয়া সামান্য টাকায় জীবন চলে তাঁর।
বরগুনার মাসুদার মেরুদণ্ডের ১২ নম্বর হাড় ভাঙা এবং তিনটি হাড় বাঁকা। মাথায় রক্ত জমাট বাঁধার কারণে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় মানসিক হাসপাতালের ‘স্লিপিং পিল’ এখন তাঁর ঘুমের ভরসা। দুর্ঘটনার পরপরই স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে যায়। এরপর অভাবের তাড়নায় ১৭ বছরের একমাত্র ছেলেকে একটি ছোট কারখানায় মাত্র ৬ হাজার টাকা বেতনের কাজে দিয়েছেন তিনি।
রানা প্লাজা ট্রাস্ট: ‘আগে খরচ, পরে বিল’ নীতি ও নারী চিকিৎসক সংকট
আহত শ্রমিকদের আজীবন চিকিৎসা দেওয়ার জন্য গঠিত ‘দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা সহায়তা ট্রাস্ট’-এর ‘আগে খরচ, পরে বিল’ নিয়মের কারণে জেসমিন বা শিলাদের মতো অনেকের জরুরি চিকিৎসাও আটকে আছে।
জেসমিনের নষ্ট ফুসফুস কাটতে প্রয়োজন তিন লাখ টাকা। আর শিলার পাকস্থলীতে হওয়া টিউমারটি দুই বছর ধরে টাকার অভাবে অপারেশন করানো যাচ্ছে না।
জেসমিন আক্ষেপ করে বলেন, ‘যেখানে তিন বেলা খাওয়ার ভাত জোগাড় করতে পারি না, সেখানে অপারেশনের তিন লাখ টাকা কোথায় পাব? আগে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে চিকিৎসা নেওয়ার এই নিয়মের কারণেই আমার অপারেশন হচ্ছে না।’

তবে এই নিয়মের বেড়াজালের বাইরে গিয়ে ট্রাস্টের চিকিৎসায় বেঁচে ফেরার কথাও জানিয়েছেন কেউ কেউ। পঞ্চম তলার শ্রমিক পারুল বলেন, ‘ভবন ধসে পিঠে রড ঢোকার কারণে আমার ডান পাশের কিডনি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ট্রাস্টের সম্পূর্ণ আর্থিক সহায়তায় ২০১৯ সালে আমার কিডনির জটিল অপারেশন হয়। এই ট্রাস্ট ফান্ড না থাকলে উন্নত চিকিৎসার অভাবে হয়তো আমি বাঁচতাম না।’
এ বিষয়ে ট্রাস্টের কর্মকর্তা রনি বলেন, ‘সাভারের বাইরে থাকা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে নির্দেশ দেওয়া আছে যে, তাঁরা নিকটস্থ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বিল ভাউচার পাঠালে আমরা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে পেমেন্ট করি। তবে অনেক সময় ভাউচারে অসংগতি থাকলে, যেমন—একই রেস্টুরেন্টের টানা সিরিয়াল নম্বরের ভাউচার দিলে, অডিট বা মন্ত্রণালয়ের আপত্তি থাকে।’
চিকিৎসার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা নারী থেরাপিস্টের অভাব। ট্রাস্টের মাধ্যমে সিআরপিতে থেরাপি নেওয়া মাসুদা বলেন, ‘নারী থেরাপিস্টের বদলে একজন পুরুষ থেরাপিস্ট নিয়োগ দেওয়ায় গত আট মাস ধরে থেরাপি নিতে পারছি না।’
এ অভিযোগ স্বীকার করে ট্রাস্ট কর্মকর্তা শাহরিয়ার রনি জানান, ট্রাস্টের দুই-তৃতীয়াংশই নারী শ্রমিক। পুরুষ থেরাপিস্টের কাছে চিকিৎসা নিতে তাঁদের আপত্তির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে সপ্তাহে অন্তত দুদিন একজন নারী চিকিৎসক বা থেরাপিস্ট দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
ক্ষতিপূরণ বিতর্ক ও অব্যবহৃত ১০৫ কোটি টাকা
রানা প্লাজা ধসে আহত শ্রমিকদের জন্য সরকারি বা ট্রাস্ট ফান্ড থেকে ক্ষতিপূরণ বরাদ্দ হলেও ‘সমন্বয়’-এর নামে সেই টাকা কেটে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
সুইং অপারেটর পারুল আক্ষেপ করে বলেন, ‘মঞ্জুরিপত্রে আমার নামে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেখানো হলেও, আগে পাওয়া অর্থের পরিমাণ দেখিয়ে সেখান থেকে প্রায় পুরো টাকাটাই কেটে নেওয়া হয়েছে। এটিএম কার্ড দিয়ে আমি মাত্র ২ হাজার টাকা তুলতে পেরেছি।’ প্রায় একই ধরনের অভিযোগ করেছেন রাশেদা বেগম, শিলা আক্তারসহ বেশ কয়েকজন আহত শ্রমিক। তাঁরা জানান, পোশাক ক্রেতাদের (বায়ার) কাছ থেকে বিকাশে পাওয়া সামান্য সহায়তার অজুহাত দেখিয়ে তাঁদের নামে আসা সরকারি অনুদানের টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে বরাদ্দ থাকলেও ব্যাংক অ্যাকাউন্টে গিয়ে তাঁরা ব্যালেন্স শূন্য দেখতে পান।
আর্থিক অনুদানের এই জটিলতা বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। অঙ্গহানির শিকার শ্রমিক সাদ্দাম জানান, প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে ১২ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র পাওয়ার পর ট্রাস্ট ফান্ড থেকেও তাঁর নামে সমপরিমাণ টাকা বরাদ্দ হয়। কিন্তু আগে টাকা পাওয়ার কারণ দেখিয়ে ট্রাস্টের বরাদ্দ তাঁকে দেওয়া হয়নি। সেটি ঘুরিয়ে আবারও প্রধানমন্ত্রীর তহবিলেই সমন্বয় করা হয়েছে। অন্যদিকে হাসপাতালে থাকা অবস্থায় প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য আসা সহায়তার টাকাও গায়েব হওয়ার অভিযোগ করেছেন এক ভুক্তভোগী।
ক্ষতিপূরণের টাকা কেটে নেওয়ার যে অভিযোগ শ্রমিকেরা তুলেছেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন ট্রাস্টের কর্মকর্তা শাহরিয়ার রনি। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে আইএলওর ফান্ড আসার আগে জরুরি ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে আহতদের ৫০ হাজার থেকে শুরু করে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত নগদ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ক্লেইমস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন যখন ক্ষতিপূরণ দেওয়া শুরু করে, তখন আইএলওর সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে দেওয়া ওই নগদ টাকা তারা সমন্বয় করে বা মাইনাস করে নেয়।’
তিনি জানান, চিঠিতে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও অনেক শ্রমিক দাবি করছেন তাঁদের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে, যা সঠিক নয়। যাঁদের অ্যাকাউন্ট করা হয়েছিল, তাঁরা সবাই টাকা পেয়েছেন। নিহতদের পরিবারগুলো সর্বোচ্চ ৭৮ লাখ এবং সর্বনিম্ন ৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকার মতো ক্ষতিপূরণ পেয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে সরকারি এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) হিসাব তুলে ধরে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে ১২৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১০৫ কোটি টাকাই অব্যবহৃত ছিল। অন্যদিকে, তহবিলে অর্থের অপ্রতুলতার কারণ দেখিয়ে আহত শ্রমিকদের বর্তমান শারীরিক অবস্থা পুনর্মূল্যায়নের জন্য মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করাও সমীচীন হবে না বলে জানিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের গঠিত একটি কমিটি।
ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পরও শ্রমিকদের এমন দাবির পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেন শ্রমিক নেতা তাসলিমা আক্তার লিমা। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘শ্রমিকেরা যে বলছে টাকা পায়নি, এর কারণ হচ্ছে—ক্ষতিপূরণের মানদণ্ড বদলানোর জন্য তখন শ্রমিকদের একটি দাবি উঠেছিল। কিন্তু সরকার সেটি আর পরিবর্তন করেনি। যা ছিল তা-ই শ্রমিকদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন যদি তাঁদের বিস্তারিত জিজ্ঞেস করা হয়, তখন তাঁরা বলবেন—যে রকম বা যে পরিমাণ টাকা পাওয়ার কথা ছিল, তাঁরা সে রকম পাননি।’
তবে প্রধানমন্ত্রীর তহবিলের টাকার হিসাব নিয়ে অস্পষ্টতা থাকার বিষয়টি স্বীকার করে তাসলিমা আক্তার লিমা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর তহবিলের ১২৭ কোটি টাকার মধ্যে ৮৫ কোটি টাকার হিসাব দেওয়া হয়নি বলে শুনেছি। বিষয়টি নিয়ে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত সেটির কোনো সুরাহা হয়নি।’
রানা প্লাজার ক্ষতিপূরণ নিয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেন, ‘আদালত ট্রাস্ট ফান্ডের মাধ্যমে ১৫ থেকে ২৭ লাখ টাকার মতো একটি ক্ষতিপূরণের কথা বলেছিলেন এবং ফান্ডের উৎসও বলে দিয়েছিলেন। কিন্তু ভুক্তভোগীরা অনুদান পেলেও সেই ক্ষতিপূরণটি এখনো পাননি। এটি মূলত নির্বাহী বিভাগের বিষয়।’
রানা প্লাজার খালি জায়গায় পুনর্বাসন মার্কেট নির্মাণের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সেখানে একটি এস্টাব্লিশমেন্ট বা প্রতিষ্ঠান করে দিলে সবাই সুবিধা পেতে পারে।’
এনজিওদের বিরুদ্ধে অনুদান বাণিজ্যের অভিযোগ
চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের এই সংকটের মাঝেই শ্রমিকদের নামে আসা বিদেশি অনুদান নিয়ে এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে উঠেছে গুরুতর প্রতারণার অভিযোগ।
শ্রমিক পারুল বলেন, ‘এনজিওগুলো আসলে ধোঁকাবাজ। তারা ১৪ বছর ধরে আহত শ্রমিকদের মাথা বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা অনুদান এনেছে। কিন্তু আমরা তার কিছুই পাইনি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী জানান, ‘আওয়াজ ফাউন্ডেশন’-এর নাজমা আক্তার শ্রমিকদের ডেকে ৫০০ টাকা যাতায়াত ভাড়া আর এক প্লেট ভাত খাইয়ে সাদা কাগজে সই নিয়ে রাখতেন। পরে ভুয়া মেডিকেল বিল বানিয়ে কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ ছাড়া অপরাজেয়, নতুন জীবন, থিয়া ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সংগঠন শ্রমিকদের দেখিয়ে সেলাই মেশিন ও ফ্যান কালেকশন করলেও তা বিতরণ করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কারখানা খোলার প্রলোভন দেখিয়ে এক শ্রমিকের চিকিৎসার জন্য বিদেশ থেকে আসা ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে।
এসব বিষয়ে ট্রাস্ট কর্মকর্তা রনি বলেন, ‘সব অভিযোগ যেমন একেবারে ভিত্তিহীন নয়, তেমনি কিছু অভিযোগ তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণেও তৈরি হতে পারে।’
শামুকের গতিতে চলছে বিচার
১৩ বছর পার হলেও এই কাঠামোগত অবহেলার কোনো বিচার পাননি শ্রমিকেরা। কারখানার ও ভবন মালিকের বিরুদ্ধে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডাইফ) করা ১১টি ফৌজদারি মামলা বছরের পর বছর ধরে ঢাকার দ্বিতীয় শ্রম আদালতে স্থবির হয়ে পড়ে আছে। মামলার বাদী ডাইফ পরিদর্শকদের খোঁজ নেই, আসামিরাও পলাতক। ১৩ বছরে হত্যা মামলাগুলো সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে থাকলেও ইমারত নির্মাণ আইনের মামলা এখনো অভিযোগ গঠনের মধ্যেই রয়েছে।
শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি, রানা প্লাজার খালি জায়গাটি ট্রাস্ট ফান্ডকে দিয়ে সেখানে একটি হাসপাতাল ও হালকা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হোক।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত কমিটির সদস্য ট্রাস্ট কর্মকর্তা রনি জানান, ২০১৪-১৫ সালের দিকে সরকার জায়গাটি ক্রোক করলেও সেখানে মার্কেট বা অন্য কিছু করার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এটি কোনো এজেন্ডাতেও ছিল না।
সব মিলিয়ে ক্ষতিপূরণ আর পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর দুর্নীতির মুখে বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। মৃত্যুর প্রহর গোনা জেসমিন আক্তারের শেষ আকুতি তাই কেবল রাষ্ট্রের কাছে, ‘আমি তো মারাই যাচ্ছি, কোনো কাজ করতে পারি না। আমাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন দেওয়া হোক। দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হোক। আর আমার অবুঝ বাচ্চাটার দায়িত্ব যেন সরকার নেয়, যাতে আমার মৃত্যুর পর ওকে পথে বসতে না হয়।’

পেটে তিন বেলা ভাত না জুটলেও নিয়ম করে অ্যান্টিবায়োটিক গিলতে হয় জেসমিন আক্তারকে। ১৩ বছর আগের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি তাঁর শরীর থেকে শুধু কর্মক্ষমতাই কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে সংসারও। অসুস্থ স্ত্রী ও সন্তানকে ফেলে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে পাওয়া ক্ষতিপূরণের ৯৫ হাজার টাকা নিয়ে তাঁর স্বামী পালিয়েছে প্রায় এক যুগ আগে।
সাভারে মাসে তিন হাজার টাকা ভাড়ার একটি ঘরে ১২ বছরের ছেলেকে নিয়ে মানুষের কাছে হাত পেতে দিন কাটে তাঁর। ফ্যান্টম টেক লিমিটেড-এর পঞ্চম তলার সাবেক এই সুইং অপারেটর আক্ষেপ করে বলেন, ‘বুকে চাপা খেয়ে ভেতরের ইনফেকশনে আমার বাম পাশের ফুসফুস নষ্ট হয়ে গেছে। আমি এখন জিন্দা লাশ। বেশিক্ষণ বসতে পারি না, দাঁড়াতে পারি না।’ বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করে নষ্ট ফুসফুসটি কেটে ফেলতে বলেছেন বলেও জানান তিনি।
জেসমিনের মতো এমন হাজারো শ্রমিকের ‘জিন্দা লাশ’ হয়ে বেঁচে থাকার শুরুটা হয়েছিল ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে। ঘাম আর শ্রমে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরানো এই শ্রমিকদের সেদিন চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল এক নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে। দীর্ঘ ১৩ বছর পেরিয়ে আজও সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন তাঁরা। লড়ছেন পঙ্গুত্ব, চরম দারিদ্র্য, অনুদান নিয়ে প্রতারণা আর বিচারহীনতার সঙ্গে।
ভবন ধসের ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ ২৩ এপ্রিল সকালে রানা প্লাজায় ফাটল দেখা দিয়েছিল। দুপুরে মাইকিং করে শ্রমিকদের ছুটিও দেওয়া হয়। কিন্তু পরদিন ২৪ এপ্রিল সকালে ফাটলের কথা জেনে কোনো শ্রমিকই কারখানায় ঢুকতে চাননি। মালিকপক্ষ ও কারখানার কর্মকর্তাদের জবরদস্তিতে একরকম বাধ্য হয়েই তাঁরা এই মৃত্যুপুরীতে গিয়েছিলেন।

সেদিনের স্মৃতিচারণ করে জেসমিন আক্তার বলেন, ‘মালিকপক্ষ জোর করে আমাদের ঢুকিয়েছে। ভয় দেখানো হয়েছিল—যে কারখানায় ঢুকবে না, তাকে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হবে এবং এক মাসের বেতন ও ওভারটাইমের টাকা দেওয়া হবে না।’
অষ্টম তলার নিউ স্টাইল কারখানার হেল্পার রাশেদা বেগম জানান, ‘ফাটলের জায়গাগুলো দেখতে চাইলে আমাদের দেখতে দেওয়া হয়নি, উল্টো প্লাস্টার করে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। লাইন চিফ ও সুপারভাইজাররা পিঠে চাপড়ে জোর করে আমাদের ভেতরে পাঠান। চার সন্তানের কথা ভেবে কান্নাকাটি করলেও কর্মকর্তারা ধমক দিয়ে আমাকে বলেছিলেন, “উপরে আল্লাহ আছে, কিচ্ছু হবে না।”’
একই তলার আরেক শ্রমিক বগুড়ার মেয়ে বুলবুলি বলেন, ‘সকালে রানা প্লাজার সামনে এসে এক ব্যক্তিকে বলতে শুনি, ‘পাঁচতলা ভবনের ভর কি নয়তলা সইতে পারবে?’ তখন ভেতরটা আচমকা কেঁপে ওঠে। তার পরেও চাকরির কথা ভেবে উঠে যাই।’
জেনারেটর ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিকট শব্দে ফ্লোর নিচে দেবে যায়। এ সময় মেশিনের কাঠ ভেঙে ডান হাতের ভেতর ঢুকে যায় বলে জানান আহত এই নারী শ্রমিক।

বিমর্ষ বর্তমান, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ধ্বংসস্তূপ থেকে যাঁরা জীবিত ফিরেছেন, তাঁদের অনেকেই আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। বরিশালের মেয়ে শিলা আক্তারের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়, ডান হাত পুরোপুরি অবশ হয়ে যায়। পেটের ওপর বিল্ডিংয়ের বিম পড়ে নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসা শিলাকে আজও প্রস্রাবের রাস্তায় পাইপ নিয়ে প্রাকৃতিক কাজ সারতে হয়। জীবনে আর মা হতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। তীব্র গরমে পিঠে বেল্ট বেঁধে আত্মীয়স্বজনদের কাছে চেয়েচিন্তে পাওয়া সামান্য টাকায় জীবন চলে তাঁর।
বরগুনার মাসুদার মেরুদণ্ডের ১২ নম্বর হাড় ভাঙা এবং তিনটি হাড় বাঁকা। মাথায় রক্ত জমাট বাঁধার কারণে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় মানসিক হাসপাতালের ‘স্লিপিং পিল’ এখন তাঁর ঘুমের ভরসা। দুর্ঘটনার পরপরই স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে যায়। এরপর অভাবের তাড়নায় ১৭ বছরের একমাত্র ছেলেকে একটি ছোট কারখানায় মাত্র ৬ হাজার টাকা বেতনের কাজে দিয়েছেন তিনি।
রানা প্লাজা ট্রাস্ট: ‘আগে খরচ, পরে বিল’ নীতি ও নারী চিকিৎসক সংকট
আহত শ্রমিকদের আজীবন চিকিৎসা দেওয়ার জন্য গঠিত ‘দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা সহায়তা ট্রাস্ট’-এর ‘আগে খরচ, পরে বিল’ নিয়মের কারণে জেসমিন বা শিলাদের মতো অনেকের জরুরি চিকিৎসাও আটকে আছে।
জেসমিনের নষ্ট ফুসফুস কাটতে প্রয়োজন তিন লাখ টাকা। আর শিলার পাকস্থলীতে হওয়া টিউমারটি দুই বছর ধরে টাকার অভাবে অপারেশন করানো যাচ্ছে না।
জেসমিন আক্ষেপ করে বলেন, ‘যেখানে তিন বেলা খাওয়ার ভাত জোগাড় করতে পারি না, সেখানে অপারেশনের তিন লাখ টাকা কোথায় পাব? আগে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে চিকিৎসা নেওয়ার এই নিয়মের কারণেই আমার অপারেশন হচ্ছে না।’

তবে এই নিয়মের বেড়াজালের বাইরে গিয়ে ট্রাস্টের চিকিৎসায় বেঁচে ফেরার কথাও জানিয়েছেন কেউ কেউ। পঞ্চম তলার শ্রমিক পারুল বলেন, ‘ভবন ধসে পিঠে রড ঢোকার কারণে আমার ডান পাশের কিডনি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ট্রাস্টের সম্পূর্ণ আর্থিক সহায়তায় ২০১৯ সালে আমার কিডনির জটিল অপারেশন হয়। এই ট্রাস্ট ফান্ড না থাকলে উন্নত চিকিৎসার অভাবে হয়তো আমি বাঁচতাম না।’
এ বিষয়ে ট্রাস্টের কর্মকর্তা রনি বলেন, ‘সাভারের বাইরে থাকা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে নির্দেশ দেওয়া আছে যে, তাঁরা নিকটস্থ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বিল ভাউচার পাঠালে আমরা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে পেমেন্ট করি। তবে অনেক সময় ভাউচারে অসংগতি থাকলে, যেমন—একই রেস্টুরেন্টের টানা সিরিয়াল নম্বরের ভাউচার দিলে, অডিট বা মন্ত্রণালয়ের আপত্তি থাকে।’
চিকিৎসার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা নারী থেরাপিস্টের অভাব। ট্রাস্টের মাধ্যমে সিআরপিতে থেরাপি নেওয়া মাসুদা বলেন, ‘নারী থেরাপিস্টের বদলে একজন পুরুষ থেরাপিস্ট নিয়োগ দেওয়ায় গত আট মাস ধরে থেরাপি নিতে পারছি না।’
এ অভিযোগ স্বীকার করে ট্রাস্ট কর্মকর্তা শাহরিয়ার রনি জানান, ট্রাস্টের দুই-তৃতীয়াংশই নারী শ্রমিক। পুরুষ থেরাপিস্টের কাছে চিকিৎসা নিতে তাঁদের আপত্তির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে সপ্তাহে অন্তত দুদিন একজন নারী চিকিৎসক বা থেরাপিস্ট দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
ক্ষতিপূরণ বিতর্ক ও অব্যবহৃত ১০৫ কোটি টাকা
রানা প্লাজা ধসে আহত শ্রমিকদের জন্য সরকারি বা ট্রাস্ট ফান্ড থেকে ক্ষতিপূরণ বরাদ্দ হলেও ‘সমন্বয়’-এর নামে সেই টাকা কেটে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
সুইং অপারেটর পারুল আক্ষেপ করে বলেন, ‘মঞ্জুরিপত্রে আমার নামে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেখানো হলেও, আগে পাওয়া অর্থের পরিমাণ দেখিয়ে সেখান থেকে প্রায় পুরো টাকাটাই কেটে নেওয়া হয়েছে। এটিএম কার্ড দিয়ে আমি মাত্র ২ হাজার টাকা তুলতে পেরেছি।’ প্রায় একই ধরনের অভিযোগ করেছেন রাশেদা বেগম, শিলা আক্তারসহ বেশ কয়েকজন আহত শ্রমিক। তাঁরা জানান, পোশাক ক্রেতাদের (বায়ার) কাছ থেকে বিকাশে পাওয়া সামান্য সহায়তার অজুহাত দেখিয়ে তাঁদের নামে আসা সরকারি অনুদানের টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে বরাদ্দ থাকলেও ব্যাংক অ্যাকাউন্টে গিয়ে তাঁরা ব্যালেন্স শূন্য দেখতে পান।
আর্থিক অনুদানের এই জটিলতা বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। অঙ্গহানির শিকার শ্রমিক সাদ্দাম জানান, প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে ১২ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র পাওয়ার পর ট্রাস্ট ফান্ড থেকেও তাঁর নামে সমপরিমাণ টাকা বরাদ্দ হয়। কিন্তু আগে টাকা পাওয়ার কারণ দেখিয়ে ট্রাস্টের বরাদ্দ তাঁকে দেওয়া হয়নি। সেটি ঘুরিয়ে আবারও প্রধানমন্ত্রীর তহবিলেই সমন্বয় করা হয়েছে। অন্যদিকে হাসপাতালে থাকা অবস্থায় প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য আসা সহায়তার টাকাও গায়েব হওয়ার অভিযোগ করেছেন এক ভুক্তভোগী।
ক্ষতিপূরণের টাকা কেটে নেওয়ার যে অভিযোগ শ্রমিকেরা তুলেছেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন ট্রাস্টের কর্মকর্তা শাহরিয়ার রনি। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে আইএলওর ফান্ড আসার আগে জরুরি ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে আহতদের ৫০ হাজার থেকে শুরু করে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত নগদ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ক্লেইমস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন যখন ক্ষতিপূরণ দেওয়া শুরু করে, তখন আইএলওর সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে দেওয়া ওই নগদ টাকা তারা সমন্বয় করে বা মাইনাস করে নেয়।’
তিনি জানান, চিঠিতে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও অনেক শ্রমিক দাবি করছেন তাঁদের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে, যা সঠিক নয়। যাঁদের অ্যাকাউন্ট করা হয়েছিল, তাঁরা সবাই টাকা পেয়েছেন। নিহতদের পরিবারগুলো সর্বোচ্চ ৭৮ লাখ এবং সর্বনিম্ন ৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকার মতো ক্ষতিপূরণ পেয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে সরকারি এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) হিসাব তুলে ধরে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে ১২৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১০৫ কোটি টাকাই অব্যবহৃত ছিল। অন্যদিকে, তহবিলে অর্থের অপ্রতুলতার কারণ দেখিয়ে আহত শ্রমিকদের বর্তমান শারীরিক অবস্থা পুনর্মূল্যায়নের জন্য মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করাও সমীচীন হবে না বলে জানিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের গঠিত একটি কমিটি।
ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পরও শ্রমিকদের এমন দাবির পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেন শ্রমিক নেতা তাসলিমা আক্তার লিমা। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘শ্রমিকেরা যে বলছে টাকা পায়নি, এর কারণ হচ্ছে—ক্ষতিপূরণের মানদণ্ড বদলানোর জন্য তখন শ্রমিকদের একটি দাবি উঠেছিল। কিন্তু সরকার সেটি আর পরিবর্তন করেনি। যা ছিল তা-ই শ্রমিকদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন যদি তাঁদের বিস্তারিত জিজ্ঞেস করা হয়, তখন তাঁরা বলবেন—যে রকম বা যে পরিমাণ টাকা পাওয়ার কথা ছিল, তাঁরা সে রকম পাননি।’
তবে প্রধানমন্ত্রীর তহবিলের টাকার হিসাব নিয়ে অস্পষ্টতা থাকার বিষয়টি স্বীকার করে তাসলিমা আক্তার লিমা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর তহবিলের ১২৭ কোটি টাকার মধ্যে ৮৫ কোটি টাকার হিসাব দেওয়া হয়নি বলে শুনেছি। বিষয়টি নিয়ে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত সেটির কোনো সুরাহা হয়নি।’
রানা প্লাজার ক্ষতিপূরণ নিয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেন, ‘আদালত ট্রাস্ট ফান্ডের মাধ্যমে ১৫ থেকে ২৭ লাখ টাকার মতো একটি ক্ষতিপূরণের কথা বলেছিলেন এবং ফান্ডের উৎসও বলে দিয়েছিলেন। কিন্তু ভুক্তভোগীরা অনুদান পেলেও সেই ক্ষতিপূরণটি এখনো পাননি। এটি মূলত নির্বাহী বিভাগের বিষয়।’
রানা প্লাজার খালি জায়গায় পুনর্বাসন মার্কেট নির্মাণের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সেখানে একটি এস্টাব্লিশমেন্ট বা প্রতিষ্ঠান করে দিলে সবাই সুবিধা পেতে পারে।’
এনজিওদের বিরুদ্ধে অনুদান বাণিজ্যের অভিযোগ
চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের এই সংকটের মাঝেই শ্রমিকদের নামে আসা বিদেশি অনুদান নিয়ে এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে উঠেছে গুরুতর প্রতারণার অভিযোগ।
শ্রমিক পারুল বলেন, ‘এনজিওগুলো আসলে ধোঁকাবাজ। তারা ১৪ বছর ধরে আহত শ্রমিকদের মাথা বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা অনুদান এনেছে। কিন্তু আমরা তার কিছুই পাইনি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী জানান, ‘আওয়াজ ফাউন্ডেশন’-এর নাজমা আক্তার শ্রমিকদের ডেকে ৫০০ টাকা যাতায়াত ভাড়া আর এক প্লেট ভাত খাইয়ে সাদা কাগজে সই নিয়ে রাখতেন। পরে ভুয়া মেডিকেল বিল বানিয়ে কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ ছাড়া অপরাজেয়, নতুন জীবন, থিয়া ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সংগঠন শ্রমিকদের দেখিয়ে সেলাই মেশিন ও ফ্যান কালেকশন করলেও তা বিতরণ করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কারখানা খোলার প্রলোভন দেখিয়ে এক শ্রমিকের চিকিৎসার জন্য বিদেশ থেকে আসা ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে।
এসব বিষয়ে ট্রাস্ট কর্মকর্তা রনি বলেন, ‘সব অভিযোগ যেমন একেবারে ভিত্তিহীন নয়, তেমনি কিছু অভিযোগ তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণেও তৈরি হতে পারে।’
শামুকের গতিতে চলছে বিচার
১৩ বছর পার হলেও এই কাঠামোগত অবহেলার কোনো বিচার পাননি শ্রমিকেরা। কারখানার ও ভবন মালিকের বিরুদ্ধে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডাইফ) করা ১১টি ফৌজদারি মামলা বছরের পর বছর ধরে ঢাকার দ্বিতীয় শ্রম আদালতে স্থবির হয়ে পড়ে আছে। মামলার বাদী ডাইফ পরিদর্শকদের খোঁজ নেই, আসামিরাও পলাতক। ১৩ বছরে হত্যা মামলাগুলো সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে থাকলেও ইমারত নির্মাণ আইনের মামলা এখনো অভিযোগ গঠনের মধ্যেই রয়েছে।
শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি, রানা প্লাজার খালি জায়গাটি ট্রাস্ট ফান্ডকে দিয়ে সেখানে একটি হাসপাতাল ও হালকা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হোক।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত কমিটির সদস্য ট্রাস্ট কর্মকর্তা রনি জানান, ২০১৪-১৫ সালের দিকে সরকার জায়গাটি ক্রোক করলেও সেখানে মার্কেট বা অন্য কিছু করার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এটি কোনো এজেন্ডাতেও ছিল না।
সব মিলিয়ে ক্ষতিপূরণ আর পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর দুর্নীতির মুখে বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। মৃত্যুর প্রহর গোনা জেসমিন আক্তারের শেষ আকুতি তাই কেবল রাষ্ট্রের কাছে, ‘আমি তো মারাই যাচ্ছি, কোনো কাজ করতে পারি না। আমাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন দেওয়া হোক। দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হোক। আর আমার অবুঝ বাচ্চাটার দায়িত্ব যেন সরকার নেয়, যাতে আমার মৃত্যুর পর ওকে পথে বসতে না হয়।’

ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির প্রচারে সারা দেশে বিলবোর্ড স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১২ কোটি টাকা।
২৫ মিনিট আগে
চট্টগ্রাম বন্দরে ডিজেল নিয়ে ভিড়েছে আরও দুই জাহাজ। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বিকেল ও শুক্রবার ভোরে নোঙর করা এসব জাহাজে ৬৮ হাজার ৪৫০ টন ডিজেল এসেছে। এ ছাড়া আজ বিকেলে জেট ফুয়েল নিয়ে আরও একটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে।
১ ঘণ্টা আগে
রাজশাহীর দূর্গাপুরে দাওকান্দি সরকারি কলেজে শিক্ষিকাকে জুতা দিয়ে পেটানোর ঘটনায় দুর্গাপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আকবর আলীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
২ ঘণ্টা আগে
রাজশাহীর দুর্গাপুরে দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে এক শিক্ষিকাকে (ডেমোনস্ট্রেটর) জুতা দিয়ে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। এ ঘটনার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
২ ঘণ্টা আগে