মতামত
লেখা:

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের ইতিহাসেই নয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও এক ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা। এর ভয়াবহতা এতটাই ব্যাপক যে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যখন শিল্প দুর্ঘটনার ইতিহাস পড়ানো হয়, তখন রানা প্লাজার ঘটনাকে এক নম্বরে রাখা হয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পৃথিবীর ইতিহাসে শিল্পক্ষেত্রে এত বড় ঘটনা সত্যিই বিরল।
সাভারে ভবনধসের পর সেনাবাহিনীর সঙ্গে উদ্ধারকাজে কারিগরি পরামর্শ দেওয়ার সুবাদে খুব কাছ থেকে এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখার সুযোগ হয়েছিল। তখনই গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি, কোথায় আমাদের সক্ষমতা আর কোথায় আমাদের গাফিলতি। সুনামি, টর্নেডো বা ভূমিকম্পের মতো কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে নয়, বরং স্রেফ ‘দুর্নীতির’ কারণে হাজার হাজার তরতাজা প্রাণ ঝরে গেছে—এ কথা ভাবলে আজও শিউরে উঠতে হয়।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পেছনে সবচেয়ে বড় দায় ছিল কাঠামোগত ও পরিকল্পনার ত্রুটি। প্রথমত, ভবনটির নকশা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সঠিকভাবে অনুমোদিত ছিল না। পৌরসভার যে অনুমোদন ছিল, তাতে পরবর্তী সম্প্রসারণ বা এক্সটেনশনের কোনো উল্লেখ ছিল না। একটি স্ট্রাকচারাল ডিজাইন তিন বা চার তলার ভার বহনের জন্য তৈরি করার পর যদি এর ওপর আরও কয়েক তলা বাড়ানো হয়, তবে তার লোড নেওয়ার ক্ষমতা থাকে না। রানা প্লাজায় ঠিক এমনটাই ঘটেছিল।
দ্বিতীয়ত, ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল একটি পুকুর বা জলাভূমি ভরাট করে। ফলে জমির ভিত্তি বা গ্রাউন্ড স্ট্রাকচার ছিল চরম দুর্বল। প্রকৌশল বিজ্ঞানে নির্মাণ কাঠামোর ক্ষেত্রে নিরাপত্তার মানদণ্ড বলে একটি ধারণা আছে। অর্থাৎ, যতটুকু ভার বহনের ক্ষমতা প্রয়োজন, তার চেয়ে কিছুটা বাড়তি সক্ষমতা দিয়ে ভবনের নকশা করা হয়, যেন সামান্য কমবেশিতে ভবনটি ধসে না পড়ে। কিন্তু রানা প্লাজার ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত ও অবৈধ সম্প্রসারণের কারণে সেই ‘ফ্যাক্টর অব সেফটিও’ নিঃশেষ হয়ে যায়। ওপরের তলাগুলোর কাঁচা ও অসমাপ্ত কনস্ট্রাকশনের লোড নিতে না পেরে ভবনটি ধসে পড়তে শুরু করে এবং তাসের ঘরের মতো পুরো কাঠামোটি ধসে পড়ে।
শহরকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে আনার জন্য ‘ডিটেলড এরিয়া প্ল্যান’ বা ড্যাপ প্রণয়ন করা হয়। কোথায় আবাসিক এলাকা হবে, কোথায় জলাশয় থাকবে, কোথায় কারখানা হবে—এসব নির্ধারণ করা ড্যাপের কাজ। ড্যাপের জরিপের মাধ্যমেই জমির মাটি পরীক্ষা করে প্রকৌশলীর পরামর্শে ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সাধারণভাবে ভরাট করা জমিতে ঝুঁকি থেকেই যায়, রানা প্লাজাও এর ব্যতিক্রম ছিল না।
আরেকটি বড় নিয়ম লঙ্ঘন ছিল ভবনের ব্যবহারে। রানা প্লাজা মূলত একটি বাণিজ্যিক ভবন হিসেবে ব্যবহারের কথা ছিল। কিন্তু সেখানে গড়ে তোলা হয়েছিল ভারী পোশাক কারখানা। এখানেই প্রশ্ন ওঠে আমাদের বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) প্রয়োগের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নিয়ে। ভবনটির যখন অনুমোদন দেওয়া হয়, তখন কোনো কাঠামোগত মূল্যায়ন করা হয়নি। ইন্সপেক্টর অব ফ্যাক্টরিস, রাজউক বা পৌরসভার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর এখানে নজরদারির অভাব ছিল। দুর্ঘটনার পর সবাই দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু একটি বিশাল ভবন চোখের সামনে অবৈধভাবে মাথা তুলে দাঁড়াল, আর এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শকরা তা দেখলেন না—এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়।
ভবন নির্মাণের অনুমোদনের ক্ষেত্রে পৌরসভার তুলনায় রাজউক কারিগরিভাবে অনেক বেশি যোগ্য। পৌরসভাগুলোতে প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল লোকবলের তীব্র সংকট রয়েছে। অথচ আইনগতভাবে রাজউকের আওতাধীন এলাকা হওয়া সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে পৌরসভাগুলো অনুমোদনের কাজ করে যাচ্ছে। রাজউকে দক্ষ স্থপতি ও প্রকৌশলী থাকায় তারা নিয়মকানুন মেনে নকশা যাচাই করতে পারে। তবে রাজউক ও পৌরসভা দুটি ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে হওয়ায় আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের বিষয়টি বেশ জটিল।
এই সংকট কাটাতে পৌরসভাগুলোকে রাজউকের মতো দক্ষ লোকবল দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার সময় পৌরসভাগুলো ভবনটি যথাযথভাবে অনুমোদিত কি না, তা যাচাই করতে পারে। ভবনের নির্মাণকাজ শেষে ব্যবহারের জন্য ছাড়পত্র নেওয়ার যে নিয়ম রয়েছে, তাকে আরও কঠোর করতে হবে। এই ছাড়পত্র ৫ বছর অন্তর নবায়ন করা এবং এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করা জরুরি। ছাড়পত্র ছাড়া কোনো ইউটিলিটি সংযোগ দেওয়া হবে না—এমন নিয়ম চালু করলে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
রানা প্লাজার পর আমাদের শিল্পাঞ্চলে কি খুব একটা উন্নতি হয়েছে? উত্তরটি হলো—আংশিক। যেসব বড় কারখানা বিদেশে সরাসরি পণ্য রপ্তানি করে, তারা বিদেশি ক্রেতা ও আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের চাপে কমপ্লায়েন্স মেনে চলতে বাধ্য হচ্ছে। রাজউকের অনুমোদন থেকে শুরু করে ফায়ার সেফটি—সবই তারা মানছে। এর ফলে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের সর্বাধিক 'গ্রিন ফ্যাক্টরি' বা পরিবেশবান্ধব কারখানার দেশে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালের এনবিআরের পরিপত্র অনুযায়ী, গ্রিন বিল্ডিংয়ের জন্য আয়কর রেয়াত বা প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু শঙ্কার জায়গাটি হলো সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করা এবং দেশীয় বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদনকারী ছোট কারখানাগুলো। যেহেতু তাদের সরাসরি বিদেশি ক্রেতাদের জবাবদিহি করতে হয় না, তাই তাদের মধ্যে কমপ্লায়েন্স মানার বা গ্রিন ফ্যাক্টরি করার কোনো তাগিদ নেই। ফলে এই খাতগুলোতে তদারকির বড় ঘাটতি রয়েই গেছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও প্রবল।
ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে এবং কর্মপরিবেশের উন্নতি ঘটাতে হলে 'পুশ অ্যান্ড পুল' (আকর্ষণ ও বাধ্যবাধকতা) নীতি গ্রহণ করতে হবে। একদিকে যারা নিয়ম মেনে সেফ বিল্ডিং বা পরিবেশবান্ধব কারখানা করবে, তাদের জন্য ট্যাক্স রিবেটসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে, যেন স্থানীয় বাজারের উৎপাদকেরাও এতে আগ্রহী হয়। অন্যদিকে যারা নিয়ম ভঙ্গ করবে, তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
তবে মনে রাখতে হবে, এনফোর্সমেন্ট বা আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে ব্যবসার পরিবেশ যেন বাধাগ্রস্ত না হয়। অতি কড়াকড়ির কারণে যদি বিনিয়োগকারীরা কারখানা করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তবে দেশে কর্মসংস্থানের বিশাল সংকট তৈরি হবে। তাই সরকারকে সুযোগ-সুবিধা প্রদান এবং নিরাপত্তার বাধ্যবাধকতা—এই দুইয়ের মধ্যে একটি চমৎকার ভারসাম্য বা ব্যালেন্স তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি)-এর নিয়মকানুন সমগ্র দেশে কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি। সর্বস্তরের মানুষের বোঝার সুবিধার্থে এর একটি সহজবোধ্য বাংলা সংস্করণ প্রকাশ করা উচিত। কারখানার ক্ষেত্রে আরও কঠোর নিয়ম প্রবর্তন করতে হবে; যেমন—কারখানার ভবনে ফ্ল্যাট প্লেট ডিজাইন নিষিদ্ধ করা এবং কলাম নির্মাণের সময় বিশেষ তদারকি নিশ্চিত করা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি জাতীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ভবনে ফাটল, প্লাস্টার খসে পড়া, ধোঁয়া, বিদ্যুতের তার গরম হওয়া বা যেকোনো অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি দেখা দিলে তা যেন সরাসরি কর্তৃপক্ষকে জানানো যায়, সেজন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষ হান্টিং নম্বর বা হটলাইন চালু করা যেতে পারে। শ্রমিক বা সাধারণ মানুষ এসএমএস বা ফোন করলেই অভিযোগটি সরাসরি সিভিল ডিফেন্স, পুলিশ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরোর কাছে চলে যাবে। এতে মালিকপক্ষ চাইলেও কোনো ত্রুটি ধামাচাপা দিতে পারবে না।
রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ আমাদের জন্য এক চরম ও নির্মম শিক্ষা। আন্তঃমন্ত্রণালয় দ্বন্দ্ব এবং দায়িত্ব নিয়ে ঠেলাঠেলি বন্ধ করে সরকারকে একটি সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। এমন এক কঠোর ও স্বয়ংক্রিয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে চাইলেও কোনো অসাধু মহল আর দ্বিতীয় একটি রানা প্লাজা নির্মাণ করতে পারবে না। হাজারো শ্রমিকের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে একটি নিরাপদ ও টেকসই শিল্পকাঠামো গড়ে তোলাই হোক আমাদের আগামী দিনের অঙ্গীকার।
খন্দকার সাব্বির আহমেদ: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক; পরিবেশবান্ধব ফ্যাক্টরি ডিজাইন বিশেষজ্ঞ

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের ইতিহাসেই নয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও এক ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা। এর ভয়াবহতা এতটাই ব্যাপক যে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যখন শিল্প দুর্ঘটনার ইতিহাস পড়ানো হয়, তখন রানা প্লাজার ঘটনাকে এক নম্বরে রাখা হয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পৃথিবীর ইতিহাসে শিল্পক্ষেত্রে এত বড় ঘটনা সত্যিই বিরল।
সাভারে ভবনধসের পর সেনাবাহিনীর সঙ্গে উদ্ধারকাজে কারিগরি পরামর্শ দেওয়ার সুবাদে খুব কাছ থেকে এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখার সুযোগ হয়েছিল। তখনই গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি, কোথায় আমাদের সক্ষমতা আর কোথায় আমাদের গাফিলতি। সুনামি, টর্নেডো বা ভূমিকম্পের মতো কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে নয়, বরং স্রেফ ‘দুর্নীতির’ কারণে হাজার হাজার তরতাজা প্রাণ ঝরে গেছে—এ কথা ভাবলে আজও শিউরে উঠতে হয়।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পেছনে সবচেয়ে বড় দায় ছিল কাঠামোগত ও পরিকল্পনার ত্রুটি। প্রথমত, ভবনটির নকশা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সঠিকভাবে অনুমোদিত ছিল না। পৌরসভার যে অনুমোদন ছিল, তাতে পরবর্তী সম্প্রসারণ বা এক্সটেনশনের কোনো উল্লেখ ছিল না। একটি স্ট্রাকচারাল ডিজাইন তিন বা চার তলার ভার বহনের জন্য তৈরি করার পর যদি এর ওপর আরও কয়েক তলা বাড়ানো হয়, তবে তার লোড নেওয়ার ক্ষমতা থাকে না। রানা প্লাজায় ঠিক এমনটাই ঘটেছিল।
দ্বিতীয়ত, ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল একটি পুকুর বা জলাভূমি ভরাট করে। ফলে জমির ভিত্তি বা গ্রাউন্ড স্ট্রাকচার ছিল চরম দুর্বল। প্রকৌশল বিজ্ঞানে নির্মাণ কাঠামোর ক্ষেত্রে নিরাপত্তার মানদণ্ড বলে একটি ধারণা আছে। অর্থাৎ, যতটুকু ভার বহনের ক্ষমতা প্রয়োজন, তার চেয়ে কিছুটা বাড়তি সক্ষমতা দিয়ে ভবনের নকশা করা হয়, যেন সামান্য কমবেশিতে ভবনটি ধসে না পড়ে। কিন্তু রানা প্লাজার ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত ও অবৈধ সম্প্রসারণের কারণে সেই ‘ফ্যাক্টর অব সেফটিও’ নিঃশেষ হয়ে যায়। ওপরের তলাগুলোর কাঁচা ও অসমাপ্ত কনস্ট্রাকশনের লোড নিতে না পেরে ভবনটি ধসে পড়তে শুরু করে এবং তাসের ঘরের মতো পুরো কাঠামোটি ধসে পড়ে।
শহরকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে আনার জন্য ‘ডিটেলড এরিয়া প্ল্যান’ বা ড্যাপ প্রণয়ন করা হয়। কোথায় আবাসিক এলাকা হবে, কোথায় জলাশয় থাকবে, কোথায় কারখানা হবে—এসব নির্ধারণ করা ড্যাপের কাজ। ড্যাপের জরিপের মাধ্যমেই জমির মাটি পরীক্ষা করে প্রকৌশলীর পরামর্শে ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সাধারণভাবে ভরাট করা জমিতে ঝুঁকি থেকেই যায়, রানা প্লাজাও এর ব্যতিক্রম ছিল না।
আরেকটি বড় নিয়ম লঙ্ঘন ছিল ভবনের ব্যবহারে। রানা প্লাজা মূলত একটি বাণিজ্যিক ভবন হিসেবে ব্যবহারের কথা ছিল। কিন্তু সেখানে গড়ে তোলা হয়েছিল ভারী পোশাক কারখানা। এখানেই প্রশ্ন ওঠে আমাদের বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) প্রয়োগের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নিয়ে। ভবনটির যখন অনুমোদন দেওয়া হয়, তখন কোনো কাঠামোগত মূল্যায়ন করা হয়নি। ইন্সপেক্টর অব ফ্যাক্টরিস, রাজউক বা পৌরসভার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর এখানে নজরদারির অভাব ছিল। দুর্ঘটনার পর সবাই দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু একটি বিশাল ভবন চোখের সামনে অবৈধভাবে মাথা তুলে দাঁড়াল, আর এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শকরা তা দেখলেন না—এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়।
ভবন নির্মাণের অনুমোদনের ক্ষেত্রে পৌরসভার তুলনায় রাজউক কারিগরিভাবে অনেক বেশি যোগ্য। পৌরসভাগুলোতে প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল লোকবলের তীব্র সংকট রয়েছে। অথচ আইনগতভাবে রাজউকের আওতাধীন এলাকা হওয়া সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে পৌরসভাগুলো অনুমোদনের কাজ করে যাচ্ছে। রাজউকে দক্ষ স্থপতি ও প্রকৌশলী থাকায় তারা নিয়মকানুন মেনে নকশা যাচাই করতে পারে। তবে রাজউক ও পৌরসভা দুটি ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে হওয়ায় আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের বিষয়টি বেশ জটিল।
এই সংকট কাটাতে পৌরসভাগুলোকে রাজউকের মতো দক্ষ লোকবল দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার সময় পৌরসভাগুলো ভবনটি যথাযথভাবে অনুমোদিত কি না, তা যাচাই করতে পারে। ভবনের নির্মাণকাজ শেষে ব্যবহারের জন্য ছাড়পত্র নেওয়ার যে নিয়ম রয়েছে, তাকে আরও কঠোর করতে হবে। এই ছাড়পত্র ৫ বছর অন্তর নবায়ন করা এবং এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করা জরুরি। ছাড়পত্র ছাড়া কোনো ইউটিলিটি সংযোগ দেওয়া হবে না—এমন নিয়ম চালু করলে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
রানা প্লাজার পর আমাদের শিল্পাঞ্চলে কি খুব একটা উন্নতি হয়েছে? উত্তরটি হলো—আংশিক। যেসব বড় কারখানা বিদেশে সরাসরি পণ্য রপ্তানি করে, তারা বিদেশি ক্রেতা ও আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের চাপে কমপ্লায়েন্স মেনে চলতে বাধ্য হচ্ছে। রাজউকের অনুমোদন থেকে শুরু করে ফায়ার সেফটি—সবই তারা মানছে। এর ফলে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের সর্বাধিক 'গ্রিন ফ্যাক্টরি' বা পরিবেশবান্ধব কারখানার দেশে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালের এনবিআরের পরিপত্র অনুযায়ী, গ্রিন বিল্ডিংয়ের জন্য আয়কর রেয়াত বা প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু শঙ্কার জায়গাটি হলো সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করা এবং দেশীয় বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদনকারী ছোট কারখানাগুলো। যেহেতু তাদের সরাসরি বিদেশি ক্রেতাদের জবাবদিহি করতে হয় না, তাই তাদের মধ্যে কমপ্লায়েন্স মানার বা গ্রিন ফ্যাক্টরি করার কোনো তাগিদ নেই। ফলে এই খাতগুলোতে তদারকির বড় ঘাটতি রয়েই গেছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও প্রবল।
ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে এবং কর্মপরিবেশের উন্নতি ঘটাতে হলে 'পুশ অ্যান্ড পুল' (আকর্ষণ ও বাধ্যবাধকতা) নীতি গ্রহণ করতে হবে। একদিকে যারা নিয়ম মেনে সেফ বিল্ডিং বা পরিবেশবান্ধব কারখানা করবে, তাদের জন্য ট্যাক্স রিবেটসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে, যেন স্থানীয় বাজারের উৎপাদকেরাও এতে আগ্রহী হয়। অন্যদিকে যারা নিয়ম ভঙ্গ করবে, তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
তবে মনে রাখতে হবে, এনফোর্সমেন্ট বা আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে ব্যবসার পরিবেশ যেন বাধাগ্রস্ত না হয়। অতি কড়াকড়ির কারণে যদি বিনিয়োগকারীরা কারখানা করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তবে দেশে কর্মসংস্থানের বিশাল সংকট তৈরি হবে। তাই সরকারকে সুযোগ-সুবিধা প্রদান এবং নিরাপত্তার বাধ্যবাধকতা—এই দুইয়ের মধ্যে একটি চমৎকার ভারসাম্য বা ব্যালেন্স তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি)-এর নিয়মকানুন সমগ্র দেশে কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি। সর্বস্তরের মানুষের বোঝার সুবিধার্থে এর একটি সহজবোধ্য বাংলা সংস্করণ প্রকাশ করা উচিত। কারখানার ক্ষেত্রে আরও কঠোর নিয়ম প্রবর্তন করতে হবে; যেমন—কারখানার ভবনে ফ্ল্যাট প্লেট ডিজাইন নিষিদ্ধ করা এবং কলাম নির্মাণের সময় বিশেষ তদারকি নিশ্চিত করা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি জাতীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ভবনে ফাটল, প্লাস্টার খসে পড়া, ধোঁয়া, বিদ্যুতের তার গরম হওয়া বা যেকোনো অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি দেখা দিলে তা যেন সরাসরি কর্তৃপক্ষকে জানানো যায়, সেজন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষ হান্টিং নম্বর বা হটলাইন চালু করা যেতে পারে। শ্রমিক বা সাধারণ মানুষ এসএমএস বা ফোন করলেই অভিযোগটি সরাসরি সিভিল ডিফেন্স, পুলিশ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরোর কাছে চলে যাবে। এতে মালিকপক্ষ চাইলেও কোনো ত্রুটি ধামাচাপা দিতে পারবে না।
রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ আমাদের জন্য এক চরম ও নির্মম শিক্ষা। আন্তঃমন্ত্রণালয় দ্বন্দ্ব এবং দায়িত্ব নিয়ে ঠেলাঠেলি বন্ধ করে সরকারকে একটি সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। এমন এক কঠোর ও স্বয়ংক্রিয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে চাইলেও কোনো অসাধু মহল আর দ্বিতীয় একটি রানা প্লাজা নির্মাণ করতে পারবে না। হাজারো শ্রমিকের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে একটি নিরাপদ ও টেকসই শিল্পকাঠামো গড়ে তোলাই হোক আমাদের আগামী দিনের অঙ্গীকার।
খন্দকার সাব্বির আহমেদ: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক; পরিবেশবান্ধব ফ্যাক্টরি ডিজাইন বিশেষজ্ঞ

তাসলিমা আখতার। বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি ও সাবেক শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য। রানা প্লাজা ধ্বংসস্তূপের চাক্ষুষ সাক্ষী ও বিভিন্ন সময়ে শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনে অন্যতম অগ্রগ্রামী নেতৃত্ব।
৮ ঘণ্টা আগে
রানা প্লাজার এই ঘটনাটিকে আমরা আসলে ‘দুর্ঘটনা’ না বলে ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’ বলব। যে স্থানে রানা প্লাজা ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল, সেটি মূলত একটি জলাশয় ছিল। একটি জলাভূমির ওপর ভবনটি তৈরি করা হলেও সেখানে প্রকৌশলগত নিরাপত্তার যথাযথ মানদণ্ড মানা হয়নি।
১৬ ঘণ্টা আগে
রাজপথের নেত্রীদের মূল্যায়ন ভবিষ্যতে নারীদের ছাত্ররাজনীতিতে অংশ নিতে অনুপ্রাণিত করবে বলে মনে করেন আরিফা সুলতানা রুমা।
১ দিন আগে
২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের নিযুক্ত বান্দরবান জেলার সহকারী সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মাধবী। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনয়নে নোটারি পাবলিক হিসেবে নিয়োগ পান।
১ দিন আগে