ইসির নির্বাচনী রোডম্যাপ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মিশ্র প্রতিক্রিয়া

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

আজ বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) এক সংবাদ সম্মেলনে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেন ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। সংগৃহীত ছবি

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২৪টি গুরুত্বপূর্ণ কাজকে প্রাধান্য দিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত রোডম্যাপকে স্বাগত জানিয়েছে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। তবে অনেকেই বলছেন, এই রোডম্যাপ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আস্থা তৈরি করলেও কিছু ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে।

জাতীয় দলের সভাপতি ও ১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক এহসানুল হুদা বলেন, নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত রোডম্যাপটি গতানুগতিক ও দায়সারা। তাঁর মতে, যে কাজগুলো দ্রুত শেষ করা সম্ভব ছিল, সেগুলোতে দীর্ঘ সময়সীমা বেঁধে দেওয়ায় কমিশনের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। কমিশন সময়মতো কাজ সম্পন্ন করে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত রোডম্যাপকে ‘পুরোনো বন্দোবস্তের পুনরাবৃত্তি’ আখ্যা দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটি বলছে, নির্বাচনী কর্মপরিকল্পনার আগে দেশবাসী অপেক্ষা করছে সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের রোডম্যাপের জন্য।

আজ বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও দলীয় মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘আধুনিক জাতিরাষ্ট্রে নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ, আমরাও নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু আজকের বাংলাদেশ রক্তস্নাত বিশেষ পরিস্থিতিতে রয়েছে। গত ২৪ জুলাই ছাত্র-জনতা জীবন দিয়েছে ৫৪ বছরের জঞ্জাল দূর করতে, স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটাতে। সেই বাস্তবতা উপেক্ষা করে কেবল নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা জুলাইকে অস্বীকার করার শামিল।’

আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) রোডম্যাপকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক মতবিনিময় ছাড়া রোডম্যাপ প্রকাশ করা ঠিক হয়নি।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তাঁরা।

পাশাপাশি ভোটারদের সচেতন করার প্রটোকল তৈরি, অবৈধ অর্থের প্রভাব রোধ ও ভোটারের বয়সসীমা ১৭ বছরে নামানোর প্রস্তাব রোডম্যাপে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন তাঁরা।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি নির্বাচনী রোডম্যাপকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি কার্যত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্বাচন রোডম্যাপের ঘোষণা। নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ দেওয়া যাবে না এবং এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে একটি পর্যবেক্ষণ কমিটি ও আচরণবিধি প্রণয়ন জরুরি।

অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের জানান, সংস্কার ও আগামী জাতীয় নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে, তা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই রোডম্যাপ ঘোষণা সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে তাদের শঙ্কা বাড়িয়েছে।

এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত রোডম্যাপকে স্বাগত জানিয়েছেন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্ট কর্নেল আলি আহমদ।

বিএনপির ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া

ঘোষিত রোডম্যাপ নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। তবে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় রোডম্যাপ ঘোষণাকে জনগণের জন্য সুসংবাদ আখ্যা দিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘রোডম্যাপ ঘোষণা হয়েছে। এতে আশাবাদী হয়েছি যে নির্বাচন কমিশন ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। মূল কথা হচ্ছে, আমরা খুশি, উই আর হ্যাপি।’

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও রোডম্যাপকে জাতির জন্য সুসংবাদ উল্লেখ করে বলেন, ‘মানুষ এখন নির্বাচনমুখী হতে পারবে। নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার আসবে, সংসদ প্রতিষ্ঠা হবে, জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা তৈরি হবে। এরপর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে।’

বিএনপির আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণায় জাতির প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। যথাযথ সময়ে রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে। এখন রোডম্যাপ অনুযায়ী নির্বাচন হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’

এনসিপির নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া

জুলাই সনদ চূড়ান্ত হওয়ার আগে নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণাকে সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শামিল বলে মন্তব্য করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

এনসিপির পক্ষ থেকে এক লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে জনগণের প্রত্যাশা ছিল বিচার ও সংস্কার। সেই লক্ষ্যে সরকার সংস্কার কমিশন গঠন করে ও ঐকমত্য কমিশনের প্রণীত জুলাই সনদের খসড়া রাজনৈতিক দলগুলোকে পাঠানো হয়। তবে খসড়ায় বাস্তবায়নের কোনো স্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকায় হতাশা তৈরি হয়েছে।’

দলটি অভিযোগ করেছে, অজানা কারণে ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক পেছানো হয়েছে ও এখনো জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নির্ধারিত হয়নি। সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত না করে নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শামিল।

রোডম্যাপকে গতানুগতিক বলছে জামায়াত

২৮ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) রাতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “ঘোষিত রোডম্যাপ গতানুগতিক এবং কিছুটা বিভ্রান্তিমূলক।”

তিনি বলেন, জাতির প্রত্যাশা আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে। কিন্তু কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তা এখনো ঠিক হয়নি। এমনকি জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তি প্রদান এবং এর বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত হয়নি। এমতাবস্থায় এই রোডম্যাপ ঘোষণা অপরিপক্ব ও আংশিক।

রোডম্যাপে জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি উল্লেখ করে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট ধারণ করে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনে জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তি প্রদান এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে রোডম্যাপ ঘোষণা করা উচিত ছিল বলে আমরা মনে করি।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত