শিয়ালবাড়িতে আগুন

৬ মাসেও ক্ষতিপূরণ পাননি ১২ দিন পর মেয়ের লাশ পাওয়া সুলতান

স্ট্রিম গ্রাফিক

‘আমার মায়াডা আগুনে পুইড়া গোডাউনের মধ্যে পইরা ছিলো। কেউ উদ্ধার করে নাই। মায়াডার লগে জামাইরেও হারাইলাম। ঠিক টাইমে মায়ার লাশটাও পাইলাম না। এহন ক্ষতিপূরণের লাইগাও ঘুরতে হইতেছে।’ কথাগুলো বলছিলেন মোহাম্মদ সুলতান মিয়া। রাজধানীর রূপনগর আবাসিক এলাকার শিয়ালবাড়িতে অগ্নিকাণ্ডে মারা যান তাঁর মেয়ে মারজিয়া সুলতানা। একইসঙ্গে মারা যান মারজিয়ার স্বামী জয় মিয়া।

ঘটনা গত বছরের ১৪ অক্টোবরের। সেদিন বেলা ১১টায় আগুন লাগে শিয়ালবাড়ির ৩ নম্বর সড়কের আলম ট্রেডার্স নামের একটি রাসায়নিক গুদামে। পরে সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের ভবনে। এর মধ্যে আর এন ফ্যাশন, এভারগ্রিন কালার প্রিন্ট ফ্যাক্টরি, এন আর এস ওয়াস ফ্যাক্টরি ও শাহ আলী ওয়াস ফ্যাক্টরি ছিল। আর এন ফ্যাশনে কাজ করতেন জয় ও মারজিয়া।

এ ঘটনায় শুরুতে ১৬ জনের লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। পুড়ে মারা যাওয়া জয় মিয়ার লাশ পাওয়া গেলেও কিন্তু মারজিয়া নিঁখোজ ছিলেন। জীবিত বা মৃত কোনোভাবেই পাওয়া যায়নি তাঁর হদিশ। কোনো উপায় না পেয়ে ঘটনার ১২ দিন পর অগ্নিদগ্ধ ভবনে নিজেই অভিযান চালান সুলতান নিজেই। শ্রমিক সংগঠনের সহায়তায় নিজেই উদ্ধার করেন গলেও যাওয়া মেয়ের লাশ। এতে ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ জনে।

এদিকে, মারজিয়ার লাশ উদ্ধার হওয়ার আগেই অভিযান শেষ করে ফায়ার সার্ভিস। দায়িত্ব আসে রূপনগর থানা পুলিশের কাঁধে। ২৬ অক্টোবর পুলিশের সহযোগিতায় উদ্ধার হওয়া লাশ নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২৬ নভেম্বর ময়নাতদন্ত শেষে মেয়ের লাশ বুঝে পান সুলতান।

কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় কোনো শ্রমিক মারা গেলে সরকারের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সরকারি এই প্রক্রিয়ায় অনেক সময় লেগে যায়। মেয়ের মৃত্যুর ৬ মাস পার হয়ে গেলেও এখনো সরকারি ক্ষতিপূরণ পাননি সুলতান।

স্ট্রিমকে সুলতান বলেন, ‘গার্মেন্টসের মালিকরা জামিন নিয়া ঘুইরা বেড়াইতেছে। এলাকায় আসতেছে। কিন্তু আইজও আমি ক্ষতিপূরণ পাইলাম না। আমার মায়া গেল, জামাই গেল—সবই গেল।’

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর ঢাকার উপমহাপরিদর্শক মো. আতিকুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘শিয়ালবাড়িতে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ জনের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়া হয়েছে। কাগজপত্রের জটিলতার কারণে বাকিদের টাকাটা এখনও দেওয়া হয়নি।’

মারজিয়ার পরিবার কবে ক্ষতিপূরণ পাবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মারজিয়ার লাশ উদ্ধারের পর আমরা ঠিকঠাক কাগজপত্র পাইনি। যদি তাঁর পরিবার আমাদেরকে ঠিকঠাক কাগজপত্র দেন, তাহলে আমরা তাঁদের টাকাটা দিয়ে দেব।’

রাজনৈতিক সহায়তাও পাননি সুলতান

মারজিয়ার বয়স মাত্র ১৪ বছর। স্বামী জয় মিয়ার বয়স ২০ বছর। মারজিয়ার বাবা মোহাম্মদ সুলতান মিয়া ও জয়ের বাবা সবুজ মিয়া আপন দুই ভাই। তাঁদের বাড়ি নেত্রকোনায়। পরে সোনামগঞ্জে গিয়ে থিতু হন মোহাম্মদ সুলতান। তিনি সিটি করপোরেশনের ময়লা পরিবহনের কাজ করেন।

শিয়ালবাড়ির অগ্নিকাণ্ডের পর নিহতদের পরিবারকে শোক জানায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। সেইসঙ্গে তাঁদের এক লাখ টাকা করে সহায়তা প্রধানেরও ঘোষণা দেয় দল দুটি। ঘোষণা অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া হয়েছে। মারজিয়ার স্বামী জয়ের বাবা সবুজ মিয়াসহ ১৬টি পরিবার সহায়তা পেয়েছে। তবে ঘটনার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও সহায়তা পাননি সুলতান মিয়া।

এদিকে, দেরিতে লাশ উদ্ধার এবং এই তথ্য না জানার কারণে দল দুটি সুলতানকে সহায়তা দিতে পারেনি বলে জানিয়েছে। এখন তথ্য দিলে সহায়তা দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক স্ট্রিমকে বলেন, ‘বিএনপির পক্ষ থেকে দুর্ঘটনায় নিহত ১৬ জনের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। মারজিয়ার লাশ পরে উদ্ধার হওয়ার ঘটনা আমাদের জানা ছিল না। এখন যেহেতু জানা গেছে, তাঁর পরিবারকে আমরা অবশ্যই সহযোগিতা করব।’

তিনি আরো বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটা ঘটেছে একটা আবাসিক এলাকায়। আমরা চেষ্টা করছি আবাসিক এলাকা থেকে এসব গোডাউন, কারখানা সরিয়ে নিতে। তাহলে এসব দুর্ঘটনা কমে আসবে বলে আশা করি।’

জামায়াতের ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের নায়েবে আমির আব্দুর রহমান মুসা স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমিরে জামায়াতের ঘোষণা অনুযায়ী শিয়ালবাড়িতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত ১৬ জনের পরিবারকে ১ লাখ টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। যে লাশটি পরে উদ্ধার করা হয়েছে, থানা থেকে সেই তথ্য আমাদের কাছে এলে তাঁর পরিবারকেও সহায়তা দেওয়া হবে।’

জমিনে প্রধান আসামি

শিয়ালবাড়িতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার নিহত পোশাকশ্রমিক ছানোয়ার হোসেনের ভাই সাইফুল ইসলাম বাদী হয়ে ১৫ অক্টোবর রূপনগর থানায় একটি মামলা করেন। অবহেলাজনিত মৃত্যু ঘটানোর অভিযোগে আলম রাসায়নিকের গুদামের মালিক শাহ আলমকে প্রধান আসামি করে মামলাটি করা হয়েছে।

পাশাপাশি মামলায় আটজনকে আসামি করা হয়। তাঁরা হলেন ‘আলম কেমিক্যাল গোডাউন’ নামের ওই রাসায়নিকের গুদামের ব্যবস্থাপক আকরাম, এভারগ্রিন কালার প্রিন্ট ফ্যাক্টরির মালিক, ব্যবস্থাপক, এনআরএস-ওয়াস ফ্যাক্টরির মালিক, এনআরএস-ওয়াস ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপক, শাহ আলী ওয়াস ফ্যাক্টরি মালিক, শাহজালী ওয়াস ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপক। এ ছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা ১০-১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, শিয়ালবাড়ি আবাসিক এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ অনুমোদনহীন ভবনে অবৈধভাবে দাহ্য পদার্থ মজুত করেন শাহ আলম। ক্যামিকেলের ওই গুদাম থেকে আশপাশের ভবনগুলোতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তবে, ভবনগুলো থেকে নামার জন্য শ্রমিকেরা কোনো সেফ এক্সিট পাননি। কয়েকটি ভবনের প্রধান ফটক ও ছাদে তালা লাগানো ছিল। ভবনগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ–ব্যবস্থাও রাখা হয়নি।

তবে মামলার মূল আসামি শাহ আলম হাইকোর্টের আদেশে জামিনে আছেন বলে জানা গেছে। মামলার বাদী সাইফুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমি ভাইকে হারিয়েছি। শুধু আমার ভাই না, অনেকে তাঁদের নিকট আত্মীদের হারিয়েছে। এই ঘটনায় হওয়া মামলার ছয় মাস পার হয়ে গেছে। কিন্তু এখনও কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। উল্টা কোর্ট থেকে জামিন নিয়ে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে।’

রূপনগর থানার ওসি (তদন্ত) মনিরুজ্জামান স্ট্রিমকে বলেন, ‘মামলাটি এখনও তদন্তাধীন। কাউকে এখনও গ্রেপ্তার করা যায়নি। তবে দুয়কজন কোর্ট থেকে জামিন নিয়েছেন। আর আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠিয়েছি। ফিরতি চিঠি পেলে ফাইনাল রিপোর্ট জমা দেবো।’

সম্পর্কিত