leadT1ad

টাকা নিয়ে ঘুরেছি মন্ত্রীকেই প্রমাণ করতে হবে: আদ-দ্বীনের নির্বাহী পরিচালক

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিন। ছবি: সংগৃহীত

আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিন বলেছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী যদি দাবি করে থাকেন, আদ-দ্বীন হাসপাতাল তাঁর পেছনে কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘুরেছে, সেই অভিযোগের প্রমাণ তাঁকেই দিতে হবে।

সোমবার (১৫ জুন) বিকেলে আদ-দ্বীন হাসপাতালে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘টাকা নিয়ে কেন ঘুরব? মন্ত্রী যদি এ বিষয়ে কিছু বলে থাকেন, তাঁকেই সেটি প্রমাণ করতে হবে। এমন কিছু আমি করিনি।’ এ সময় হাসপাতালের লাইসেন্স ফিরে পেতে মঙ্গলবার (১৬ জুন) আপিল করা হবে বলেও জানান শেখ মহিউদ্দিন।

গত ২৭ মে রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তদন্তের পরে ১১ জুন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তিন দিনের মধ্যে রোগীদের অন্য হাসপাতালে সরিয়ে নিতে নির্দেশ দেয়। লাইসেন্স বাতিলের পর বিপাকে পড়েন সেখানে চিকিৎসাধীন রোগীরা।

আদ-দ্বীনের লাইসেন্স বাতিল নিয়ে আলোচনার মধ্যে ১৩ জুন নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল দাবি করেন, লাইসেন্স বাঁচাতে হাসপাতালটির কর্তৃপক্ষ কোটি কোটি টাকা নিয়ে তাঁর পেছনে ঘুরেছে।

তিনি বলেন, ‘এই যে আদ-দ্বীন হাসপাতাল কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘুরেছে আমার পেছনে। আল্লাহর রহমতে আপনাদের দোয়ায় কোনো টাকার প্রতি লোভ হয় নাই। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আপনি যা করবেন, আমি পূর্ণ সমর্থন দেব। আমি লাইসেন্স বাতিল করে দিয়েছি।’

মন্ত্রী ওই অনুষ্ঠানে আরও বলেন, ‘আর জামায়াতের লোকেরা বলে– এটা নাকি বেইনসাফ হইছে। মানে, ওই ব্যাটাও জামায়াত করে। মানুষকে ধোঁকা দেয়। কয়েকটা টাকা কম নেয়। ছয়টা বাচ্চাকে মেরে ফেলছে। ওরা এখন উনার পক্ষে কথা বলে। কথা বলুক আর যাই করুক, লাইসেন্স বাতিল করছি তো করছিই। এই একটা শাস্তি সারা দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলো ঠিক হয়ে যাবে।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যের একদিন পর সংবাদ সম্মেলনে এসে অভিযোগ নাকচ করলেন আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক। এ সময় জামায়াতের বিষয়ে মন্তব্য করতে অনাগ্রহ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। মন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেই ভালো হয়।’

মঙ্গলবার আপিল

লাইসেন্স বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল করা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ মহিউদ্দিন বলেন, লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। সে অনুযায়ী মঙ্গলবার আপিল করা হবে।

সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা– প্রশ্নে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত এমন চিন্তা নেই। সরকার সহযোগিতা করবে এবং ঘাটতিগুলো দূর করার পর হাসপাতাল আবার লাইসেন্স পাবে– এমনটাই প্রত্যাশা তাদের।

প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে বিস্তৃত ফরেনসিক পরীক্ষা দরকার

হাসপাতালে এখনো ভর্তি থাকা রোগীদের বিষয়ে শেখ মহিউদ্দিন বলেন, নতুন কোনো রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না। তবে কিছু রোগী, বিশেষ করে নবজাতক ও সংকটাপন্ন রোগীদের তাৎক্ষণিকভাবে স্থানান্তর করা ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমানে আইসিইউতে ৫, এনআইসিইউতে ৩৬, শিশু বিভাগে ৬, গাইনি বিভাগে ৯ জন এবং অন্যান্য বিভাগে কয়েকজন ভর্তি আছেন।

শিশুমৃত্যুর ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতগুলো শিশুর মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। শেখ মহিউদ্দিনের দাবি, তদন্ত প্রতিবেদনে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয়নি; সেখানে ভেন্টিলেশন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে। বিষয়টির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে আরও বিস্তৃত ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন, যা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হওয়া উচিত।

কার্বন-ডাই অক্সাইড কিছুটা বেশি

ছয় নবজাতকের মৃত্যুতে সরকারের তদন্ত ও পরবর্তী কার্যক্রম সম্পর্কে শেখ মহিউদ্দিন জানান, বিশেষজ্ঞ দলের মতামতের ভিত্তিতে হাসপাতালের প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের কাজ তারা শুরু করেছেন। পরামর্শক দলে বুয়েট প্রকৌশলী, সিভিল প্রকৌশলী ও একজন কেমিক্যাল প্রকৌশলী রয়েছেন। তাদের পর্যবেক্ষণে ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রাকে প্রধান উদ্বেগের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

শেখ মহিউদ্দিন জানান, আমরা কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও অক্সিজেন পরিমাপের যন্ত্র সংগ্রহ করেছি। এসব যন্ত্র দিয়ে প্রতিটি কক্ষ পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় কোনো কক্ষেই উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, হাসপাতালের ভেতরে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বাইরের পরিবেশের তুলনায় কিছুটা বেশি পাওয়া গেছে, যা সাধারণ আবাসিক ভবনেও দেখা যায়। তবে সেটি গ্রহণযোগ্য মাত্রার বাইরে নয়। তারপরও রোগীদের স্বাচ্ছন্দ্য বাড়াতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা আরও কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের এই নির্বাহী পরিচালক বলেন, প্রকৌশলীদের পরামর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন কক্ষে পজিটিভ এয়ার প্রেসার ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে, যাতে কার্বন ডাই-অক্সাইড দ্রুত বের হয়ে যেতে পারে। শিশু ওয়ার্ডসহ কয়েকটি ওয়ার্ডে ইতোমধ্যে এই কাজ শেষ হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারি প্রতিবেদনে ভেন্টিলেশনের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আমাদের নিয়োজিত বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যে মাত্রা পাওয়া গেছে, তা শিশু মৃত্যুর কারণ হওয়ার মতো নয়।

শেখ মহিউদ্দিন বলেন, নবজাতকদের শারীরিক সহনশীলতা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় ভিন্ন। অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া বা কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার মতো পরিবর্তনের প্রতি তাঁরা বেশি সংবেদনশীল। এই কারণে বিষয়টি জটিল।

সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আশ্বাস পাওয়া গেছে কিনা– প্রশ্নে তিনি বলেন, সরকার থেকে কোনো আশ্বাস দেওয়া হয়নি। তবে সমস্যাগুলোর সমাধান করা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব বলেই তাঁরা প্রয়োজনীয় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

অন্যান্য হাসপাতাল শিক্ষা পেলে আমি খুশি

শেখ মহিউদ্দিন বলেন, হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে। এটা আমার ফাঁসি হয়ে গেছে। আমার হাসপাতালের ফাঁসি। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে আমরা সম্মান জানাই। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন– এটি দিয়ে অন্য বেসরকারি মেডিকেল কলেজকে শিক্ষা দিচ্ছি। আলহামদুলিল্লাহ, এটা দিয়ে যদি অন্য মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো শিক্ষা পায়, তাতে আমি খুশি। আমার হাসপাতালকে শিক্ষা দিয়ে যদি অন্য মেডিকেল কলেজকে পরিবর্তন করা যায়, তাহলে এটা নিয়ে আমার কোনো কষ্ট নেই।

বেকারি বন্ধ রাখা হয়েছে

হাসপাতালে বেকারি থাকা প্রসঙ্গে শেখ মহিউদ্দিন বলেন, হাসপাতাল ভবনের ওপরের তলায় থাকা বেকারিটির লাইসেন্স নিয়ে কোনো আইনি সমস্যা ছিল না। তবে সরকারের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে বেকারিটি আপাতত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে কর্মরত ৭০০-৮০০ শ্রমিকদের অন্যত্র কাজের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে বেকারিটি অন্য স্থানে স্থানান্তর করা হবে।

তিনি বলেন, সরকার তাদের কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয়নি। তবে যে প্রতিবেদনের ভিত্তিতে লাইসেন্স বাতিল হয়েছে, সেই প্রতিবেদনে চিহ্নিত সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারকে এসব অগ্রগতির বিষয়ও জানানো হবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত