leadT1ad

কাটছে যুদ্ধের আতঙ্ক, কেমন ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা

প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬, ১৮: ১১
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। স্ট্রিম গ্রাফিক

যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে আপাতত স্বস্তি ফিরে এসেছে। তাঁরা বলছেন, এতদিন কর্মবিরতি, ফ্লাইট বন্ধে দেশে ফিরতে না পারা ও নিরাপত্তা শঙ্কা নিয়ে দিন পার করেছেন। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক। কাজে ফিরেছেন। কেউ চাইলে দেশেও যেতে পারছেন।

ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, বাহরাইন, জর্ডান ও কুয়েতে বসবাসরত সাত বাংলাদেশি তাদের যুদ্ধদিনের অভিজ্ঞতা স্ট্রিমের কাছে তুলে ধরেছেন। তাঁরা বলেছেন, যুদ্ধ চললেও এসব দেশে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা বিরল। কর্মবিরতির সময়েও নিয়োগদাতারা ঠিকঠাক বেতন দিয়েছেন। যদিও পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ছেদ পড়েছে। এই কারণে কয়েকটি দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে। নির্মাণ খাত এখনো ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।

সাইরেন বাজলেই বন্ধ কাজ

কাতারে ছয় বছর আছেন নরসিংদীর আজিজুল হাকিম। তিনি স্ট্রিমকে জানান, সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা দেখা দিলেই সাইরেন বাজতো এবং সে অনুযায়ী কাজ শুরু বা বন্ধ হতো। গত ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে এক মাসের মতো কাজ বন্ধ থাকলেও, কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।

আজিজুলের ভাষ্যে, এক মাস কাজ বন্ধ থাকলেও কোনো শ্রমিক ছাঁটাই হয়নি। বরং কর্মবিরতির পুরো সময়ের বেতন দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কাজ পুরোদমে চলছে। কোনো জটিলতা নেই।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান কুয়েতপ্রবাসী সাগর শিকদার, ‘শ্রমিক ছাঁটাই হয়নি। বেতনও কমেনি। যুদ্ধাবস্থায় সরকার শ্রমিক এবং অন্যান্যদের যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছে, সবাই তা মেনে চলেছে।’

দূতাবাসের ভূমিকায় ক্ষোভ

নরসিংদীর আরেক প্রবাসী মামুন মোল্লা। সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে কাজ করলেও, যুদ্ধের পুরো সময় কাটিয়েছেন রিয়াদে। মামুন মোল্লা স্ট্রিমকে জানান, কাজ বন্ধ থাকলেও কোম্পানিগুলো নিয়মিত বেতন দিয়েছে। যুদ্ধের সময় রিয়াদের কিছু ফ্লাইট মদিনা থেকে পরিচালিত হলেও, এখন তা স্বাভাবিক।

কফিল (নিয়োগকর্তা) নিয়মিত খোঁজখবর নিলেও সংকটে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি, ‘যুদ্ধাবস্থা কিংবা অন্যান্য সময়ে বাংলাদেশের দূতাবাস চাইলে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। অনেক সমস্যায় আমরা প্রবাসীরা দূতাবাসের কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাই না।’

অবশ্য বাহরাইনে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মো. রাশেদ জানান, বাংলাদেশ দূতাবাস বাহরাইন সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে ফ্লাইট ব্যবস্থাপনা ও জরুরি তথ্য সরবরাহে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে।

ইরানের লক্ষ্য ছিল সামরিক স্থাপনা

বাহরাইন ও জর্ডানে যুদ্ধের শুরুতে আতঙ্ক থাকলেও, এখন জীবনযাত্রা স্বাভাবিক। মো. রাশেদ জানান, শুরুতে সাইরেন বাজলে মানুষ নিরাপদ স্থানে যেত। তবে সাধারণ মানুষ বুঝে গেছে ইরানের মূল লক্ষ্য আমেরিকান ঘাঁটিগুলো, সাধারণ জনগণ নয়। তাই যুদ্ধের শেষদিকে মিসাইল দেখেও কেউ আতঙ্কিত হতেন না।

জর্ডানে বিভিন্ন কারখানায় প্রায় ১৬ হাজার বাংলাদেশি কাজ করেন। সেখানে কর্মরত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী শুভ্র অনি বলেন, ‘জর্ডানের খুব কাছে ইসরায়েল। তারপরও যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনে বড় ধরনের কোনো প্রভাব পড়েনি। মানুষ বুঝে গেছে, হামলার লক্ষ্য সামরিক স্থাপনা, সাধারণ জনগণ নয়।’

আমিরাতে অর্থনৈতিক ধাক্কা

সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুদ্ধ এয়ার-টু-এয়ার হওয়ায় আবাসিক এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে বলে জানিয়েছেন ২১ বছর ধরে দুবাইয়ে থাকা প্রকৌশলী আমিনুল হক। তবে অন্যান্য দেশের তুলনায় অর্থনৈতিক প্রভাব বেশি ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সমুদ্রপথে জাহাজ সময়মতো না আসায় ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নেমেছে। অনেক কনস্ট্রাকশন প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে শ্রমিক ছাঁটাইও হয়।

আমিনুল হক জানান, ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ যখন বিরতি নিল, শান্তি আলোচনা এগোতে থাকল। তখন থেকে পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নতি হতে থাকে। এখনো সব সমস্যা পুরোপুরি সমাধান না হলেও আগের চেয়ে পরিস্থিতি ভালো।

নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ইরানে

ইরানে সাত বছর ধরে আছেন নেত্রকোনার মো. মুত্তাকিন। তিনি ইরানের আল-মুস্তফা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। মুত্তাকিন স্ট্রিমকে জানান, যুদ্ধের কারণে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় নিম্ন আয়ের মানুষ বিপাকে পড়েছেন। তবে স্কলারশিপের শিক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়া ফ্রি হওয়ায়, কোনো অসুবিধা হয়নি।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার ও দূতাবাসের উদ্যোগে দুটি বিশেষ ফ্লাইটে শতাধিক বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। তবে আমি দেশে ফিরিনি। কারণ, আমাদের এলাকায় সরাসরি কোনো হামলা হয়নি।’

যুদ্ধের শুরুতে সরকার পতনের গুঞ্জন ছিল বলে জানান মুত্তাকিন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি শহীদ হওয়ার ঘটনা মোড় পাল্টে দেয়। আর মিনাবে বিদ্যালয়ের দেড় শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা পুরো দেশের মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রবিমুখ করে তোলে।

মুত্তাকিন বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে– এই হামলা ইরানিদের মধ্যকার জাতীয় ঐক্য আরও দৃঢ় করেছে। পুরো জাতি ‘সিসাঢালা প্রাচীর’– এর মতো লড়াই করছে।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত