এক বছর ধরে বন্ধ আশুগঞ্জ সার কারখানা, ২ হাজার কোটি টাকার উৎপাদন ব্যাহত

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
ব্রাহ্মণবাড়িয়া

এক বছর ধরে বন্ধ আশুগঞ্জ সার কারখানা। ছবি: সংগৃহীত

গ্যাস সংকটে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার কারখানা। প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারখানাটি বন্ধ থাকায় গত এক বছরে অন্তত ২ হাজার কোটি টাকার ইউরিয়া উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। অথচ বর্তমানে আমদানি করা সার দিয়ে চাহিদা মেটানো হচ্ছে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বৃদ্ধি পাওয়া সারা দেশে সার বিতরণ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এ কারণে বন্ধ কারখানাটি আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

আশুগঞ্জ উপজেলা সদরের মেঘনা নদীর তীরে চার দশকেরও বেশি সময় আগে প্রতিষ্ঠিত আশুগঞ্জ সার কারখানা। কারখানা সূত্র জানিয়েছে, এই কারখানায় প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১৫০ টন ইউরিয়া সার উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। শুরুর দিকে যা আরও বেশি ছিল। গত বছরের (২০২৫) ১ মার্চ কারখানাটিতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় সার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কারখানাটি বন্ধ থাকায় প্রতিদিন উৎপাদন যে পরিমাণে ব্যহত হচ্ছে, তা টাকার অংকে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি। কারখানা বন্ধ থাকলেও শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন ও যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণসহ আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে অর্থ সংকটও তৈরি হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে।

দীর্ঘদিনের পুরোনো হওয়ায় আশুগঞ্জ সার কারখানায় গ্যাস কিছুটা বেশি লাগে স্বীকার করেই ওই কর্মকর্তা জানান, উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে প্রতিদিন ৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয়। গত কয়েক বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। এতে করে সার উৎপাদনে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের বেধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যাচ্ছে না। ফলে চাহিদা মেটানো হয় বিদেশ থেকে আমদানি করা সার দিয়ে।

উৎপাদন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘জিয়া সার কারখানা’ নাম পরিবর্তন করে ‘আশুগঞ্জ সার কারখানা’ করা হয়, এবং গ্যাস রেশনিংয়ের অজুহাতে বছরের অর্ধেকেরও বেশি সময় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। ফলে পুরোদমে উৎপাদন চালু রাখতে না পারায় লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় কারখানাটি।

এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ছে সারের দাম। এ অবস্থায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ব্যাহত হতে পারে সার আমদানি; যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সার বিতরণ কার্যক্রমে। তাই সংকট মোকাবেলায় দেশের বন্ধ সার কারখানাগুলো চালুর দাবি সংশ্লিষ্টদের।

আশুগঞ্জ সার কারখানা শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. আবু কাউসার বলেন, শুধু জিয়া সার কারখানা নামের কারণে রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকার কারখানাটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। গ্যাস রেশনিংয়ের নামে ইচ্ছাকৃতভাবে কারখানায় বছরের অধিকাংশ সময় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখত। ফলে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে না পেরে আশুগঞ্জ সার কারখানা এখন লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত।

তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বাড়ছে। যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে সার আমদানি ব্যাহত হবে। তাই সংকট মোকাবিলায় দেশের বন্ধ সার কারখানাগুলো দ্রুত চালু করা দরকার।

আশুগঞ্জ সার কারখানার উৎপাদন কবে চালু হবে, এর সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই কর্তৃপক্ষের কাছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আশুগঞ্জ সার কারখানার উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) তাজুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, গ্যাসের জন্য নিয়মিত মন্ত্রণালয় এবং পেট্রোবাংলায় যোগাযোগ করা হচ্ছে। উৎপাদন চালুর জন্য আমরা সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। গ্যাস সরবরাহ পেলে ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে সার উৎপাদন চালু করা সম্ভব।

এ ছাড়া আশুগঞ্জে সরকারের নতুন আরেকটি সার কারখানা করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

এই সার কারখানায় গ্যাস সাপ্লাইয়ের বিষয়ে সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অধিবেশনেও কথা উঠেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সংসদ অধিবেশনে বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে একটা সার কারখানা আছে, যেটি জিয়া ফার্টিলাইজার কারখানা নামেই পরিচিত। সেখানে গ্যাসের অভাবে আমরা সার উৎপাদন করতে পারছি না। মাননীয় মন্ত্রী দয়া করে বলবেন যে এই সার কারখানায় উনি গ্যাস সাপ্লাই দিতে পারবেন কিনা।’

এর জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘আমরা শিগগিরই সার কারখানায় গ্যাস সাপ্লাই করার চেষ্টা করব।’

সম্পর্কিত