স্ট্রিম ডেস্ক

আজ ধরিত্রী দিবস। এদিন এলেই সবাই যেন পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করতে সচেষ্ট হয়ে ওঠেন। বিষয়—কার্বন নিঃসরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু নীতি। কিন্তু এই বড় আলোচনাগুলো প্রায়ই একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে আড়াল করে দেয়; তা হলো, যে শহরে আমরা প্রতিদিন বাস করছি, সেটি কতটা বাসযোগ্য? ধরিত্রীর উপর কি আদৌ এর কোনো প্রভাব আছে?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নটি সবচেয়ে জোরালোভাবে সামনে আসে ঢাকাকে ঘিরে। ঢাকা এমন একটি শহর যেখানে দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন এবং জনসংখ্যার বড় অংশ কেন্দ্রীভূত, কিন্তু একই সঙ্গে পরিবেশগত চাপও সবচেয়ে বেশি।
বসবাসযোগ্যতা কোনো একক বিষয় নয়, এটি কয়েকটি সূচকের সমন্বয়।বায়ুর মান, তাপমাত্রা, সবুজ বনাঞ্চল, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকি। এই সূচকগুলোকে পরস্পরবিচ্ছিন্ন মনে হলেও, বাস্তবে এগুলো একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ঢাকার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, প্রায় প্রতিটি সূচকেই এক ধরনের অবনতি দেখা যাচ্ছে, যা শহরের সামগ্রিক বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। প্রতিদিনের দূষণ, যানবাহনের চাপ, স্বাস্থ্যঝুঁকি এসবই একটি অন্যটির সাথে সম্পর্কিত।
সবচেয়ে সরাসরি এবং পরিমাপযোগ্য সংকট হলো বায়ুদূষণ। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা আই কিউ এয়ারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ঢাকার গড় পিএম ২.৫ ঘনত্ব ছিল প্রায় ৭৮ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার, যা ওয়ার্ল্ড হেল্থ অরগানাইজেশনের নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রা (৫ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার) এর প্রায় ১৫ গুণ বেশি।
এখানে একটি বিষয় বোঝা জরুরি— পিএম ২.৫ হলো এমন ক্ষুদ্র কণা, যা সহজেই ফুসফুসে প্রবেশ করে রক্তপ্রবাহে মিশে যেতে পারে। অর্থাৎ এটি শুধু ‘ময়লা বাতাস’ নয়, বরং একটি সরাসরি স্বাস্থ্যঝুঁকি। দীর্ঘমেয়াদে এই দূষণ শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হৃদরোগ, এমনকি অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে বায়ুদূষণ শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের একটি বড় সংকট—যা প্রতিদিন ঢাকার বাসিন্দাদের প্রভাবিত করছে, অনেক সময় অদৃশ্যভাবে।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি বৃহত্তর সমস্যার অংশ। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে, যেখানে গড় বায়ুদূষণ ডব্লিও এইচও নির্দেশিকার তুলনায় ১৩ গুণেরও বেশি। অর্থাৎ, ঢাকার বায়ুমান শুধু খারাপ নয়, বৈশ্বিক মানদণ্ডেও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
শুধু গড় হিসাব নয়, দৈনন্দিন বাস্তবতাও একই কথা বলে। ২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে ঢাকার বায়ুমান সূচক ৩০০-এর ওপরে পৌঁছেছে—যা ‘বিপজ্জনক’ পর্যায়ে পড়ে। আমরা প্রায়ই খবরে দেখি ‘ঢাকা আজ বায়ুদূষণে শীর্ষ বা দ্বিতীয়।’ আই কিউ এয়ারের অর্থ অনুযায়ী, এই সময়গুলোতে বাতাসে থাকা ক্ষুদ্র কণাগুলো সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ফুসফুস ও রক্তপ্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই দূষণের উৎসও বিচ্ছিন্ন নয়। ইটভাটা, নির্মাণকাজ, পুরনো যানবাহন, রাস্তার ধুলা—সব মিলিয়ে একটি জটিল দূষণচক্র তৈরি হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, যখন বাতাসে ধুলার পরিমাণ বেড়ে যায় এবং দূষণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ কমে যায়। এই দূষিত পরিবেশ কোন আকস্মিক সমস্যা নয়, বরং নগর পরিকল্পনা, শিল্পায়ন ও নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার দীর্ঘমেয়াদি ফল।
বসবাসযোগ্যতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো শহরের তাপমাত্রা ও পরিবেশগত স্বস্তি। ঢাকায় ‘আরবান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট’ এখন স্পষ্ট। কংক্রিট, অ্যাসফল্টের আধিক্য, গাছপালা কমে যাওয়ায় এবং খোলা জায়গার অভাবে শহর দিনের বেলায় তাপ শোষণ করে রাখে। গাছপালা কম থাকায় সেই তাপ কমানোর স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কাজ করে না। ফলে শহরের তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামীণ এলাকার তুলনায় বেশি হয়ে যায়, বিশেষ করে রাতেও তাপ কমতে চায় না। এই পরিস্থিতি মানুষের ঘুম, কর্মক্ষমতা এবং স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। যারা খোলা জায়গায় কাজ করেন যেমন রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক—তাদের জন্য এই তাপমাত্রা সরাসরি শারীরিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়।
বিশ্বের অনেক শহরের ক্ষেত্রে ‘বাসযোগ্যতা’ নির্ধারণ করা হয় কয়েকটি সূচকের মাধ্যমে—বায়ুমান, তাপমাত্রা, সবুজ এলাকা, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যঝুঁকি। ‘ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’-এর ‘গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স’-এ এসব সূচক বিবেচনা করা হয়, যেখানে ঢাকার অবস্থান বরাবরই নিচের দিকে থাকে। ফলে পরিবেশগত সূচকগুলো—বিশেষ করে বায়ুদূষণ ও সবুজের ঘাটতি ঢাকাকে একটি উচ্চ-ঝুঁকির শহর হিসেবে চিহ্নিত করে।
সবুজ এলাকা কমে যাওয়াও এই সমস্যার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ঢাকায় মাথাপিছু খোলা সবুজ জায়গা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক কম। ওয়ার্ল্ড হেল্থ অরগানাইজেশনের সুপারিশ অনুযায়ী শহরে মাথাপিছু ন্যূনতম প্রায় ৯ বর্গমিটার সবুজ জায়গা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকায় রমনা পার্কের মত কিছু পার্ক থাকলেও শহরের বিশাল জনসংখ্যার জন্য তা যথেষ্ট নয়। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শহরের মোট সবুজের আচ্ছাদনও ক্রমাগত কমছে।
সবুজ শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়। সবুজাভ পরিবেশ তাপমাত্রা কমায়, বায়ু পরিশোধনে সাহায্য করে। মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, সবুজ কমে যাওয়া মানে শহরের বাসযোগ্যতা একাধিক স্তরে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
এছাড়াও, নদীদূষণ ঢাকার পরিবেশ সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যেন এটি স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। একসময় ঢাকার প্রাণ ছিল এর আশপাশের নদীগুলো—বিশেষ করে বুড়িগঙ্গা নদী। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নদী-ব্যবস্থার বড় অংশ শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালি বর্জ্য এবং দখলের চাপে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদী এখন অনেক জায়গায় আর পানির প্রবহমান উৎস নয়, নদী যেন দূষিত বর্জ্য বহনের একটি চ্যানেল। বুড়িগঙ্গার কালো পানি ও দুর্গন্ধ যেন ঢাকার দূষিত পরিবেশের প্রতীক।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা অনেক জায়গায় প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। একই সঙ্গে উচ্চমাত্রার জৈব ও রাসায়নিক দূষণ—বিশেষ করে ট্যানারি ও শিল্পবর্জ্য—নদীর পানিকে ব্যবহার অনুপযোগী করে তুলেছে। ওয়ার্ল্ড হেল্থ অরগানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা ৫ মিলিগ্রাম/লিটার হলেও আন্তর্জাতিক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণেও দেখা যায়, ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর পানিতে এই মাত্রা কখনো ২ মিলিগ্রাম/লিটারে নেমে যায়, যা জলজ প্রাণের টিকে থাকার জন্য মারাত্মকভাবে অনুপযোগী।
এই দূষণের উৎসও একাধিক। হেমায়েতপুরের ট্যানারি শিল্পাঞ্চল, শহরের বিভিন্ন শিল্পকারখানা, অনিয়ন্ত্রিত ড্রেনেজ এবং সরাসরি নদীতে ফেলা পয়ঃবর্জ্য—সব মিলিয়ে একটি ধারাবাহিক দূষণচক্র তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বর্জ্য শোধনাগার থাকা সত্ত্বেও তা সঠিকভাবে কার্যকর না হওয়ায় দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। সব মিলিয়ে নদীদূষণ শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং নগর-ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থতার প্রতিফলন। নদী যখন তার প্রাকৃতিক ভূমিকা হারায়, তখন শহরের পানি নিষ্কাশন, জলবায়ু ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র্য—সবকিছুই ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আসে—নগর-ব্যবস্থাপনা। বর্জ্য-ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা—এসব ক্ষেত্রেও ঢাকায় দীর্ঘদিনের সমস্যা রয়েছে। শহরের উৎপাদিত বর্জ্যের একটি বড় অংশ সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয় না, যার ফলে তা খোলা জায়গা, খাল বা নদীতে গিয়ে পড়ে। এর প্রভাব শুধু পরিবেশগত নয়; এটি পানি দূষণ, রোগের বিস্তার এবং জলাবদ্ধতার মতো সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
এই সবকিছু একসাথে দেখলে একটি স্পষ্ট চিত্র তৈরি হয়—ঢাকা একটি ‘ফাংশনাল সিটি’ হলেও বাসযোগ্য নয়। অর্থাৎ এখানে অর্থনৈতিক কার্যক্রম চলছে, মানুষ কাজ করছে, শহর বাড়ছে—কিন্তু সেই বৃদ্ধির সঙ্গে বাসযোগ্যতার উন্নতি তাল মিলিয়ে চলছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন নিজেই নতুন চাপ তৈরি করছে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘ঢাকা কি বসবাসযোগ্য?’ প্রশ্নটি শুধু একটি তাত্ত্বিক আলোচনা নয়। এটি নীতিনির্ধারণ, নগর-পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। যদি বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, সবুজ সংরক্ষণ এবং নগর-ব্যবস্থাপনার মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই শহর শুধু বসবাসের জন্য কঠিনই হবে না, বরং স্বাস্থ্য ও জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ধরিত্রী দিবস একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে—আমরা যে পৃথিবীতে বাস করছি, সেটিকে কীভাবে টিকিয়ে রাখবো। ঢাকার ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নটি আরও নির্দিষ্ট: এই শহরকে শুধু চালু রাখা নয়, বসবাসের উপযোগী রাখার জন্য আমরা কী করছি?

আজ ধরিত্রী দিবস। এদিন এলেই সবাই যেন পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করতে সচেষ্ট হয়ে ওঠেন। বিষয়—কার্বন নিঃসরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু নীতি। কিন্তু এই বড় আলোচনাগুলো প্রায়ই একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে আড়াল করে দেয়; তা হলো, যে শহরে আমরা প্রতিদিন বাস করছি, সেটি কতটা বাসযোগ্য? ধরিত্রীর উপর কি আদৌ এর কোনো প্রভাব আছে?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নটি সবচেয়ে জোরালোভাবে সামনে আসে ঢাকাকে ঘিরে। ঢাকা এমন একটি শহর যেখানে দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন এবং জনসংখ্যার বড় অংশ কেন্দ্রীভূত, কিন্তু একই সঙ্গে পরিবেশগত চাপও সবচেয়ে বেশি।
বসবাসযোগ্যতা কোনো একক বিষয় নয়, এটি কয়েকটি সূচকের সমন্বয়।বায়ুর মান, তাপমাত্রা, সবুজ বনাঞ্চল, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকি। এই সূচকগুলোকে পরস্পরবিচ্ছিন্ন মনে হলেও, বাস্তবে এগুলো একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ঢাকার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, প্রায় প্রতিটি সূচকেই এক ধরনের অবনতি দেখা যাচ্ছে, যা শহরের সামগ্রিক বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। প্রতিদিনের দূষণ, যানবাহনের চাপ, স্বাস্থ্যঝুঁকি এসবই একটি অন্যটির সাথে সম্পর্কিত।
সবচেয়ে সরাসরি এবং পরিমাপযোগ্য সংকট হলো বায়ুদূষণ। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা আই কিউ এয়ারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ঢাকার গড় পিএম ২.৫ ঘনত্ব ছিল প্রায় ৭৮ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার, যা ওয়ার্ল্ড হেল্থ অরগানাইজেশনের নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রা (৫ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার) এর প্রায় ১৫ গুণ বেশি।
এখানে একটি বিষয় বোঝা জরুরি— পিএম ২.৫ হলো এমন ক্ষুদ্র কণা, যা সহজেই ফুসফুসে প্রবেশ করে রক্তপ্রবাহে মিশে যেতে পারে। অর্থাৎ এটি শুধু ‘ময়লা বাতাস’ নয়, বরং একটি সরাসরি স্বাস্থ্যঝুঁকি। দীর্ঘমেয়াদে এই দূষণ শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হৃদরোগ, এমনকি অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে বায়ুদূষণ শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের একটি বড় সংকট—যা প্রতিদিন ঢাকার বাসিন্দাদের প্রভাবিত করছে, অনেক সময় অদৃশ্যভাবে।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি বৃহত্তর সমস্যার অংশ। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে, যেখানে গড় বায়ুদূষণ ডব্লিও এইচও নির্দেশিকার তুলনায় ১৩ গুণেরও বেশি। অর্থাৎ, ঢাকার বায়ুমান শুধু খারাপ নয়, বৈশ্বিক মানদণ্ডেও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
শুধু গড় হিসাব নয়, দৈনন্দিন বাস্তবতাও একই কথা বলে। ২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে ঢাকার বায়ুমান সূচক ৩০০-এর ওপরে পৌঁছেছে—যা ‘বিপজ্জনক’ পর্যায়ে পড়ে। আমরা প্রায়ই খবরে দেখি ‘ঢাকা আজ বায়ুদূষণে শীর্ষ বা দ্বিতীয়।’ আই কিউ এয়ারের অর্থ অনুযায়ী, এই সময়গুলোতে বাতাসে থাকা ক্ষুদ্র কণাগুলো সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ফুসফুস ও রক্তপ্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই দূষণের উৎসও বিচ্ছিন্ন নয়। ইটভাটা, নির্মাণকাজ, পুরনো যানবাহন, রাস্তার ধুলা—সব মিলিয়ে একটি জটিল দূষণচক্র তৈরি হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, যখন বাতাসে ধুলার পরিমাণ বেড়ে যায় এবং দূষণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ কমে যায়। এই দূষিত পরিবেশ কোন আকস্মিক সমস্যা নয়, বরং নগর পরিকল্পনা, শিল্পায়ন ও নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার দীর্ঘমেয়াদি ফল।
বসবাসযোগ্যতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো শহরের তাপমাত্রা ও পরিবেশগত স্বস্তি। ঢাকায় ‘আরবান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট’ এখন স্পষ্ট। কংক্রিট, অ্যাসফল্টের আধিক্য, গাছপালা কমে যাওয়ায় এবং খোলা জায়গার অভাবে শহর দিনের বেলায় তাপ শোষণ করে রাখে। গাছপালা কম থাকায় সেই তাপ কমানোর স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কাজ করে না। ফলে শহরের তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামীণ এলাকার তুলনায় বেশি হয়ে যায়, বিশেষ করে রাতেও তাপ কমতে চায় না। এই পরিস্থিতি মানুষের ঘুম, কর্মক্ষমতা এবং স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। যারা খোলা জায়গায় কাজ করেন যেমন রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক—তাদের জন্য এই তাপমাত্রা সরাসরি শারীরিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়।
বিশ্বের অনেক শহরের ক্ষেত্রে ‘বাসযোগ্যতা’ নির্ধারণ করা হয় কয়েকটি সূচকের মাধ্যমে—বায়ুমান, তাপমাত্রা, সবুজ এলাকা, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যঝুঁকি। ‘ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’-এর ‘গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স’-এ এসব সূচক বিবেচনা করা হয়, যেখানে ঢাকার অবস্থান বরাবরই নিচের দিকে থাকে। ফলে পরিবেশগত সূচকগুলো—বিশেষ করে বায়ুদূষণ ও সবুজের ঘাটতি ঢাকাকে একটি উচ্চ-ঝুঁকির শহর হিসেবে চিহ্নিত করে।
সবুজ এলাকা কমে যাওয়াও এই সমস্যার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ঢাকায় মাথাপিছু খোলা সবুজ জায়গা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক কম। ওয়ার্ল্ড হেল্থ অরগানাইজেশনের সুপারিশ অনুযায়ী শহরে মাথাপিছু ন্যূনতম প্রায় ৯ বর্গমিটার সবুজ জায়গা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকায় রমনা পার্কের মত কিছু পার্ক থাকলেও শহরের বিশাল জনসংখ্যার জন্য তা যথেষ্ট নয়। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শহরের মোট সবুজের আচ্ছাদনও ক্রমাগত কমছে।
সবুজ শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়। সবুজাভ পরিবেশ তাপমাত্রা কমায়, বায়ু পরিশোধনে সাহায্য করে। মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, সবুজ কমে যাওয়া মানে শহরের বাসযোগ্যতা একাধিক স্তরে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
এছাড়াও, নদীদূষণ ঢাকার পরিবেশ সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যেন এটি স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। একসময় ঢাকার প্রাণ ছিল এর আশপাশের নদীগুলো—বিশেষ করে বুড়িগঙ্গা নদী। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নদী-ব্যবস্থার বড় অংশ শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালি বর্জ্য এবং দখলের চাপে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদী এখন অনেক জায়গায় আর পানির প্রবহমান উৎস নয়, নদী যেন দূষিত বর্জ্য বহনের একটি চ্যানেল। বুড়িগঙ্গার কালো পানি ও দুর্গন্ধ যেন ঢাকার দূষিত পরিবেশের প্রতীক।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা অনেক জায়গায় প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। একই সঙ্গে উচ্চমাত্রার জৈব ও রাসায়নিক দূষণ—বিশেষ করে ট্যানারি ও শিল্পবর্জ্য—নদীর পানিকে ব্যবহার অনুপযোগী করে তুলেছে। ওয়ার্ল্ড হেল্থ অরগানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা ৫ মিলিগ্রাম/লিটার হলেও আন্তর্জাতিক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণেও দেখা যায়, ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর পানিতে এই মাত্রা কখনো ২ মিলিগ্রাম/লিটারে নেমে যায়, যা জলজ প্রাণের টিকে থাকার জন্য মারাত্মকভাবে অনুপযোগী।
এই দূষণের উৎসও একাধিক। হেমায়েতপুরের ট্যানারি শিল্পাঞ্চল, শহরের বিভিন্ন শিল্পকারখানা, অনিয়ন্ত্রিত ড্রেনেজ এবং সরাসরি নদীতে ফেলা পয়ঃবর্জ্য—সব মিলিয়ে একটি ধারাবাহিক দূষণচক্র তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বর্জ্য শোধনাগার থাকা সত্ত্বেও তা সঠিকভাবে কার্যকর না হওয়ায় দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। সব মিলিয়ে নদীদূষণ শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং নগর-ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থতার প্রতিফলন। নদী যখন তার প্রাকৃতিক ভূমিকা হারায়, তখন শহরের পানি নিষ্কাশন, জলবায়ু ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র্য—সবকিছুই ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আসে—নগর-ব্যবস্থাপনা। বর্জ্য-ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা—এসব ক্ষেত্রেও ঢাকায় দীর্ঘদিনের সমস্যা রয়েছে। শহরের উৎপাদিত বর্জ্যের একটি বড় অংশ সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয় না, যার ফলে তা খোলা জায়গা, খাল বা নদীতে গিয়ে পড়ে। এর প্রভাব শুধু পরিবেশগত নয়; এটি পানি দূষণ, রোগের বিস্তার এবং জলাবদ্ধতার মতো সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
এই সবকিছু একসাথে দেখলে একটি স্পষ্ট চিত্র তৈরি হয়—ঢাকা একটি ‘ফাংশনাল সিটি’ হলেও বাসযোগ্য নয়। অর্থাৎ এখানে অর্থনৈতিক কার্যক্রম চলছে, মানুষ কাজ করছে, শহর বাড়ছে—কিন্তু সেই বৃদ্ধির সঙ্গে বাসযোগ্যতার উন্নতি তাল মিলিয়ে চলছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন নিজেই নতুন চাপ তৈরি করছে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘ঢাকা কি বসবাসযোগ্য?’ প্রশ্নটি শুধু একটি তাত্ত্বিক আলোচনা নয়। এটি নীতিনির্ধারণ, নগর-পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। যদি বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, সবুজ সংরক্ষণ এবং নগর-ব্যবস্থাপনার মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই শহর শুধু বসবাসের জন্য কঠিনই হবে না, বরং স্বাস্থ্য ও জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ধরিত্রী দিবস একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে—আমরা যে পৃথিবীতে বাস করছি, সেটিকে কীভাবে টিকিয়ে রাখবো। ঢাকার ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নটি আরও নির্দিষ্ট: এই শহরকে শুধু চালু রাখা নয়, বসবাসের উপযোগী রাখার জন্য আমরা কী করছি?

বহুল আলোচিত সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের ১০ বছর পর এই মামলায় প্রথম কাউকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেপ্তার হাফিজুর রহমান সেনাবাহিনীর সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার।
৫ মিনিট আগে
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে মাদক সেবন করতে দেখে ফেলা কেন্দ্র করে ছুরিকাঘাতে বকুল বেগম নামে একজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত হেলিম মিয়ার ভাতিজাসহ তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন। বুধবার দুপুরে উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের সিদ্ধেশ্বরপুর গ্রামে এ হত্যাকাণ্ড ঘটনা ঘটে।
১৪ মিনিট আগে
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সব রাজনৈতিক দল, সবাই মিলে একটি স্বৈরাচারকে এই দেশ থেকে বিতাড়িত করেছি। কিন্তু দুঃখজনক হলো, সেই স্বৈরাচারের সময় এবং আরও দুঃখজনক হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও শিশুদের হামের টিকা বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়নি।
৩৮ মিনিট আগে
এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দারকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
২ ঘণ্টা আগে