বিশ্ব ধরিত্রী দিবস

রঙিন ‘ভূতের’ দাপটে বিপন্ন জলাভূমি

পৃথিবীর ১০ শতাংশের কম এলাকা জুড়ে থাকলেও ৪০ শতাংশ প্রাণের আশ্রয়স্থল এই জলাভূমি আজ বিপন্ন। ৩০০ বছরে হারিয়েছে প্রায় ৮৭ শতাংশ জলাশয়। দূষণের পাশাপাশি ‘অ্যালজি ব্লুম’ বা ক্ষতিকর শৈবাল এখন নতুন আতঙ্ক। চীন থেকে আমেরিকা—রঙিন এই ‘ভূতের’ বিষে জলজ জীবন ও বাস্তুসংস্থান আজ ধ্বংসের মুখে।

পানিতে অতিরিক্ত পরিমাণে শৈবাল জন্মালে তাকে ‘ক্ষতিকর অ্যালজি ব্লুম’ বলা হয়। সংগৃহীত ছবি

‘জলাভূমি’ শব্দটির সঙ্গে আমাদের অনেকেরই শৈশবের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। জলাভূমি মানেই পুকুর, খাল-বিল বা ডোবা-নালা, যার স্বচ্ছ পানিতে দাপাদাপি করতে ইচ্ছা করে। যেখানে কান পাতলেই শোনা যায় ব্যাঙ আর পোকামাকড়ের গুঞ্জন। কখনও কখনও উঁকি মারে মাছ। পাড়ে থাকে নলখাগড়া আর ছোট ছোট গাছ।

জলাভূমি হলো এমন এলাকা যা বছরের বেশিরভাগ সময় পানিতে ডুবে থাকে। পৃথিবীর মোট আয়তনের ১০ শতাংশের কম জায়গা জুড়ে জলাভূমি রয়েছে। তবে পৃথিবীর প্রায় ৪০ শতাংশ গাছপালা ও প্রাণী এখানেই জন্মায় বা বাস করে। জাতিসংঘের তথ্যমতে পুকুর, নদী, সমুদ্র উপকূল, প্রবাল প্রাচীর, সাধারণ বিল সবকিছুই জলাভূমির অন্তর্ভুক্ত।

একটু ভাবুন তো, ছোটবেলায় যত ডোবা-নালা, পুকুর বা জলাভূমি দেখেছেন, এখনও কি সব আগের মতোই আছে?

গত ৩০০ বছরে পৃথিবীর প্রায় ৮৭ শতাংশ জলাভূমি ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ধ্বংসের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলাভূমি ভরাটের মত কারণকে দায়ী করেন পরিবেশবিদরা।

ক্ষতিকর শৈবাল বা অ্যালজি ব্লুম। আর্থডে ডট অর্গ ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া ছবি
ক্ষতিকর শৈবাল বা অ্যালজি ব্লুম। আর্থডে ডট অর্গ ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া ছবি

পৃথিবীর প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ জলাশয়ের কাছাকাছি বাস করে। কিন্তু মানুষ আশেপাশে থাকা জলাভূমিকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। নিজেদের স্বার্থে এগুলোকে ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে দালানকোঠা কিংবা সেখানে ময়লা ফেলে পানি দূষণ করা হয়েছে।

তবে এই কারণগুলোর পাশাপাশি আমাদের জলাভূমি এখন নতুন হুমকির মুখে পড়েছে। এই হুমকির নাম ক্ষতিকর অ্যালজি ব্লুম বা শৈবাল।

ক্ষতিকর শৈবাল বা অ্যালজি ব্লুম কী

পানিতে অতিরিক্ত পরিমাণে শৈবাল জন্মালে তাকে ‘ক্ষতিকর অ্যালজি ব্লুম’ বলা হয়। ইংরেজিতে একে সংক্ষেপে এইচএবি বলা হয়। এই শৈবাল বন্যপ্রাণী থেকে শুরু করে মানুষের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে। এগুলো যখন পচে যায় তখন কিছু জীবাণু এদের খেয়ে ফেলে। এই প্রক্রিয়ায় জীবাণুগুলো পানির অক্সিজেন শেষ করে ফেলে।

অক্সিজেনের অভাবে সামুদ্রিক প্রাণীদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রাণী মারা যায়। একে বলা হয় ‘অক্সিজেন ডেড জোন’। ২০২০ সালে রাশিয়ার কামচাটকা অঞ্চলের সৈকতে প্রচুর মৃত প্রাণী ভেসে এসেছিল। এই মৃত্যুর পেছনে প্রথমে তেলের দূষণকে দায়ী করা হয়। পরে বিজ্ঞানীরা জানান সমুদ্রের বিশাল এলাকাজুড়ে জন্মানো ক্ষতিকর শৈবালই এর মূল কারণ। এই শৈবাল ছিল কয়েক কিলোমিটার চওড়া।

আরও কিছু উদাহরণ দিলে শৈবালের প্রভাব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।

চীনের লাল ‘ভূত’

চীনের দক্ষিণ উপকূলে ‘ফেওসিস্টস গ্লোবোসা’ নামের এক ধরনের শৈবাল দেখা যায়। এই শৈবালের কারণে পানি লাল হয়ে যায়। স্থানীয়রা একে ‘লাল ভূত’ বলে ডাকেন। ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে এই শৈবালের প্রকোপ এতটাই বেড়ে যায় যে স্থানীয় প্রশাসন মানুষকে পর্যন্ত সেই এলাকায় যেতে নিষেধ করে। সামুদ্রিক খাবার খেতেও নিষেধ করা হয়। এই ঘন শৈবাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাইপে আটকে যায়। কুলিং পাইপ বন্ধ হয়ে জেনারেটর অচল হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই শৈবালের কারণে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে ‘হাইপোক্সিয়া’ তৈরি হয়। এতে করে অনেক প্রাণী মারা যায়।

চীনের লাল ‘ভূত’। সংগৃহীত ছবি
চীনের লাল ‘ভূত’। সংগৃহীত ছবি

১৯৩৩ সালে সর্বপ্রথম চীনে এমন ক্ষতিকর শৈবালের কথা জানা যায়। আশির দশক থেকে এর পরিমাণ অনেক বেড়েছে। ২০১৪ ও ২০২৩ সালের মধ্যে চীনে গড়ে প্রতি বছর ৫০ বার এমন ‘লাল ভূত’ দেখা গেছে। অ্যালুমিনিয়াম মেশানো বিশেষ কাদামাটি ব্যবহার করে এই সমস্যা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

গ্রেট লেকসের নীল ও সবুজ শৈবাল

চীনে লাল ভূত দেখা গেলেও উত্তর আমেরিকার গ্রেট লেকস অঞ্চলে দেখা যায় ‘সায়ানোব্যাকটেরিয়া’। এটা নীলচে সবুজ রঙের এক ধরনের শৈবাল। প্রতি বছর এই হ্রদগুলোতে এমন শৈবাল দেখা যায়। বিশেষ করে এরি লেকে এর প্রকোপ খুব বেশি। এই হ্রদের গভীরতা ও গঠনগত কারণে এখানে সহজেই শৈবাল জন্মাতে পারে। পানির তাপমাত্রা, ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে এখানে স্তরায়ণ তৈরি হয়। ফলে কয়েক মাস ধরে এই হ্রদে অক্সিজেনের অভাব বা ডেড জোন থাকে।

এই শৈবালের কারণে ওই এলাকার প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে। সেখানে বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দেয়। এলাকার পর্যটন শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শৈবাল জন্মানোর প্রধান কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা আশপাশের খামারের সার ও শিল্পজাত দূষিত পদার্থকে দায়ী করেন। এই দূষিত পদার্থগুলো শৈবালের খাবার হিসেবে কাজ করে।

দক্ষিণ আফ্রিকার হার্টবিসপোর্ট ড্যাম

২০২২ ও ২০২৩ সালে নাসা দক্ষিণ আফ্রিকার হার্টবিসপোর্ট ড্যামে ক্ষতিকর শৈবালের ছবি তোলে। ড্যামের পানি চাষাবাদের কাজে যেমন ব্যবহৃত হয়, মানুষ সাঁতার কাটা বা ভ্রমণের উদ্দেশ্যেও এই পানি ব্যবহার করে। বিশেষজ্ঞরা জানান, এই শৈবালযুক্ত পানিতে সাঁতার কাটলে মানুষের শরীরে ফুসকুড়ি হতে পারে। এই পানি এতটাই ক্ষতিকর যে পোষা প্রাণীও এই পানি খেলে অসুস্থ হতে পারে।

ক্ষতিকর শৈবালের কারণে অক্সিজেন কমে গিয়ে ২০২৩ সালে সেখানে প্রচুর মাছ মারা যায়। একই সমস্যা দেখা দিয়েছিল আশির দশকেও। সে সময় দক্ষিণ আফ্রিকার হার্টবিসপোর্ট ড্যামের পানিতে ফসফরাসের মাত্রা বেড়ে ক্ষতিকর শৈবাল তৈরি হয়। তখন পরিবেশবান্ধব ‘বায়োরেমিডিয়েশন’ পদ্ধতিতে এটা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। যদিও পরবর্তী সময়ে অর্থের অভাবে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। দুই হাজার সালের দিকে আবার শৈবালের প্রকোপ বাড়ে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এমন শৈবাল নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ চালু আছে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে সামুদ্রিক শৈবালের সাহায্যে জৈবিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি পরীক্ষা করা হচ্ছে। নরওয়ে, চিলি, অস্ট্রেলিয়াতে গভীর পানির আপওয়েলিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।

আর্থ ডে ডট অর্গ ওয়েবসাইট অবলম্বনে

সম্পর্কিত