গাবতলীতে গরু-ছাগলে লোকসান, জায়গা ভাড়ার নামে চাঁদাবাজি

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ২৭ মে ২০২৬, ২২: ২৮
গাবতলী হাটের গেট। স্ট্রিম ছবি

ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীর গাবতলী পশুর হাটে এবার ক্রেতা সংকট ও দরপতনে দিশাহারা বিক্রেতারা। বড় গরু থেকে শুরু করে ছাগল—সবখানেই লোকশানের কথা বলছেন তারা। এরমধ্যে যোগ হয়েছে ইজারাদারদের নিয়মবহির্ভূত জায়গা ও খুঁটিভাড়া আদায়।

সরেজমিনে গাবতলী হাট ঘুরে বিক্রেতা, ইজারাদার ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এবারের হাটের এমন হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে।

কুষ্টিয়া থেকে আসা গরু ব্যবসায়ী আবুল হাসান জানান, চারটি গরুর মধ্যে দুটিতে তার অন্তত ৫০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। তিনি বলেন, হাটে গরু বেশি, কিন্তু ক্রেতা কম। গরু তো আর ফেরত নিব না, কম-বেশি দামে দিয়ে যাব। সবাই ছোট গরু নিচ্ছে, বড় গরু চাহিদা কম।

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ থেকে আসা গরু ব্যবসায়ী আরিফ ও শফি ১০ দিন ধরে হাটে আছেন। তারা ২৫টি গরুর মধ্যে মাত্র ৮টি বিক্রি করতে পেরেছেন। তারা বলেন, টাকাওয়ালা মানুষ তো চলে গেছে। এখন যারা হাটে আসছে তাদের পকেট খালি। এই ক্ষতি গোছাইতে আরও দুই-এক কোরবানি লাগবে।

গত তিন দিনের বৃষ্টি ও কাদার কারণে ক্রেতার উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে কমেছে বলে মনে করেন তারা ।

নদীপথে ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশের কারণে শেষ মুহূর্তে দাম পড়ে যাওয়ার অভিযোগ করে সুখচান ব্যাপারী বলেন, সুলতানগঞ্জ, কুষ্টিয়া আর জলঙ্গি দিয়ে মোদি সরকারের লোক নদীর মধ্যে গরু নামিয়ে দিছে। সেই গরু ভেসে আসছে। যে গরুর দাম কাল ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার, আজকে এসে বলছে ৮৫ হাজার।

গরুর পাশাপাশি ছাগলের হাটেও ক্রেতা সংকট দেখা গেছে। পাবনার কাজীরহাট থেকে আসা ব্যাপারী আব্দুল মজিদ জানান, তার প্রতিটি ছাগলে এক থেকে দেড় হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘যেই ছাগল ১৮ হাজার টাকার বেশি দিয়ে কিনছি, সেটা বিক্রি করছি ১৬ বা ১৭ হাজার টাকায়। বাজারে ক্রেতা একবারেই নেই। আমার আরও ৫০টা ছাগল আসার কথা ছিল, লোকসান হওয়ায় ছোট ভাইকে ফোন করে আসতে নিষেধ করে দিয়েছি।’

মানিকগঞ্জ থেকে আসা আরেক ছাগল ব্যাপারী হাসান জানান, ৩২টি ছাগলের মধ্যে ২১টি বিক্রি করলেও কাঙ্ক্ষিত লাভ হয়নি। প্রতিটি ছাগলে হাজার টাকা লাভের আশা থাকলেও মিলছে মাত্র ২০০ থেকে ৫০০ টাকা।

ক্রেতার অপেক্ষায় এক বিক্রেতা। স্ট্রিম ছবি

খুঁটি ও জায়গার নামে চাঁদাবাজি

সিটি করপোরেশনের নিয়ম অনুযায়ী হাটে ক্রেতার কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে হাসিল নেওয়ার বিধান থাকলেও, গাবতলীতে বিক্রেতাদের কাছ থেকেও জায়গার ভাড়া বা খুঁটির টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

লক্ষ্মীপুরের আরিফ ও শফি জানান, তাদের ২৫ গরুর জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়েছে। তারা অভিযোগ করেন, ‘গরু বেচতে পারি আর না পারি, জায়গার টাকা দিতেই হবে। এক-একটা গরুর জন্য ৭-৮ হাজার টাকা করে দিতে হচ্ছে। ইজারাদাররা হাসিলের পাশাপাশি জায়গার ভাড়াও নিচ্ছে। এটা বেআইনিভাবে হলেও পুলিশ বা প্রশাসন নীরব।’

সরকার নির্ধারিত হাটের বাইরে প্যান্ডেল বা শেড তৈরি করে এই অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ এনে সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে আসা গরু এক বিক্রেতা বলেন, কোরবানির সময় অস্থায়ী একটা গরু বাঁধার খোপের জন্য প্রায় ১০ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। স্থায়ী ইটবালু ব্যবসায়ীরা বছরভিত্তিক ইজারা নিয়ে কোরবানির সময় সাব-লেটে এসব জায়গা চড়া দামে ভাড়া দিচ্ছেন। সিটি করপোরেশন মার্কেট ভাঙার পর হাটের আয়তন কমে যাওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়েই বাইরের এসব বেসরকারি প্যান্ডেলে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে গরু রাখছেন। আর এই সুযোগে তারা অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।

খুঁটির ভাড়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মানিকগঞ্জের হাবিবুর রহমান বলেন, গরু বিক্রি হলে তো যে কিনবে সে হাসিল দিচ্ছেই, তাহলে আমাদের থেকে কেন টাকা নেবে? সরকারি নিয়মে তো বলাই থাকে যে ইজারাদাররা খুঁটি, বাঁশ সবকিছু দেবে। এই টাকা নেওয়ার কোনো অধিকার তাদের নাই।

নির্ধারিত সীমানার বাইরে হাট বসা এবং বিক্রেতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) শক্ত অবস্থানের কথা জানিয়ে ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা বলেন, পশুর হাট ইজারার ৩ নম্বর শর্তে স্পষ্ট উল্লেখ আছে—কোনোভাবেই নির্ধারিত এলাকার বাইরে হাট বা গরু বিক্রি করা যাবে না। এর ব্যত্যয় হলে ম্যাজিস্ট্রেটকে জানালে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।

অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ইজারার ২ নম্বর শর্ত অনুযায়ী শুধু বিক্রি হওয়া পশুর মূল্যের ৫ শতাংশ হারে হাসিল আদায় করা যাবে এবং এটি শুধু ক্রেতার তরফ থেকেই দিতে হবে। এর বাইরে বাঁশ, খুঁটি বা ফ্যানের কথা বলে কোনো রকম অর্থ আদায়ের সুযোগ নেই। কেউ এমনটি করার চেষ্টা করলে অভিযোগ পাওয়ামাত্রই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ইজারাদারদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সম্পর্কিত