ঈদ ছুটিতে উধাও নর্দমার ঢাকনা, ঘুমে সিটি কর্তৃপক্ষ

সর্বোচ্চ ২৫ হাজারের ঢাকনা ভাঙারি দোকানে বিক্রি হচ্ছে ২০০-৩০০ টাকায়। স্ট্রিম গ্রাফিক

শুধু প্রধান সড়ক নয়, রাজধানীর অলিগলিতেও প্রাণ হাতে পথ চলতে হচ্ছে। কারণ, ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে নগরবাসী খুঁজে পাচ্ছেন না নর্দমার (ম্যানহোল) ঢাকনা। বিপদে পড়ছেন চালকেরাও। রাতে গাড়ি নিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।

নগরবাসীর অভিযোগ, সারা বছরই সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীলরা ঘুমিয়ে থাকে। টুকটাক ঢাকনা খোয়া যায়। তবে ঈদের ছুটিতে প্রশাসনও ছিল ঢিলেঢালা। ফলে ব্যাপক হারে নর্দমার ঢাকনা চুরি গেছে। অনেক স্থানে ভাঙা থাকলেও দীর্ঘদিন সংস্কার কাজ হয়নি। ফলে এখন এসব পথে এখন রাতে চলতে ডর করে।

এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আব্দুস সালাম স্ট্রিমকে বলেছেন, পুরো ঢাকা তো পাহারা দিয়ে রাখা সম্ভব না। রাতে এসব চুরি হয়ে যায়। যারা মাদক সেবন করে, রাস্তায় থাকে, তারা খুলে নিয়ে বিক্রি করে। জনসচেতনতা ছাড়া এটি রোধ করা সম্ভব না।

তিনি বলেন, আগামীতে লোহার পরিবর্তে প্লাস্টিক বা অন্য কোনো কিছুর ঢাকনা ব্যবহারের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে। সেটি করা গেলে কেউ খুলে নিয়ে বিক্রি করতে পারবে না।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর অনেক এলাকার প্রধান ও অলিগলির সড়কে নর্দমার ঢাকনা নেই। এর মধ্যে শুধু রাজধানীর কারওয়ান বাজার মোড় এলাকা থেকেই চুরি হয়েছে অন্তত পাঁচটি ঢাকনা। কারওয়ান বাজার মোড়ে মেট্রো স্টেশনের সিঁড়ি থেকে নেমেই দেখা যায়– একটি গর্তে ফেলে রাখা হয়েছে সিমেন্টের রোড ডিভাইডার। স্থানীয় দোকানিরা জানিয়েছেন, নর্দমার ঢাকনাটি অনেকদিন আগে চুরি হলেও, মেরামত করেনি। প্রধান সড়কের পাশে থাকা অরক্ষিত নর্দমায় কেউ যেন পড়ে না যান, সেজন্য নিজেদের উদ্যোগে ডিভাইডার ফেলে রেখেছেন তারা।

রাজধানীর কলাবাগান থানার পাশেই গলির সড়কে মাঝখানে ঢাকনাবিহীন নর্দমা। ঝুঁকি নিয়ে চলছে মানুষ ও যানবাহন। স্ট্রিম ছবি
রাজধানীর কলাবাগান থানার পাশেই গলির সড়কে মাঝখানে ঢাকনাবিহীন নর্দমা। ঝুঁকি নিয়ে চলছে মানুষ ও যানবাহন। স্ট্রিম ছবি

এর ঠিক পাশেই ফুটপাতের আরও তিনটি নর্দমার ঢাকনা নেই। ওই এলাকা ঘুরে দেখা গেছে– এসব নর্দমায় অবাধে ময়লা ফেলা থেকে শুরু করে মলমূত্র ত্যাগ করছেন ছিন্নমূলের মানুষ। ফলে এলাকাজুড়ে ছড়াচ্ছে দুর্ঘটনা। নাক চেপে হাঁটতে হচ্ছে সাধারণ মানুষদের।

কলাবাগান থানা থেকে বাংলাভিশনের দিকে বের হওয়ার গলিতেও ঘটেছে ঢাকনা চুরির ঘটনা। সরু গলির মাঝ থেকে ঢাকনা খোয়া গেছে। এতে বেড়েছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। থেকে থেমে যেতে হচ্ছে রিকশা, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালকদের।

এই এলাকায় রিকশা চালান মোহাম্মদ খোকন। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘ঈদের আগেও ঢাকনাটা ছিল। ঈদের পরে এসে দেখি, নাই। এই রাস্তাটা খুব ছোট। খেয়াল না করলে যে কেউ পড়ে যেতে পারে। এখন বৃষ্টির সময়। পানি জমে থাকলে রাস্তা দেখা যায় না। এই সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়।’

সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, কোনো সড়কে নর্দমার ঢাকনা চুরি গেলে বা ভেঙে গেলে স্থানীয়রা সেখানে লাঠি বা কোনো কিছু পুঁতে সংকেত দেন। এতে ওই গর্ত এড়িয়ে চলা যায়। কিন্তু এখানে সেটাও নেই। ফলে যে কোনো সময় গর্তে পড়তে পারে গাড়ি।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মেট্রো স্টেশনের সিঁডি সংলগ্ন ফুটপাতে দীর্ঘদিন ঢাকনাবিহীন নর্দমা। স্ট্রিম ছবি
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মেট্রো স্টেশনের সিঁডি সংলগ্ন ফুটপাতে দীর্ঘদিন ঢাকনাবিহীন নর্দমা। স্ট্রিম ছবি

একইভাবে কাঁঠালবাগান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মিরপুর, ধানমন্ডি, খিলগাঁওসহ, বাসাবো, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নর্দমার ঢাকনা চুরির ঘটনা ঘটেছে। টোকাই, ভাসমান মানুষ এসব ঢাকনা চুরি করে বলে দাবি স্থানীয়দের। তাদের ভাষ্য, নেশার টাকা জোগাড় করতে ঢাকনা ভেঙে কেজি দরে বিক্রি করেন তারা।

কাঁঠাল বাগানের বাসিন্দা সাদিক হোসেন স্ট্রিমকে বলেন, ভালো মানুষের তো ঢাকনা চুরি করার মতো সময় বা রুচি কোনোটাই থাকার কথা না। এসব মূলত চুরি করে টোকাইরা। সব টোকাইও আবার করে না। কিছু আছে নেশাখোর। এরা ঢাকনা বিক্রি করে নেশার টাকা জোগায়।

নেই সংস্কারের উদ্যোগ

নর্দমার ঢাকনা শুধু চুরি হয়নি। অনেক জায়গায় ভেঙে গেছে। কিন্তু হয়নি সংস্কার। চূড়ান্ত ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন। সম্প্রতি কাঁঠাল বাগানের লাকি হোটেলের গলিতে লাগানো হয়েছে একটি প্লাস্টিকের ঢাকনা। সেটি ভেঙে গেছে কয়েকদিন আগে। এছাড়া, পান্থপথ মোড়, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরেও দেখা গেছে ভাঙা ঢাকনা।

সরেজমিনে দেখা যায়, এসব জায়গায় সতর্কতার জন্য রাখা হয়েছে রোড ডিভাইডার। কিছু জায়গায় বাঁশ পুঁতে মাথায় লাল কাপড় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। আগে থেকে বুঝতে পেরে থেমে থেমে পার হচ্ছে গাড়ি।

মোটরসাইকেলচালক আরিফুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘বাইকের গতি যখন বেশি থাকে, তখন দূর থেকে এসব গর্ত চোখে পড়ে না। তখন দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকে। স্থানীয়রা বাঁশ বা অন্য কিছু দিয়ে সতর্ক না করলে আমাদের চলাচলে খুবই বিপদ হতে পারে।’

রাজধানীর অনেক সড়কেই নর্দমান গর্তে বাঁশে লাল নিশানা দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। স্ট্রিম ছবি
রাজধানীর অনেক সড়কেই নর্দমান গর্তে বাঁশে লাল নিশানা দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। স্ট্রিম ছবি

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ট্রাফিক পুলিশ বক্সের পাশেও দেখা গেছে একই অবস্থা। ভাঙা নর্দমায় পুঁতে রাখা হয়েছে বাঁশ, তার মাথায় বাঁধা লাল কাপড়। সিএনজিচালিত অটোচালক আবুল হাশেম বলেন, ‘একেবারে সিগন্যালের মুখের ঢাকনাটা ভাঙা। সিগন্যালে তো এমনিতেই একটু জ্যাম পড়ে। এই গর্তের কারণে দূরে দূরে থাকতে হয়। এই কারণে এখানে জ্যামও বাড়ছে।’

২৫ হাজার টাকার ঢাকনা নিয়ে উদাসীন কর্তৃপক্ষ

সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, প্রকার ভেদে নর্দমার ঢাকনা নানা দামের হয়। সর্বনিম্ন ৮ হাজার ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকার ঢাকনা রয়েছে। তবে ছিন্নমূলের লোকজন এসব চুরি করে কেজি দরে বিক্রি করে। কখনো ২০০-৩০০ টাকায় দিয়ে দেয়। সেগুলো ভাঙারিরা ভেঙেচুরে নতুন করে অন্য কাজে ব্যবহার করে। এসব ঢাকনা চুরির ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে দিনকে দিন বেপরোয়া চোররা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান স্ট্রিমকে বলেন, এসব ঢাকনা চুরি হওয়ার মূল কারণ ভাঙারি মার্কেট। এদের একটি বড় চক্র আছে, যারা এসব জিনিস কেনে। শুধু নর্দমার ঢাকনা নয়, সিটি করপোরেশনের অনেক জিনিস চুরি হয়। এর মধ্যে আছে গাড়ির যন্ত্রাংশ, ক্যাবল, স্কেলেটরের ক্যাবলসহ নানা সামগ্রী।

রাজধানীর মহাসড়কের মাঝখানে ঢাকনাবিহীন নর্দমার সামনে পুলিশ প্লাস্টিকের সড়ক বিভাজক হরহামেশা চোখে পড়ে। স্ট্রিম ছবি
রাজধানীর মহাসড়কের মাঝখানে ঢাকনাবিহীন নর্দমার সামনে পুলিশ প্লাস্টিকের সড়ক বিভাজক হরহামেশা চোখে পড়ে। স্ট্রিম ছবি

তিনি বলেন, ঢাকনাতে কোনো আইডেন্টিফিকেশন নম্বর থাকে না। ফলে মামলা করেও উদ্ধার করা সম্ভব নয়। এই সুযোগ নেয় ছিন্নমূলের মানুষ। তবে আমরা পুলিশের সঙ্গে বসেছিলাম। যেসব ভাঙারি ব্যবসায়ীরা এসব কেনেন, তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, মাদকসেবীদের হাত থেকে নর্দমার ঢাকনা রক্ষায় আমরা স্থানীয় জনগণকে সচেতন করছি। তারা সচেতন না হলে সিটি করপোরেশনের পক্ষে এটি রক্ষা করা সম্ভব নয়।

সম্পর্কিত