বেইজিং সমীকরণ: আরাগচি-ট্রাম্পের পর পুতিনের সফর ও নতুন বিশ্বব্যবস্থার বার্তা

প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬, ১২: ৩১
স্ট্রিম গ্রাফিক

চলতি মাসের প্রথমার্ধে বেইজিং যেভাবে পর পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সবশেষে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আতিথেয়তা দিল, তা বিশ্বশক্তির চিরচেনা ভারসাম্যকে পুরোপুরি নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে, ২০০১ সালের ‘সুপ্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি’র ২৫ বছর পূর্তিতে ১৯-২০ মে তারিখে পুতিনের চীন সফর কেবল মস্কো-বেইজিং ‘সীমাহীন অংশীদারত্ব’ অক্ষেরই নবায়ন নয়, বরং ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বেইজিং মিশনের কৌশলগত সীমাবদ্ধতার এক স্পষ্ট জবাব।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার জটিল পটভূমিতে, প্রতিদ্বন্দ্বী সব পক্ষই বেইজিংকে কেন্দ্র করে নিজেদের সমীকরণ মেলাচ্ছে। এই চেইন ডিপ্লোম্যাসির মাধ্যমে চীন বিশ্বমঞ্চে নিজেকে এক অপরিহার্য ‘নিরপেক্ষ পরাশক্তি’ ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ট্রাম্পের বিদায়ের পরপরই বেইজিংয়ের মাটিতে পুতিনের এই আত্মবিশ্বাসী পদচারণা প্রমাণ করে, রাশিয়াকে পাশ কাটিয়ে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিন ফুরিয়েছে। পরাশক্তিদের এই ধারাবাহিক বেইজিং আগমন ওয়াশিংটন-নিয়ন্ত্রিত একমেরু কাঠামোর আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটিয়ে এক নতুন বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার অকাট্য বার্তা দিচ্ছে, যার অলিখিত সদরদপ্তর এখন বেইজিং।

২৫ বছরের মৈত্রী ও কৌশলগত অংশীদারত্বের গভীরতা

২০০১ সালের ১৬ জুলাই মস্কোয় তৎকালীন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিনের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল ঐতিহাসিক ‘সুপ্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি’ । বিগত ২৫ বছর ধরে এই চুক্তিটিই রাশিয়া-চীন ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করেছে। ২০০১ সালে যেখানে এই দুই পরাশক্তির দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল মাত্র ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে গত আড়াই দশকে তা অবিশ্বাস্য গতিতে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে রেকর্ড ২৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ দুই রাষ্ট্রপ্রধানের উপস্থিতিতে প্রায় দুই ডজন (২০টিরও বেশি) সুনির্দিষ্ট দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, প্রোটোকল এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিগুলোর প্রধান ক্ষেত্র ও সুনির্দিষ্ট দিকগুলো হচ্ছে—

মৈত্রী চুক্তির আনুষ্ঠানিক মেয়াদ বৃদ্ধি

সফরের সবচেয়ে বড় আইনি ও রাজনৈতিক দিক হলো ২০০১ সালের মূল দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে আরও বৃদ্ধি করা। এর মাধ্যমে দুই দেশই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই বার্তা দিয়েছে যে, বিশ্বরাজনীতিতে ক্ষমতার সমীকরণ বা সরকার পরিবর্তন হলেও মস্কো-বেইজিং কৌশলগত অক্ষ দীর্ঘমেয়াদে অটুট থাকবে।

বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার যৌথ কৌশলগত ঘোষণা

পুতিন এবং শি চিন পিং যৌথভাবে একটি যুগান্তকারী রাজনৈতিক ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন, যার আনুষ্ঠানিক শিরোনাম, ‘‘Joint Statement on Further Strengthening Comprehensive Strategic Coordination and Deepening Good-Neighborly and Friendly Cooperation’’। এই ঘোষণাপত্রে দুই নেতাই স্পষ্ট করেন যে, তাঁরা আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে একটি ‘বহুমেরুর বিশ্বব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর, যেখানে কোনো একক দেশ বিশ্বকে নিজেদের নিয়ম মানতে বাধ্য করতে পারবে না।

অর্থনৈতিক ডি-ডলারাইজেশন ও ব্যাংকিং লিংকেজ

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা (যেমন: সুইফট ট্রানজেকশন সিস্টেম থেকে রাশিয়াকে বাদ দেওয়া) এড়াতে এই সফরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে নিজস্ব মুদ্রা—রুশ রুবল এবং চীনা ইউয়ানের ব্যবহার শতভাগে উন্নীত করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাংকিং প্রোটোকল স্বাক্ষরিত হয়। বর্তমানে দুই দেশের বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি নিজস্ব মুদ্রায় সম্পন্ন হচ্ছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের একচেটিয়া আধিপত্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

জ্বালানি ও আন্তঃসীমান্ত অবকাঠামো উন্নয়ন

সাইবেরিয়া অঞ্চল থেকে চীনে গ্যাস সরবরাহের মেগা প্রকল্প ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ পাইপলাইনের অগ্রগতি এবং রাশিয়ার দূরপ্রাচ্য থেকে চীনে কম মূল্যে বা ছাড়ে অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের জন্য নতুন লজিস্টিকস চুক্তি অনুমোদিত হয়।

প্রযুক্তি, মহাকাশ ও ‘শিক্ষা বর্ষ’ ঘোষণা

২০২৬ এবং ২০২৭ সালকে যৌথভাবে ‘চীন-রাশিয়া শিক্ষাবর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর অধীনে দুই দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যৌথ বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরি স্থাপন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর এবং বেসামরিক মহাকাশ গবেষণায় ডেটা শেয়ারিংয়ের চুক্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

লন্ডনের কিংস কলেজের প্রতিরক্ষা অধ্যয়ন বিভাগের পোস্ট ডক্টরাল গবেষক ড. মেরিনা মিরন আল-জাজিরাকে এই সম্পর্কের গভীরতা ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘রাশিয়া ও চীনের এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কেবল মুখের কথায় সীমাবদ্ধ নেই; এই সফরের ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সীমান্ত বাণিজ্য এবং বিশেষ করে সামরিক ও বেসামরিক—উভয় ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তির আদান-প্রদান আরও কয়েক ধাপ গভীর হতে যাচ্ছে।’

ওয়াশিংটন, মস্কো কিংবা তেহরান—আজকের দিনে বৈশ্বিক সংকটের যেকোনো পক্ষই হোক না কেন, তাদের জন্য বেইজিং এখন এক অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী। ইরান যেমন ট্রাম্পের সঙ্গে যেকোনো সম্ভাব্য আলোচনার আগে নিজের অবস্থান শক্ত করতে বেইজিংয়ের রাজনৈতিক লিভারেজ ব্যবহার করতে চেয়েছে, তেমনি ট্রাম্প প্রশাসনও মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন সংকটে চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগাতে বেইজিংয়ের দ্বারস্থ হয়েছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, রাশিয়া যেখানে ইউক্রেন যুদ্ধের পটভূমিতে সামরিক ড্রোন ও উন্নত ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রাংশের জন্য চীনা বেসামরিক-সামরিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে চীনও তার বিশাল অভ্যন্তরীণ শিল্পোৎপাদনের চাকা সচল রাখতে রাশিয়ার কাছ থেকে ডিসকাউন্টে জ্বালানি সম্পদ নিশ্চিত করছে। এই অংশীদারত্ব দুই পক্ষের জন্যই অত্যন্ত বাস্তবসম্মত এবং সুদূরপ্রসারী।

ট্রাম্পের বেইজিং ব্যর্থতা এবং পুতিনের আত্মবিশ্বাস

ট্রাম্প বেইজিং ছাড়ার পরপরই হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে চীনের সাথে একটি ‘বৃহত্তর ও ঐতিহাসিক বাণিজ্যচুক্তি’র সম্ভাবনা নিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বেইজিং মিশন ওয়াশিংটনের জন্য কোনো উল্লেখযোগ্য ভূ-রাজনৈতিক বা কৌশলগত সাফল্য বয়ে আনতে পারেনি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও বিতর্কিত ইস্যুগুলো—যেমন দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক আধিপত্য এবং তাইওয়ান প্রণালির নিরাপত্তা সংকটে বেইজিং মার্কিন নীতি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

শুধু তাই নয়, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং তার প্রক্সি নেটওয়ার্কের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক হামলার পটভূমিতে ওয়াশিংটন বেইজিংকে পাশে চেয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসন আশা করেছিল, তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে চীন তাদের সাথে সুর মেলাবে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং অত্যন্ত কঠোরভাবে মার্কিন এই চাপ ও একপেশে নিষেধাজ্ঞার নীতি খণ্ডন করে দেন, যা ট্রাম্পের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে। বেইজিংয়ের এই অনড় অবস্থান স্পষ্ট করে দেয় যে, এশিয়ায় মার্কিন কৌশলকে কাউন্টার করতে চীন নিজের অবস্থানে অটল। ট্রাম্পের এই কূটনৈতিক ব্যর্থতা মস্কোর জন্য বিরাট রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করে দেয়।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক থিংক-ট্যাংক চ্যাথাম হাউসের রাশিয়া ও ইউরেশিয়া কর্মসূচির সিনিয়র ফেলো টিমোথি অ্যাশ এই কূটনৈতিক জটিলতার গভীর বিশ্লেষণ করতে গিয়ে উল্লেখ করেন, ট্রাম্প-সির হাই-প্রোফাইল বৈঠকটি বৈশ্বিক দ্বন্দ্ব নিরসনে যা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাতে মস্কো নেপথ্যে অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছে। ট্রাম্প চীনের কাছ থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন ইস্যুতে যে ধরণের কৌশলগত ছাড় বা ইরানের ওপর একতরফা চাপ সৃষ্টির যে গ্যারান্টি চেয়েছিলেন, বেইজিং তার কিছুই ওয়াশিংটনকে দেয়নি।

চীন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি বা গ্লোবাল এনার্জি সাপ্লাই চেইনে তারা তেহরান কিংবা মস্কো—কাউকেই একাকী ফেলে যাবে না। এই নির্দিষ্ট ও অটল কূটনৈতিক বার্তাই ভ্লাদিমির পুতিনকে বেইজিংয়ে আলোচনার টেবিলে বসার আগে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত সুবিধা এবং আত্মবিশ্বাস এনে দিয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট এখন পুরোপুরি নিশ্চিত যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের যতই বাণিজ্যিক লেনদেন বা দরকষাকষি থাকুক না কেন, মস্কোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে ক্ষুণ্ণ করে ওয়াশিংটনের সাথে কোনো বৃহত্তর বৈশ্বিক সমীকরণ মেলানোর পরিকল্পনা বেইজিংয়ের এজেন্ডায় নেই।

ক্ষমতার সমীকরণ: ‘সির চেয়ে পুতিনের এটা বেশি প্রয়োজন’

ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এবং জি-সেভেনসহ পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে রাশিয়ার অর্থনীতি ও সামরিক খাত এখন অনেকটাই বেইজিংমুখী হয়ে পড়েছে। এই কঠিন বাস্তবতার আলোকেই চ্যাথাম হাউসের আন্তর্জাতিক গবেষক টিমোথি অ্যাশ মন্তব্য করেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের চেয়ে ভ্লাদিমির পুতিনেরই বর্তমান সময়ে এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও সফরটি বেশি প্রয়োজন ছিল।’

ইউক্রেন ফ্রন্টে বছরের পর বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের কারণে মস্কো কৌশলগত, আর্থিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে বেইজিংয়ের ওপর এক ধরণের দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর নির্ভরশীল অংশীদারে পরিণত হয়েছে। রাশিয়া বর্তমানে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য অপরিহার্য ড্রোন, মাইক্রোচিপস এবং নিখুঁত গাইডেড মিসাইল তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অসামরিক ও সামরিক—উভয় ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য চীনা হাই-টেক প্রযুক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে।

অন্যদিকে এই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে চীনও তার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ খুব চমৎকারভাবে আদায় করে নিচ্ছে। পশ্চিমা বাজার থেকে ছিটকে পড়া রাশিয়ার বিশাল জ্বালানি সম্পদ বেইজিং আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে অনেক কম মূল্যে পাওয়ার একচেটিয়া সুবিধা ভোগ করছে। এরফলে একদিকে যেমন পুতিন তার যুদ্ধ অর্থনীতি সচল রাখছেন, অন্যদিকে চীনও সস্তায় জ্বালানি নিশ্চিত করে মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধের মুখে নিজের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খাতকে সুরক্ষিত রাখছে।

এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতাকে কেবলই রাশিয়ার একতরফা দুর্বলতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। ব্রাসেলসভিত্তিক থিংক-ট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের রাশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ওলেগ ইগনাতভ আল-জাজিরাকে বলেন, ‘মস্কো ও বেইজিং একে অপরের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য অংশীদার, কৌশলগত অংশীদার হলেও তারা কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক মিত্র নয়।’

তিনি জোর দিয়ে বলেন, দুই দেশের এই সম্পর্ক অত্যন্ত স্থিতিশীল, সুগভীর এবং এর পেছনে রয়েছে একটি অভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক দর্শন। উভয় পক্ষই মূলত বর্তমানের মার্কিন-নেতৃত্বাধীন একমেরু বিশ্বব্যবস্থাকে ভেঙে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ‘বহুমেরুর বিশ্বব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠা করার জন্য সম্মিলিত চেষ্টা চালাচ্ছে।

এই দর্শনের মূল কথাই হলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন কোনো একক প্রভাবশালী পরাশক্তি বা গ্লোবাল হেজিমনি থাকা উচিত নয়, যারা ক্ষমতার জোরে অন্য স্বাধীন দেশগুলোকে নিজেদের ইচ্ছা বা এজেন্ডা মানতে বাধ্য করবে। পুতিনের জন্য এই সফর প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক লাইফলাইন ধরে রাখার জন্য জরুরি হলেও, বেইজিংয়ের জন্য এটি ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক একাধিপত্যকে রুখে দেওয়ার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজেদের একটি অলিখিত অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অত্যন্ত শক্তিশালী এক হাতিয়ার।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং নিরপেক্ষ পরাশক্তির মুখচ্ছবি

শি-পুতিন শীর্ষ বৈঠকের ওপর কৌশলগত কালো ছায়া ফেলছে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের তীব্র উত্তেজনা। মধ্যপ্রাচ্যের এই ভয়াবহ সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি রুটের সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রবেশদ্বার—কৌশলগত হরমুজ প্রণালির ওপর। এই রুটটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে খনিজ তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে এক নজিরবিহীন অস্থিরতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

তবে এই চরম সংকটের মধ্যেও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে রাশিয়ার জন্য একটি সাময়িক অর্থনৈতিক স্বস্তি তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান জ্বালানি প্রতিযোগী দেশগুলো যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কোণঠাসা ও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায়, আন্তর্জাতিক বাজারে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের চাহিদা এবং মূল্য রাতারাতি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে মস্কো স্বল্প মেয়াদে এই বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলা থেকে বড় ধরণের আর্থিক মুনাফা লুটে নিতে সক্ষম হচ্ছে।

কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এই সাময়িক লাভ সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রাশিয়া ও চীন—উভয় পরাশক্তির জন্যই অত্যন্ত জরুরি। কারণ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে চীনের বিশাল অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এবং রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মিত্রদের অস্তিত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। এই কারণেই বেইজিং সামিট থেকে দুই নেতাই অবিলম্বে এই অঞ্চলে সম্পূর্ণ বৈরিতা অবসান এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের এই জ্বলন্ত পরিস্থিতির মাঝেই চীন বিশ্বমঞ্চে নিজেকে ‘নিরপেক্ষ পরাশক্তি’ হিসেবে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে উপস্থাপন করছে। লন্ডনের কিংস কলেজের প্রতিরক্ষা অধ্যয়ন বিভাগের গবেষক ড. মেরিনা মিরন এই কূটনৈতিক চালের নিখুঁত ব্যাখ্যা দিয়ে আল-জাজিরাকে বলেন, ‘চীন রাশিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও, অন্তত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বা প্রকাশ্যে কোনো একক পরাশক্তি বা ব্লকের পক্ষ না নেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে।’

বেইজিং মূলত পশ্চিমা বিশ্বের তৈরি করা সেই পুরোনো ন্যারেটিভকে ভাঙতে চায়, যেখানে বলা হতো চীন-রাশিয়া-ইরান মিলে একটি ‘অশুভ অক্ষ’ তৈরি করেছে। চীন কোনো সামরিক জোটে সরাসরি অংশ না নিয়ে এবং কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি বজায় রেখে, সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি শান্তিপ্রিয় শক্তির মুখচ্ছবি তুলে ধরছে। এই কৌশলের অংশ হিসেবেই বেইজিং একই সাথে ওয়াশিংটন ও তেহরান—উভয় পক্ষের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিজেদের মাটিতে আতিথেয়তা দিয়ে এটি প্রমাণ করেছে যে, বিশ্বের যেকোনো বড় সংকট সমাধানের চাবিকাঠি এখন আর শুধু হোয়াইট হাউসের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে নেই।

মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি চলমান ইউক্রেন সংকটের ক্ষেত্রেও বেইজিং অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদি একটি কূটনৈতিক নীতি বজায় রেখে চলেছে। চীন বরাবরই বহুজাতিক মঞ্চে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আলোচনার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিয়ে আসছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন কোনো একক প্রভাবশালী পরাশক্তি বা গ্লোবাল হেজিমনি থাকা উচিত নয়, যারা ক্ষমতার জোরে অন্য স্বাধীন দেশগুলোকে নিজেদের ইচ্ছা বা এজেন্ডা মানতে বাধ্য করবে।

তবে গবেষক মেরিনা মিরন ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নিরপেক্ষতার আড়ালে বেইজিংয়ের সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক সীমা রয়েছে; আর তা হলো—চীন কোনো অবস্থাতেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত অংশীদার রাশিয়ার পরাজয় বা অপমান মেনে নেবে না। ক্রেমলিন যদি এই যুদ্ধে মার্কিন-নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা ব্লকের কাছে পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তবে তা এশিয়ায় চীনের একক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। আর এই গভীর কৌশলগত সমীকরণের কারণেই, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের জন্য বেইজিং কখনোই মস্কোর ওপর কোনো ধরণের একতরফা চাপ সৃষ্টি করবে না।

চ্যাথাম হাউসের ফেলো টিমোথি অ্যাশ স্পষ্ট করেছেন যে, ট্রাম্প বেইজিংয়ে এসে রাশিয়ার বিরুদ্ধে চীনের যে ধরণের কঠোর অবস্থান বা নিষেধাজ্ঞা আশা করেছিলেন, বেইজিং তা সরাসরি এড়িয়ে গেছে।

বেইজিং সমীকরণ: নতুন বিশ্বব্যবস্থার অলিখিত সদরদপ্তর

গত ৫ মে ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক আব্বাস আরাগচি, এরপর ১৪-১৫ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার ঠিক চার দিনের মাথায় ১৯-২০ মে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের চীন সফরকে বিশ্লেষকেরা বলছেন বেইজিংয়ের ‘চেইন ডিপ্লোম্যাসি’। এই কূটনৈতিক মহড়ার টাইমিং প্রমাণ করে, বেইজিং এখন আর বিশ্বরাজনীতির কোনো সাধারণ অনুসারী বা আঞ্চলিক শক্তি নয়; এটি এখন গ্লোবাল অর্ডারের এমন এক অলিখিত সদরদপ্তর, যেখানে সম্পূর্ণ নিজেদের শর্তে ও এজেন্ডায় তারা বিশ্বের প্রধানতম প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর পারস্পরিক বোঝাপড়া ও ভাগ্য নির্ধারণ করতে সক্ষম।

এই ধারাবাহিক কূটনীতির মাধ্যমে বেইজিং পশ্চিমা ব্লকের উদ্দেশ্যে তিনটি সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত ভূ-রাজনৈতিক বার্তা পরিষ্কার করে দিয়েছে—

অপরিহার্য বৈশ্বিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীনের উদয়

ওয়াশিংটন, মস্কো কিংবা তেহরান—আজকের দিনে বৈশ্বিক সংকটের যেকোনো পক্ষই হোক না কেন, তাদের জন্য বেইজিং এখন এক অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী। ইরান যেমন ট্রাম্পের সঙ্গে যেকোনো সম্ভাব্য আলোচনার আগে নিজের অবস্থান শক্ত করতে বেইজিংয়ের রাজনৈতিক লিভারেজ ব্যবহার করতে চেয়েছে, তেমনি ট্রাম্প প্রশাসনও মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন সংকটে চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগাতে বেইজিংয়ের দ্বারস্থ হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষকদের মতে, চীন নিজেকে এমন এক স্তরে নিয়ে গেছে যেখানে তাকে বাদ দিয়ে বৈশ্বিক কোনো বড় দ্বন্দ্বের স্থায়ী সমাধান আর সম্ভব নয়।

মস্কো-বেইজিং ‘সীমাহীন অংশীদারত্ব’ অক্ষ ভাঙা অসম্ভব

ট্রাম্পের সফরের ঠিক পরপরই বেইজিংয়ের মাটিতে পুতিনের এই হাই-প্রোফাইল আগমন ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় ধাক্কা এবং স্পষ্ট বার্তা। ট্রাম্প বেইজিংয়ে এসে চীনের সঙ্গে মার্কিন বাণিজ্যের যে প্রলোভন বা শর্তই দিয়ে থাকুন না কেন, তা রাশিয়ার সঙ্গে চীনের কৌশলগত ‘সীমাহীন অংশীদারত্বকে’ বিন্দুমাত্র দুর্বল করতে পারবে না। চ্যাথাম হাউসের গবেষকদের মতে, এটি আমেরিকার সেই চিরন্তন কৌশলগত ভয়কে সত্যি প্রমাণ করেছে—তা হলো, ওয়াশিংটন চাইলেও বেইজিং ও মস্কোকে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না, বরং পশ্চিমা চাপ এই দুই পরাশক্তিকে আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

মার্কিন-নেতৃত্বাধীন একমেরু বিশ্বব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক অবসান

এই সফরগুলোর মাধ্যমে বেইজিং বিশ্বকে দেখিয়েছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা জোট এখন আর এককভাবে কোনো বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত বা নিষেধাজ্ঞা অন্য দেশের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে না। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একমেরু ব্যবস্থার সমাপ্তি ঘটে আনুষ্ঠানিকভাবে এক ‘বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা’ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার ড্রাইভিং সিটে বসে আছে চীন।

হয়তো এই সংক্ষিপ্ত সফর থেকে রাতারাতি কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট বা নাটকীয় যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসেনি, তবে এর প্রতীকী ও কৌশলগত মূল্য অপরিসীম। লন্ডনের কিংস কলেজের প্রতিরক্ষা গবেষক ড. মেরিনা মিরন আল-জাজিরাকে বলেছেন, ‘একদিন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এবং এর ঠিক পরপরই রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে বেইজিংয়ে স্বাগত জানিয়ে শি চিন পিং স্পষ্ট করে দিয়েছেন—বিশ্ব কূটনীতির অলিখিত ভরকেন্দ্র এখন ওয়াশিংটন থেকে স্থানান্তরিত হয়ে বেইজিংয়ে সুসংহত হয়েছে।’

দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, ২০২৬ সালের ‘বেইজিং সমীকরণ’ আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণকে আরও তীব্র ও স্পষ্ট করে তুলবে। এর সম্ভাব্য পরিণতি হিসেবে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থব্যবস্থায় মার্কিন ডলারের একচেটিয়া আধিপত্য দ্রুত দুর্বল হতে পারে, কারণ চীন-রাশিয়া-ইরানের মতো দেশগুলো এখন সম্পূর্ণ বিকল্প ব্যাংকিং চ্যানেল ও নিজস্ব মুদ্রার পরিধি তৈরিতে সফল হচ্ছে।

ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ইউক্রেনের মতো যেকোনো জটিল বৈশ্বিক সংকটে ওয়াশিংটন আর একক সালিসকারী হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবে না, বরং প্রতিটি বড় ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষিতে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতা ও গ্রিন সিগন্যাল নেওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়াবে। তবে এই কাঠামোর একটি বড় ঝুঁকি হলো, চীন ও রাশিয়ার এই ক্রমবর্ধমান নৈকট্য এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের আরও বেশি সামরিকায়নের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা ভবিষ্যতে নতুন কোনো আঞ্চলিক কোল্ড ওয়ার জন্ম দেবে।

এছাড়া ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এখন আর কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের অন্ধ অনুসারী হতে হবে না; তারা নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে ওয়াশিংটন এবং বেইজিং—উভয় পক্ষের সঙ্গেই সমান্তরাল দরকষাকষির এক নতুন কূটনৈতিক স্পেস বা সুযোগ পাবে।

  • সুমন সুবহান: নিরাপত্তা বিশ্লেষক
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত