আজ বব ডিলানের জন্মদিন। ১৯৪১ সালের ২৪ মে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এই নগরবাউল ছয় দশক ধরে গানে গানে বলেছেন চলতি সময় ও সমাজের কথা। আজ ফিরে তাকানো যাক ১৯৬৫ সালের ২৫ জুলাইয়ের সেই সন্ধ্যায়। যেদিন সবাইকে অবাক করে দিয়ে ‘নিউপোর্ট ফোক ফেস্টিভ্যাল'-এ ইলেকট্রিক গিটার হাতে দেখা মিলেছিল ‘অচেনা’ এক ডিলানের। কী ঘটেছিল সেদিন? কীভাবে তাঁর সংগীতের ভাষা ও গতি নতুন মোড় নিয়েছিল।
গৌতম কে শুভ

বব ডিলানকে নিয়ে লিখতে বসা মানে এক চলিষ্ণু ইতিহাসকে ধরার চেষ্টা করা। তাঁর প্রভাব পেরিয়েছে ভাষা, দেশ ও প্রজন্মের যাবতীয় গণ্ডি। ছয় দশক ধরে দুনিয়াজুড়ে বেজে চলেছে তাঁর গান।
ডিলানের বেশিরভাগ জনপ্রিয় গানের জন্মই সেই ১৯৬০-এর দশকে। তখন ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড, ‘দ্য টাইমস দে আর আ-চেঞ্জিং’ বা ‘এ হার্ড রেইন’ গানগুলো নাগরিক অধিকার ও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের ‘জাতীয় সংগীত’ হয়ে দাঁড়ায়।
এখানে মনে রাখা দরকার, ডিলানের গানযাত্রার শুরু লোকসংগীতের মাধ্যমে। কিন্তু তিনি নিজেকে কখনও কোনো তকমার ভেতরে আটকে রাখতে চাননি। যখন সবাই তাঁকে ‘প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর’ আর ফোক গায়ক হিসেবে দেবতুল্য মনে করতে শুরু করল, তখন ডিলান হাতে নিলেন ইলেকট্রিক গিটার।
এরপর এগোলেন ফোক-রক, ব্লুজ, রক এমনকি কান্ট্রি মিউজিকের দিকেও। সব ধারাতেই তিনি হয়ে উঠলেন চলতি সময়ের দলিল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সাহিত্যে পেলেন নোবেলও।
এই যে ক্রমাগত প্রাসঙ্গিক থাকা, নতুন কিছু করার চেষ্টা, এদিকে তাকালে আমাদের প্রথমেই ফিরে যেতে হবে ১৯৬৫ সালের ২৫ জুলাইয়ে, মার্কিন মুলুকের ‘নিউপোর্ট ফোক ফেস্টিভ্যাল’-এ। সেদিন ডিলান প্রথমবার ইলেকট্রিক গিটার হাতে মঞ্চে উঠেছিলেন।

তারপর? ডিলানের সংগীত জগৎ যেন বড়সড় মোড় নিল। সেদিনের ডিলান যেন ‘অন্য ডিলান’। এভাবে তাঁকে আগে কখনো আর দেখা যায়নি! কী হয়েছিল সেদিন?
কনসার্টে দেখতে আসা হাজারো লোকসংগীতপ্রেমীরা তখন এক কবির গান শোনার অপেক্ষায়। মনে মনে ভাবছেন, এই বুঝি হাতে অ্যাকুস্টিক গিটার আর গলায় হারমোনিকা ঝুলিয়ে মঞ্চে উঠবেন ডিলান। একটু পরেই হয়তো শুরু হবে ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’।
কিন্তু সে সময় কী করছিলেন তরুণ ডিলান? তিনি তো ইলেকট্রিক গিটার হাতে মঞ্চের পেছনে দাঁড়িয়ে একেবারে উল্টোটা ভাবছেন। ‘লাইক এ রোলিং স্টোন’ গানটা অ্যালবামের মতোই রক-স্টাইলে করতে হবে। নতুন গান। মাত্র পাঁচ দিন আগেই বাজারে এসেছে। প্রথমবারের মতো লাইভে গাওয়া হবে। এ গান দিয়েই ডিলানের রক ধারার গানের সূচনা। ইতিহাসের চোখ দিয়ে দেখলে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তো বটেই।
ডিলান মঞ্চে উঠলেন। সবাই অবাক! অ্যাকুস্টিক গিটার কই! তাঁর সঙ্গে আছেন ‘বাটারফিল্ড ব্লুজ’ ব্যান্ডের মাইক, স্যাম লে আর জেরোম আর্নল্ড। আবার পিয়ানোবাদক আল কুপারও হাজির।
গাওয়া শুরু করলেন ডিলান, ‘ম্যাগিস ফার্ম’। কিন্তু দর্শকদের তেমন সাড়া নেই। গান শেষে হাততালির শব্দ খুবই কম। শোরগোল শোনা যাচ্ছে। কেউ কেউ চিৎকার করে বলছে, একটু আগেই মঞ্চ মাতানো পপ গায়িকা ‘কাজিন এমি’কে আবার ফিরিয়ে আনো।

ডিলান যখন ‘লাইক আ রোলিং স্টোন’ গাওয়া শুরু করলেন, অবস্থা আরও বেগতিক। দর্শকসারি থেকে ভেসে আসতে লাগলো, ‘ফোক গান গাও’, ‘তুমি বিক্রি হয়ে গেছো’, ‘এটা তো ফোক ফেস্টিভ্যাল’। পেশাদারি সংগীতজীবনে এমন অভিজ্ঞতা এই প্রথম ডিলানের।
কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই ‘ইট টেকস আ ট্রেন টু ক্রাই’ গানটাও শেষ করলেন। হাততালি একদম নেই। বিপরীতে আছে অনেক বেশি দুয়োধ্বনি। এবারে ডিলান ও তাঁর দল মঞ্চ ছেড়ে চলে গেলেন। সুনসান নীরবতার মধ্যে টের পাওয়া যাচ্ছে ফোক-ভক্তদের হতাশা। ঘড়ির কাঁটা কি থেমে গেছে?
এবার কী হবে? ডিলানের পারফর্ম করা শেষ! তখন এগিয়ে এলেন ফোক দুনিয়ার প্রিয়মুখ পিটার ইয়ারো। ডিলানকে অনুরোধ করলেন মঞ্চে ফিরে আসার। আর হাতে তুলে দিলেন সেই পুরোনো সঙ্গী, অ্যাকুস্টিক গিটার।
ডিলান একা মঞ্চে ফিরে এসে বুঝলেন, তাঁর যে স্কেলের হারমোনিকা লাগবে, তা সঙ্গে নেই। দর্শকরা ‘ট্যামবুরিন ম্যান’ গাইতে অনুরোধ করলেন। ডিলান বললেন, ‘ঠিক আছে, তোমাদের জন্য ওটাই গাই।‘
ডিলান আবার দর্শকদের উদ্দেশ্যে বললেন, আপনাদের কারো কাছে কি ‘ই’ স্কেলের হারমোনিকা আছে? ২০ সেকেন্ডের মধ্যে কে যেন মঞ্চে হারমোনিকা ছুড়েও মারল। শুরু হলো গান। শেষে চেনা সেই মুহুর্মুহু করতালি। তাঁদের চেনা ডিলান ফিরে এসেছেন!
এ উৎসবে শেষ গান হিসেবে ডিলান গাইলেন, ‘ইটস অল ওভার নাও, বেবি ব্লু’। সেদিন কি কেউ বুঝতে পেরেছিল, যে অন্য ডিলানকে আজ তাঁরা দেখল, এই ডিলান ফোক গানকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেবেন ‘ফোক-রক’ দিয়ে?
ডিলানের গান পরিবেশনায় শুধু দর্শকরাই নয়, অস্বস্তিতে পড়েছিলেন অনেক ফোক সংগীত শিল্পীও। তাঁদের অনেকেই ছিলেন ডিলানের গানের আদর্শিক বন্ধু। সেই দলে ছিলেন কিংবদন্তি ফোক গায়ক পিট সিগারও। সেদিনের কনসার্টের অন্যতম আয়োজক সিগারই।

অনেক দিন ধরে একটি গল্প বেশ প্রচলিত ছিল। ডিলানের পারফরম্যান্স চলাকালে রাগে-ক্ষোভে সিগার নাকি বলেছিলেন, ‘আমার হাতে যদি কুড়াল থাকত, তাহলে ডিলানের মাইক্রোফোনের কেবলের তার কেটে দিতাম।’
অনেক বছর পর পিট সিগার এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছিলেন। আসল কাহিনি একটু অন্যরকম। খুবই বাজে ‘সাউন্ড সিস্টেম’ ছিল সেদিন, বিশেষত ডিলানের সময়। একটা শব্দও ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছিল না। সিগার সাউন্ড সিস্টেমের এই হালের জন্য খুব বিরক্ত হয়ে কথাটি বলেছিলেন। অর্থাৎ তিনি ডিলানের এই নতুন রূপান্তরের বিপক্ষে ছিলেন না। তাঁর ক্ষোভ ছিল প্রযুক্তিগত। আর তা একজন সাউন্ড-পারফেকশনিস্টের মনোভাব থেকে।
অবশ্য কনসার্টের সাউন্ড সিস্টেমকে একমাত্র দোষ হিসেবে দেখার উপায় নেই। মাত্র এক রাতের অনুশীলনে ডিলান নতুন পরিচয় হওয়া চারজনের সঙ্গে স্টেজে ওঠেন। তা-ও আবার প্রথমবারের মতো ইলেকট্রিক গিটার হাতে। অন্যদিকে কনসার্টের সময়স্বল্পতার জন্য সাউন্ড চেক করার সময়ও পাননি।
এখানে ‘এগোলেন’ মানে ফোককে পাশ কাটিয়ে রক মিউজিকের (মূলত ফোক-রক) দিকে ঝুঁকলেন, ব্যাপারটা এমন নয়। গল্পটা সময়ের সঙ্গে নতুন সাউন্ড তৈরির। ডিলানের শিকড়ই তো ফোক সংগীত। তিনি ‘উডি গাথরি’ দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত। উডিকে নিজের ‘গানবাবা’ মনে করতেন। পল রোবসন আর পিট সিগারও তাঁর ভাবনায় প্রভাব রেখেছে। সেই পরম্পরা থেকেই ডিলানের গানে এসেছে রাজনৈতিক বার্তা, সাধারণ মানুষের কথা ও প্রতিবাদের সুর।

ডিলানের এই রূপান্তর নিয়ে রক সংগীত গবেষক এলিজা ওয়াল্ড তাঁর ‘ডিলান গোজ ইলেকট্রিক’ বইতে বিশদে লিখেছেন। এই বই অবলম্বনেই ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ‘আ কমপ্লিট আননোন’ নামে সিনেমা হয়। অস্কারের বেশ কয়েকটি শাখায় মনোনয়নও পেয়েছে সিনেমাটি।
ডিলানের রকের দিকে ঝুঁকে পড়া নিয়ে বুঝতে গেলে তাকাতে হবে ষাটের দশকের একদম শুরুর দিকে। যখন বিলবোর্ডের শীর্ষ ১০ অ্যালবামের মধ্যে ৬-৭টাই থাকত ফোক গানের! এরপর ঘটল ‘বিটলস-ঝড়’। রক মিউজিকের জন্য তৈরি হতে লাগলো বিশাল ভক্তকূল। ১৯৬৪ সালে বিটলস হিট হওয়ার পর ফোক দুনিয়ার অনেকেই মনে করলেন, তাঁদের জায়গাটা বুঝি হারিয়ে যাচ্ছে। ‘ফোক মিউজিক মুভমেন্ট’ শেষ।
তুমুল জনপ্রিয়তার ফোক-কালেও ডিলান রক সংগীতকে হালকা কিছু ভাবেননি। বিটলসের গান খুব পছন্দ করতেন। আর ভালোবাসতেন ‘রক অ্যান্ড রোল’। তিনি মনে করতেন বিটলস কেন পিওর ‘রক এন রোল’ করল না।
১৯৬৪ সালে ‘দ্য অ্যানিম্যালস’ ব্যান্ড প্রচলিত ফোক গান ‘হাউস অব দ্য রাইজিং সান’কে নতুনভাবে হাজির করল। ডিলানের প্রথম অ্যালবামেও গানটি ছিল। নতুন এই ভার্সন শুনে ডিলান বুঝেছিলেন, এমন গান রকেও করা যেতে পারে। তারপরের ঘটনা তো আমাদের জানাই। ডিলান গান বাঁধলেন। হলেন ফোক-রকের নগরবাউল।
ডিলান শুধু ‘প্রতিবাদী গায়ক’ বা ‘ফোক গায়ক’ হয়ে একটি ধারাতে থাকতে চাননি। তিনি নিজেই বলেছিলেন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। একইসঙ্গে খুঁজছিলেন এমন এক ভাষা, যেখানে তাঁর আবেগ, বেদনা, রাগ—সবকিছুই আরও জোরালোভাবে প্রকাশ পাবে। তাঁর মনে হয়েছিল ইলেকট্রিক গিটার, ড্রামস আর পুরো ব্যান্ড সেটআপ দিয়ে গান করার মানে ভাবনার জায়গা থেকেও নতুন কিছু খোঁজা। ফলে ফোক থেকে রকের দিকে যাত্রাটা ছিল তাঁর নিজের ভেতরের টান, বাইরের কোনো চাপ নয়।

বব ডিলানকে নিয়ে লিখতে বসা মানে এক চলিষ্ণু ইতিহাসকে ধরার চেষ্টা করা। তাঁর প্রভাব পেরিয়েছে ভাষা, দেশ ও প্রজন্মের যাবতীয় গণ্ডি। ছয় দশক ধরে দুনিয়াজুড়ে বেজে চলেছে তাঁর গান।
ডিলানের বেশিরভাগ জনপ্রিয় গানের জন্মই সেই ১৯৬০-এর দশকে। তখন ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড, ‘দ্য টাইমস দে আর আ-চেঞ্জিং’ বা ‘এ হার্ড রেইন’ গানগুলো নাগরিক অধিকার ও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের ‘জাতীয় সংগীত’ হয়ে দাঁড়ায়।
এখানে মনে রাখা দরকার, ডিলানের গানযাত্রার শুরু লোকসংগীতের মাধ্যমে। কিন্তু তিনি নিজেকে কখনও কোনো তকমার ভেতরে আটকে রাখতে চাননি। যখন সবাই তাঁকে ‘প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর’ আর ফোক গায়ক হিসেবে দেবতুল্য মনে করতে শুরু করল, তখন ডিলান হাতে নিলেন ইলেকট্রিক গিটার।
এরপর এগোলেন ফোক-রক, ব্লুজ, রক এমনকি কান্ট্রি মিউজিকের দিকেও। সব ধারাতেই তিনি হয়ে উঠলেন চলতি সময়ের দলিল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সাহিত্যে পেলেন নোবেলও।
এই যে ক্রমাগত প্রাসঙ্গিক থাকা, নতুন কিছু করার চেষ্টা, এদিকে তাকালে আমাদের প্রথমেই ফিরে যেতে হবে ১৯৬৫ সালের ২৫ জুলাইয়ে, মার্কিন মুলুকের ‘নিউপোর্ট ফোক ফেস্টিভ্যাল’-এ। সেদিন ডিলান প্রথমবার ইলেকট্রিক গিটার হাতে মঞ্চে উঠেছিলেন।

তারপর? ডিলানের সংগীত জগৎ যেন বড়সড় মোড় নিল। সেদিনের ডিলান যেন ‘অন্য ডিলান’। এভাবে তাঁকে আগে কখনো আর দেখা যায়নি! কী হয়েছিল সেদিন?
কনসার্টে দেখতে আসা হাজারো লোকসংগীতপ্রেমীরা তখন এক কবির গান শোনার অপেক্ষায়। মনে মনে ভাবছেন, এই বুঝি হাতে অ্যাকুস্টিক গিটার আর গলায় হারমোনিকা ঝুলিয়ে মঞ্চে উঠবেন ডিলান। একটু পরেই হয়তো শুরু হবে ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’।
কিন্তু সে সময় কী করছিলেন তরুণ ডিলান? তিনি তো ইলেকট্রিক গিটার হাতে মঞ্চের পেছনে দাঁড়িয়ে একেবারে উল্টোটা ভাবছেন। ‘লাইক এ রোলিং স্টোন’ গানটা অ্যালবামের মতোই রক-স্টাইলে করতে হবে। নতুন গান। মাত্র পাঁচ দিন আগেই বাজারে এসেছে। প্রথমবারের মতো লাইভে গাওয়া হবে। এ গান দিয়েই ডিলানের রক ধারার গানের সূচনা। ইতিহাসের চোখ দিয়ে দেখলে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তো বটেই।
ডিলান মঞ্চে উঠলেন। সবাই অবাক! অ্যাকুস্টিক গিটার কই! তাঁর সঙ্গে আছেন ‘বাটারফিল্ড ব্লুজ’ ব্যান্ডের মাইক, স্যাম লে আর জেরোম আর্নল্ড। আবার পিয়ানোবাদক আল কুপারও হাজির।
গাওয়া শুরু করলেন ডিলান, ‘ম্যাগিস ফার্ম’। কিন্তু দর্শকদের তেমন সাড়া নেই। গান শেষে হাততালির শব্দ খুবই কম। শোরগোল শোনা যাচ্ছে। কেউ কেউ চিৎকার করে বলছে, একটু আগেই মঞ্চ মাতানো পপ গায়িকা ‘কাজিন এমি’কে আবার ফিরিয়ে আনো।

ডিলান যখন ‘লাইক আ রোলিং স্টোন’ গাওয়া শুরু করলেন, অবস্থা আরও বেগতিক। দর্শকসারি থেকে ভেসে আসতে লাগলো, ‘ফোক গান গাও’, ‘তুমি বিক্রি হয়ে গেছো’, ‘এটা তো ফোক ফেস্টিভ্যাল’। পেশাদারি সংগীতজীবনে এমন অভিজ্ঞতা এই প্রথম ডিলানের।
কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই ‘ইট টেকস আ ট্রেন টু ক্রাই’ গানটাও শেষ করলেন। হাততালি একদম নেই। বিপরীতে আছে অনেক বেশি দুয়োধ্বনি। এবারে ডিলান ও তাঁর দল মঞ্চ ছেড়ে চলে গেলেন। সুনসান নীরবতার মধ্যে টের পাওয়া যাচ্ছে ফোক-ভক্তদের হতাশা। ঘড়ির কাঁটা কি থেমে গেছে?
এবার কী হবে? ডিলানের পারফর্ম করা শেষ! তখন এগিয়ে এলেন ফোক দুনিয়ার প্রিয়মুখ পিটার ইয়ারো। ডিলানকে অনুরোধ করলেন মঞ্চে ফিরে আসার। আর হাতে তুলে দিলেন সেই পুরোনো সঙ্গী, অ্যাকুস্টিক গিটার।
ডিলান একা মঞ্চে ফিরে এসে বুঝলেন, তাঁর যে স্কেলের হারমোনিকা লাগবে, তা সঙ্গে নেই। দর্শকরা ‘ট্যামবুরিন ম্যান’ গাইতে অনুরোধ করলেন। ডিলান বললেন, ‘ঠিক আছে, তোমাদের জন্য ওটাই গাই।‘
ডিলান আবার দর্শকদের উদ্দেশ্যে বললেন, আপনাদের কারো কাছে কি ‘ই’ স্কেলের হারমোনিকা আছে? ২০ সেকেন্ডের মধ্যে কে যেন মঞ্চে হারমোনিকা ছুড়েও মারল। শুরু হলো গান। শেষে চেনা সেই মুহুর্মুহু করতালি। তাঁদের চেনা ডিলান ফিরে এসেছেন!
এ উৎসবে শেষ গান হিসেবে ডিলান গাইলেন, ‘ইটস অল ওভার নাও, বেবি ব্লু’। সেদিন কি কেউ বুঝতে পেরেছিল, যে অন্য ডিলানকে আজ তাঁরা দেখল, এই ডিলান ফোক গানকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেবেন ‘ফোক-রক’ দিয়ে?
ডিলানের গান পরিবেশনায় শুধু দর্শকরাই নয়, অস্বস্তিতে পড়েছিলেন অনেক ফোক সংগীত শিল্পীও। তাঁদের অনেকেই ছিলেন ডিলানের গানের আদর্শিক বন্ধু। সেই দলে ছিলেন কিংবদন্তি ফোক গায়ক পিট সিগারও। সেদিনের কনসার্টের অন্যতম আয়োজক সিগারই।

অনেক দিন ধরে একটি গল্প বেশ প্রচলিত ছিল। ডিলানের পারফরম্যান্স চলাকালে রাগে-ক্ষোভে সিগার নাকি বলেছিলেন, ‘আমার হাতে যদি কুড়াল থাকত, তাহলে ডিলানের মাইক্রোফোনের কেবলের তার কেটে দিতাম।’
অনেক বছর পর পিট সিগার এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছিলেন। আসল কাহিনি একটু অন্যরকম। খুবই বাজে ‘সাউন্ড সিস্টেম’ ছিল সেদিন, বিশেষত ডিলানের সময়। একটা শব্দও ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছিল না। সিগার সাউন্ড সিস্টেমের এই হালের জন্য খুব বিরক্ত হয়ে কথাটি বলেছিলেন। অর্থাৎ তিনি ডিলানের এই নতুন রূপান্তরের বিপক্ষে ছিলেন না। তাঁর ক্ষোভ ছিল প্রযুক্তিগত। আর তা একজন সাউন্ড-পারফেকশনিস্টের মনোভাব থেকে।
অবশ্য কনসার্টের সাউন্ড সিস্টেমকে একমাত্র দোষ হিসেবে দেখার উপায় নেই। মাত্র এক রাতের অনুশীলনে ডিলান নতুন পরিচয় হওয়া চারজনের সঙ্গে স্টেজে ওঠেন। তা-ও আবার প্রথমবারের মতো ইলেকট্রিক গিটার হাতে। অন্যদিকে কনসার্টের সময়স্বল্পতার জন্য সাউন্ড চেক করার সময়ও পাননি।
এখানে ‘এগোলেন’ মানে ফোককে পাশ কাটিয়ে রক মিউজিকের (মূলত ফোক-রক) দিকে ঝুঁকলেন, ব্যাপারটা এমন নয়। গল্পটা সময়ের সঙ্গে নতুন সাউন্ড তৈরির। ডিলানের শিকড়ই তো ফোক সংগীত। তিনি ‘উডি গাথরি’ দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত। উডিকে নিজের ‘গানবাবা’ মনে করতেন। পল রোবসন আর পিট সিগারও তাঁর ভাবনায় প্রভাব রেখেছে। সেই পরম্পরা থেকেই ডিলানের গানে এসেছে রাজনৈতিক বার্তা, সাধারণ মানুষের কথা ও প্রতিবাদের সুর।

ডিলানের এই রূপান্তর নিয়ে রক সংগীত গবেষক এলিজা ওয়াল্ড তাঁর ‘ডিলান গোজ ইলেকট্রিক’ বইতে বিশদে লিখেছেন। এই বই অবলম্বনেই ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ‘আ কমপ্লিট আননোন’ নামে সিনেমা হয়। অস্কারের বেশ কয়েকটি শাখায় মনোনয়নও পেয়েছে সিনেমাটি।
ডিলানের রকের দিকে ঝুঁকে পড়া নিয়ে বুঝতে গেলে তাকাতে হবে ষাটের দশকের একদম শুরুর দিকে। যখন বিলবোর্ডের শীর্ষ ১০ অ্যালবামের মধ্যে ৬-৭টাই থাকত ফোক গানের! এরপর ঘটল ‘বিটলস-ঝড়’। রক মিউজিকের জন্য তৈরি হতে লাগলো বিশাল ভক্তকূল। ১৯৬৪ সালে বিটলস হিট হওয়ার পর ফোক দুনিয়ার অনেকেই মনে করলেন, তাঁদের জায়গাটা বুঝি হারিয়ে যাচ্ছে। ‘ফোক মিউজিক মুভমেন্ট’ শেষ।
তুমুল জনপ্রিয়তার ফোক-কালেও ডিলান রক সংগীতকে হালকা কিছু ভাবেননি। বিটলসের গান খুব পছন্দ করতেন। আর ভালোবাসতেন ‘রক অ্যান্ড রোল’। তিনি মনে করতেন বিটলস কেন পিওর ‘রক এন রোল’ করল না।
১৯৬৪ সালে ‘দ্য অ্যানিম্যালস’ ব্যান্ড প্রচলিত ফোক গান ‘হাউস অব দ্য রাইজিং সান’কে নতুনভাবে হাজির করল। ডিলানের প্রথম অ্যালবামেও গানটি ছিল। নতুন এই ভার্সন শুনে ডিলান বুঝেছিলেন, এমন গান রকেও করা যেতে পারে। তারপরের ঘটনা তো আমাদের জানাই। ডিলান গান বাঁধলেন। হলেন ফোক-রকের নগরবাউল।
ডিলান শুধু ‘প্রতিবাদী গায়ক’ বা ‘ফোক গায়ক’ হয়ে একটি ধারাতে থাকতে চাননি। তিনি নিজেই বলেছিলেন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। একইসঙ্গে খুঁজছিলেন এমন এক ভাষা, যেখানে তাঁর আবেগ, বেদনা, রাগ—সবকিছুই আরও জোরালোভাবে প্রকাশ পাবে। তাঁর মনে হয়েছিল ইলেকট্রিক গিটার, ড্রামস আর পুরো ব্যান্ড সেটআপ দিয়ে গান করার মানে ভাবনার জায়গা থেকেও নতুন কিছু খোঁজা। ফলে ফোক থেকে রকের দিকে যাত্রাটা ছিল তাঁর নিজের ভেতরের টান, বাইরের কোনো চাপ নয়।

কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে বহু গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু উপন্যাস? হ্যাঁ, তাও লেখা হয়েছে। নজরুলের বিদ্রোহ, প্রেম, সাম্য, মানবতা ও বেদনা যেন উপন্যাসের আধারেই মুদ্রণযোগ্য। কেননা তাঁর জীবন সংগ্রাম, আবেগ, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিতে সমৃদ্ধ। এ লেখায় নজরুলের জীবনীভিত্তিক পাঁ
৫ ঘণ্টা আগে
কাজী নজরুল ইসলামকে বোঝার জন্য তাঁর সাহিত্যকে শুধু পাঠ্যবইয়ের অলংকার হিসেবে পড়লে চলে না। তাঁকে বুঝতে হলে শুনতে হয় বাংলার শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘশ্বাস, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তরুণদের অস্থিরতা, ধর্মীয় বিভাজনে ক্লান্ত মানুষের আর্তি, অবহেলিত নারীর আর্তনাদ। নজরুল সেইসব কণ্ঠকে ভাষা দিয়েছিলেন। তাঁর কলমে বিদ
৫ ঘণ্টা আগে
কাজী নজরুল ইসলামের শিল্প সাহিত্যের বিবিধ বিষয়ে যুক্ত হওয়ার ইতিহাস সর্বজনবিদিত। তাঁর এই যুক্ত হওয়া কেবল রচনা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একই সঙ্গে একজন পারফর্মার, একজন শিল্পী। ফলে নজরুল কবি, কথাসাহিত্যিক ও সংগীত রচয়িতার পাশাপাশি একজন সংগীত শিল্পী, একজন বাদক, একজন অভিনয় শিল্পী এবং একই সঙ্গে একজন রাজন
৫ ঘণ্টা আগে
নজরুল এমন একজন সাংস্কৃতিক আইকন; যিনি একাধারে বিপ্লব, বিদ্রোহ, সাম্যবাদ, প্রেম, ইসলামি ঐতিহ্য এবং বাঙালিত্বের প্রতীকও।
১৯ ঘণ্টা আগে