হামে শিশু মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে: আমরা কি এখনও নীরব থাকব?

প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৬, ১২: ৩৭
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত সরকারি হিসাবেই দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রকৃত সংখ্যা কত তা আমরা জানি না। বাস্তবতা হয়তো সরকারি হিসাবের তিন কিংবা পাঁচ গুণ বেশি। কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যানেই যে সংখ্যাটি উঠে এসেছে, সেটিই বা কম কীসের? প্রতিটি সংখ্যা তো একটি শিশুর জীবন, একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি মায়ের বুকফাটা কান্না, একটি বাবার অসহায় দীর্ঘশ্বাস। একটি শিশুর মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ হারানোর শোকগাথা।

দেশজুড়ে যেন শিশু মৃত্যুর এক নীরব মিছিল নেমেছে—যে মিছিল প্রতিদিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। অথচ এই ভয়াবহ পরিস্থিতিও আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা প্রশাসনের মধ্যে তেমন কোনো বড় আলোড়ন তুলতে পারেনি। সংক্রমণ শুরুর দুই মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোনো সর্বাত্মক উদ্যোগ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। সরকার টিকা কার্যক্রম নিয়েই যেন আত্মতুষ্ট, আর সাধারণ মানুষ নিজ নিজ ব্যস্ততায় নিমগ্ন। কোথায় কোন শিশু মারা যাচ্ছে এবং কোন মা সন্তান হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে যাচ্ছেন তা যেন আমাদের বিবেককে আর নাড়া দেয় না।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আমরা যেন ধীরে ধীরে হামে শিশু মৃত্যুকেও স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছি। অথচ প্রতিটি শিশুমৃত্যুই আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার জন্য একেকটি কঠিন সতর্কবার্তা। একটি সভ্য সমাজ কখনো শিশু মৃত্যুর সঙ্গে আপস করতে পারে না।

এখনো সময় আছে। সরকারকে অবিলম্বে জাতীয় জরুরি প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন, বিভাগীয় পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা ইউনিট চালু, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম সরবরাহ, মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

প্রশ্ন হলো, এত শিশু মৃত্যুর পরও কেন আমরা এখনো কার্যকর জরুরি ব্যবস্থা নিতে পারলাম না? কেন জাতীয় পর্যায়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে জরুরি টাস্কফোর্স গঠন করা হলো না? কেন বিভাগীয় বা জেলা পর্যায়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য আলাদা ইউনিট চালু করা হলো না? কেন প্রতিটি জেলায় জরুরি নজরদারি, দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা গেল না? কেন স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে ওঠেনি?

আজও দেশের বহু পরিবার হামে আক্রান্ত শিশু নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোথাও শয্যা নেই, কোথাও শিশু বিশেষজ্ঞ নেই, কোথাও অক্সিজেন বা প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট। অনেকে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে জটিল অবস্থায় ঢাকায় ছুটে আসছে। কিন্তু সব পরিবার কি রাজধানীতে আসতে পারে? প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র মানুষ কি সন্তানের চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সামর্থ্য রাখে? যেসব শিশু চিকিৎসা না পেয়ে পথেই মারা যাচ্ছে, তাদের দায় কে নেবে?

শুধু টিকা দিয়েই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রয়োজন ছিল সমন্বিত জনস্বাস্থ্য প্রতিক্রিয়া। প্রয়োজন ছিল আক্রান্ত শিশুদের জন্য দ্রুত চিকিৎসা সুবিধা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পুষ্টিসহায়তা নিশ্চিত করা। পরিস্থিতির ব্যাপকতা বিবেচনায় প্রয়োজন ছিল স্থানীয় সরকার, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, ইমাম, স্বেচ্ছাসেবক, যুব সংগঠন ও গণমাধ্যমসহ সবাইকে সম্পৃক্ত করা ।

হামকে অনেকেই সাধারণ রোগ হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং অপুষ্ট শিশুদের জন্য মারাত্মক প্রাণঘাতী। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এনসেফালাইটিসসহ নানা জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে শিশুরা দ্রুত মৃত্যুর দিকে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় অপুষ্টি, দারিদ্র্য এবং স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে হামের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। অর্থাৎ এটি কেবল একটি সংক্রামক রোগ নয়; এটি আমাদের সামাজিক বৈষম্য, স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মানবিক অবহেলারও প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে জনবল সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, শহরকেন্দ্রিক চিকিৎসাসেবা, সমন্বয়ের অভাব, পর্যাপ্ত বাজেটের ঘাটতি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার সংকটসহ বহু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু সংকটের সময়েই রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতা যাচাই হয়। কোভিড-১৯ আমাদের শিখিয়েছে, জনস্বাস্থ্য সংকট শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানবিক দায়িত্বের প্রশ্ন। হাম পরিস্থিতিকেও সেই গুরুত্ব দিয়েই দেখতে হবে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আমরা যেন ধীরে ধীরে হামে শিশু মৃত্যুকেও স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছি। অথচ প্রতিটি শিশুমৃত্যুই আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার জন্য একেকটি কঠিন সতর্কবার্তা। একটি সভ্য সমাজ কখনো শিশু মৃত্যুর সঙ্গে আপস করতে পারে না।

এখনো সময় আছে। সরকারকে অবিলম্বে জাতীয় জরুরি প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন, বিভাগীয় পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা ইউনিট চালু, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম সরবরাহ, মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি টিকাবঞ্চিত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয় করতে হবে, যাতে কোনো শিশুই টিকার বাইরে না থাকে।

একই সঙ্গে দরকার নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রবাহ ও স্বচ্ছতা। কত শিশু আক্রান্ত, কোথায় মৃত্যু হচ্ছে, কোন এলাকায় ঝুঁকি বেশি—এসব তথ্য জনগণের সামনে নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। কারণ তথ্য গোপন করলে সংকট কমে না; বরং মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে আতঙ্ক নয়, সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।

শিশুরা কোনো পরিসংখ্যান নয়। তারা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, আমাদের মানবতার প্রতিচ্ছবি। তাদের মৃত্যুর মিছিল চলতে থাকলে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি কিংবা সমৃদ্ধ বাংলাদেশের সব কথাই অর্থহীন হয়ে পড়বে। একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু তার অবকাঠামো, মেগাপ্রকল্প বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; বরং সে কতটা তার শিশুদের জীবন রক্ষা করতে পারে, তার ওপর নির্ভর করে।

আজ আমাদের নিজেদের কাছেই প্রশ্ন করতে হবে, আমরা কি সত্যিই মানবিক সমাজ হিসেবে বেঁচে আছি? নাকি আমরা এমন এক নিষ্ঠুর উদাসীনতার মধ্যে ডুবে গেছি, যেখানে শিশু মৃত্যুও আর আমাদের নাড়া দেয় না?

প্রশ্ন একটাই, আর কত শিশুর মৃত্যু হলে আমাদের বিবেক জাগ্রত হবে? আমরা কি এখনও নীরব থাকব?

ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহ্বায়ক, অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস, বাংলাদেশ।

সম্পর্কিত