নজরুল এমন একজন সাংস্কৃতিক আইকন; যিনি একাধারে বিপ্লব, বিদ্রোহ, সাম্যবাদ, প্রেম, ইসলামি ঐতিহ্য এবং বাঙালিত্বের প্রতীকও।
জফির সেতু

বলতে দ্বিধা নেই যে যে সমাজে আমরা বসবাস করি সেই সমাজটি বিভিন্ন দিক থেকে অবিকশিত। বিশেষ করে সাতচল্লিশ পরবর্তীকালে বাংলাদেশে যে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব হয়েছে, সে সমাজের ভিতরে-বাইরে রয়েছে নানান সংকট। এর মধ্যে আত্মপরিচয়ের সংকট হচ্ছে সবচেয়ে তীব্র। ভারতীয় সমাজে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষটি জন্ম নেয় মুসলমান আগমনকাল থেকে, বিষয়টি এমন নয়। আর্যবসতির কাল থেকেও যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ পত্রপল্লবে লালিত হয়ে আসছিল তার খোদ প্রমাণ ঋগ্বেদে রয়েছে। ঔপনিবেশিক কালে এই বৃক্ষ পুষ্পমঞ্জরিতে ছেয়ে যেতে থাকে ব্রিটিশবেনিয়াদের আলো-হাওয়ায়; যার নমুনা উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে উদ্ভূত ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদ’। তার আগে মুসলমানদের শাসনযন্ত্র থেকে পতন ও ধর্মীয় গোঁড়ামি ক্রমে তাদের একশেষ করতে ছাড়েনি; আর এরই ফল দাঁড়ায় নিজেদের পরিচয়ের জটিলতা; কূপমণ্ডূকতা, এমনকি হীনম্মন্যতাও। বাংলাদেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির সাহিত্যবোধ প্রশ্নে ও মননশীলতা গঠনে এমনরূপ পরিপ্রেক্ষিত মাথায় রেখেই নজরুল-পাঠ কিংবা নজরুল-চর্চার সংকট নিয়ে আলাপ তোলা সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে প্রথম যে কথাটি বলা যায় তা হলো নজরুল এমন এক সাংস্কৃতিক আইকন; যিনি একাধারে বিপ্লব, বিদ্রোহ, সাম্যবাদ, প্রেম, ইসলামি ঐতিহ্য এবং বাঙালিত্বের প্রতীকও। তাঁর নাম উচ্চারিত হয় রাষ্ট্রীয় মঞ্চে, জাতীয় দিবসে, ধর্মীয় আবেগে, রাজনৈতিক বক্তৃতায় এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। কিন্তু এই বহুল উচ্চারিত নামের আড়ালে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ক্রমশ স্পষ্টও হয়ে ওঠে যে, আমরা কি সত্যিই নজরুলকে পাঠ করি? তাঁর চিন্তা, নন্দন, দর্শন ও মানবিক অবস্থানকে আত্মস্থ করি? তাঁর আদর্শকে ধারণ করি? নাকি আমরা কেবল তাঁর নাম, পরিচয় এবং প্রতীকটিকেই ব্যবহার করি?
এমনসব জিজ্ঞাসার পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণও রয়েছে। নজরুল আমাদের দেশে একটা আবেগ; একটা বিশ্বাস এবং একটা নাম। আর তার কারণ নিছক সাহিত্যিক নয়; বরং গভীরভাবে সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও মনস্তাত্ত্বিক। নজরুল শুধু কবি নন, প্রতীকও। তাঁকে ‘জাতীয় কবি’, ‘বিদ্রোহী কবি’, ‘মুসলমান জাগরণের কবি’ ইত্যাদি বলা হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির বড়ো অংশের মধ্যে নজরুলকে নিয়ে এক ধরনের আবেগপ্রসূত আনুগত্য বিদ্যমান, অথচ সেই আনুগত্যের ভিত পাঠনির্ভর নয়। তাঁরা নজরুলকে শ্রদ্ধা করেন, কারণ তিনি মুসলমান সমাজ থেকে আগত, তাও আবার দরিদ্রশ্রেণি থেকে উদ্ভূত বলে। অন্যদিকে এই আবেগী শ্রেণি নজরুলকে রবীন্দ্রনাথের বিপরীতেও দাঁড় করান, কারণ এতে একটি সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার মনস্তত্ত্ব কাজ করে। অথচ এঁদের অধিকাংশই নজরুলের প্রবন্ধ, উপন্যাস কিংবা গল্প পড়েন না; এমনকি তাঁর কবিতারও সীমিত কয়েকটি অংশের বাইরে প্রবেশ করেন না। ফলে নজরুল একটি জীবন্ত বৌদ্ধিক সত্তা না হয়ে ধীরে ধীরে একটি পরিচয়ের প্রতীকে পরিণত হন। অন্যভাবে বলতে গেলে বাংলাদেশে নজরুল এক ধরনের পৌত্তলিকতা দ্বারা আক্রান্ত। অনেকের কাছে নজরুল একটা টোটেমমাত্র।
‘পৌত্তলিকতা’ বা ‘টোটেম’ শব্দটি এখানে ধর্মতাত্ত্বিক অর্থে ব্যবহার করা হয়নি; বরং সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কারণ পৌত্তলিকতা এমন এক মানসিক প্রবণতা, যেখানে মানুষ কোনো ব্যক্তি, প্রতীক বা নামকে চিন্তার বিষয় হিসেবে নয়, ভক্তির বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। সেখানে অনুধাবন বা অনুশীলনের চেয়ে প্রতীক বড় হয়ে ওঠে; বিশ্লেষণের চেয়ে আনুগত্য, চিন্তার চেয়ে পরিচয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, বাঙালি মুসলমানের একাংশের মধ্যে নজরুলের সঙ্গে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা সাহিত্যিক আত্মস্থতার চেয়ে প্রতীকমূলক আনুগত্যের কাছাকাছি। বরং বলা ভালো যে, অনেকে নজরুলকে মুসলমান আত্মপরিচয়ের ‘সাংস্কৃতিক মূর্তি’ হিসেবে ধারণ করেছেন। অর্থাৎ এই মানসিকতার সঙ্গে ‘পৌত্তলিকতা’র সাযুজ্য বর্তমান। অন্যদিকে পৌত্তলিক মানসিকতা মূলত প্রতীকনির্ভর। সেখানে বস্তু বা প্রতীক তার বাস্তব সীমা ছাড়িয়ে ‘পবিত্র মর্যাদা’ অর্জন করে। মানুষ তখন প্রতীকের অর্থ নিয়ে নয়, প্রতীকের উপস্থিতি নিয়ে আবেগী হয়ে ওঠে। এই প্রতীককে প্রশ্ন করা যায় না; তাকে কেবল শ্রদ্ধা করা যায়। ফলে চিন্তা ধীরে ধীরে আচার বা প্রথা হয়ে ওঠে। নজরুলের ক্ষেত্রেও এমন ঘটেছে যে, তাঁকে ভালোবাসা হয়, কিন্তু পুরোটা গ্রহণ করা হয় না। একেই প্রতীকী ভক্তির লক্ষণ বলে চিহ্নিত করা যায়।
অবশ্য এই প্রতীকমনস্কতা বাঙালি মুসলমানের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক মানসের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায় যে, কঠোর একেশ্বরবাদী ধর্ম গ্রহণ করলেও বাঙালি মুসলমান-সমাজ সম্পূর্ণভাবে প্রতীকবিমুখ হতে পারেনি। পিরের মাজার, দরগাহ, তাবিজ, পবিত্র বস্তু, অলৌকিকতার বিশ্বাস, নেতার ছবি মাথার উপরে রাখা ইত্যাদি এখনও জনপ্রিয়। কারণ তাদের মন সহজে বিমূর্ততায় স্থির থাকতে পারে না; সে দৃশ্যমান প্রতীক আকাঙ্ক্ষা করে।
এই প্রতীকপ্রবণতা আধুনিক কালেও রূপবদল করেছে। এখন মাজারের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতা, ধর্মীয় বক্তা, সাহিত্যিক কিংবা জাতীয় প্রতীকও ভক্তির কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ফলে পৌত্তলিকতা কেবল মূর্তিপূজার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি মানসিক গঠনের অংশ হয়ে আছে। নজরুলকে ঘিরে যে-ভক্তি, তার ভেতরেও এই মনস্তত্ত্ব কাজ করে। বাঙালি মুসলমান-সমাজের একাংশ তাঁকে এমনভাবে ধারণ করেছে যে, যেন তিনি কেবল একজন কবি নন, বরং মুসলমান আত্মপরিচয়ের পবিত্র প্রতীক। তাই তাঁকে নিয়ে সমালোচনা অনেক সময়ে অস্বস্তি তৈরি করে। তাঁর এমন সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথাবলা অসম্মানের সমান হয়ে ওঠে। নজরুলকে নিয়ে আহমদ শরীফ কিংবা হুমায়ুন আজাদের মূল্যায়ন তাই ধোপে টিকে না; নজরুল-প্রেমীদের কাছে উভয়েই এখন বিরাগভাজন হয়ে আছেন।
বলতে গেলে এখান থেকেই নজরুলকে ‘পাঠহীন ভক্তি’র সূত্রপাত। এটা যে কেবল নজরুলের বেলায় প্রযোজ্য তাও কিন্তু নয়। বাংলাদেশে জীবনানন্দ দাশকে বড়ো কবি হিসেবে মানা হয়, কিংবা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে বড়োমাপের কথাসাহিত্যিক হিসেবে দেখা হয়; অথচ শিক্ষিত পাঠকের কাছেও যে তাঁরা ঠিকমতো পৌঁছেছেন তা বলা যায় না। পাঠ না-করেই তাঁরা মাথার উপরে আছেন। জসীম উদ্দীনকে নিয়েও আমাদের মনে অনেক আবেগ রয়েছে; তিনি বাংলার পল্লিকবি; কিন্তু তাঁর কবিতা বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি পড়েন বলে মনে হয় না। শুধু পাঠ্যপুস্তকের স্মৃতি হাতড়ে তাঁকে মহিমান্বিত করে তোলা হয়।
উল্লিখিত সাহিত্যিকদের মতো আরও অনেককে আমরা ‘ভক্তিযোগে’ ‘মূর্তি করে’ মাথার ওপর রেখে দিয়েছি। শুনতে যেমনই লাগুক, এটাই সত্য আমাদের সমাজের ক্ষেত্রে। অন্যদিকে দেখা গেছে ভক্তি যখন পাঠের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় না, তখন তা সমালোচনাহীন আনুগত্যে পরিণত হয়। আর সমালোচনাহীন আনুগত্য খুব সহজেই পরিচয়ের রাজনীতির উপাদান হয়ে ওঠে। মুসলমান মধ্যবিত্ত সমাজের একাংশের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে যেখানে একটি সাংস্কৃতিক নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে আসছিল দীর্ঘদিন ধরে। তাই নজরুল প্রশ্নে বলতে হয় ঔপনিবেশিক ইতিহাস, পাকিস্তানি রাষ্ট্রচিন্তা, ভাষা আন্দোলন পরবর্তী জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মীয় পুনরুত্থান সবকিছু মিলিয়ে এই সমাজ এমন একজন সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক প্রতীক খুঁজেছে, যিনি একই সঙ্গে বাঙালি এবং মুসলমান। নজরুল তাঁদের সেই প্রয়োজন পূরণ করেছেন। ফলে তাঁকে সাহিত্যিকের চেয়ে, সমন্বয়বাদী বা বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের চেয়ে মুসলমানদের প্রতিনিধি হিসেবেই বেশি ব্যবহার করা হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও একটা গোষ্ঠীর কাছে মূর্তিস্বরূপ; অবশ্য যারা তাঁকে গভীরভাবে পড়েন, তাঁদের মধ্যে যেমন সমালোচক আছেন, তেমনি ভক্তও আছেন। কিন্তু নজরুলের ক্ষেত্রে দেখা যায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভক্তি আছে, পাঠ নেই; আবেগ আছে, বিশ্লেষণ নেই; পরিচয় আছে, আত্মস্থতা নেই। এই পরিস্থিতি শুধু নজরুলচর্চার সংকট নয়, একে বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক পাঠসংস্কৃতিরও একটি দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। কারণ আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে বইপড়ার চেয়ে নাম উচ্চারণ করা সহজ; চিন্তা ধারণ করার চেয়ে প্রতীক ব্যবহার করা সহজ, সাহিত্যকে আত্মস্থ করার চেয়ে তাকে পরিচয়ের অলঙ্কারে পরিণত করা সহজ। নজরুল এই প্রবণতার সবচেয়ে বড়ো শিকারদের একজন।
এমন বলার কারণ হলো কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন গভীরভাবে অসাম্প্রদায়িক, বিদ্রোহী এবং মানবমুক্তির কবি। তিনি ইসলামি ঐতিহ্য ব্যবহার করেছেন, কিন্তু কখনো ধর্মীয় সংকীর্ণতাকে সমর্থন করেননি। তিনি হিন্দু পুরাণও ব্যবহার করেছেন সমান স্বাচ্ছন্দ্যে। তাঁর কবিতায় যেমন ‘আল্লাহু আকবর’ আছে, তেমনি আছে ‘ভগবান’, ‘শিব’, ‘কালী’, ‘কৃষ্ণ’ ইত্যাদি। তাঁর সাম্যবাদী মনোভাব ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মানুষের মর্যাদাকে বড়ো করে দেখেছে। তিনি লিখেছিলেন, ‘গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’; কিন্তু আজকের পরিচয়-আবিষ্ট সমাজে এই নজরুলকে কমই দেখা হয়। বরং তাঁকে একটি নিরাপদ ধর্মীয় প্রতীকে রূপান্তর করা হয়েছে। যেন তিনি কেবল মুসলমান সমাজের প্রতিনিধি, কেবল ইসলামি গানের রচয়িতা, কেবল ধর্মীয় আবেগের কবি। তাঁর বিদ্রোহ, তাঁর সমাজতন্ত্র, তাঁর উপনিবেশ-বিরোধিতা, তাঁর ধর্মীয় গোঁড়ামি-বিরোধিতা, তাঁর নারীমুক্তি-চিন্তা প্রভৃতিকে একপ্রকার আড়াল করেই রাখা হয়।
এই আড়ালের পেছনে কাজ করে রাজনীতি এবং তার কৌশল হচ্ছে এক ধরনের সাংস্কৃতিক বাছাইকরণ। সমাজ নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী একজন লেখকের নির্দিষ্ট অংশকে গ্রহণ করে এবং বাকিটা নীরবে বর্জন করে। ফলে যে নজরুল আমাদের সামনে হাজির হন, তিনি পূর্ণ নজরুল নন; তিনি একটি ‘নির্মিত’ নজরুল। আর এই নির্মাণের পেছনে রাষ্ট্র, শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম এবং সাংস্কৃতিক রাজনীতিরও ভূমিকা আছে। পাঠ্যপুস্তকে নজরুলকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন তিনি মূলত বিদ্রোহের প্রতীক এবং ইসলামি চেতনার কবি। তাঁর গভীর বৌদ্ধিক প্রবন্ধ, ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে ভাবনা, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান কিংবা সাহিত্যিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা খুব কম আলোচিত হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা একটি সংক্ষিপ্ত, সরলীকৃত এবং প্রায় ‘পৌরাণিক’ নজরুলকে চিনে বড়ো হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির বড় একটা অংশ সাহিত্যকে পাঠের বিষয় হিসেবে নয়, সাংস্কৃতিক অবস্থানের অংশ হিসেবে ব্যবহার করে। কোন কবিকে সমর্থন করা হচ্ছে, কোন লেখকের নাম উচ্চারণ করা হচ্ছে তা নান্দনিক পছন্দের চেয়ে বরং পরিচয়গত অবস্থানকে বেশি প্রকাশ করে। নজরুল বনাম রবীন্দ্রনাথ বিতর্কের মধ্যেও এই মনস্তত্ত্ব কাজ করে। যে মানুষটি জীবনে রবীন্দ্রনাথের একটি পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ পড়েনি, নজরুলের কোনো বই পড়েনি, তিনিও দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে নজরুল রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বড়ো। বলাবাহুল্য, এই বড়ো হওয়ার মাপকাঠি সাহিত্য নয়; এটি পরিচয়গত আত্মতৃপ্তি। এখানে রবীন্দ্রনাথকে ‘হিন্দু জমিদার’ এবং নজরুলকে ‘মুসলমানদের কবি’ হিসেবে দাঁড় করিয়ে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিশোধের অনুভূতি কাজ করে। অথচ এই অবস্থান শেষপর্যন্ত নজরুলেরই ক্ষতি করে। কারণ এতে তিনি সাহিত্যিক হিসেবে নন, প্রতীক হিসেবেই ব্যবহৃত হন। ফলে নজরুলের প্রকৃত বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যায়।
বাংলাদেশে নজরুল পাঠের সংকট সবচেয়ে বেশি ঘনীভূত হয় নজরুল বিষয়ে অধিকাংশ মানুষের দ্বিধাগ্রস্ততা। কারণ মুসলমান সমাজের কাছে নজরুল নিজেই এক অদ্ভুত এবং জটিল উপস্থিতি। তাই তাদের কাছে নজরুলের ব্যক্তিগত জীবন এবং তাঁর বহুমাত্রিকতা এমন যে, তাঁকে না-পারা যায় সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে, না-পারা যায় প্রত্যাখ্যানও করতে। নজরুলের স্ত্রী ছিলেন প্রমীলা সেনগুপ্ত এবং তাঁদের জ্যেষ্ঠপুত্রের নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণ মহাম্মদ। এরকম নানা বিষয়ে নজরুল প্রশ্নে মুসলমানের মনে দ্বৈততাও কাজ করে। এই দ্বৈততা বা দ্বিধাই নজরুলকে ঘিরে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক সত্য। অবশ্য বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় বরাবরই এক ধরনের দ্বৈততার মধ্যে গঠিত হয়েছে। একদিকে তাদের ভাষা ও লোক-ঐতিহ্য, অন্যদিকে ধর্মীয় পরিচয়। এই দুই প্রবাহ কখনো পরস্পরকে সমর্থন করেছে, কখনো সংঘাত তৈরি করেছে। ঔপনিবেশিক যুগে শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত যখন বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে আধুনিকতার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন মুসলমান-সমাজের বড়ো অংশ অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে ছিল। ফলে বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে অনেক মুসলমানই ‘অপর’ সংস্কৃতি বলে অনুভব করত।
অনেকের মনে গোপন আশঙ্কা ছিল যে, বাঙালি সংস্কৃতি ধারণ করলে ইসলামি স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকবে কি না? এই ঐতিহাসিক সংকটকালে নজরুলের আবির্ভাব। তিনি হাজির হলেন এমন এক কণ্ঠস্বর নিয়ে, যেখানে ইসলামি ঐতিহ্য আছে, আবার শ্যামাসংগীতও আছে; যেখানে আজান আছে, আবার বাঁশির সুরও আছে; যেখানে কারবালার বেদনা আছে, আবার বৃন্দাবনের রাধাকৃষ্ণও আছে। তিনি বাঙালি মুসলমানকে প্রথমবারের মতো অনুভব করালেন যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চা করেও ইসলামি আবেগ প্রকাশ সম্ভব; আর বাংলা সাহিত্য হিন্দুদের যেমন, মুসলমানেরও সাহিত্য। এই কারণেই নজরুল বাঙালি মুসলমানের কাছে শুধু কবি নন; তিনি এক ধরনের সাংস্কৃতিক আশ্রয় হিসেবে আবির্ভূত হলেন। কিন্তু এখানেই তাঁকে নিয়ে দ্বিধার শুরু।
কারণ নজরুল যে ইসলামি চেতনা ধারণ করেছিলেন তা ছিল মুক্ত, মানবতাবাদী এবং সাংস্কৃতিকভাবে উন্মুক্ত। তিনি ধর্মকে কখনো সংকীর্ণ পরিচয়ের অস্ত্র বানাননি। তাঁর ইসলাম ছিল সৌন্দর্যের, সাম্যের এবং বিদ্রোহের ভাষা। তিনি যেমন হামদ-নাত লিখেছেন, তেমনি শ্যামাসঙ্গীত বা বৈষ্ণবপদও লিখেছেন সমান আবেগে। তিনি মহাম্মদের প্রশস্তি লিখতে গিয়ে যেমন উজ্জ্বল, তেমনি বিষ্ণু, শিব বা কৃষ্ণকে নিয়েও লিখতে দ্বিধা করেননি। কিন্তু বাঙালি মুসলমান সমাজের একটি বড়ো অংশ ঐতিহাসিকভাবে এমন এক ধর্মীয় মনস্তত্ত্বে অভ্যস্ত, যেখানে পরিচয়ের সীমানা স্পষ্ট ও কঠোর। ফলে নজরুলের বহুস্বরিকতা তাদের জন্য একই সঙ্গে আকর্ষণীয় ও অস্বস্তিকর। তারা নজরুলকে চান, কারণ তিনি মুসলমান; কিন্তু তাঁর সেই উদার সাংস্কৃতিক চেতনা পুরোপুরি গ্রহণ করতে দ্বিধাবোধও করেন। এই দ্বিধাও যেখানে বহুস্তরীয়।
দ্বিধার একটি গভীরতর দিক হলো নজরুল বাঙালি মুসলমানকে শুধু গৌরব দেননি; তিনি প্রশ্নও করেছেন। তিনি সামন্তবাদ, ধর্মীয় ভণ্ডামি, মোল্লাতন্ত্র, সামাজিক বৈষম্য এবং পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লিখেছেন। কিন্তু যে-সমাজ এখনও পিতৃতান্ত্রিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার ভেতর আবদ্ধ, সেই সমাজের জন্য এই নজরুল অস্বস্তিকর বটে। ফলে তাঁর বিদ্রোহকে রোমান্টিক করা হয়, কিন্তু তাঁর চিন্তার বিপ্লবী দিকগুলোকে পুরোপুরি গ্রহণ করা হয় না। ফলে এটি একটি সাংস্কৃতিক পরিহাস হিসেবেও দৃশ্যমান হয়। যে বাঙালি মুসলমান-সমাজ নজরুলকে নিজেদের কবি বলে গর্ব করে, সেই সমাজই তাঁর আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থানে দাঁড়ায়।
নজরুল ছিলেন মুক্তচিন্তার কবি; কিন্তু অনেকে তাঁর মুক্তচিন্তাকে সন্দেহের চোখে দেখেন। নজরুল ছিলেন সাম্যের কবি, কিন্তু তাঁর ভক্তসমাজের মধ্যেই শ্রেণি ও লিঙ্গবৈষম্য প্রবল। নজরুল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, কিন্তু তাঁকে ব্যবহার করা হয় সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে। সত্যি বলতে এই দ্বিধা নজরুলকে নিয়ে নয়, এটি বাঙালি মুসলমানের নিজের আত্মপরিচয়েরই দ্বিধা। সে কি প্রথমে বাঙালি, না মুসলমান? বাঙালি সংস্কৃতি কি তার নিজস্ব ঐতিহ্য, নাকি কেবল ভাষাগত আবাস? অন্যদিকে ধর্মীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক আধুনিকতা কি একসঙ্গে সম্ভব?
নজরুল প্রশ্নগুলোর সহজ উত্তর দেননি, বরং তাঁর জীবন ও সাহিত্য দিয়ে দেখিয়েছেন যে মানুষের পরিচয় বহুমাত্রিক। তাই নজরুলকে সত্যিকার অর্থে গ্রহণ করা মানে তাঁর বহুত্ববাদকে গ্রহণ করা, তাঁর মানবতাবাদকে গ্রহণ করা, তাঁর সাহসী প্রশ্নগুলোকে গ্রহণ করা। নজরুলকে গ্রহণ করা মানে ঘাড়ের ওপর মূর্তি প্রতিস্থাপন করে শুধু তাঁর নাম উচ্চারণ করা নয়, তাঁর অস্বস্তিকর সত্যগুলোর মুখোমুখি দাঁড়ানো।
এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, তাহলে কি মুসলমান পরিচয়ের কারণে নজরুলের জনপ্রিয়তা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক হয়ে যায়? না, বিষয়টি এমনও নয়। একটি সমাজ তার নিজের ইতিহাস, বঞ্চনা ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা থেকে প্রতীক নির্মাণ করবেই। মুসলমান মধ্যবিত্তশ্রেণি নজরুলের মধ্যে যে নিজের আত্মপরিচয়ের একটি স্বীকৃতি খুঁজে পেয়েছে তা ঐতিহাসিক পরম্পরার ফল হিসেবেই গণ্য করা ভালো। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন পরিচয় সাহিত্যবোধকে প্রতিস্থাপন করে ফেলে। যখন একজন কবিকে পড়ার চেয়ে তাঁকে ‘আমাদের লোক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই প্রধান হয়ে ওঠে, তখন তাঁর সাহিত্যিক মূল্যায়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন সমালোচনা অসম্ভব হয়ে পড়ে, পাঠক আর কবির মুখোমুখি হবার প্রয়োজন বোধ করেন না; বরং তাঁকে একটি পবিত্র প্রতীকে পরিণত করেন।
এই প্রবণতা শুধু নজরুলের ক্ষেত্রে নয়; উপমহাদেশের প্রায় সব সমাজেই এমন উদাহরণ বিদ্যমান। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে তীব্র এই কারণে যে, এখানে সাহিত্য ও সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পরিচয় এবং ধর্মীয় পরিচয়ের দ্বন্দ্বের মধ্যে অবস্থান করেছে। ফলে সাহিত্যিকদেরও রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শিবিরে বিভক্ত করা হয়েছে, গ্রহণ ও বর্জন পরিচিতির মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়ে আসছে।
এ ধরনের বিভাজনের বিপজ্জনক দিক হলো তা প্রকৃত পাঠসংস্কৃতিকে দুর্বল করে দেয়। কারণ পাঠ মানে প্রশ্ন করা, দ্বিমত করা, নতুনভাবে আবিষ্কার করা। কিন্তু পরিচয়ভিত্তিক ভক্তি প্রশ্নকে নিরুৎসাহিত করে; অর্থাৎ, প্রশ্নহীন আনুগত্য প্রকাশ করতে শেখায়। এক্ষেত্রে লেখককে পড়ার চেয়ে তাঁকে নিজের করে তোলা এবং রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে এমন এক সমাজ তৈরি হয়েছে, যেখানে নজরুলের নাম সবাই জানে, কিন্তু তাঁর ‘বর্তমান বিশ্বসাহিত্য’ প্রবন্ধ কেউ পড়ে না; তাঁর ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নিয়ে আলোচনা করে না; তাঁর রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলির দার্শনিকতা নিয়ে আলাপ জুড়েনা; তাঁর উপন্যাস বা ছোটোগল্প প্রায় বিস্মৃত। এমনকি তাঁর অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদও অনেক সময় আড়াল করে দেওয়া হয়। আবার যখন প্রয়োজন হয়, তা তুলেও ধরা হয়।
এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন আসে নজরুল-সত্তার উপরিকাঠামো দিয়ে তাঁর বিচার কি কেবল পাঠকের ব্যর্থতা? নাকি আমাদের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানেরও ব্যর্থতা? জবাবে বলতে হয়, দুটোই। কেননা, আমাদের স্কুলিং হয় সেই একই বৃত্তে; পাঠ্যবইয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতা দিলে নজরুলেরও একটা দিতে হবে। আর নজরুলকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় বিদ্রোহী, প্রেমের ও ইসলামি রেনেসাঁর কবি হিসেবে। এই খোপ থেকে বেশিরভাগই আর কখনো বের হয়ে আসতে পারেনা গোটা জীবনে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নজরুলের ভগ্নদশা সবচেয়ে বেশি, এখানে নজরুল পড়ানো হয় উনিশ শতকীয় জ্ঞান দিয়ে। আবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নজরুলকে নিয়ে যে-সব গবেষণা হয় তা মাস্টার মশাইদের পদোন্নতির জন্য, কিন্তু সেই গবেষণার বড়ো অংশই পুনরাবৃত্তিমূলক এবং অপ্রয়োজনীয়। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও নজরুলকে স্মরণ করে, কিন্তু তাঁকে নতুনভাবে পাঠের উদ্যোগ কম। গণমাধ্যম নজরুলকে ব্যবহার করে বিশেষ দিবসে, কিন্তু তাঁর চিন্তার জটিলতা নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা হয় খুব কম। ফলে নজরুল একটি আনুষ্ঠানিক উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন।
এখানে আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয় কাজ করে যে, পাঠহীন ভক্তি মানুষকে একটি সহজ আত্মপরিচয় দেয়। বইপড়া কষ্টসাধ্য, চিন্তার মুখোমুখি হওয়া অস্বস্তিকর; কিন্তু প্রতীকের প্রতি আনুগত্য সহজ। তাই অনেকের পক্ষে নজরুলকে পড়ার চেয়ে ‘নিজেদের কবি’ হিসেবে দাবি করেই তৃপ্ত থাকা সহজ পথ। অথচ প্রকৃত সাহিত্যিক সম্পর্ক কখনো এত সরল নয়। একজন কবিকে ভালোবাসা মানে তাঁর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানো; তাঁকে প্রশ্ন করা, তাঁর সীমাবদ্ধতা ও শক্তি দুটোকেই বোঝা। পাঠহীন ভক্তি সেই গভীর সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না।
নজরুল-চর্চার এসব ব্যক্তিক ও সাংস্কৃতিক সংকটের উত্তরণ ঘটাতে হলে তাঁকে পাঠ ও পুনর্পাঠ সবচেয়ে জরুরি। পাঠ মানে শুধু আবৃত্তি নয়, বেছে বেছে রচনা পড়াও নয়; বরং একজন জটিল ও আধুনিক বুদ্ধিজীবী হিসেবে নজরুলের সমুদয় রচনায় অবগাহন করা। নজরুলের ইসলামি সংগীত যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাঁর সাম্যবাদী কণ্ঠও গুরুত্বপূর্ণ; তাঁর প্রেমের কবিতা যেমন মূল্যবান, তেমনি তাঁর রাজনৈতিক প্রবন্ধও মূল্যবান। তাঁকে কেবল ‘বিদ্রোহী কবি’ বা ‘প্রেমের কবি’ কিংবা ‘মুসলমান কবি’ হিসেবে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর বহুমাত্রিকতা নষ্ট হয়, গ্রহণযোগ্যতাও হ্রাস পায়। একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বনাম নজরুল এই কৃত্রিম প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকেও বের হয়ে আসতে হবে আমাদের। বাংলা সাহিত্য কোনো শূন্যসম খেলা নয় যে, একজনকে বড়ো করতে হলে আরেকজনকে ছোটো করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল দুই ভিন্ন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, দুই ভিন্ন নন্দনচেতনা এবং দুই ভিন্ন কণ্ঠস্বরের প্রতিনিধি। তাঁদের সম্পর্ক প্রতিযোগিতার নয়, বরং পরস্পরকে সমৃদ্ধ করার। ব্যক্তিগত ও সৃষ্টিশীল জীবনে উভয়েই পরস্পরের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন, দুজনের মধ্যেও ছিল গভীর বন্ধন। অসূয়াবশত এখানে বিরোধ বা বিভেদের কিছু নেই।
তবে এটাও ঠিক যে, দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজ সাহিত্যকে এই উদারতার জায়গা থেকে না দেখে, বরং প্রতীকী আধিপত্যের জায়গা থেকে দেখে। ফলে পাঠের বদলে পরিচয়, চিন্তার বদলে স্লোগান, সাহিত্যবোধের বদলে আবেগ ইত্যাদি প্রাধান্য পায়। তাই নজরুলের প্রতি প্রকৃত সম্মান দেখাতে হলে তাঁকে পড়তে হবে। তাঁর সঙ্গে একমত না হলেও তাঁকে বুঝতে হবে। তাঁর সাহস, দ্বন্দ্ব, প্রশ্ন, বৈপরীত্য এবং মানবতাবাদ প্রভৃতির মুখোমুখি হতে হবে। কারণ একজন কবিকে কেবল নাম উচ্চারণ করে ভালোবাসা যায় না, তাঁকে ভালোবাসতে হলে তাঁর ভাষা, চিন্তা ও স্বপ্নের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। কবির স্বপ্ন ও আশাকে নিজের ভেতর লালন করতে হয়। আজকের বাংলাদেশে নজরুল-চর্চার সবচেয়ে বড়ো সংকট সম্ভবত এই যে, আমরা নজরুলকে স্মরণ করি বেশি, পাঠ করি কম; ব্যবহার করি বেশি, বুঝি কম; প্রতীক বানাই বেশি, আত্মস্থ করি কম। আর এই ‘পাঠহীন ভক্তি’ই শেষ পর্যন্ত একজন জীবন্ত কবিকে সাংস্কৃতিক মূর্তিতে পরিণত করে। নজরুল অনেকের কাছে হয়েছেনও তাই; এই অর্থে নজরুলের সাহিত্য তাদের কাছে অর্থহীনও। যদিও নজরুল অর্থহীনতার কবি নন।
লেখক: কবি, আখ্যান-লেখক ও গবেষক। অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

বলতে দ্বিধা নেই যে যে সমাজে আমরা বসবাস করি সেই সমাজটি বিভিন্ন দিক থেকে অবিকশিত। বিশেষ করে সাতচল্লিশ পরবর্তীকালে বাংলাদেশে যে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব হয়েছে, সে সমাজের ভিতরে-বাইরে রয়েছে নানান সংকট। এর মধ্যে আত্মপরিচয়ের সংকট হচ্ছে সবচেয়ে তীব্র। ভারতীয় সমাজে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষটি জন্ম নেয় মুসলমান আগমনকাল থেকে, বিষয়টি এমন নয়। আর্যবসতির কাল থেকেও যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ পত্রপল্লবে লালিত হয়ে আসছিল তার খোদ প্রমাণ ঋগ্বেদে রয়েছে। ঔপনিবেশিক কালে এই বৃক্ষ পুষ্পমঞ্জরিতে ছেয়ে যেতে থাকে ব্রিটিশবেনিয়াদের আলো-হাওয়ায়; যার নমুনা উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে উদ্ভূত ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদ’। তার আগে মুসলমানদের শাসনযন্ত্র থেকে পতন ও ধর্মীয় গোঁড়ামি ক্রমে তাদের একশেষ করতে ছাড়েনি; আর এরই ফল দাঁড়ায় নিজেদের পরিচয়ের জটিলতা; কূপমণ্ডূকতা, এমনকি হীনম্মন্যতাও। বাংলাদেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির সাহিত্যবোধ প্রশ্নে ও মননশীলতা গঠনে এমনরূপ পরিপ্রেক্ষিত মাথায় রেখেই নজরুল-পাঠ কিংবা নজরুল-চর্চার সংকট নিয়ে আলাপ তোলা সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে প্রথম যে কথাটি বলা যায় তা হলো নজরুল এমন এক সাংস্কৃতিক আইকন; যিনি একাধারে বিপ্লব, বিদ্রোহ, সাম্যবাদ, প্রেম, ইসলামি ঐতিহ্য এবং বাঙালিত্বের প্রতীকও। তাঁর নাম উচ্চারিত হয় রাষ্ট্রীয় মঞ্চে, জাতীয় দিবসে, ধর্মীয় আবেগে, রাজনৈতিক বক্তৃতায় এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। কিন্তু এই বহুল উচ্চারিত নামের আড়ালে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ক্রমশ স্পষ্টও হয়ে ওঠে যে, আমরা কি সত্যিই নজরুলকে পাঠ করি? তাঁর চিন্তা, নন্দন, দর্শন ও মানবিক অবস্থানকে আত্মস্থ করি? তাঁর আদর্শকে ধারণ করি? নাকি আমরা কেবল তাঁর নাম, পরিচয় এবং প্রতীকটিকেই ব্যবহার করি?
এমনসব জিজ্ঞাসার পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণও রয়েছে। নজরুল আমাদের দেশে একটা আবেগ; একটা বিশ্বাস এবং একটা নাম। আর তার কারণ নিছক সাহিত্যিক নয়; বরং গভীরভাবে সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও মনস্তাত্ত্বিক। নজরুল শুধু কবি নন, প্রতীকও। তাঁকে ‘জাতীয় কবি’, ‘বিদ্রোহী কবি’, ‘মুসলমান জাগরণের কবি’ ইত্যাদি বলা হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির বড়ো অংশের মধ্যে নজরুলকে নিয়ে এক ধরনের আবেগপ্রসূত আনুগত্য বিদ্যমান, অথচ সেই আনুগত্যের ভিত পাঠনির্ভর নয়। তাঁরা নজরুলকে শ্রদ্ধা করেন, কারণ তিনি মুসলমান সমাজ থেকে আগত, তাও আবার দরিদ্রশ্রেণি থেকে উদ্ভূত বলে। অন্যদিকে এই আবেগী শ্রেণি নজরুলকে রবীন্দ্রনাথের বিপরীতেও দাঁড় করান, কারণ এতে একটি সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার মনস্তত্ত্ব কাজ করে। অথচ এঁদের অধিকাংশই নজরুলের প্রবন্ধ, উপন্যাস কিংবা গল্প পড়েন না; এমনকি তাঁর কবিতারও সীমিত কয়েকটি অংশের বাইরে প্রবেশ করেন না। ফলে নজরুল একটি জীবন্ত বৌদ্ধিক সত্তা না হয়ে ধীরে ধীরে একটি পরিচয়ের প্রতীকে পরিণত হন। অন্যভাবে বলতে গেলে বাংলাদেশে নজরুল এক ধরনের পৌত্তলিকতা দ্বারা আক্রান্ত। অনেকের কাছে নজরুল একটা টোটেমমাত্র।
‘পৌত্তলিকতা’ বা ‘টোটেম’ শব্দটি এখানে ধর্মতাত্ত্বিক অর্থে ব্যবহার করা হয়নি; বরং সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কারণ পৌত্তলিকতা এমন এক মানসিক প্রবণতা, যেখানে মানুষ কোনো ব্যক্তি, প্রতীক বা নামকে চিন্তার বিষয় হিসেবে নয়, ভক্তির বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। সেখানে অনুধাবন বা অনুশীলনের চেয়ে প্রতীক বড় হয়ে ওঠে; বিশ্লেষণের চেয়ে আনুগত্য, চিন্তার চেয়ে পরিচয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, বাঙালি মুসলমানের একাংশের মধ্যে নজরুলের সঙ্গে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা সাহিত্যিক আত্মস্থতার চেয়ে প্রতীকমূলক আনুগত্যের কাছাকাছি। বরং বলা ভালো যে, অনেকে নজরুলকে মুসলমান আত্মপরিচয়ের ‘সাংস্কৃতিক মূর্তি’ হিসেবে ধারণ করেছেন। অর্থাৎ এই মানসিকতার সঙ্গে ‘পৌত্তলিকতা’র সাযুজ্য বর্তমান। অন্যদিকে পৌত্তলিক মানসিকতা মূলত প্রতীকনির্ভর। সেখানে বস্তু বা প্রতীক তার বাস্তব সীমা ছাড়িয়ে ‘পবিত্র মর্যাদা’ অর্জন করে। মানুষ তখন প্রতীকের অর্থ নিয়ে নয়, প্রতীকের উপস্থিতি নিয়ে আবেগী হয়ে ওঠে। এই প্রতীককে প্রশ্ন করা যায় না; তাকে কেবল শ্রদ্ধা করা যায়। ফলে চিন্তা ধীরে ধীরে আচার বা প্রথা হয়ে ওঠে। নজরুলের ক্ষেত্রেও এমন ঘটেছে যে, তাঁকে ভালোবাসা হয়, কিন্তু পুরোটা গ্রহণ করা হয় না। একেই প্রতীকী ভক্তির লক্ষণ বলে চিহ্নিত করা যায়।
অবশ্য এই প্রতীকমনস্কতা বাঙালি মুসলমানের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক মানসের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায় যে, কঠোর একেশ্বরবাদী ধর্ম গ্রহণ করলেও বাঙালি মুসলমান-সমাজ সম্পূর্ণভাবে প্রতীকবিমুখ হতে পারেনি। পিরের মাজার, দরগাহ, তাবিজ, পবিত্র বস্তু, অলৌকিকতার বিশ্বাস, নেতার ছবি মাথার উপরে রাখা ইত্যাদি এখনও জনপ্রিয়। কারণ তাদের মন সহজে বিমূর্ততায় স্থির থাকতে পারে না; সে দৃশ্যমান প্রতীক আকাঙ্ক্ষা করে।
এই প্রতীকপ্রবণতা আধুনিক কালেও রূপবদল করেছে। এখন মাজারের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতা, ধর্মীয় বক্তা, সাহিত্যিক কিংবা জাতীয় প্রতীকও ভক্তির কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ফলে পৌত্তলিকতা কেবল মূর্তিপূজার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি মানসিক গঠনের অংশ হয়ে আছে। নজরুলকে ঘিরে যে-ভক্তি, তার ভেতরেও এই মনস্তত্ত্ব কাজ করে। বাঙালি মুসলমান-সমাজের একাংশ তাঁকে এমনভাবে ধারণ করেছে যে, যেন তিনি কেবল একজন কবি নন, বরং মুসলমান আত্মপরিচয়ের পবিত্র প্রতীক। তাই তাঁকে নিয়ে সমালোচনা অনেক সময়ে অস্বস্তি তৈরি করে। তাঁর এমন সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথাবলা অসম্মানের সমান হয়ে ওঠে। নজরুলকে নিয়ে আহমদ শরীফ কিংবা হুমায়ুন আজাদের মূল্যায়ন তাই ধোপে টিকে না; নজরুল-প্রেমীদের কাছে উভয়েই এখন বিরাগভাজন হয়ে আছেন।
বলতে গেলে এখান থেকেই নজরুলকে ‘পাঠহীন ভক্তি’র সূত্রপাত। এটা যে কেবল নজরুলের বেলায় প্রযোজ্য তাও কিন্তু নয়। বাংলাদেশে জীবনানন্দ দাশকে বড়ো কবি হিসেবে মানা হয়, কিংবা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে বড়োমাপের কথাসাহিত্যিক হিসেবে দেখা হয়; অথচ শিক্ষিত পাঠকের কাছেও যে তাঁরা ঠিকমতো পৌঁছেছেন তা বলা যায় না। পাঠ না-করেই তাঁরা মাথার উপরে আছেন। জসীম উদ্দীনকে নিয়েও আমাদের মনে অনেক আবেগ রয়েছে; তিনি বাংলার পল্লিকবি; কিন্তু তাঁর কবিতা বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি পড়েন বলে মনে হয় না। শুধু পাঠ্যপুস্তকের স্মৃতি হাতড়ে তাঁকে মহিমান্বিত করে তোলা হয়।
উল্লিখিত সাহিত্যিকদের মতো আরও অনেককে আমরা ‘ভক্তিযোগে’ ‘মূর্তি করে’ মাথার ওপর রেখে দিয়েছি। শুনতে যেমনই লাগুক, এটাই সত্য আমাদের সমাজের ক্ষেত্রে। অন্যদিকে দেখা গেছে ভক্তি যখন পাঠের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় না, তখন তা সমালোচনাহীন আনুগত্যে পরিণত হয়। আর সমালোচনাহীন আনুগত্য খুব সহজেই পরিচয়ের রাজনীতির উপাদান হয়ে ওঠে। মুসলমান মধ্যবিত্ত সমাজের একাংশের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে যেখানে একটি সাংস্কৃতিক নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে আসছিল দীর্ঘদিন ধরে। তাই নজরুল প্রশ্নে বলতে হয় ঔপনিবেশিক ইতিহাস, পাকিস্তানি রাষ্ট্রচিন্তা, ভাষা আন্দোলন পরবর্তী জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মীয় পুনরুত্থান সবকিছু মিলিয়ে এই সমাজ এমন একজন সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক প্রতীক খুঁজেছে, যিনি একই সঙ্গে বাঙালি এবং মুসলমান। নজরুল তাঁদের সেই প্রয়োজন পূরণ করেছেন। ফলে তাঁকে সাহিত্যিকের চেয়ে, সমন্বয়বাদী বা বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের চেয়ে মুসলমানদের প্রতিনিধি হিসেবেই বেশি ব্যবহার করা হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও একটা গোষ্ঠীর কাছে মূর্তিস্বরূপ; অবশ্য যারা তাঁকে গভীরভাবে পড়েন, তাঁদের মধ্যে যেমন সমালোচক আছেন, তেমনি ভক্তও আছেন। কিন্তু নজরুলের ক্ষেত্রে দেখা যায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভক্তি আছে, পাঠ নেই; আবেগ আছে, বিশ্লেষণ নেই; পরিচয় আছে, আত্মস্থতা নেই। এই পরিস্থিতি শুধু নজরুলচর্চার সংকট নয়, একে বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক পাঠসংস্কৃতিরও একটি দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। কারণ আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে বইপড়ার চেয়ে নাম উচ্চারণ করা সহজ; চিন্তা ধারণ করার চেয়ে প্রতীক ব্যবহার করা সহজ, সাহিত্যকে আত্মস্থ করার চেয়ে তাকে পরিচয়ের অলঙ্কারে পরিণত করা সহজ। নজরুল এই প্রবণতার সবচেয়ে বড়ো শিকারদের একজন।
এমন বলার কারণ হলো কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন গভীরভাবে অসাম্প্রদায়িক, বিদ্রোহী এবং মানবমুক্তির কবি। তিনি ইসলামি ঐতিহ্য ব্যবহার করেছেন, কিন্তু কখনো ধর্মীয় সংকীর্ণতাকে সমর্থন করেননি। তিনি হিন্দু পুরাণও ব্যবহার করেছেন সমান স্বাচ্ছন্দ্যে। তাঁর কবিতায় যেমন ‘আল্লাহু আকবর’ আছে, তেমনি আছে ‘ভগবান’, ‘শিব’, ‘কালী’, ‘কৃষ্ণ’ ইত্যাদি। তাঁর সাম্যবাদী মনোভাব ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মানুষের মর্যাদাকে বড়ো করে দেখেছে। তিনি লিখেছিলেন, ‘গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’; কিন্তু আজকের পরিচয়-আবিষ্ট সমাজে এই নজরুলকে কমই দেখা হয়। বরং তাঁকে একটি নিরাপদ ধর্মীয় প্রতীকে রূপান্তর করা হয়েছে। যেন তিনি কেবল মুসলমান সমাজের প্রতিনিধি, কেবল ইসলামি গানের রচয়িতা, কেবল ধর্মীয় আবেগের কবি। তাঁর বিদ্রোহ, তাঁর সমাজতন্ত্র, তাঁর উপনিবেশ-বিরোধিতা, তাঁর ধর্মীয় গোঁড়ামি-বিরোধিতা, তাঁর নারীমুক্তি-চিন্তা প্রভৃতিকে একপ্রকার আড়াল করেই রাখা হয়।
এই আড়ালের পেছনে কাজ করে রাজনীতি এবং তার কৌশল হচ্ছে এক ধরনের সাংস্কৃতিক বাছাইকরণ। সমাজ নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী একজন লেখকের নির্দিষ্ট অংশকে গ্রহণ করে এবং বাকিটা নীরবে বর্জন করে। ফলে যে নজরুল আমাদের সামনে হাজির হন, তিনি পূর্ণ নজরুল নন; তিনি একটি ‘নির্মিত’ নজরুল। আর এই নির্মাণের পেছনে রাষ্ট্র, শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম এবং সাংস্কৃতিক রাজনীতিরও ভূমিকা আছে। পাঠ্যপুস্তকে নজরুলকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন তিনি মূলত বিদ্রোহের প্রতীক এবং ইসলামি চেতনার কবি। তাঁর গভীর বৌদ্ধিক প্রবন্ধ, ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে ভাবনা, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান কিংবা সাহিত্যিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা খুব কম আলোচিত হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা একটি সংক্ষিপ্ত, সরলীকৃত এবং প্রায় ‘পৌরাণিক’ নজরুলকে চিনে বড়ো হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির বড় একটা অংশ সাহিত্যকে পাঠের বিষয় হিসেবে নয়, সাংস্কৃতিক অবস্থানের অংশ হিসেবে ব্যবহার করে। কোন কবিকে সমর্থন করা হচ্ছে, কোন লেখকের নাম উচ্চারণ করা হচ্ছে তা নান্দনিক পছন্দের চেয়ে বরং পরিচয়গত অবস্থানকে বেশি প্রকাশ করে। নজরুল বনাম রবীন্দ্রনাথ বিতর্কের মধ্যেও এই মনস্তত্ত্ব কাজ করে। যে মানুষটি জীবনে রবীন্দ্রনাথের একটি পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ পড়েনি, নজরুলের কোনো বই পড়েনি, তিনিও দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে নজরুল রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বড়ো। বলাবাহুল্য, এই বড়ো হওয়ার মাপকাঠি সাহিত্য নয়; এটি পরিচয়গত আত্মতৃপ্তি। এখানে রবীন্দ্রনাথকে ‘হিন্দু জমিদার’ এবং নজরুলকে ‘মুসলমানদের কবি’ হিসেবে দাঁড় করিয়ে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিশোধের অনুভূতি কাজ করে। অথচ এই অবস্থান শেষপর্যন্ত নজরুলেরই ক্ষতি করে। কারণ এতে তিনি সাহিত্যিক হিসেবে নন, প্রতীক হিসেবেই ব্যবহৃত হন। ফলে নজরুলের প্রকৃত বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যায়।
বাংলাদেশে নজরুল পাঠের সংকট সবচেয়ে বেশি ঘনীভূত হয় নজরুল বিষয়ে অধিকাংশ মানুষের দ্বিধাগ্রস্ততা। কারণ মুসলমান সমাজের কাছে নজরুল নিজেই এক অদ্ভুত এবং জটিল উপস্থিতি। তাই তাদের কাছে নজরুলের ব্যক্তিগত জীবন এবং তাঁর বহুমাত্রিকতা এমন যে, তাঁকে না-পারা যায় সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে, না-পারা যায় প্রত্যাখ্যানও করতে। নজরুলের স্ত্রী ছিলেন প্রমীলা সেনগুপ্ত এবং তাঁদের জ্যেষ্ঠপুত্রের নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণ মহাম্মদ। এরকম নানা বিষয়ে নজরুল প্রশ্নে মুসলমানের মনে দ্বৈততাও কাজ করে। এই দ্বৈততা বা দ্বিধাই নজরুলকে ঘিরে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক সত্য। অবশ্য বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় বরাবরই এক ধরনের দ্বৈততার মধ্যে গঠিত হয়েছে। একদিকে তাদের ভাষা ও লোক-ঐতিহ্য, অন্যদিকে ধর্মীয় পরিচয়। এই দুই প্রবাহ কখনো পরস্পরকে সমর্থন করেছে, কখনো সংঘাত তৈরি করেছে। ঔপনিবেশিক যুগে শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত যখন বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে আধুনিকতার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন মুসলমান-সমাজের বড়ো অংশ অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে ছিল। ফলে বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে অনেক মুসলমানই ‘অপর’ সংস্কৃতি বলে অনুভব করত।
অনেকের মনে গোপন আশঙ্কা ছিল যে, বাঙালি সংস্কৃতি ধারণ করলে ইসলামি স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকবে কি না? এই ঐতিহাসিক সংকটকালে নজরুলের আবির্ভাব। তিনি হাজির হলেন এমন এক কণ্ঠস্বর নিয়ে, যেখানে ইসলামি ঐতিহ্য আছে, আবার শ্যামাসংগীতও আছে; যেখানে আজান আছে, আবার বাঁশির সুরও আছে; যেখানে কারবালার বেদনা আছে, আবার বৃন্দাবনের রাধাকৃষ্ণও আছে। তিনি বাঙালি মুসলমানকে প্রথমবারের মতো অনুভব করালেন যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চা করেও ইসলামি আবেগ প্রকাশ সম্ভব; আর বাংলা সাহিত্য হিন্দুদের যেমন, মুসলমানেরও সাহিত্য। এই কারণেই নজরুল বাঙালি মুসলমানের কাছে শুধু কবি নন; তিনি এক ধরনের সাংস্কৃতিক আশ্রয় হিসেবে আবির্ভূত হলেন। কিন্তু এখানেই তাঁকে নিয়ে দ্বিধার শুরু।
কারণ নজরুল যে ইসলামি চেতনা ধারণ করেছিলেন তা ছিল মুক্ত, মানবতাবাদী এবং সাংস্কৃতিকভাবে উন্মুক্ত। তিনি ধর্মকে কখনো সংকীর্ণ পরিচয়ের অস্ত্র বানাননি। তাঁর ইসলাম ছিল সৌন্দর্যের, সাম্যের এবং বিদ্রোহের ভাষা। তিনি যেমন হামদ-নাত লিখেছেন, তেমনি শ্যামাসঙ্গীত বা বৈষ্ণবপদও লিখেছেন সমান আবেগে। তিনি মহাম্মদের প্রশস্তি লিখতে গিয়ে যেমন উজ্জ্বল, তেমনি বিষ্ণু, শিব বা কৃষ্ণকে নিয়েও লিখতে দ্বিধা করেননি। কিন্তু বাঙালি মুসলমান সমাজের একটি বড়ো অংশ ঐতিহাসিকভাবে এমন এক ধর্মীয় মনস্তত্ত্বে অভ্যস্ত, যেখানে পরিচয়ের সীমানা স্পষ্ট ও কঠোর। ফলে নজরুলের বহুস্বরিকতা তাদের জন্য একই সঙ্গে আকর্ষণীয় ও অস্বস্তিকর। তারা নজরুলকে চান, কারণ তিনি মুসলমান; কিন্তু তাঁর সেই উদার সাংস্কৃতিক চেতনা পুরোপুরি গ্রহণ করতে দ্বিধাবোধও করেন। এই দ্বিধাও যেখানে বহুস্তরীয়।
দ্বিধার একটি গভীরতর দিক হলো নজরুল বাঙালি মুসলমানকে শুধু গৌরব দেননি; তিনি প্রশ্নও করেছেন। তিনি সামন্তবাদ, ধর্মীয় ভণ্ডামি, মোল্লাতন্ত্র, সামাজিক বৈষম্য এবং পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লিখেছেন। কিন্তু যে-সমাজ এখনও পিতৃতান্ত্রিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার ভেতর আবদ্ধ, সেই সমাজের জন্য এই নজরুল অস্বস্তিকর বটে। ফলে তাঁর বিদ্রোহকে রোমান্টিক করা হয়, কিন্তু তাঁর চিন্তার বিপ্লবী দিকগুলোকে পুরোপুরি গ্রহণ করা হয় না। ফলে এটি একটি সাংস্কৃতিক পরিহাস হিসেবেও দৃশ্যমান হয়। যে বাঙালি মুসলমান-সমাজ নজরুলকে নিজেদের কবি বলে গর্ব করে, সেই সমাজই তাঁর আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থানে দাঁড়ায়।
নজরুল ছিলেন মুক্তচিন্তার কবি; কিন্তু অনেকে তাঁর মুক্তচিন্তাকে সন্দেহের চোখে দেখেন। নজরুল ছিলেন সাম্যের কবি, কিন্তু তাঁর ভক্তসমাজের মধ্যেই শ্রেণি ও লিঙ্গবৈষম্য প্রবল। নজরুল ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, কিন্তু তাঁকে ব্যবহার করা হয় সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে। সত্যি বলতে এই দ্বিধা নজরুলকে নিয়ে নয়, এটি বাঙালি মুসলমানের নিজের আত্মপরিচয়েরই দ্বিধা। সে কি প্রথমে বাঙালি, না মুসলমান? বাঙালি সংস্কৃতি কি তার নিজস্ব ঐতিহ্য, নাকি কেবল ভাষাগত আবাস? অন্যদিকে ধর্মীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক আধুনিকতা কি একসঙ্গে সম্ভব?
নজরুল প্রশ্নগুলোর সহজ উত্তর দেননি, বরং তাঁর জীবন ও সাহিত্য দিয়ে দেখিয়েছেন যে মানুষের পরিচয় বহুমাত্রিক। তাই নজরুলকে সত্যিকার অর্থে গ্রহণ করা মানে তাঁর বহুত্ববাদকে গ্রহণ করা, তাঁর মানবতাবাদকে গ্রহণ করা, তাঁর সাহসী প্রশ্নগুলোকে গ্রহণ করা। নজরুলকে গ্রহণ করা মানে ঘাড়ের ওপর মূর্তি প্রতিস্থাপন করে শুধু তাঁর নাম উচ্চারণ করা নয়, তাঁর অস্বস্তিকর সত্যগুলোর মুখোমুখি দাঁড়ানো।
এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, তাহলে কি মুসলমান পরিচয়ের কারণে নজরুলের জনপ্রিয়তা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক হয়ে যায়? না, বিষয়টি এমনও নয়। একটি সমাজ তার নিজের ইতিহাস, বঞ্চনা ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা থেকে প্রতীক নির্মাণ করবেই। মুসলমান মধ্যবিত্তশ্রেণি নজরুলের মধ্যে যে নিজের আত্মপরিচয়ের একটি স্বীকৃতি খুঁজে পেয়েছে তা ঐতিহাসিক পরম্পরার ফল হিসেবেই গণ্য করা ভালো। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন পরিচয় সাহিত্যবোধকে প্রতিস্থাপন করে ফেলে। যখন একজন কবিকে পড়ার চেয়ে তাঁকে ‘আমাদের লোক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই প্রধান হয়ে ওঠে, তখন তাঁর সাহিত্যিক মূল্যায়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন সমালোচনা অসম্ভব হয়ে পড়ে, পাঠক আর কবির মুখোমুখি হবার প্রয়োজন বোধ করেন না; বরং তাঁকে একটি পবিত্র প্রতীকে পরিণত করেন।
এই প্রবণতা শুধু নজরুলের ক্ষেত্রে নয়; উপমহাদেশের প্রায় সব সমাজেই এমন উদাহরণ বিদ্যমান। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে তীব্র এই কারণে যে, এখানে সাহিত্য ও সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পরিচয় এবং ধর্মীয় পরিচয়ের দ্বন্দ্বের মধ্যে অবস্থান করেছে। ফলে সাহিত্যিকদেরও রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শিবিরে বিভক্ত করা হয়েছে, গ্রহণ ও বর্জন পরিচিতির মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়ে আসছে।
এ ধরনের বিভাজনের বিপজ্জনক দিক হলো তা প্রকৃত পাঠসংস্কৃতিকে দুর্বল করে দেয়। কারণ পাঠ মানে প্রশ্ন করা, দ্বিমত করা, নতুনভাবে আবিষ্কার করা। কিন্তু পরিচয়ভিত্তিক ভক্তি প্রশ্নকে নিরুৎসাহিত করে; অর্থাৎ, প্রশ্নহীন আনুগত্য প্রকাশ করতে শেখায়। এক্ষেত্রে লেখককে পড়ার চেয়ে তাঁকে নিজের করে তোলা এবং রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে এমন এক সমাজ তৈরি হয়েছে, যেখানে নজরুলের নাম সবাই জানে, কিন্তু তাঁর ‘বর্তমান বিশ্বসাহিত্য’ প্রবন্ধ কেউ পড়ে না; তাঁর ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নিয়ে আলোচনা করে না; তাঁর রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলির দার্শনিকতা নিয়ে আলাপ জুড়েনা; তাঁর উপন্যাস বা ছোটোগল্প প্রায় বিস্মৃত। এমনকি তাঁর অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদও অনেক সময় আড়াল করে দেওয়া হয়। আবার যখন প্রয়োজন হয়, তা তুলেও ধরা হয়।
এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন আসে নজরুল-সত্তার উপরিকাঠামো দিয়ে তাঁর বিচার কি কেবল পাঠকের ব্যর্থতা? নাকি আমাদের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানেরও ব্যর্থতা? জবাবে বলতে হয়, দুটোই। কেননা, আমাদের স্কুলিং হয় সেই একই বৃত্তে; পাঠ্যবইয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতা দিলে নজরুলেরও একটা দিতে হবে। আর নজরুলকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় বিদ্রোহী, প্রেমের ও ইসলামি রেনেসাঁর কবি হিসেবে। এই খোপ থেকে বেশিরভাগই আর কখনো বের হয়ে আসতে পারেনা গোটা জীবনে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নজরুলের ভগ্নদশা সবচেয়ে বেশি, এখানে নজরুল পড়ানো হয় উনিশ শতকীয় জ্ঞান দিয়ে। আবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নজরুলকে নিয়ে যে-সব গবেষণা হয় তা মাস্টার মশাইদের পদোন্নতির জন্য, কিন্তু সেই গবেষণার বড়ো অংশই পুনরাবৃত্তিমূলক এবং অপ্রয়োজনীয়। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও নজরুলকে স্মরণ করে, কিন্তু তাঁকে নতুনভাবে পাঠের উদ্যোগ কম। গণমাধ্যম নজরুলকে ব্যবহার করে বিশেষ দিবসে, কিন্তু তাঁর চিন্তার জটিলতা নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা হয় খুব কম। ফলে নজরুল একটি আনুষ্ঠানিক উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন।
এখানে আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয় কাজ করে যে, পাঠহীন ভক্তি মানুষকে একটি সহজ আত্মপরিচয় দেয়। বইপড়া কষ্টসাধ্য, চিন্তার মুখোমুখি হওয়া অস্বস্তিকর; কিন্তু প্রতীকের প্রতি আনুগত্য সহজ। তাই অনেকের পক্ষে নজরুলকে পড়ার চেয়ে ‘নিজেদের কবি’ হিসেবে দাবি করেই তৃপ্ত থাকা সহজ পথ। অথচ প্রকৃত সাহিত্যিক সম্পর্ক কখনো এত সরল নয়। একজন কবিকে ভালোবাসা মানে তাঁর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানো; তাঁকে প্রশ্ন করা, তাঁর সীমাবদ্ধতা ও শক্তি দুটোকেই বোঝা। পাঠহীন ভক্তি সেই গভীর সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না।
নজরুল-চর্চার এসব ব্যক্তিক ও সাংস্কৃতিক সংকটের উত্তরণ ঘটাতে হলে তাঁকে পাঠ ও পুনর্পাঠ সবচেয়ে জরুরি। পাঠ মানে শুধু আবৃত্তি নয়, বেছে বেছে রচনা পড়াও নয়; বরং একজন জটিল ও আধুনিক বুদ্ধিজীবী হিসেবে নজরুলের সমুদয় রচনায় অবগাহন করা। নজরুলের ইসলামি সংগীত যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাঁর সাম্যবাদী কণ্ঠও গুরুত্বপূর্ণ; তাঁর প্রেমের কবিতা যেমন মূল্যবান, তেমনি তাঁর রাজনৈতিক প্রবন্ধও মূল্যবান। তাঁকে কেবল ‘বিদ্রোহী কবি’ বা ‘প্রেমের কবি’ কিংবা ‘মুসলমান কবি’ হিসেবে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর বহুমাত্রিকতা নষ্ট হয়, গ্রহণযোগ্যতাও হ্রাস পায়। একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বনাম নজরুল এই কৃত্রিম প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকেও বের হয়ে আসতে হবে আমাদের। বাংলা সাহিত্য কোনো শূন্যসম খেলা নয় যে, একজনকে বড়ো করতে হলে আরেকজনকে ছোটো করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল দুই ভিন্ন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, দুই ভিন্ন নন্দনচেতনা এবং দুই ভিন্ন কণ্ঠস্বরের প্রতিনিধি। তাঁদের সম্পর্ক প্রতিযোগিতার নয়, বরং পরস্পরকে সমৃদ্ধ করার। ব্যক্তিগত ও সৃষ্টিশীল জীবনে উভয়েই পরস্পরের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন, দুজনের মধ্যেও ছিল গভীর বন্ধন। অসূয়াবশত এখানে বিরোধ বা বিভেদের কিছু নেই।
তবে এটাও ঠিক যে, দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজ সাহিত্যকে এই উদারতার জায়গা থেকে না দেখে, বরং প্রতীকী আধিপত্যের জায়গা থেকে দেখে। ফলে পাঠের বদলে পরিচয়, চিন্তার বদলে স্লোগান, সাহিত্যবোধের বদলে আবেগ ইত্যাদি প্রাধান্য পায়। তাই নজরুলের প্রতি প্রকৃত সম্মান দেখাতে হলে তাঁকে পড়তে হবে। তাঁর সঙ্গে একমত না হলেও তাঁকে বুঝতে হবে। তাঁর সাহস, দ্বন্দ্ব, প্রশ্ন, বৈপরীত্য এবং মানবতাবাদ প্রভৃতির মুখোমুখি হতে হবে। কারণ একজন কবিকে কেবল নাম উচ্চারণ করে ভালোবাসা যায় না, তাঁকে ভালোবাসতে হলে তাঁর ভাষা, চিন্তা ও স্বপ্নের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। কবির স্বপ্ন ও আশাকে নিজের ভেতর লালন করতে হয়। আজকের বাংলাদেশে নজরুল-চর্চার সবচেয়ে বড়ো সংকট সম্ভবত এই যে, আমরা নজরুলকে স্মরণ করি বেশি, পাঠ করি কম; ব্যবহার করি বেশি, বুঝি কম; প্রতীক বানাই বেশি, আত্মস্থ করি কম। আর এই ‘পাঠহীন ভক্তি’ই শেষ পর্যন্ত একজন জীবন্ত কবিকে সাংস্কৃতিক মূর্তিতে পরিণত করে। নজরুল অনেকের কাছে হয়েছেনও তাই; এই অর্থে নজরুলের সাহিত্য তাদের কাছে অর্থহীনও। যদিও নজরুল অর্থহীনতার কবি নন।
লেখক: কবি, আখ্যান-লেখক ও গবেষক। অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

বলা হয়, আমরা যা খাই তার প্রতিচ্ছবি আমাদের ত্বকে ফুটে ওঠে। কোরবানি ঈদ মানেই নানা পদের মাংসের সঙ্গে প্রচুর তেল-মশলার আয়োজন। আমাদের ত্বকে এসব খাবারের প্রভাব পড়তে পারে। ফলে ঈদের সময় ব্রণের উপদ্রব বেড়ে যাওয়া কিংবা ত্বক তেলতেলে হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
৩ ঘণ্টা আগে
প্রতিবারই হয়তো ইচ্ছা করে দূরে কোথাও ঘুরতে যাবেন, কিন্তু সময়ের অভাবে যাওয়া হয়ে ওঠে না। এবারের ঈদের লম্বা ছুটিতে সেই সুযোগটি কাজে লাগাতে পারেন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে নিজের পছন্দের কোনো জায়গা থেকে কয়েক দিন ঘুরে এলে মন ভালো হয়ে যাবে।
৬ ঘণ্টা আগে
সোশ্যাল মিডিয়ার ‘ট্রেন্ডিং’ বিষয় বিক্রেতা-খামারিরা বেশ ভালোই ধরতে জানে। এ কারণেই এবারের ঈদে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’, ‘নেতানিয়াহু’, ‘পুতিন’ আর ‘মোদি’ নামের গরু-মহিষ কোরবানির হাটে আলোচনার তুঙ্গে। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, কেন পশুর এমন বিচিত্র আর বাহারি নাম দেওয়া হয়?
১ দিন আগে
ভূ-পর্যটক তারেক অণুর ধারাবাহিক ভ্রমণ-কাহিনি ‘আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ’-এর ১৪তম পর্ব প্রকাশিত হলো আজ। চোখ রাখুন বাংলা স্ট্রিমের ফিচার পাতায়।
১ দিন আগে