ওমানে একসঙ্গে মৃত্যু

এক বাড়িতে চার ভাইয়ের থাকার স্বপ্ন শেষ হলো পাশাপাশি কবরে

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
চট্টগ্রাম

প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬, ১৭: ৩০
প্রবাসে মারা যাওয়া চার ভাইয়ের জানাজা। সংগৃহীত ছবি

একটি সরু পথ পেরিয়ে মানুষ ভিড় করছেন জামাল উদ্দিনের বাড়িতে। বাড়ির সামনে সারি করে রাখা চারটি কফিন। চার ভাই ওমানে একসঙ্গে মারা গেছেন। তাঁদের কফিন ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন শতাধিক মানুষ। এর মধ্যে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছে স্বজনদের আহাজারিতে।

বুধবার (২০ মে) সকাল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের বন্দেরাজার পাড়ায় গিয়ে এই দৃশ্য দেখা যায়। তার আগে চার সহোদরের মরদেহ ভোরের দিকে গ্রামের বাড়ি পৌঁছে। তাঁরা হলেন রাশেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সহিদুল ইসলাম ও সিরাজুল ইসলাম। তাঁদের মধ্যে দুজনের গত শুক্রবার (১৫ মে) দেশে ফেরার কথা ছিল।

এর আগে মঙ্গলবার রাতে ওমানের রাজধানী মাস্কাট থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে তাদের মরদেহ দেশে আনা হয়। রাজধানী হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সরকারি ব্যবস্থাপনায় ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহগুলো গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। একই ফ্লাইটে নিহতদের স্বজন ফজলুল হকও দেশে ফেরেন।

স্বজনরা জানান, ১৩ মে ওমানের আল মিলাদ্দাহ এলাকায় একটি গাড়ির ভেতর থেকে চার ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করে ওমান রয়্যাল পুলিশ। ময়নাতদন্ত শেষে পুলিশ জানায়, বিষাক্ত গ্যাসের কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, গাড়ির শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র থেকে ওই গ্যাস নির্গত হয়েছিল।

প্রবাসে একসঙ্গে মারা যাওয়া রাঙ্গুনিয়ার চার ভাই। সংগৃহীত ছবি
প্রবাসে একসঙ্গে মারা যাওয়া রাঙ্গুনিয়ার চার ভাই। সংগৃহীত ছবি

তাদের খালাতো ভাই এমরান হোসেনসহ পরিবারের সদস্যরা জানান, চার ভাইয়ের বাবা জামাল উদ্দিন অনেক আগেই মারা গেছেন। তখন সবচেয়ে ছোট ভাইয়ের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। এরপর তাঁদের মা অনেক কষ্ট করে সন্তানদের বড় করেন। প্রায় এক যুগ আগে মেজ সন্তান প্রথমে ওমানে যান। পরে একে একে অন্য ভাইয়েরাও সেখানে পাড়ি জমান। প্রবাসে তাঁরা গাড়ি ধোয়ার ব্যবসা গড়ে তোলেন। এতেই আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে ওঠেন তাঁরা।

একই বাড়িতে থাকার পরিকল্পনা ছিল চার ভাইয়ের। এ জন্য চার বছর আগে গ্রামের বাড়িতে ৩০ শতাংশ জমির ওপর নতুন ভবন নির্মাণ শুরু করেন তাঁরা। স্বপ্নের সেই বাড়ির নিচতলার কাজ এখনো শেষ হয়নি। এর মধ্যে তাঁদের হারাল পরিবার।

মৃতদের মধ্যে রাশেদ ও শাহেদ বিবাহিত ছিলেন। তার মধ্যে শাহেদের বিয়ে হয়েছে মাত্র আট মাস আগে। পরিবারের একমাত্র জীবিত ভাই এনামুল হক স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। ভাইদের মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তাদের মা-ও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে পরিবার জানিয়েছে।

বুধবার সকাল ১১টার দিকে হোসনাবাদ লালানগর উচ্চবিদ্যালয় মাঠে চার ভাইয়ের একসঙ্গে জানাজা হয়। এতে অংশ নেন আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েকশ মানুষ। মাঠ ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী সড়ক পর্যন্ত দাঁড়িয়েছিল জামাতের কাতার। পরে বন্দেরাজার পাড়া জামে মসজিদসংলগ্ন কবরস্থানে পাশাপাশি কবরে চারজনের দাফন সম্পন্ন হয়।

চার ভাইয়ের পরিবার একসঙ্গে থাকার স্বপ্নে তৈরি হচ্ছিল ভবন। স্ট্রিম ছবি
চার ভাইয়ের পরিবার একসঙ্গে থাকার স্বপ্নে তৈরি হচ্ছিল ভবন। স্ট্রিম ছবি

স্থানীয় মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মওলানা ইদ্রিছ বলেন, একসঙ্গে চারজনের জানাজা ও দাফনের ঘটনা এলাকায় আগে ঘটেনি। প্রয়োজনীয় খাটিয়ার ব্যবস্থা করতেও অন্য মসজিদের সহায়তা নিতে হয়েছে।

এলাকার বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক জাকের হোসেন বলেন, এক পরিবারের চার ভাইকে একসঙ্গে হারানোর ঘটনা মেনে নেওয়া কঠিন। পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকা শোকাহত। সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারকে দাফন ও মরদেহ পরিবহনের জন্য তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল হাসান বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মারা যাওয়া প্রত্যেক প্রবাসীর পরিবার তিন লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সেই অর্থ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত