মাসউদের বক্তব্যে উত্তাপ, স্পিকার বললেন এটি শাহবাগ নয়

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

সংসদে হান্নান মাসউদ। ছবি: সংগৃহীত

‘প্রধানমন্ত্রী অসত্য তথ্য দেন ও ঋণখেলাপিদের উৎসাহিত করেন’—সংসদে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদের এমন বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক হয়েছে। একপর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল হান্নান মাসউদের উদ্দেশ্যে বলেন, এটি শাহবাগ চত্বর নয়, জাতীয় সংসদ।

রোববার (২১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতার ওপর আলোচনার একপর্যায়ে এই বিতর্ক হয়।

বাজেট বক্তৃতায় হান্নান মাসউদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন ভাষণে অসত্য তথ্য দিচ্ছেন। তিনি বলেন যে, বিরোধী দল মিছিল করছে কেন—মদের দাম বাড়ানো হয়েছে, সিগারেটের দাম বাড়ানো হয়েছে। এ রকম অসত্য তথ্য দিয়ে যখন প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেন, আমরা খুবই আশাহত হই। আমরা আশাহত হই, যখন ঋণ নিয়ে কথা বলতে চাই, ব্যাংক নিয়ে কথা বলতে চাই। তখন প্রধানমন্ত্রী দাঁড়িয়ে বলেন, ‘‘আপনারা যারা ঋণ নেন নাই, সবাই জমিদার।’’ এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মূলত ঋণখেলাপিদের উৎসাহিত করছেন।’

এ সময় তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে একাধিক সদস্য দাঁড়িয়ে কথা বলার চেষ্টা করেন। একসঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিন ফারুক দাঁড়িয়ে যান। এরপর স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল থেকে অনুমতি নিয়ে জয়নাল আবদিন ফারুককে কথা বলার সুযোগ দেন ডেপুটি সংসদ স্পিকার।

হান্নান মাসউদের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে জয়নাল আবদিন ফারুক বলেন, ‘আমরা এই সংসদকে কার্যকর করার জন্য একটি সম্মতিতে এসেছি, সংসদে কোনো অসত্য বাক্য উত্থাপন করা হবে না, এমন কোনো কথা বলা হবে না যাতে মান-সম্মান হানি হয়। সংসদ নেতাকে কটূক্তি করা হয়। আজকে নোয়াখালীর সংসদ সদস্য এই সংসদের নেতাকে নিয়ে যে বক্তব্য রেখেছেন তাতে আমরা খুবই ক্ষুব্ধ। কারণ, আমাদের নেতা দীর্ঘ ১৬ বছর দেশের মানুষের গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের জন্য সংগ্রাম করে সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছেন। আমাদের সংসদ নেতাকে নিয়ে যে অসত্য কথা বলা হয়েছে, তা সংসদীয় কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ বা প্রত্যাহার করার জন্য স্পিকারের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।’

এরপর বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ফ্লোর নেন। তিনি বলেন, ‘কোথায় আমাদের সদস্য অসত্য বলেছেন, তা কিন্তু মাননীয় সংসদ সদস্য বলতে পারছেন না। তাঁকে সুনির্দিষ্টভাবে বলতে হবে কোন তথ্যটি ভুল ছিল। সংসদ নেতার সমালোচনা করার অধিকার বিরোধী দলের রয়েছে। আমরা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছি এবং কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদের দিকে ফিরে যেতে চাই না। তাই হান্নান মাসউদের মন্তব্য এক্সপাঞ্জ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি বিবেচনা করার আহ্বান জানাচ্ছি।

নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ যে বক্তব্য রেখেছেন তা সত্য ও সঠিক নয়। আমাদের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক যে কথাটি বলেছেন তা সম্পূর্ণ সত্য ও সঠিক। নোয়াখালীর সংসদ সদস্য তার বক্তব্যে সুনির্দিষ্টভাবেই সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অসত্য বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন।’

এ সময় বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা প্রতিবাদ জানালে মির্জা ফখরুল তাঁদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা যখন কথা বলেন তখন তো আমরা চুপ ছিলাম, আমাদের তো কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। আপনারা ফ্যাসিবাদের কথা বলেন, অথচ ফ্যাসিস্টসুলভ আচরণ আপনাদের মাঝেই দেখা যাচ্ছে।’

স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘হান্নান মাসউদের বক্তব্যে যে অংশটুকু অসত্য আছে, সংসদ নেতার সম্মান রক্ষার্থে সেই বক্তব্যটুকু যেন দয়া করে কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ করা হয়।’

এ সময় হান্নান মাসউদ দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন, এবং কথা বলতে চান। তখন একাধিকবার তাঁকে বসার জন্য অনুরোধ করা হলেও তিনি বসেননি। অনুরোধের একপর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার তাঁকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, ‘মাননীয় সদস্য আপনি বসুন। এটি শাহবাগ চত্বর নয়, জাতীয় সংসদ। তাই সংসদের ভেতরে সংসদীয় নিয়ম ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।’

এসময় হান্নান মাসউদ বসে পড়লে, বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ফ্লোর নেন। তিনি বলেন, ‘সংসদের ভেতরে একটি সংসদীয় রীতি বা নর্মস রয়েছে, বাইরেরও একটা ব্যাকরণ আছে। বাইরের জবাব বাইরে দেওয়া হোক এবং সংসদের জবাব সংসদের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। সংসদের ভেতরে কোনটি সত্য আর কোনটি অসত্য, এই ঝগড়ায় মেতে উঠলে তা সবার জন্যই লজ্জাজনক হতে পারে। তাই কারো সম্মানের হানি না করে এই পুরো বিতর্কিত বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়াই সবার জন্য কল্যাণকর।’

বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর স্পিকার জানান, সংসদীয় রীতিনীতি অনুযায়ী সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত