leadT1ad

আইসিজির প্রতিবেদন, কতটা মসৃণ হবে বাংলাদেশের নির্বাচন

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯: ২২
প্রতীকী ছবি

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের প্রায় দেড় বছর পর বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন হচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচনে প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ নাগরিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। বিগত ১৫ বছরে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর প্রথম গ্রহণযোগ্য কোনো নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন তারা। আর এই নির্বাচনের মাধ্যমে শেষ হবে অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যায়।

সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের (আইসিজি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল এবং সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য রাখার চ্যালেঞ্জগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্জন ‘জুলাই সনদ’। ৮৪ প্রস্তাবনার এই সনদে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাস, বিরোধী দলের নজরদারি শক্তিশালী এবং বিচার বিভাগে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাব কমানোর ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে।

বিএনপি, জামায়াতসহ ২৫টি রাজনৈতিক দল সনদে সই করলেও, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরত রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটি সংস্কারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। বিএনপি সংসদের উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থাসহ সনদের ৯ বিষয়ে আপত্তি দিয়েছিল। যদিও সংস্কারবিরোধী চিহ্নিত হওয়ার ভয়ে দলটি শেষ পর্যন্ত গণভোটে ‘হ্যাঁ’– এর পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। এবার সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই সনদের ওপর গণভোট হবে।

অর্থনৈতিক ফ্রন্টে অন্তর্বর্তী সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তায় ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা এবং বন্দরের কার্যক্রমে গতি আনতে বিদেশি কোম্পানিকে নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। বিচারক নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়ায় সংস্কার এনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুসংহত করার চেষ্টা করেছে। তবে সংস্কারের সব ক্ষেত্রে সমান সাফল্য আসেনি। নিরাপত্তা খাতের সংস্কার অধরাই রয়ে গেছে।

পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা এখনো পুরোপুরি ফেরেনি। ফলে ‘মব’-এর মতো সহিংসতা বেড়েছে। র‌্যাব বা ডিজিএফআইয়ের মতো বিতর্কিত সংস্থাগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের বদলে সরকার অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিচারের দিকেই বেশি নজর দিয়েছে। রক্ষণশীল গোষ্ঠীর বিরোধিতার মুখে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ এমনকি গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের শতাধিক সুপারিশ আলোর মুখ দেখেনি।

আইসিজি বলেছে, অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন গণভোটের ফলাফল যাই হোক না কেন, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর জুলাই সনদের সংস্কার বাস্তবায়নের বড় চাপ থাকবে। তবে অতীতে রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতায় গিয়ে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের নজির থাকায়, শেষ পর্যন্ত সংস্কার কতটুকু বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েই গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন ঘিরে দেশে উৎসবমুখর পরিবেশের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বিরাজ করছে। বিশেষ করে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক অঙ্গন নতুন করে উত্তপ্ত হয়েছে।

আইসিজিসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণ, বাংলাদেশে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সহিংসতার ঐতিহাসিক প্রবণতা রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে এই সহিংসতার হার ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল সহিংসতার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১১ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১৬ রাজনীতিক নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশ বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। এর মধ্যে জুলাইযোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। তফসিলের পরদির রাজধানীতে প্রচারের সময় তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সদস্যরা রয়েছেন– এমন মনে করে সাধারণ মানুষ। হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভারতবিরোধী মনোভাব চাঙ্গা এবং বিভিন্ন স্থানে দেশটির হাইকমিশন, উপহাইকমিশন ছাড়াও গণমাধ্যম কার্যালয় আক্রান্ত হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে ও পরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, আনসার, বিজিবিসহ প্রায় ৯ লাখ কর্মী মোতায়েন করা হবে। এর মধ্যে এক লাখ সেনাসদস্য। তবে পুলিশের ওপর আস্থার সংকট এবং ক্রমবর্ধমান ‘মবকে’ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আইসিজি বলেছে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন– ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা নয়। বরং ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো একটি প্রকৃত জনম্যান্ডেটসম্পন্ন সরকার গঠনের সুযোগ। তবে বিজয়ী দলের সামনে অপেক্ষা করছে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সচল, বিশেষ করে পোশাক শিল্প ও রেমিট্যান্সের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে তাদের অগ্রাধিকার। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানও নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারতকে সামলানো, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বিরোধে ভারসাম্য রক্ষা এবং নিষিদ্ধ হিজবুত তাহরীরের মতো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উত্থান ঠেকানো হবে চ্যালেঞ্জিং। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা পূরণ। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরই বয়স ৩০ বছরের নিচে। তাদের জন্য কর্মসংস্থান এবং জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কার নিশ্চিত করতে না পারলে রাজনৈতিক পরিবর্তনকে তারা কেবল ‘প্রসাধনী’ পরিবর্তন হিসেবে গণ্য করতে পারে, যা ভবিষ্যতে ফের অস্থিরতা তৈরি করবে।

এছাড়া রাজনৈতিক রিকনসিলিয়েশন একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী লীগকে চিরতরে নির্বাচনের বাইরে রাখা কঠিন হলেও, ২০২৪ সালের গণহত্যার জন্য দলটির নেতৃত্বের পক্ষ থেকে কোনো অনুশোচনা না থাকায় তাদের ফিরিয়ে আনার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকার এতদিন স্থিতিশীলতা বজায় রাখলেও, নির্বাচিত সরকারকে এসব জটিলতা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সমাধান খুঁজতে হবে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত