জুলাই জাদুঘরে নেই ফেলানী স্মৃতিস্তম্ভ, ব্যাখ্যা দিলেন ডিজি

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৬, ২১: ৫০
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর গ্রাফিতিতে নতুন করে উঠে আসেন সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফের হত্যার শিকার কিশোরী ফেলানী খাতুন। ছবি: সংগৃহীত

‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ থেকে শহীদ ফেলানী খাতুনের স্মৃতিস্তম্ভ (মনুমেন্ট) সরানোর অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক মাধ্যমেও অনেকে এই নিয়ে পোস্ট দিয়েছেন। তবে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক (ডিজি) তানজিম ইবনে ওয়াহাব জানিয়েছেন, ফেলানী স্মৃতিস্তম্ভ সরানো হয়নি। এটির সঙ্গে আরও কন্টেন্ট পর্যালোচনার জন্য স্টোরে রাখা হয়েছে।

স্ট্রিমকে মহাপরিচালক আরও জানান, আগামী ৫ আগস্ট জুলাই জাদুঘর উদ্বোধন হবে। তার আগে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হবে। উচ্চ পর্যায়ের এই পর্ষদই জাদুঘরের কী কন্টেন্ট থাকবে, কী থাকবে না, সেই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে বাবার সঙ্গে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার সময় বিএসএফের গুলিতে নিহত হন বাংলাদেশি কিশোরী ফেলানী খাতুন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর পাঁচ ঘণ্টা তাঁর লাশ কাঁটাতারে ঝুলে থাকার দৃশ্য দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

নুরুল ইসলাম ও জাহানারা বেগম দম্পতির আট সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছিলেন ফেলানী। ১৯৯৬ সালে জন্ম নেওয়া ফেলানী পরিবারের সঙ্গে ভারতে বসবাস করছিলেন। বিয়ের উদ্দেশে দেশে ফেরার পথেই সীমান্তে প্রাণ হারান। শহীদ ফেলানীকে ‘সীমান্ত হত্যার’ প্রতীক ধরা হয়।

সম্প্রতি জুলাই স্মৃতি জাদুঘর থেকে শহীদ ফেলানীর স্মৃতিস্তম্ভ সরিয়ে ফেলার বিষয় সামাজিক মাধ্যমে আসে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার সাংবাদিক ও লেখক মাসকাওয়াথ আহসানের ফেসবুক পোস্টের নিচে মন্তব্য করেন, ‘এটি (ফেলানী স্মৃতিস্তম্ভ) সরিয়ে ফেলা হয়েছে।’ আবার ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উপসচিব সুকর্ণ আহমেদও জানান, তিনি গত ২৮ মার্চ জাদুঘরে যান। সেখানে ফেলানী স্মৃতিস্তম্ভ দেখতি পাননি।

কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানীর মরদেহের ছবি (বামে), ফেলানীর কবর (ডানে)
কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানীর মরদেহের ছবি (বামে), ফেলানীর কবর (ডানে)

এরপর জুলাই স্মৃতি জাদুঘর জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার জন্য ৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট) পর্যন্ত সময় বেধে দিয়েছেন এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের আগেই জুলাই জাদুঘর চালু করতে হবে। এর ব্যতয় হলে জনগণ নিজেই জাদুঘর উন্মুক্ত করবে।

জাতীয় জাদুঘরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জুলাই জাদুঘরে কী কী কন্টেন্ট প্রদর্শন করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের পর এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। তবে আগামী ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে জাদুঘরটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে।

এ ব্যাপারে জাতীয় জাদুঘরের ডিজি তানজিম ইবনে ওয়াহাব স্ট্রিমকে বলেন, জাদুঘরে কোনো কিছু লুকানোর সুযোগ নেই। কারণ, এটি জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয় এবং তারাই এসে এটি দেখেন। আগামী ৫ আগস্ট জাদুঘরটি উদ্বোধন করা হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের কোনো কন্টেন্ট এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। শুধু ফেলানী নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আমরা অসংখ্য কন্টেন্ট তৈরি করেছি। চূড়ান্ত প্রদর্শনে কী থাকবে আর কী থাকবে না, তা নিয়ে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা চলছে। নতুন পর্ষদ গঠনের পর তারাই সিদ্ধান্ত নেবে।

সামাজিক মাধ্যমের চলমান আলোচনাকে ভিত্তিহীন দাবি করে তানজিম ইবনে ওয়াহাব বলেন, ‘এখন যেসব আলোচনা হচ্ছে, এসবের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ভিত্তি নেই। সবারই উচিত এই ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে গুজবনির্ভর কথা বলা থেকে বিরত থাকা।’

বর্তমানে সাংবাদিকদের জুলাই স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রস্তুতি শেষ করে গণমাধ্যমকর্মীদের পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে।’

জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। ছবি: সংগৃহীত
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। ছবি: সংগৃহীত

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন ঘটে। এরপর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন আওয়ামী লীগের এই সভাপতি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণের লক্ষ্যে গণভবনে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর স্থাপন করা হয়। এটি উদ্বোধনে একাধিকবার ঘোষণা দিলেও আলোর মুখ দেখেনি।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাদুঘর পরিদর্শন করে দ্রুত চালুর নির্দেশনা দিয়েছিলেন। পরে তাঁর সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট উদ্বোধনের ঘোষণা দিলেও, তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি।

বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরের ১৫ কর্মকর্তা-কর্মচারী অতিরিক্ত দায়িত্বে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে কাজ করছেন। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্থায়ী নিয়োগ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত