হুমায়ূন শফিক

কালজয়ী কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের জীবদ্দশার কোনো স্পষ্ট স্মৃতি তাঁর সন্তানদের মানসপটে নেই। খুব অল্প বয়সে বাবাকে হারানোর কারণে তাঁদের কারও স্মৃতিতেই বাবার উপস্থিতি নেই বললেই চলে। তবে বাবার রক্ত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে পথ চলছেন তাঁর সন্তানেরা।
জহির রায়হানের মেজো ছেলে লেখক অনল রায়হান নিজের লেখালেখি, কল্পবিজ্ঞান ও চলচ্চিত্র নির্মাণের গভীর ইচ্ছা নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। অন্যদিকে আরেক ছেলে তপু রায়হান সিনেমা নির্মাণ, বাবার অসমাপ্ত কাজ পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া, ব্যবসা এবং রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে নিজেকে মেলে ধরেছেন।
১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি বড় ভাই শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে মিরপুর থেকে নিখোঁজ হন জহির রায়হান। তখন তাঁর সন্তানদের বয়স ছিল খুবই কম। ফলে বাবার স্পর্শ বা তাঁর সান্নিধ্যের কোনো স্পষ্ট স্মৃতি কোনো সন্তানের স্মৃতিতেই নেই।
অনল রায়হান স্ট্রিমকে বলেন, ‘৬৮-তে আমার জন্ম। কিন্তু বাবার কোনো স্মৃতি মনে নেই, একদমই মনে নেই। বাবা যখন শহীদ হলেন ৩০ জানুয়ারিতে, তখন আমার তিন বছর বয়স। আমার বড় ভাই বিপুল—বিপুলের জন্ম হয়েছে ৬৪-তে। বাবা যখন শহীদ হন তখন বিপুলের বয়স সাত বছর। আমি ওর মুখেও কখনো শুনিনি যে বাবার কোনো স্মৃতি তার আছে। আমরা চার ভাই... মানে স্মৃতি থেকে কোনো সন্তানই কিছু বলতে পারবে না।’
একইভাবে বাবাকে নিয়ে কোনো ব্যক্তিগত স্মৃতি নেই বলে জানান তপু রায়হান। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমার জন্ম ১৯৭০ সালে। বাবা যখন নিখোঁজ বা অন্তর্ধান হলেন, তখন আমার বয়স মাত্র এক বছর। এক বছর বয়সের স্মৃতি তো আর মনে থাকে না, তাই বাবাকে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত কোনো স্মৃতি নেই।’
বাবার উত্তরসূরি হিসেবে সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন অনল রায়হান। নিজের প্রকাশিত বইগুলো সম্পর্কে বলেন, ‘লেখালেখি তো করবই। লেখালেখি করি। আমার বই বেরিয়েছে বেশ কয়েকটা। সব কটা বই-ই সুপারফ্লপ। শেষ বইটা বেরিয়েছিল দুই বছর আগে। একটা উপন্যাস, ওটাও সুপারফ্লপ। তবে আমি লিখব। লেখাটা আমার রক্তে আছে।’
ভবিষ্যৎ সাহিত্যকর্ম প্রসঙ্গে তিনি জানান, উপন্যাসের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাস্তবধর্মী নন-ফিকশন এবং কল্পবিজ্ঞান ঘরানার সাহিত্য রচনায় তাঁর প্রবল আগ্রহ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যা লিখেছি সবই উপন্যাস। ভবিষ্যতেও উপন্যাস লিখব। আরেকটা জায়গা তৈরি হচ্ছে। ধরেন, বাস্তবকে যেভাবে দেখা যায়, ঠিক সেই জায়গা থেকে—নন-ফিকশন। এছাড়া সায়েন্স ফিকশন লিখতে চাই। আই লাভ টু রাইট সায়েন্স ফিকশন।’
অন্যদিকে তপু রায়হান নিজে সরাসরি সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও পরিবারের অন্য সদস্যদের লেখার প্রতি অনুরাগ তুলে ধরেন। তিনি জানান, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত নই। লেখালেখি আমার ভাইয়েরা করেন। আমার ভাই আরাফাত রায়হান, অনল রায়হান ও তনয় রায়হান—তারা নাটক ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত আছেন এবং লেখালেখি করেন।’
জহির রায়হানের নাম ও সেলুলয়েড যেন একে অপরের পরিপূরক। তাঁর সন্তানদের মধ্যেও সেই চলচ্চিত্র নির্মাণের টান সুপ্তভাবে রয়ে গেছে।
অনল রায়হান জানান, সিনেমা বানানোর ইচ্ছাটা আজও তাঁর রক্তে বহমান এবং মৃত্যুর আগে অন্তত একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র তিনি বানিয়ে যেতে চান। তবে বাবার সাহিত্য নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব একটি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। অতীতে বাবার বিখ্যাত গল্প ‘তৃষ্ণা’ অবলম্বনে চিত্রনাট্য তৈরি করেও শেষ পর্যন্ত সিনেমা না বানানোর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘যিনি ইনভেস্ট করতে চেয়েছিলেন, তিনি ভাবছিলেন যে জহির রায়হানের কোনো উপন্যাস থেকে যদি জহির রায়হানের ছেলে বানায় তাহলে এটার একটা মার্কেট ভ্যালু হবে। কিন্তু জহির রায়হানের গল্প থেকে সিনেমা করতে গেলে প্রথম বাধাটা হচ্ছে এটা ‘‘পিরিয়ড ফিল্ম’’ হয়ে যাবে। মানে ৫০-৬০ এর দশকে যে সময়ে গল্পগুলো লিখেছেন। একটা পিরিয়ড ফিল্ম বানাতে গেলে যে বাজেট লাগে, ঢাকা শহরের ৫০-এর দশকের রাস্তা, সেই পোশাক-আশাক, সেই বাড়ি... এটা প্রপারলি না দেখাতে পারলে তো এই ছবি বানানোর কোনো মানে হয় না। এটা তো বিশাল খরচের ব্যাপার।’
বাবার গল্প হুবহু পর্দায় আনার চেয়ে নিজের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতাকে পর্দায় রূপ দিতে চান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাবার গল্প দিয়ে ছবি বানাবার কোনো ইচ্ছা নাই এখন। আমি যদি বানাই, আমি আমার সময় নিয়ে, আমি যা দেখছি সেই অভিজ্ঞতা থেকে বানাব। যাতে একটা সততা থাকে।’
অন্যদিকে তপু রায়হানের চলচ্চিত্রে পদার্পণ ঘটেছিল নব্বইয়ের দশকেই। ১৯৯৩ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘প্রেম প্রীতি’ নামের একটি সিনেমা। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালে মা কোহিনুর আক্তার সুচন্দার পরিচালনায় আরও একটি চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হন। তবে সেই সময়ের চলচ্চিত্রের পরিবেশ ও পারিবারিক সুনামের কথা চিন্তা করে একপর্যায়ে চলচ্চিত্র থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি।
এ বিষয়ে তপু রায়হান বলেন, ‘ওই সময়ে আম্মা বললেন যে আর চলচ্চিত্র করার দরকার নেই। কারণ তখনকার পরিবেশ-পরিস্থিতি ভালো ছিল না। ভালো মানের সিনেমা হচ্ছিল না এবং দর্শকরাও সিনেমা হলে যাচ্ছিল না। আম্মা বলেছিলেন, তোমার বাবার এক ধরনের সুনাম আছে, পরিবারের যে ব্যাকগ্রাউন্ড (আমি, ববিতা, চম্পা), তুমি সেই পরিবারের ছেলে। তাই এমন পরিবেশে থাকলে পারিবারিক মর্যাদা ও ইমেজ ক্ষুণ্ণ হবে। মূলত সে কারণেই চলচ্চিত্র থেকে বের হয়ে আসা।’
তবে চলচ্চিত্র থেকে পুরোপুরি মন উঠে যায়নি তাঁর। পরিবারের যৌথ প্রযোজনায় বাবার কালজয়ী সাহিত্য রুপালি পর্দায় আনার আকাঙ্ক্ষা আজও জীবিত। তপু রায়হান বলেন, ‘আম্মার অনেক দিনের ইচ্ছা, ‘হাজার বছর ধরে’-র পর বাবার ‘বরফ গলা নদী’ উপন্যাসটি নিয়ে একটি চলচ্চিত্র বানাবেন। আম্মা যদি এটি করেন, তবে আমি তার সাথে প্যানেল ডিরেক্টর হিসেবে থাকব।’

পাশাপাশি জহির রায়হানের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকা অসমাপ্ত মাস্টারপিস নিয়েও বড় পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। তিনি বলেন, ‘আমার নিজের পরিকল্পনা আছে বাবার অসমাপ্ত ছবি ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-কে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার। ছবিটির কোনো লিখিত স্ক্রিপ্ট ছিল না, বাবার পুরো চিন্তাভাবনা তাঁর মাথায় ছিল। সেটাকে একটি রূপ দেওয়ার ইচ্ছা আছে।’ তবে চলচ্চিত্রকে তিনি ফুল-টাইম বা পুরোপুরি বাণিজ্যিক পেশা হিসেবে নেবেন না, ভালো গল্পের ভিত্তিতে মাঝেমধ্যে কাজ করবেন।
সাহিত্য ও সিনেমার পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনে ভিন্ন পেশাগত অঙ্গনে যুক্ত রয়েছেন দুই ভাই। অনল রায়হান বর্তমানে নিজস্ব একটি ক্যাফে-রেস্তোরাঁ পরিচালনা করছেন এবং একটি কমিউনিকেশন এজেন্সিতে কনসালটেন্সি পেশায় দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে তপু রায়হান ব্যবসা পরিচালনা করছেন, যার রয়েছে নিজস্ব সেটআপ।
ব্যবসায়ের পাশাপাশি তপু রায়হানের আরেকটি আগ্রহের জায়গা হলো রাজনীতি। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ থেকেই তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় হয়েছেন এবং গত নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তপু রায়হান বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি মিশুক স্বভাবের ছিলাম। মানুষের সঙ্গে মেলামেশা এবং তাদের সুখ-দুঃখে পাশে থাকাটা আমার পছন্দ ছিল। সামাজিক কাজ করতে গেলে একটি প্ল্যাটফর্ম দরকার হয়, সেই চিন্তা থেকেই রাজনীতিতে আসা। রাজনীতিতে থাকলে মানুষের কাছে যাওয়ার পথটা সহজ হয়। আমি ঢাকা-১৭ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনও করেছি।’
নতুন কোনো দল গঠনের ইচ্ছা না থাকলেও ভবিষ্যতে কোনো প্রতিষ্ঠিত দলের অধীনে রাজনীতি করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। নিজেদের পরিবারকে ঘিরে রাজনৈতিক নানা বিভ্রান্তিকর ধারণার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের নিয়ে রাজনৈতিক নানা ধারণা রয়েছে। যেমন—আমাদের জন্ম মুক্তিযুদ্ধের সময়ে হওয়ায় অনেকে মনে করেন আমরা বোধহয় আওয়ামী লীগের ভাবধারা ধারণ করি। আবার আমরা যে সময়টায় বড় হয়েছি ও রাজনীতি বুঝেছি, সেটি ছিল বিএনপির আমল। তাছাড়া আরাফাত রহমান কোকো আমার সহপাঠী ছিল, আমরা একসঙ্গে পড়াশোনা ও চলাফেরা করেছি; তাই অনেকে ভাবত আমি বোধহয় বিএনপি করি।’
জহির রায়হানের অন্তর্ধান আজও বাংলা সংস্কৃতি ও ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। এই রহস্য উন্মোচন নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে তপু রায়হান বলেন, ‘আমার কাকা শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে বাবা যখন নিখোঁজ হলেন, তখন আম্মারা রহস্য উদঘাটনের জন্য তৎকালীন সরকারের কাছে গিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো রহস্য উন্মোচিত হয়নি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ১২ বছর নিখোঁজ থাকলে নিখোঁজ ঘোষণা করা হয়, সেভাবেই আমরা ধরে নিয়েছি।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘কিন্তু বাবা কীভাবে নিখোঁজ বা শহীদ হলেন, সেই প্রকৃত সত্য আজও কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারেনি; এটা নিয়ে সবসময় বিতর্ক রয়েছে। অনেকে বলেন, দেশ স্বাধীনের পর তো পাক হানাদার বাহিনী থাকার কথা না। আবার অনেকে বলেন, মিরপুর মুক্ত হয়েছিল সবার শেষে, তাই মিরপুর ১০ নম্বরে তখন হানাদার বাহিনী ছিল। বাবার সাথে যারা ছিলেন, তারাও সময়ের সাথে সাথে মারা গেছেন। তাই সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য আজও কারও জানা নেই।’
বাবার অন্তর্ধানের রহস্য উদঘাটনে সরকারের উদ্যোগের প্রত্যাশা রেখে তিনি বলেন, ‘সারাদেশে বাবার বহু ভক্ত-অনুরাগী ও সংগঠন আছে, যারা প্রতিনিয়ত আমাদের কাছে এই বিষয়ে জানতে চান। কোনো সরকার যদি উদ্যোগ নেয়, তবে আমরা অবশ্যই চাইব এই অন্তর্ধানের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন হোক।’

কালজয়ী কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের জীবদ্দশার কোনো স্পষ্ট স্মৃতি তাঁর সন্তানদের মানসপটে নেই। খুব অল্প বয়সে বাবাকে হারানোর কারণে তাঁদের কারও স্মৃতিতেই বাবার উপস্থিতি নেই বললেই চলে। তবে বাবার রক্ত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে পথ চলছেন তাঁর সন্তানেরা।
জহির রায়হানের মেজো ছেলে লেখক অনল রায়হান নিজের লেখালেখি, কল্পবিজ্ঞান ও চলচ্চিত্র নির্মাণের গভীর ইচ্ছা নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। অন্যদিকে আরেক ছেলে তপু রায়হান সিনেমা নির্মাণ, বাবার অসমাপ্ত কাজ পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া, ব্যবসা এবং রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে নিজেকে মেলে ধরেছেন।
১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি বড় ভাই শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে মিরপুর থেকে নিখোঁজ হন জহির রায়হান। তখন তাঁর সন্তানদের বয়স ছিল খুবই কম। ফলে বাবার স্পর্শ বা তাঁর সান্নিধ্যের কোনো স্পষ্ট স্মৃতি কোনো সন্তানের স্মৃতিতেই নেই।
অনল রায়হান স্ট্রিমকে বলেন, ‘৬৮-তে আমার জন্ম। কিন্তু বাবার কোনো স্মৃতি মনে নেই, একদমই মনে নেই। বাবা যখন শহীদ হলেন ৩০ জানুয়ারিতে, তখন আমার তিন বছর বয়স। আমার বড় ভাই বিপুল—বিপুলের জন্ম হয়েছে ৬৪-তে। বাবা যখন শহীদ হন তখন বিপুলের বয়স সাত বছর। আমি ওর মুখেও কখনো শুনিনি যে বাবার কোনো স্মৃতি তার আছে। আমরা চার ভাই... মানে স্মৃতি থেকে কোনো সন্তানই কিছু বলতে পারবে না।’
একইভাবে বাবাকে নিয়ে কোনো ব্যক্তিগত স্মৃতি নেই বলে জানান তপু রায়হান। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমার জন্ম ১৯৭০ সালে। বাবা যখন নিখোঁজ বা অন্তর্ধান হলেন, তখন আমার বয়স মাত্র এক বছর। এক বছর বয়সের স্মৃতি তো আর মনে থাকে না, তাই বাবাকে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত কোনো স্মৃতি নেই।’
বাবার উত্তরসূরি হিসেবে সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন অনল রায়হান। নিজের প্রকাশিত বইগুলো সম্পর্কে বলেন, ‘লেখালেখি তো করবই। লেখালেখি করি। আমার বই বেরিয়েছে বেশ কয়েকটা। সব কটা বই-ই সুপারফ্লপ। শেষ বইটা বেরিয়েছিল দুই বছর আগে। একটা উপন্যাস, ওটাও সুপারফ্লপ। তবে আমি লিখব। লেখাটা আমার রক্তে আছে।’
ভবিষ্যৎ সাহিত্যকর্ম প্রসঙ্গে তিনি জানান, উপন্যাসের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাস্তবধর্মী নন-ফিকশন এবং কল্পবিজ্ঞান ঘরানার সাহিত্য রচনায় তাঁর প্রবল আগ্রহ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যা লিখেছি সবই উপন্যাস। ভবিষ্যতেও উপন্যাস লিখব। আরেকটা জায়গা তৈরি হচ্ছে। ধরেন, বাস্তবকে যেভাবে দেখা যায়, ঠিক সেই জায়গা থেকে—নন-ফিকশন। এছাড়া সায়েন্স ফিকশন লিখতে চাই। আই লাভ টু রাইট সায়েন্স ফিকশন।’
অন্যদিকে তপু রায়হান নিজে সরাসরি সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও পরিবারের অন্য সদস্যদের লেখার প্রতি অনুরাগ তুলে ধরেন। তিনি জানান, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত নই। লেখালেখি আমার ভাইয়েরা করেন। আমার ভাই আরাফাত রায়হান, অনল রায়হান ও তনয় রায়হান—তারা নাটক ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত আছেন এবং লেখালেখি করেন।’
জহির রায়হানের নাম ও সেলুলয়েড যেন একে অপরের পরিপূরক। তাঁর সন্তানদের মধ্যেও সেই চলচ্চিত্র নির্মাণের টান সুপ্তভাবে রয়ে গেছে।
অনল রায়হান জানান, সিনেমা বানানোর ইচ্ছাটা আজও তাঁর রক্তে বহমান এবং মৃত্যুর আগে অন্তত একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র তিনি বানিয়ে যেতে চান। তবে বাবার সাহিত্য নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব একটি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। অতীতে বাবার বিখ্যাত গল্প ‘তৃষ্ণা’ অবলম্বনে চিত্রনাট্য তৈরি করেও শেষ পর্যন্ত সিনেমা না বানানোর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘যিনি ইনভেস্ট করতে চেয়েছিলেন, তিনি ভাবছিলেন যে জহির রায়হানের কোনো উপন্যাস থেকে যদি জহির রায়হানের ছেলে বানায় তাহলে এটার একটা মার্কেট ভ্যালু হবে। কিন্তু জহির রায়হানের গল্প থেকে সিনেমা করতে গেলে প্রথম বাধাটা হচ্ছে এটা ‘‘পিরিয়ড ফিল্ম’’ হয়ে যাবে। মানে ৫০-৬০ এর দশকে যে সময়ে গল্পগুলো লিখেছেন। একটা পিরিয়ড ফিল্ম বানাতে গেলে যে বাজেট লাগে, ঢাকা শহরের ৫০-এর দশকের রাস্তা, সেই পোশাক-আশাক, সেই বাড়ি... এটা প্রপারলি না দেখাতে পারলে তো এই ছবি বানানোর কোনো মানে হয় না। এটা তো বিশাল খরচের ব্যাপার।’
বাবার গল্প হুবহু পর্দায় আনার চেয়ে নিজের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতাকে পর্দায় রূপ দিতে চান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাবার গল্প দিয়ে ছবি বানাবার কোনো ইচ্ছা নাই এখন। আমি যদি বানাই, আমি আমার সময় নিয়ে, আমি যা দেখছি সেই অভিজ্ঞতা থেকে বানাব। যাতে একটা সততা থাকে।’
অন্যদিকে তপু রায়হানের চলচ্চিত্রে পদার্পণ ঘটেছিল নব্বইয়ের দশকেই। ১৯৯৩ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘প্রেম প্রীতি’ নামের একটি সিনেমা। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালে মা কোহিনুর আক্তার সুচন্দার পরিচালনায় আরও একটি চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হন। তবে সেই সময়ের চলচ্চিত্রের পরিবেশ ও পারিবারিক সুনামের কথা চিন্তা করে একপর্যায়ে চলচ্চিত্র থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি।
এ বিষয়ে তপু রায়হান বলেন, ‘ওই সময়ে আম্মা বললেন যে আর চলচ্চিত্র করার দরকার নেই। কারণ তখনকার পরিবেশ-পরিস্থিতি ভালো ছিল না। ভালো মানের সিনেমা হচ্ছিল না এবং দর্শকরাও সিনেমা হলে যাচ্ছিল না। আম্মা বলেছিলেন, তোমার বাবার এক ধরনের সুনাম আছে, পরিবারের যে ব্যাকগ্রাউন্ড (আমি, ববিতা, চম্পা), তুমি সেই পরিবারের ছেলে। তাই এমন পরিবেশে থাকলে পারিবারিক মর্যাদা ও ইমেজ ক্ষুণ্ণ হবে। মূলত সে কারণেই চলচ্চিত্র থেকে বের হয়ে আসা।’
তবে চলচ্চিত্র থেকে পুরোপুরি মন উঠে যায়নি তাঁর। পরিবারের যৌথ প্রযোজনায় বাবার কালজয়ী সাহিত্য রুপালি পর্দায় আনার আকাঙ্ক্ষা আজও জীবিত। তপু রায়হান বলেন, ‘আম্মার অনেক দিনের ইচ্ছা, ‘হাজার বছর ধরে’-র পর বাবার ‘বরফ গলা নদী’ উপন্যাসটি নিয়ে একটি চলচ্চিত্র বানাবেন। আম্মা যদি এটি করেন, তবে আমি তার সাথে প্যানেল ডিরেক্টর হিসেবে থাকব।’

পাশাপাশি জহির রায়হানের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকা অসমাপ্ত মাস্টারপিস নিয়েও বড় পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। তিনি বলেন, ‘আমার নিজের পরিকল্পনা আছে বাবার অসমাপ্ত ছবি ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-কে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার। ছবিটির কোনো লিখিত স্ক্রিপ্ট ছিল না, বাবার পুরো চিন্তাভাবনা তাঁর মাথায় ছিল। সেটাকে একটি রূপ দেওয়ার ইচ্ছা আছে।’ তবে চলচ্চিত্রকে তিনি ফুল-টাইম বা পুরোপুরি বাণিজ্যিক পেশা হিসেবে নেবেন না, ভালো গল্পের ভিত্তিতে মাঝেমধ্যে কাজ করবেন।
সাহিত্য ও সিনেমার পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনে ভিন্ন পেশাগত অঙ্গনে যুক্ত রয়েছেন দুই ভাই। অনল রায়হান বর্তমানে নিজস্ব একটি ক্যাফে-রেস্তোরাঁ পরিচালনা করছেন এবং একটি কমিউনিকেশন এজেন্সিতে কনসালটেন্সি পেশায় দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে তপু রায়হান ব্যবসা পরিচালনা করছেন, যার রয়েছে নিজস্ব সেটআপ।
ব্যবসায়ের পাশাপাশি তপু রায়হানের আরেকটি আগ্রহের জায়গা হলো রাজনীতি। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ থেকেই তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় হয়েছেন এবং গত নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তপু রায়হান বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি মিশুক স্বভাবের ছিলাম। মানুষের সঙ্গে মেলামেশা এবং তাদের সুখ-দুঃখে পাশে থাকাটা আমার পছন্দ ছিল। সামাজিক কাজ করতে গেলে একটি প্ল্যাটফর্ম দরকার হয়, সেই চিন্তা থেকেই রাজনীতিতে আসা। রাজনীতিতে থাকলে মানুষের কাছে যাওয়ার পথটা সহজ হয়। আমি ঢাকা-১৭ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনও করেছি।’
নতুন কোনো দল গঠনের ইচ্ছা না থাকলেও ভবিষ্যতে কোনো প্রতিষ্ঠিত দলের অধীনে রাজনীতি করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। নিজেদের পরিবারকে ঘিরে রাজনৈতিক নানা বিভ্রান্তিকর ধারণার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের নিয়ে রাজনৈতিক নানা ধারণা রয়েছে। যেমন—আমাদের জন্ম মুক্তিযুদ্ধের সময়ে হওয়ায় অনেকে মনে করেন আমরা বোধহয় আওয়ামী লীগের ভাবধারা ধারণ করি। আবার আমরা যে সময়টায় বড় হয়েছি ও রাজনীতি বুঝেছি, সেটি ছিল বিএনপির আমল। তাছাড়া আরাফাত রহমান কোকো আমার সহপাঠী ছিল, আমরা একসঙ্গে পড়াশোনা ও চলাফেরা করেছি; তাই অনেকে ভাবত আমি বোধহয় বিএনপি করি।’
জহির রায়হানের অন্তর্ধান আজও বাংলা সংস্কৃতি ও ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। এই রহস্য উন্মোচন নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে তপু রায়হান বলেন, ‘আমার কাকা শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে বাবা যখন নিখোঁজ হলেন, তখন আম্মারা রহস্য উদঘাটনের জন্য তৎকালীন সরকারের কাছে গিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো রহস্য উন্মোচিত হয়নি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ১২ বছর নিখোঁজ থাকলে নিখোঁজ ঘোষণা করা হয়, সেভাবেই আমরা ধরে নিয়েছি।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘কিন্তু বাবা কীভাবে নিখোঁজ বা শহীদ হলেন, সেই প্রকৃত সত্য আজও কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারেনি; এটা নিয়ে সবসময় বিতর্ক রয়েছে। অনেকে বলেন, দেশ স্বাধীনের পর তো পাক হানাদার বাহিনী থাকার কথা না। আবার অনেকে বলেন, মিরপুর মুক্ত হয়েছিল সবার শেষে, তাই মিরপুর ১০ নম্বরে তখন হানাদার বাহিনী ছিল। বাবার সাথে যারা ছিলেন, তারাও সময়ের সাথে সাথে মারা গেছেন। তাই সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য আজও কারও জানা নেই।’
বাবার অন্তর্ধানের রহস্য উদঘাটনে সরকারের উদ্যোগের প্রত্যাশা রেখে তিনি বলেন, ‘সারাদেশে বাবার বহু ভক্ত-অনুরাগী ও সংগঠন আছে, যারা প্রতিনিয়ত আমাদের কাছে এই বিষয়ে জানতে চান। কোনো সরকার যদি উদ্যোগ নেয়, তবে আমরা অবশ্যই চাইব এই অন্তর্ধানের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন হোক।’
.png)

চলচ্চিত্রের জন্ম মুহূর্তে সে নির্বাক ছিল। ছবির পর ছবি তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যেত, কিন্তু ওরা কথা বলত না। কথা না বললেও বিভিন্ন অভিব্যক্তির মাধ্যমে নির্বাক ছবি সবাক হয়ে ধরা দিত দর্শকের মনে। তারপর ছবিতে ধ্বনি এলো, শব্দ এলো, সংলাপ এলো। ছায়াছবিতে সংলাপের সংযোজনের সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্র শিল্প তার বনে
২ ঘণ্টা আগে
জহির রায়হান (১৯৩৫-১৯৭২) যখন ব্রিটিশ ভারতের ফেনীর মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করলেন, তখন বিশ্বজুড়ে ঘটনার ঘনঘটা। মাথার ওপর শোষকের খাঁড়া ঝুলছে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন-অত্যাচার, দিগ্বিদিক কাঁপিয়ে চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ত্রিশের অর্থনৈতিক মন্দার পশ্চিমা ঢেউ, দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের হাহাকার, সাম্প্রদায়িক ব