জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

সচিবালয়ে বিদায়ের সুর, চলছে নতুন সরকার বরণের প্রস্তুতিও

প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫: ১১
সচিবালয়। স্ট্রিম ছবি

দুদিন পরেই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। সব ঠিকঠাক থাকলে ভোটের এক সপ্তাহের মধ্যেই গঠিত হবে নতুন সরকার। এর মধ্য দিয়ে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মযজ্ঞেরও সমাপ্তি হবে। সবমিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার এখন বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একইসঙ্গে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ও প্রস্তুতি নিচ্ছে নতুন সরকারকে বরণে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য ৪৫টি গাড়ি প্রস্তুত করা হচ্ছে।

ভোটের আগে আজ মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ কর্মদিবস। সে কারণে উপদেষ্টারা দপ্তরের নিজস্ব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়েছেন। বিদায় নিয়েছেন গেল দেড় বছরের সহকর্মীদের কাছ থেকে। সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে গেল দেড় বছরে নিজেদের তৎপরতার ফিরিস্তি তুলে ধরেছেন।

আগামী বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বুধবার ও বৃহস্পতিবার (১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি) ছুটি থাকবে। এরপর শুক্র ও শনিবার দুই দিন সাপ্তাহিক ছুটি। সেই হিসাবে বলা যায়, আজ মঙ্গলবারই (১০ ফেব্রুয়ারি) শেষ অফিস করছেন উপদেষ্টারা। অনেকে সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন সরকার গঠন হবে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমানে উপদেষ্টা পরিষদে প্রধান উপদেষ্টা ছাড়াও ২০ জন উপদেষ্টা রয়েছেন।

প্রস্তুত হচ্ছে গাড়ি

নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচনের পর প্রথমে শপথ নেন নতুন নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। এরপর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করা হয়। এরপর নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। নতুন মন্ত্রিসভার দাপ্তরিক কাজ করে থাকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বঙ্গভবনে মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করা হয়। অতিথিসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।

মন্ত্রীদের জন্য প্রস্তুত করা গাড়ি। ফাইল ছবি
মন্ত্রীদের জন্য প্রস্তুত করা গাড়ি। ফাইল ছবি

নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ। রাষ্ট্রপতি প্রথমে সরকারপ্রধানকে শপথ পাঠ করাবেন। এরপর পর্যায়ক্রমে মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পড়াবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে মন্ত্রিসভার সর্বোচ্চ সংখ্যা ৪৫ জন ধরে নিয়ে গাড়ি প্রস্তুত করা হচ্ছে। এজন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক গাড়ি প্রস্তুত রাখার জন্য সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ভিভিআইপি প্রটোকলে সব সময় কয়েকটি গাড়ি বেশি প্রস্তুত রাখতে হয়। কোনো কারণে একটি গাড়ি নষ্ট হলে বা দুর্ঘটনায় পড়লে সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি গাড়ি পাঠানো যায়—সে কারণে ৫টি গাড়ি বেশি রাখা হচ্ছে বলেও জানা গেছে। সব মিলিয়ে ৫০টি গাড়ি প্রস্তুত করা হচ্ছে।

জানা গেছে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টারা যেসব গাড়ি ব্যবহার করছেন, সেগুলোসহ সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরে থাকা মোট ৫০টি গাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে প্রস্তুত করা হচ্ছে। যারা নতুন সরকারে শপথের আমন্ত্রণ পাবেন, তাদের বাসা থেকে বঙ্গভবনে নিয়ে যাওয়ার জন্য পাঠানো হবে এসব গাড়ি।

সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের পরিবহন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মো. খায়রুল কবীর মেনন বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা প্রয়োজনীয় সংখ্যক গাড়ি প্রস্তুত রাখছি। তবে ঠিক কতগুলো গাড়ি লাগবে, সেটা শপথের দিন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে আমাদের জানানো হবে। সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব।’

উপদেষ্টারা জমা দিলেন লাল পাসপোর্ট

এরই মধ্যে বেশির ভাগ উপদেষ্টাই কূটনৈতিক বা লাল পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। তারা নতুন পাসপোর্ট নিতে সচিবালয়ের পাসপোর্ট অফিসে আবেদন করছেন। কেউ কেউ পাসপোর্ট পেয়েও গেছেন। কোনো কোনো উপদেষ্টা সম্পদের হিসাবও জমা দিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। সবমিলিয়ে সচিবালয়ে চলছে বিদায়ের সুর।

উপদেষ্টারা সরকারি বাসা গোছাচ্ছেন; মেয়াদ শেষ হলেই ছেড়ে দেবেন। কেউ কেউ বাসা ছাড়ার আবেদনও করেছেন বলে উপদেষ্টাদের দপ্তর থেকে জানা গেছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত, শিল্প এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান গত ৩১ জানুয়ারি তার সরকারি বাসাটি ছেড়ে দিয়েছেন। উপদেষ্টার দপ্তর থেকে জানা গেছে, তিনি তার কূটনৈতিক পাসপোর্টও জমা দিয়েছেন।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে রয়েছেন শারমীন এস মুরশিদ। তার একান্ত সচিব (পিএস) তারেক মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, ‘সোমবার স্যারের কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেওয়া হচ্ছে। এরপর সবুজ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করা হবে। বাসা ছাড়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।’

কূটনীতিক পাসপোর্ট। স্ট্রিম গ্রাফিক
কূটনীতিক পাসপোর্ট। স্ট্রিম গ্রাফিক

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতারের সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোহাম্মদ আলী আকবর বলেন, ‘ম্যাডামের কূটনৈতিক পাসপোর্ট ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি কোনো সরকারি বাড়ি নেননি। আর সম্পদের হিসাবও জমা দেওয়া হয়েছে।’

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের একান্ত সচিব সত্যজিত রায় দাশ বলেন, ‘স্যারের কূটনৈতিক পাসপোর্ট ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে, বাসা ছাড়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’

বাণিজ্য, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা শেখ বশিরউদ্দীন কোনো সরকারি বাড়ি কিংবা গাড়ি নেননি। তিনি এখনও তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেননি। কারণ তিনি জাপান সফরে ছিলেন।

সম্পদের হিসাবের বিষয় জানতে চাইলে রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) শেখ বশিরউদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত পরশু (শুক্রবার) যখন জাপানের উদ্দেশ্যে রওনা দিই, আমি আমার অফিসকে ফোন করে বলেছি, তারা সম্পদের বিবরণী পাঠিয়ে দিয়েছে। সেটি আমার কাছে পৌঁছেছে, আমি সেটি সই করে আজ (রোববার) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিয়ে দেব।’

সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, উপদেষ্টা কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন, নতুন পাসপোর্টের আবেদনও করেছেন। তিনি কোনো সরকারি বাড়ি নেননি।

পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সহকারী একান্ত সচিব কামরুন নাহার বলেন, ‘স্যার কূটনৈতিক পাসপোর্ট নেননি। সরকারি বাড়িও নেননি। তাই স্যারের এগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয় নেই। আর সম্পদের হিসাব স্যার ইতোমধ্যে জমা দিয়েছেন।’

গত ৩ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেওয়ার বিষয়ে অর্থ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমি দিয়ে দিয়েছি। আমি সাধারণত জরুরি ছাড়া কোনো মিটিংয়ে যাই না। সে জন্য আমি দিয়ে দিয়েছি। অনেকেই দিয়ে দিচ্ছে। এটা নিয়ম—দিয়ে দেওয়া।’ সালেহউদ্দিন আহমেদের পাসপোর্টের সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর পাসপোর্টও জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম সরকারি বাড়ি নেননি। তিনি তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট ইতোমধ্যে জমা দিয়েছেন বলে তাঁর দপ্তর থেকে জানা গেছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ, রেল, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান তাঁর পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। বাসা ছাড়ারও প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

ধর্ম উপদেষ্টার দায়িত্বে রয়েছেন ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। তাঁর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, উপদেষ্টা তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। সচিবালয়ের দপ্তরে থাকা নিজের বইপত্রসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছাচ্ছেন। দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরই বাসা ছেড়ে দেবেন। ঢাকায় তাঁর কোনো বাসা নেই। মেয়াদ শেষে তিনি চট্টগ্রামে চলে যাবেন।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে আছেন ফারুক ই আজম। তার দপ্তর থেকে জানা গেছে, তিনি ইতোমধ্যে তাঁর কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। সবুজ পাসপোর্টও হাতে পেয়েছেন।

ফ্ল্যাটও গুছিয়ে রাখছেন। উপদেষ্টা হওয়ার আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন। মেয়াদ শেষে তিনি সেখানেই চলে যাবেন বলে তার দপ্তর থেকে জানা গেছে।

বিদায়ের বেলায় উপদেষ্টারা যা বলছেন

উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনে নিজের কোনো ব্যর্থতা আছে কি না—জানতে চাইলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ‘ব্যর্থতা নিয়ে বিদায় নিচ্ছি না। আমরা কোন দিকে এগোচ্ছি, সেটা যদি দেখেন, আমি বলব আমরা সফল হয়েছি।’

খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ‘বিদায়ের সময় ভেতরের কথা নিয়ে তিক্ততা বাড়াতে চাই না। একই সঙ্গে সরকারের ভেতরে অন্যদের সমর্থন না পাওয়ায় ভূমি নিবন্ধন আইন মন্ত্রণালয় থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনতে পারিনি। এজন্য আমাদের মনোভাবই দায়ী।’

কেন সফল হননি—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের তো সমর্থন পেতে হবে। এটার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারের আরও যারা আছেন, তাদের সমর্থন লাভ করতে পারিনি।’

আপনি কাকে দায়ী করছেন—এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি কাউকে দায়ী করছি না। এজন্য আমাদের মনোভাবই দায়ী। সেক্ষেত্রে আমাকে দায়ী করতে হবে, কারণ আমি পারিনি। ব্যর্থতার দায়ভার আমি নিচ্ছি। ব্যাপারটা সম্পর্কে আমরা সবাই একমত হতে পারিনি বলেই এটি হয়নি। আশা করি, ভবিষ্যতে কোনো না কোনো সময় এটি সম্ভব হবে।’

অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ নিজেকে ৭০ ভাগ সফল বলে দাবি করে বলেন, ‘উপদেষ্টা হিসেবে নিজেকে ১০০-তে ৭০ নম্বর দেব। অনেক কাজ করার ছিল, কিন্তু সব করতে পারিনি। বিশেষ করে এনবিআর সংস্কার পুরোপুরি শেষ করে যেতে পারিনি। সাঙ্গপাঙ্গরা যদি ভালো না হয়, তাহলে আমি একা ভালো হয়ে কিছু করতে পারব না। সবাইকে ভালো হতে হবে।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত