জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ব্যালটযুদ্ধের প্রস্তুতি: প্রচারণা শেষ, সিদ্ধান্ত এখন ভোটারের হাতে

প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫: ৩২
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। স্ট্রিম গ্রাফিক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে টানা ১৮ দিনের নির্বাচনী প্রচারণা শেষ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্দেশনা অনুযায়ী, মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায় সব ধরনের আনুষ্ঠানিক প্রচার কার্যক্রম শেষ হয়। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ভোটের চূড়ান্ত ক্ষণগণনা। গত ১৮ দিনে রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা গণসংযোগ, পথসভা ও জনসভার মাধ্যমে ভোটারদের কাছে তাদের পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছেন। প্রচার শেষ হওয়ায় এখন ভোটের আগের দুই দিন ভোটাররা শান্ত পরিবেশে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

রাজধানী ঢাকায় এবারের নির্বাচনে ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গেছে। বিভিন্ন আসনে প্রায় ১২৫ জন প্রার্থী লড়াই করছেন। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারা সরাসরি মাঠে নেমে ভোট চেয়েছেন। অনেক প্রার্থী বড় মিছিল ও শোডাউনের মাধ্যমে প্রচার শেষ করলেও কিছু ভিন্নধর্মী চিত্রও দেখা গেছে। এনসিপি’র নাহিদ ইসলাম নিজের এলাকায় দৌড়ে দৌড়ে গণসংযোগ করেন। জামায়াতে ইসলামীর আমিরও রাজধানীর একাধিক আসনে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালান।

ঢাকা-৮ আসনে ১১ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জানান, তার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছিল শহীদ শরীফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের মাধ্যমে এবং শেষও হয়েছে একই ধারাবাহিকতায়। মঙ্গলবার ফজরের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে কবর জিয়ারত ও শাহবাগ ফুল মার্কেটে গণসংযোগের মধ্য দিয়ে তার প্রচারণার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাজধানীতে টানা দুই দিনে ১৫টি জনসভা শেষে মা–বাবার কবর জিয়ারতের মাধ্যমে প্রচারণা শেষ করেন। সোমবার রাতে তিনি শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন। এর আগে ২২ জানুয়ারি সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে তিনি প্রচারণা শুরু করেছিলেন। প্রচারের শেষ দিনে ঢাকা-১৭ আসনের এক পথসভায় তিনি বলেন, “বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে জনগণের রায় চাই। দেশ পুনর্গঠনই বিএনপির মূল লক্ষ্য।”

বিএনপি-জামায়াত লড়াই তরুণ ভোটারদের ভূমিকা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। এতে মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে মূল লড়াই হচ্ছে। জয়-পরাজয়ের অন্যতম বড় নির্ধারক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন তরুণ ভোটাররা। প্রতিটি দলই তাদের ইশতেহারে তরুণদের অগ্রাধিকার দিয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে বড় দুই দলের মধ্যে বাকযুদ্ধ হলেও দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া বড় কোনো সহিংসতা ঘটেনি। এতে ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

নির্বাচন বিশ্লেষক ও ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলীর মতে, নির্বাচনে তরুণ বিশেষত ‘জেন-জি’র ভোট বড় নিয়ামক হতে পারে। জুলাই বিপ্লবের প্রেক্ষিতে তরুণদের ভোটচিন্তা প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে নতুত্বের দিকে ধাবিত হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রতীক বা দল বিবেচনায় না নিয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভাবনার প্রকাশও দেখা যেতে পারে।

মাঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট

সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তারা ভোটের পর ২ দিনসহ মোট ৭ দিন দায়িত্ব পালন করবেন। এ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মোট ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে।

এদিকে ভোটগ্রহণ উপলক্ষে ২৯৯ আসনে ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ দিনের জন্য ৬৫৫ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনি অপরাধ ও আচরণবিধি ভঙ্গে তাৎক্ষণিক সাজা দিতে পারবেন তারা। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ দিদার হোসাইন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে রোববার এ তথ্য জানানো হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, রোববার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে নেমেছে। সেনাবাহিনী আগে থেকেই মাঠে আছে। তবে রোববার থেকে নির্বাচনের জন্য বাড়তি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ভোটের পরিবেশ সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। আমরা মনে করি নির্বাচনি পরিবেশ সম্পূর্ণ ভালো আছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম বলেন, আওয়ামী লীগের একাংশ কেন্দ্রে যাবে না এবং নানা গুজবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় জন্মাতে পারে। তবে আরেক কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার মতো কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।

ভোটকেন্দ্রে শঙ্কা দেখছে না ইসি

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর একটি বড় অংশ দলীয় সিদ্ধান্তে ভোটকেন্দ্রে যাবেন না। অনেকে মামলার আসামি, তারা পলাতক রয়েছেন। আর কারাবন্দিদের অনেকেই ভোট দিচ্ছেন না। এ থেকেও ভোট পড়ার হারের কিছু ধারণা পেয়েছে ইসি।

এছাড়া তফসিল ঘোষণা থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোটখাটো সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচন নিয়ে অসত্য তথ্য ও গুজবের ছড়াছড়ি। এমনকি ভোট স্থগিত হয়েছে, এমন গুজবও ছড়িয়েছে। এতে সাধারণ ভোটাররা ভোট দিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিতে পড়তে পারেন বলে মনে করছে ইসি। এ কারণে এ ধরনের গুজবে কান না দিতে প্রচার চালানো হচ্ছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম বলেন, দলীয় কার্যক্রম স্থগিত থাকা আওয়ামী লীগ নানাভাবে তাদের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। দলটি তাদের নেতাকর্মীদের ভোট দিতে না যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একাংশ কেন্দ্রে যাবে না, এটা পরিষ্কার। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় জন্মাতে পারে। ওই সব মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাবেন কিনা-তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

আরেক নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ভোটগ্রহণের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে এমন উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই।

নির্বাচনে প্রার্থী ভোটার

এবার নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে ভোট হচ্ছে। একজন প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় শেরপুর-৩ আসনের ভোট এখন হচ্ছে না। নির্বাচনে মোট প্রার্থী ২ হাজার ২৯ জন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ এবং স্বতন্ত্র ২৭৪। নারী প্রার্থী ৮৩ জন। আবার নারী প্রার্থীদের মধ্যে দলীয় ৬৩ এবং স্বতন্ত্র ২০ জন। মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ এবং হিজড়া ১ হাজার ২৩২ জন। ১২৪টি দেশে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছিল। ইতোমধ্যে ৪ লাখ ২২ হাজার ৯৬০টি পোস্টাল এসে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ৯৪ শতাংশ পুরুষ এবং ৬ শতাংশ নারী।

গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ২৯৯টি আসনে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে বিকাল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ চলবে। ওই দিন দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে এ ভোটগ্রহণ হবে। এ নির্বাচনে ২ হাজার ২৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগ ও নয়টি দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি। আইন অনুযায়ী, কাল মঙ্গলবার সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে নির্বাচনি প্রচার আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে।

ইসির ধারণা ৬০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পড়বে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ভোট পড়তে পারে বলে ধারণা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বৃহস্পতিবার ভোটের দিন রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের কার্যক্রমের ওপর ভোটার উপস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো থাকলে ভোট পড়ার হার ৬৫-৭৫ শতাংশ (প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ) হতে পারে। আর প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীরা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে ভোটার উপস্থিতি কমে যাবে। ইসির একাধিক সূত্রে এমন ধারণা প্রত্যাশার কথা জানা গেছে।

ইসি সূত্র বলছে, এবার নির্বাচন ঘিরে মানুষের মধ্যে উৎসব দেখা গেলেও বিগত তিনটি নির্বাচনের ভয় কাটেনি। তারা উদাহরণ টেনে বলেন, প্রবাসে দেড় কোটি মানুষের বসবাস হলেও পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন সাত লাখ ৬৭ হাজার ২৩৩ জন আর রোববার রাত পর্যন্ত ভোট দিয়েছেন ৫ লাখ ৬ হাজার ২৪৭ জন।

অপরদিকে দেশে প্রায় ১৭ লাখ ব্যক্তি ভোটগ্রহণ কাজে নিয়োজিত হলেও পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে মাত্র ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮৯৮ জন নিবন্ধন করেছেন। আর ভোট দিয়েছেন ৪ লাখ ৫৩ হাজার ৯৮৭ জন। ইসির কর্মকর্তারা বলেন, প্রবাসী এবং দেশের ভেতরে নির্বাচনের কাজে নিয়োজিত ও সরকারি চাকরিজীবীদের বড় অংশ স্বেচ্ছায় ভোট দেওয়া থেকে বিরত রয়েছেন।

নির্বাচনে ভোট পড়ার হার নিয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বাচনে নির্বিঘ্নে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। ভোট নিয়ে মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখতে পাচ্ছি। আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, এ নির্বাচনে ৬০-৬৫ শতাংশ ভোট পড়বে।

বিগত নির্বাচনগুলোতে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেসব নির্বাচনে পরিবেশ ভালো ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ছিল, সেসব নির্বাচনে ভোট পড়ার হার বেশি ছিল। আর যেসব নির্বাচন বিতর্কিত, সেগুলোতে ভোট পড়ার হার কম। যেমন, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪২ শতাংশ ভোট পড়েছে। ওই নির্বাচনে ৪৪টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে অংশ নিয়েছিল আওয়ামী লীগসহ ২৮টি রাজনৈতিক দল। বিএনপিসহ ১৬টি নিবন্ধিত দল ওই নির্বাচন বর্জন করেছিল।

এর আগে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৮০ শতাংশ। আর ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছিল। ওই তিন নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ রয়েছে; এর মধ্যে ২০১৮ সালের নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ বলে সমালোচিত।

তবে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়ার হার ছিল ৮৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। এর আগে ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৭৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ওই দুই নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নিয়েছিল।

Ad 300x250

সম্পর্কিত