সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল

হামের প্রকোপ: শয্যা সংকটে চিকিৎসা মেঝেতেও

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬, ২৩: ০১
রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হামে আক্রান্ত শিশু। স্ট্রিম ছবি

বিভিন্ন সংক্রামক রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয় রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। এই হাসপাতাল ১০০ শয্যার। বর্তমানে হামে আক্রান্ত হয়ে সেখানে ভর্তি ৭২ জন।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সরেজমিনে হাসপাতালটিতে দেখা যায়, প্রতিটি ওয়ার্ডে রোগীর ভিড়। শয্যা ও ওয়ার্ডের মেঝেতে জায়গা না পেয়ে অনেকে করিডরেও চিকিৎসা নিচ্ছে। রোগীদের বেশির ভাগ শিশু। হাম ও জলবসন্তের রোগীদের একইসঙ্গে রাখা হয়েছে এ হাসপাতালে।

এই হাসপাতালে হাম ছাড়াও জলবসন্ত, জলাতঙ্ক, এইচআইভি, টিটেনাস, কালাজ্বর, ডিপথেরিয়া, নিপাহসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে জানান হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. তানজিনা জাহান।

তিনি বলেন, হাসপাতালে হামের রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যা রয়েছে মাত্র ১০টি। অথচ রোগী ভর্তি থাকছে কয়েক গুণ। বেশির ভাগই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে হামের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। এ রোগে আক্রান্তদের অধিকাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী। চিকিৎসকরা জানান, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রেফার্ড হয়ে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে রোগীরা। হাসপাতালের শয্যা ও মেঝেতে শুয়ে থাকা শিশুদের গায়ে হামের লালচে দানা, অনেকের শ্বাসকষ্ট। তাদের পাশে বসে উদ্বেগে দিন পার করছেন অভিভাবকেরা।

মাদারীপুর সদরে থেকে গত রোববার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় হাম আক্রান্ত ছোয়ামনিকে। হাসপাতালের ষষ্ঠ তলার ওয়ার্ডের বাইরে করিডরে চিকিৎসা চলছে তার। ১০ মাস বয়সী এই শিশুর মা লিমা আক্তার বলেন, মেয়েকে হামের টিকা দেওয়া হয়নি। টিকার সময় রমজান চলে এসেছিল। তখন আর টিকা পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, হাম আক্রান্ত হওয়ার পর ছোয়ামনিকে প্রথমে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর সেখান থেকে ফরিদপুরে নিতে বলে। কিন্তু আমরা এখানে নিয়ে এসেছি। বাচ্চার অবস্থা ছিল খারাপ, চিকিৎঃসক আইসিইউতে নিতে বলেছিল। এই হাসপাতালে আসার পর চিকিৎসক বলেছে, এখানে আইসিইউ ফাঁকা নেই। পরে আগারগাঁওয়ে শিশু হাসপাতালে খোঁজ নিয়েও আইসিইউ না পাওয়ায় এখানেই রেখেছি।

গত সপ্তাহে হামে আক্রান্ত হয় ৫ মাস বয়সী আরিয়া। প্রথমে ঢাকার কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। এরপর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে এখন সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুরা বেশি ভুগছে শ্বাসকষ্টে। স্ট্রিম ছবি
রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুরা বেশি ভুগছে শ্বাসকষ্টে। স্ট্রিম ছবি

রাজধানীর বনশ্রীর নন্দীপাড়া এলাকায় আরিয়ার পরিবারের বসবাস। তার মা রুনা বেগম বলেন, খাবার খেতে পারছে না। শুধু স্যালাইন চলছে। আর শ্বাসকষ্টে সমস্যা হচ্ছে, অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে।

হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বেশির ভাগ রোগী গুরুতর অবস্থা নিয়ে এখানে আসছে। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার জটিলতাও দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ঢাকাসহ পার্শ্ববর্তী ও বাইরের জেলা থেকেও রোগী আসছে। শুধু হাম নিয়ে ভর্তি রোগীদের গড়ে পাঁচ থেকে সাত দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে তা বেড়ে ১০ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত থাকতে হচ্ছে। শয্যাসংকটে হাম ও জলবসন্তের রোগীদের একসঙ্গে রাখতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত তিন মাসে হাসপাতালটিতে হামে আক্রান্ত হয়ে ২৩টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত বছর পুরো সময়ে যেখানে হামের রোগী ছিল মাত্র ৬৯ জন, সেখানে এ বছর মাত্র তিন মাসেই প্রায় ৬০০ রোগী চিকিৎসা নিতে এসেছে।

হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. শ্রীবাস পাল জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে আরেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর হাসপাতালটিতে হামে মৃত্যু হলো ২৩ শিশুর, যাদের অধিকাংশের বয়স ৩ থেকে ১০ মাসের মধ্যে। বর্তমানে আরও ১১ শিশু আইসিইউতে চিকিৎসা নিচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানায়, গত জানুয়ারি মাসে ২৫ রোগী ভর্তি হলেও কোনো মৃত্যু ছিল না। ফেব্রুয়ারিতে রোগী বেড়ে দাঁড়ায় ৮৮ জনে, মৃত্যু হয় একজনের। আর চলতি মার্চ মাসের এই ৩১ দিনেই ৪৫০ জনের বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন ২৩ জন।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, দেশে হামের টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় বর্তমান প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ। সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী হার বিবেচনায় নিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে জাতীয় টিকাদান-সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপের (নাইট্যাগ) এক জরুরি সভা হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, নিয়মিত কর্মসূচির বাইরে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ছয় মাস বয়সী শিশুদেরও হামের টিকা দেওয়া হবে।

এদিকে, ঘাটতি দূর করতে দ্রুত টিকা আনা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা টিকা আনব।’

সম্পর্কিত