টানা বৃষ্টিতে ভোলায় ১৩০ হেক্টর ফসল নষ্ট, দুশ্চিন্তায় কৃষকেরা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
ভোলা

প্রকাশ : ১২ মে ২০২৬, ১০: ২৮
অনেক ধান এখন পানির নিচে

ভোরের আলো ফোটার আগেই প্রতিদিন মাঠে যেতেন ৬৫ বছরের কৃষক মোহাম্মদ ইসমাইল। কয়েক মাসের শ্রমে গড়া সয়াবিন ও বাদামের ক্ষেত দেখে বুক ভরে যেত তাঁর। স্বপ্ন ছিল, এবার ভালো ফলন হলে এনজিওর ঋণ শোধ করবেন, মেয়ের বিয়ের খরচ দেবেন, ঘরের টিনও বদলাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন পানির নিচে।

ভোলা সদর উপজেলার বাপ্তা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চৌমুহনী বাজারসংলগ্ন বিস্তীর্ণ মাঠে এখন থইথই পানি। কয়েক দিন আগেও যেখানে সবুজ সয়াবিন, বাদাম, মুগডাল ও মরিচের ক্ষেত বাতাসে দুলছিল, সেখানে এখন পচা ফসলের গন্ধ।

স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, গত এক সপ্তাহের টানা বর্ষণ ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় প্রায় ১৩০ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এতে প্রায় ২ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন দুই শতাধিক কৃষক।

মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কৃষক মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ‘এই জমির ফসলই ছিল আমার পরিবারের বাঁচার ভরসা। ব্যাংক আর এনজিও থেকে সুদে টাকা এনে চাষ করেছি। ভাবছিলাম এবার লাভ হবে। কিন্তু এখন সব শেষ। পানির নিচে সব পচে গেছে।’

একই এলাকার কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রায় ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তিনি মরিচ ও মুগডালের আবাদ করেছিলেন। কিন্তু জলাবদ্ধতায় পুরো ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘দিন-রাত পরিশ্রম করে ফসল ফলাইছি। এখন মাঠে গেলে বুক ফেটে কান্না আসে। ঋণের কিস্তি কিভাবে দিবো জানি না। এনজিওর লোকেরা তো আর ক্ষতি বুঝবে না।’

ক্ষতিগ্রস্ত ফসল হাতে কৃষক
ক্ষতিগ্রস্ত ফসল হাতে কৃষক

সরেজমিনে দেখা গেছে, চৌমুহনী বাজারসংলগ্ন নিচু এলাকার বেশির ভাগ জমিতে হাঁটুসমান পানি জমে আছে। অনেক জায়গায় সয়াবিনগাছ কালো হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। বাদামের গাছ পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কৃষকদের কেউ কেউ শেষ চেষ্টা হিসেবে জমি থেকে পানি সরাতে ছোট ছোট নালা কাটছেন। তবে তাতেও খুব একটা কাজ হচ্ছে না।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পানি নিষ্কাশনের জন্য দুটি ড্রেন নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন তাঁরা। কৃষি অফিস থেকে শুরু করে বিএডিসিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার গিয়েও কোনো সমাধান পাননি। তাঁদের দাবি, সময়মতো ড্রেনেজব্যবস্থা করা হলে এমন ক্ষতি হতো না।

কৃষক নেতা মো. নাজিম উদ্দীন বলেন, ‘এই এলাকার কৃষকরা বছরের পর বছর একই সমস্যায় ভুগছে। আমরা বহুবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে গেছি। কিন্তু কেউ গুরুত্ব দেয়নি। এবার কৃষকদের কোটি কোটি টাকার ফসল নষ্ট হলো। এই ক্ষতির দায় কে নেবে?’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক কৃষক এখন নিঃস্ব হয়ে গেছে। কেউ গরু বিক্রি করবে, কেউ জমি বন্ধক দেবে—এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দ্রুত সরকারি সহায়তা না পেলে অনেক পরিবার পথে বসবে।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান বলেন, ‘টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে এডিবির সহায়তায় কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।’

কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ভোলা জেলায় ২৩ হাজার ৭৭৬ জন কৃষকের ৮৩ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সম্পর্কিত