ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন

ইরানে গোপনে ‘হামলা চালিয়েছিল’ আরব আমিরাত

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ইরানের লাভান দ্বীপের তেল শোধনাগারে হামলার পর আগুর জ্বলছে। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গেযুদ্ধ চলাকালে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) গোপনে ইরানে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছেন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কয়েকজন ব্যক্তি। এতে উপসাগরীয় এই দেশটিকে প্রথমবারের মতো সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার মতো খবর পাওয়া গেল। খবর দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনী পশ্চিমা প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান ও নজরদারি ব্যবস্থায় সমৃদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও প্রভাব রক্ষায় দেশটি এখন আরও সক্রিয়ভাবে সামরিক শক্তি ব্যবহারে আগ্রহী।

সূত্রগুলোর দাবি, হামলা চালানোর বিষয়টি সংযুক্ত আরব আমিরাত স্বীকার করেনি। দেশটির চালানো হামলাগুলোর মধ্যে একটি ছিল ইরানের লাভান দ্বীপের তেল শোধনাগার। এপ্রিলের শুরুতে ওই হামলার পর সেখানে বড় ধরনের আগুন লাগে এবং শোধনাগারটির কার্যক্রম কয়েক মাসের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।

ওই সময় ইরান বলেছিল, শত্রুপক্ষের হামলায় শোধনাগারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর জবাবে তারা সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুদ্ধবিরতির আগেই হামলাটি হয়েছিল বলে যুক্তরাষ্ট্র এতে আপত্তি জানায়নি। যুদ্ধে অংশ নিতে আগ্রহী উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূমিকাকে ওয়াশিংটন নীরবে স্বাগত জানিয়েছে।

তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হামলার বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তারা আগের বিবৃতির কথা উল্লেখ করে বলেছে, শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডের জবাব দেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক দিনা এসফানদিয়ারি বলেন, ইরানের ওপর সরাসরি হামলা চালানো কোনো উপসাগরীয় আরব দেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এর ফলে তেহরান এখন ইউএই ও যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টা করা অন্যান্য আরব দেশের মধ্যে বিভক্তি তৈরির চেষ্টা করবে।

যুদ্ধ শুরুর আগে উপসাগরীয় দেশগুলো জানিয়েছিল, তারা নিজেদের আকাশসীমা হামলার কাজে ব্যবহার করতে দেবে না। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন শহর, জ্বালানি অবকাঠামো ও বিমানবন্দরে হামলা শুরু করে। এর উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য বাড়ানো।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান সবচেয়ে বেশি হামলা চালিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। প্রায় ২ হাজার ৮০০ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়া হয় দেশটিতে। এটি অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি।

এসব হামলার প্রভাব বিমান চলাচল, পর্যটন ও আবাসন খাতে পড়েছে। ছাঁটাই ও বাধ্যতামূলক ছুটির ঘটনাও বেড়েছে দেশটিতে। উপসাগরীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে ইরান সম্পর্কে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন এসেছে।

লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো এইচ এ হেলিয়ার বলেন, আমিরাত শুরু থেকেই যুদ্ধ চায়নি। কিন্তু নিজেদের ওপর হামলার পর তারা আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে দেখতে শুরু করেছে।

মার্চের মাঝামাঝি থেকে ইরানে হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পৃক্ততা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। তখন ইরানের আকাশে এমন একটি যুদ্ধবিমান দেখা যায়, যা ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের বলে মনে হয়নি। পরে বিশ্লেষকেরা দাবি করেন, ফরাসি মিরাজ যুদ্ধবিমান ও চীনা উইং লুং ড্রোন ব্যবহার করে সংযুক্ত আরব আমিরাত যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল।

সামরিক শক্তির দিক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমানবাহিনী অত্যন্ত আধুনিক ও প্রশিক্ষিত। অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা ডেভ ডেপ্টুলা বলেন, নির্ভুল হামলা, আকাশ প্রতিরক্ষা ও নজরদারির ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন অঞ্চলটির অন্যতম শক্তিশালী বাহিনী।

এদিকে যুদ্ধ ঘিরে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে নতুন রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লেও সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাত জাতিসংঘে একটি প্রস্তাবের খসড়াকে সমর্থন দিয়েছে। সেই প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ভাঙার কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজন হলে শক্তি প্রয়োগের অনুমোদনের কথাও এতে উল্লেখ আছে।

এ ছাড়া দুবাইয়ে ইরান-সংশ্লিষ্ট স্কুল ও ক্লাব বন্ধ করা হয়েছে এবং ইরানি নাগরিকদের ভিসা ও ট্রানজিট সুবিধা সীমিত করা হয়েছে। এর ফলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরানের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাত যে অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে আসছিল, তা কমে গেছে।

এর জবাবে ইরান বারবার অভিযোগ করেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে যোগ দিয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন কর্মকর্তা জন ভেনেবল বলেন, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর দেশটির আকাশে সামরিক অভিযান চালানোর ঝুঁকি এখন অনেক কমে গেছে। তার ভাষায়, এখন মাঝারি ও উচ্চ উচ্চতায় যুদ্ধবিমান কার্যত বাধাহীনভাবে অভিযান চালাতে পারে।

সম্পর্কিত