পোশাক শিল্পে রূপান্তরের আড়ালেও রয়ে গেছে ঝুঁকি

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১: ৩২
স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী শিল্প দুর্ঘটনা সাভারের রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর পূর্ণ হলো। ২০১৩ সালের এই দিনে ৯তলা ভবনটি ধসে পড়ে ১ হাজার ১৩৮ জন পোশাকশ্রমিকের নিহত হন। আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেন হাজারো শ্রমিক। এ ঘটনাটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থাকে পুরো বিশ্বের সামনে ফুটে ওঠে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর গত ১৩ বছরে বাংলাদেশের পোশাক খাতে রূপান্তর ঘটেছে। শীর্ষস্থানীয় কারখানাগুলো নিরাপদ হলেও, এই খাতের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোতে কাঠামোগত দুর্বলতা ও নজরদারির অভাবের অভিযোগ রয়েছে।

রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে দেশের পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা সংস্কারে গঠিত হয়েছিল ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট ‘অ্যাকর্ড’ এবং উত্তর আমেরিকার ক্রেতাদের জোট ‘অ্যালায়েন্স’। এই দুই জোটের অধীনে দেশের প্রায় দুই হাজার কারখানায় সংস্কারকাজ হয়।

২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর অ্যালায়েন্স তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার পর ‘নিরাপণ’ নামে একটি সংস্থা গঠিত হলেও তারা বেশি দিন টেকেনি। অন্যদিকে, অ্যাকর্ডের কাজ ২০২০ সালের ১ জুন থেকে তদারকি শুরু করে মালিক, শ্রমিক ও ক্রেতাদের ত্রিপক্ষীয় জোট ‘আরএমজি সাসটেইনিবিলিটি কাউন্সিল’ (আরএসসি)।

আরএসসির অধীনে থাকা কারখানাগুলো নিরাপদ হলেও এর বাইরে থাকা কারখানাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা রয়ে গেছে। অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের বাইরে থাকা ১ হাজার ৫৪৯টি কারখানা একসময় জাতীয় ত্রিপক্ষীয় কর্মপরিকল্পনার (এনটিএপি) অধীনে পরিদর্শনের আওতায় আনা হয়েছিল। ‘সংশোধন সমন্বয় সেল’ (আরসিসি) নামের একটি প্রকল্পের অধীনে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) এসব কারখানার তদারকি শুরু করে।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে আরসিসি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ডিআইএফই ‘ইন্ডাস্ট্রি সেফটি ইউনিট’ গঠনের মাধ্যমে বাকি সংস্কারকাজ শেষ করার উদ্যোগ নেয়। এই ইউনিটের অধীনে থাকা ৬৬৬টি কারখানার সংস্কারকাজের অগ্রগতি খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। আর্থিক সংকট, সদিচ্ছা ও নজরদারির অভাবে মাঝারি মানের অনেক কারখানা এখনো অগ্নিকাণ্ড ও কাঠামোগত ঝুঁকিতে রয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার ফেডারেশনের (বিজিআইডব্লিউএফ) সভাপতি কল্পনা আক্তার স্ট্রিমকে বলেন, রানা প্লাজা ধসের পর পোশাক শিল্পে নিরাপত্তার দিক থেকে মোটাদাগে উন্নয়ন হয়েছে। তবে এখানে দুটি ভাগ রয়েছে, অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের অধীনে থাকা প্রায় দুই হাজার প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা সন্তোষজনক পর্যায়ে এসেছে।

তিনি বলেন, এর বাইরে থাকা প্রায় দেড় হাজার পোশাক কারখানায় নিরাপত্তাব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে। কারণ, এগুলোর যথাযথ তদারকি হয় না। এর দায় আসলে ডিআইএফই’র। তারা নানা অজুহাতে তদারকিটা ঠিকভাবে করছে না। ফলে এই কারখানাগুলো নিরাপত্তার দিক থেকে ভালনারেবল। যে কারণে গত বছর আমরা মিরপুরে বড় অগ্নিকাণ্ড দেখতে পেলাম, কিন্তু এটি তো হওয়ার কথা ছিল না।

এ ব্যাপারে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য ও গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. ফোরকান আহসান স্ট্রিমকে বলেন, পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানে নিয়মিতভাবে পরিদর্শন করা হচ্ছে। আমাদের যতটুকু রিসোর্স আছে, তার যথাযথ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ইন্সপেকশনের চেষ্টা করা হয়।’

ঝুঁকি ছোট কারখানায়

বড় কারখানাগুলো কমপ্লায়েন্স বা শর্ত মেনে চললেও, কাজের বাড়তি চাপ সামলাতে অনেক সময় তারা ছোট কারখানায় ‘সাবকন্ট্রাক্টিং’ বা ঠিকা কাজ দেয়। এসব ছোট কারখানার বেশিরভাগই ডিআইএফই বা আরএসসির নজরদারির বাইরে থাকে। আবাসিক ভবনে বা ঝুঁকিপূর্ণ শেডে গড়ে ওঠা এসব কারখানায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমন পথ বা ভবনের কাঠামোগত অনুমোদনের তোয়াক্কা করা হয় না।

শ্রমিক নেতারা বলছেন, বড় কারখানায় কর্মপরিবেশ ভালো হলেও ছোট কারখানাগুলোর শ্রমিকেরা এখনো মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। কলকারখানা অধিদপ্তরের জনবল ও সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া এই খাতের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি রানা প্লাজার হতাহতদের ক্ষতিপূরণের যে দীর্ঘমেয়াদি দাবি, তার একটি আইনি ও স্থায়ী কাঠামো এখনো দেশে গড়ে ওঠেনি।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাম্প্রতিক বাৎসরিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিগত কয়েক বছরের তুলনায় সর্বশেষ ২০২৫ সালে পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেড়েছে। ২০২৫ সালে পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৬৬৫টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর এলাকায়। সেখানে একটি পোশাক কারখানা ও রাসায়নিক গুদামে লাগা আগুনে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ১৬ জন নিরীহ শ্রমিকের মৃত্যু হয়।

পরিসংখ্যান বলছে, এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল ২৩৬টি। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল মোট ৪০৩টি; যার মধ্যে ১৮৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটে রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানায় এবং ২১৪টি ঘটে স্থানীয় পোশাক কারখানায়।

এর আগে ২০২২ সালে দেশে মোট ৩৮৪টি পোশাক কারখানায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটে (রপ্তানিমুখী ২৪১টি ও স্থানীয় ১৪৩টি)। অন্যদিকে, ২০২১ সালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল মোট ২৭৫টি পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে (রপ্তানিমুখী ১৮০টি ও স্থানীয় ৯৫টি)।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু স্ট্রিমকে বলেন, ২০১৩ সালে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ইউরোপের ক্রেতাদের উদ্যোগে অ্যাকর্ড এবং উত্তর আমেরিকা অঞ্চলের ক্রেতাদের উদ্যোগে অ্যালায়েন্স গঠিত হয়। এর পাশাপাশি সরকার কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডাইফি) কার্যক্রম জোরদার করে।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তারাও এসব উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে কারখানায় অবস্থানকারীদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ বাস্তবায়নে সচেষ্ট হন। এর ফলে আবাসিক এলাকা ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ভবন থেকে কারখানাগুলো ধীরে ধীরে ডেডিকেটেড কারখানা ভবনে স্থানান্তরিত হতে থাকে। যেখানে আন্তর্জাতিক গাইডলাই অনুসারে সব ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।

মাহমুদ হাসান খান বাবু আরও বলেন, বর্তমানে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স বলবৎ না থাকলেও তারা যেসব কার্যক্রম শুরু করে দিয়ে গিয়েছিল, সেগুলোর ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। তাছাড়া ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতাদের থেকে ক্রয়াদেশ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা জনিত পূর্ণাঙ্গ শর্ত পরিপালনের কোন বিকল্প নেই। সে অনুযায়ী, কারখানাগুলো সার্বিক নিরাপত্তা বিধান করেছে। এর ফলে বর্তমানে বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত ৮০ শতাংশ কারখানা ডেডিকেটেড ভবনে স্থানান্তরিত হয়েছে। আর কর্মক্ষেত্রে জখমের (ক্যাজুয়ালটি) হার প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

সম্পর্কিত