লেস্টারের রূপকথার পতন ও কভেন্ট্রির আড়াই দশকের অপেক্ষার অবসান

স্পোর্টস ডেস্ক
স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২: ৪৬
স্ট্রিম গ্রাফিক

ইংলিশ ফুটবলের সমীকরণ কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে থাকল এই মৌসুম। যেখানে এক সময়ের জায়ান্ট কিলার লেস্টার সিটির বিদায়ে নেমে এসেছে বিষাদের ছায়া, সেখানে দীর্ঘ ২৫ বছরের অন্ধকার গহ্বর থেকে রাজকীয় আলোয় ফিরে এসেছে কভেন্ট্রি সিটি।

লেস্টার সিটির উত্থান-পতন

২০১৫-১৬ মৌসুমের ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ জয় করে লেস্টার সিটি। এই দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে ছিলেন জেমি ভার্ডি, রিয়াদ মাহরেজ ও এন'গোলো কান্তের মতো ফুটবলাররা। তবে পর্দার আড়ালে থেকে তাদের এই অসাধ্য সাধনের মূল কারিগর ছিলেন দলের ম্যানেজার ক্লদিও রানিয়েরি। তাছাড়া ২০২১ সালে চেলসিকে ১-০ গোলে হারিয়ে এফএ-কাপে চ্যাম্পিয়নস হয়েছিল লেস্টার সিটি যেই দলের সদস্য হিসেবে ছিল জেমি ভার্ডি ও বাংলাদেশের বর্তমান মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরী।

আবার যখন ২০২৪-২৫ মৌসুমের পর তারা চ্যাম্পিয়নশিপে রেলিগেশনের শিকার হয়। এবারের ২০২৫-২৬ সিজনে তারা রেলিগেট হয়ে হয়ে এবার ইংলিশ লিগ-১ (তৃতীয় স্তরে) নেমে গিয়েছে।

টিএনটি স্পোর্টসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লেস্টারের অবনমন কেবল মাঠের খেলার অভাব ছিল না, বরং আর্থিক নীতি এবং স্কোয়াড পুনর্গঠনে ভুল সিদ্ধান্তের ফল ছিল। দশ বছর আগে যারা প্রিমিয়ার লিগে জিতেছিল, তাদের চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে নেমে ইংলিশ লিগ-১ এ যাওয়াটা ফুটবল বিশ্বের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।

ক্লাবের চেয়ারম্যান আইয়াওয়াত 'টপ' শ্রীভাধানাপ্রভা কোনো অজুহাত না দেখিয়ে তিনি সমর্থকদের কাছে বলেন, ‘এই ব্যর্থতার সম্পূর্ণ দায়ভার আমার। আমাদের এই অবস্থানে আসার জন্য যে সিদ্ধান্তগুলো দায়ী, তার জন্য আমি সমর্থকদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।’

হামজা চৌধুরী। সংগৃহীত ছবি
হামজা চৌধুরী। সংগৃহীত ছবি

কভেন্ট্রি সিটি: ২৫ বছরের বনবাস ও রাজকীয় প্রত্যাবর্তন

২০০০-০১ মৌসুমে রেলিগেট হওয়ার পর কভেন্ট্রি সিটি এমন এক গোলকধাঁধায় পড়েছিল যে তারা এক সময় লিগ টু-তেও (চতুর্থ বিভাগ) নেমে গিয়েছিল।

২৫ বছর আগে যখন তারা বিদায় নিয়েছিল, তখন ক্লাবের ভবিষ্যৎ ছিল অনিশ্চিত। সাম্প্রতিক প্রমোশনের পর ক্লাবের বর্তমান পরিবেশ যেমন ছিলো তারই সাথে তার মূলে ছিলো তাদের দলের প্রধান কোচ ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড যিনি ২০২৪ এর নভেম্বরে আড়াই বছরের চুক্তিতে যুক্ত হয়। তিনি এ ২০২৫-২৬ মৌসুমে চ্যাম্পিয়ানশীপের সেরা কোচ হিসেবে নির্বাচিত হয়, আর তার দলের সঠিক পরিকল্পনার ফলেই তার দলের এই ধ্বংসস্তূপ থেকেও ফেরাটা সম্ভব হলো।

সমর্থকদের উচ্ছ্বাস

কভেন্ট্রি যখন তাদের ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করে প্রিমিয়ার লিগে ফেরা নিশ্চিত করল, তখন সমর্থক ও মালিকপক্ষের একটাই সুর ছিল ‘আমরা ফিরে এসেছি’। তাদের এক সমর্থক বলেন, ‘আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না, দীর্ঘ ২৫টা বছর পর আমরা প্রিমিয়ার লিগে। ইয়েস এবার আমরা পেরেছি। আর্সেনাল, ইউনাইটেড চেলসি উই উইল সি ইউ।’ এই বার্তার মাধ্যমেও এটি প্রকাশিত হয় যে তাদের সমর্থকেরাও প্রস্তুত ইংলিশ লীগে তাদের হারানো গৌরবকে ফিরে আনার জন্য।

সংগৃহীত ছবি
সংগৃহীত ছবি

প্রিমিয়ার লিগে সুযোগ পাওয়া কেন এভারেস্ট জয়ের সমান কঠিন

বিবিসি এবং স্পোর্টসের তথ্যমতে, চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে প্রিমিয়ার লিগে আসাটা বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। এর পেছনে থাকা মূল কারণ হলো:

আর্থিক জীবনের গ্যারান্টি (১৭০ মিলিয়ন ইউরোরও বেশি অর্থ): প্রিমিয়ার লিগে ওঠা মানেই একটি ক্লাবের ব্যাংক ব্যালেন্সে এক রাতেই প্রায় ১৭০ থেকে ২০০ মিলিয়ন পাউন্ড যোগ হওয়া। এই বিশাল অর্থের জন্য চ্যাম্পিয়নশিপের ২৪টি দল এমনভাবে লড়ে যে এখানে ছোট কোনো ভুলের জায়গা থাকে না।

চ্যাম্পিয়নশিপের নিষ্ঠুর ম্যারাথন: ৪৬টি ম্যাচের দীর্ঘ লিগ শেষে মাত্র দুটি দল সরাসরি সুযোগ পায়। বাকিদের লড়তে হয় প্লে-অফের মতো নার্ভ-র‍্যাকিং পরীক্ষায়। কভেন্ট্রিকে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে আড়াই দশক ধরে অপেক্ষা করতে হয়েছে, যা তাদের মানসিক শক্তির পরিচয় দেয়।

প্যারাসুট পেমেন্টের বৈষম্য: লেস্টার সিটির মতো যারা প্রিমিয়ার লিগ থেকে নামে, তারা কয়েক বছর মোটা অংকের সরকারি সাহায্য পায়। ফলে কভেন্ট্রির মতো ক্লাবগুলোর জন্য এই বড় বাজেটের দলগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে চ্যাম্পিয়নশিপে জেতাটা অসম লড়াইয়ের মতো।

লেস্টার সিটি এবং কভেন্ট্রি সিটির এই চিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রিমিয়ার লিগ কোনো স্থায়ী উত্তরাধিকার নয়। এখানে টিকে থাকতে হলে যেমন মেধা লাগে, তেমনি ফিরে আসতে লাগে অসীম ধৈর্য ও কঠোর অধ্যাবসায়। লেস্টারের মালিকের স্বীকারোক্তি এবং কভেন্ট্রির ২৫ বছরের জয়োল্লাস এবারের মৌসুমে রচিত হলো ইংলিশ ফুটবলের এক নতুন অধ্যায়।

সম্পর্কিত