ইমরান হোসাইন

রাজধানীর একটি বাসায় ৯ বছর ধরে গৃহকর্মীর কাজ করেন ভোলার নদীভাঙন কবলিত এলাকার বাসিন্দা নাজমা আক্তার। তবে ঈদ সামনে রেখে আকস্মিক তাকে ছাঁটাই করেছেন গৃহকর্তা। নাজমা অন্য যে বাসায় কাজ করতেন সেখানেও একই অবস্থা। দুই নিয়োগকর্তারই এমন সিদ্ধান্তে ঈদের আগে অথই সাগরে পড়েছেন নিম্ন আয়ের এই নারী।
নাজমা স্ট্রিমকে বলেন, ‘এক বাসায় আমাকে ৬ তারিখে কাজ থেকে মানা করেছে, আরেক বাসায় ৭ তারিখে। তারা এখন দেশে যাবে। আমাকে বলেছে— তুমি এখন যাও, পরে এলে আবার তোমাকে কাজে রাখব। আমি বললাম, এটা আবার কেমন কথা! আমার এক মাসের বেতন দেওয়া উচিত। তারা বলল, এক মাসের বেতন কেমনে দেব? তুমি কি কাজ করছো?’
উৎসবের আগে এমন আকস্মিক চাকরিচ্যুতি কেবল নাজমার নয়, রাজধানীর লাখো গৃহকর্মীর নিত্যদিনের বাস্তবতা। অথচ ২০১৫ সালে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি’র ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে চাকরি থেকে অপসারণ বা অবসানের ক্ষেত্রে উভয়পক্ষকে ন্যূনতম এক মাস পূর্বে পরস্পরকে অবহিত করতে হবে। যদি তাৎক্ষণিকভাবে গৃহকর্তা গৃহকর্মীর চাকরির অবসান ঘটায়, তাহলে ৩০ দিনের মজুরি প্রদান করে চাকরির অবসান ঘটাতে হবে।’ তবে বাস্তবে এই নীতির প্রয়োগ দেখা যায় না।
নীতি থেকে অধ্যাদেশে ৪ স্বীকৃতি
দীর্ঘ এক দশক পর গত বছর পাস হওয়া শ্রম (সংশোধিত) অধ্যাদেশে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতির কয়েকটি মূল বিষয় আইনি রূপ পেয়েছে। এর মধ্যে চারটি মূল নীতি এই অধ্যাদেশে স্থান পেয়েছে। প্রথমত, সুরক্ষা নীতির ৫.২ ধারায় গৃহকর্মীর যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছিল, শ্রম আইনের ২ ধারায় সেই সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এই সংজ্ঞায়নের মাধ্যমে গৃহকর্মীরা প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক শ্রমিক হিসেবে আইনি স্বীকৃতি পেয়েছে। তৃতীয়ত, নীতির ৭.৯ ধারায় কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের যে বিধান রাখা হয়েছিল, অধ্যাদেশে নতুন ধারা যোগ করে ‘এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম ফান্ড’ গঠনের মাধ্যমে সেই দাবি আংশিকভাবে পূরণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সুরক্ষা নীতিতে অভিযোগের ক্ষেত্র কেবল মনিটরিং সেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে অধ্যাদেশে গৃহকর্মীদের শ্রম আইনের আওতায় আনার ফলে এখন সরাসরি শ্রম আদালতে মামলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে আইনি এই অগ্রগতির পরও নীতিতে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো—ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, বাধ্যতামূলক নিয়োগপত্র, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং ১৬ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটির বিধান এই অধ্যাদেশে নেই।
কর্মঘণ্টা ও মজুরিতে শোষণ
গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতির ৭.৪ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক গৃহকর্মীর কর্মঘণ্টা এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যেন তিনি পর্যাপ্ত ঘুম, বিশ্রাম, চিত্তবিনোদন ও প্রয়োজনীয় ছুটি পান। ৭ তারিখের মধ্যে আগের মাসের বেতন পরিশোধের বিধানও রয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। রাজধানীর দারুস সালাম এলাকার আয়শা বেগম দুই বাসায় কাজ করে মাসে পান ৫ হাজার টাকা পান, যা দৈনিক হিসাবে ১৫০ টাকারও কম। আবার তাসনুর নামে আরেক গৃহকর্মী দিনে ৫ ঘণ্টা কাজ করে মাসে পান মাত্র দুই হাজার টাকা। ভোলা থেকে আসা নাসিমা বেগম সকাল ৬টা থেকে রাত ৮–৯টা পর্যন্ত কাজ করে আয় করেন ৮ হাজার টাকা। কিন্তু মাসে ছুটি মেলে মাত্র দুই দিন।
অন্যভাবে গৃহকর্মীদের ঠকানো হয়। এক গৃহকর্মী জানান, রোজার ক্লান্তির কারণে ফ্যান মুছতে না পারায় ১২০০ টাকা বেতন থেকে ২০০ টাকা কেটে রেখেছেন তার নিয়োগকর্তা। কল্যাণপুর পোড়া বস্তির রুজিনা বেগম জানান, এক বাসায় ১৪ মাস রান্নার কাজ করেছেন মাসে ১ হাজার টাকায়। তবে কোনোদিন বোনাস পাননি। সম্প্রতি তাকে কাজ থেকে বাদ দিয়ে ৫০০ টাকা চুক্তিতে আরেকজনকে নেওয়া হয়েছে।
সুরক্ষা নীতির ৭.৭ ধারায় বলা হয়েছে, অসুস্থ গৃহকর্মীকে কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে এবং নিয়োগকারী নিজ ব্যয়ে তার যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন। তবে এটিও মানেন না নিয়োগকর্তারা।
উৎসবের দিনেও ছুটি নেই, বাড়ে কাজের চাপ
উৎসবের দিনে বোনাস দূরে থাক, ছুটিও পান না অনেক গৃহকর্মীরা। ঈদের ছুটি নিয়ে কল্যাণপুরের ছকিনা বেগম বলেন, ‘৩০ দিনই কাজ করি। শুক্রবার-শনিবারও যেতে হয়। ঈদে এখনও বাড়তি টাকা বা যাকাত পাইনি। আগে পুরোনো শাড়ি বা খাবার পাওয়া যেত। তাও এখন মানুষ দেয় না।’
গৃহ শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী আবুল হোসাইন বলেন, ঈদে গৃহকর্মীদের বাস্তবতা এমনই। সারা বছরের চেয়ে ঈদের দিনগুলোতে পরিবারগুলোতে কাজের চাপ অনেক বেশি থাকে। ফলে বিশ্রামের বদলে উৎসবের দিনগুলোতে গৃহকর্মীদের আরও বেশি শ্রম দিতে হয়।
ছুটির বিষয়ে শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বোঝাপড়ার মাধ্যমে কাজ করলে সমস্যা নেই। কেউ ঈদের দিন কাজ করে পরে ২ দিন ছুটি পেতে পারে। কিন্তু সমস্যা হয় তখন, যখন বিষয়টা চাপিয়ে দেওয়া হয়।’
আইনি স্বীকৃতি বনাম বঞ্চনার বাস্তবতা
গৃহকর্মীদের অধিকার রক্ষায় দীর্ঘ ১০ বছরেও সুরক্ষা নীতি কার্যকর না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন অধিকারকর্মীরা।
গৃহ শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের আবুল হোসাইন বলেন, ‘সুরক্ষা নীতিতে চমৎকার সব কথা থাকলেও আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না। অধ্যাদেশের ফলে গৃহকর্মীরা অন্তত শ্রম আইনে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে মাত্র ৪টি ধারা গৃহকর্মীদের জন্য রাখা হয়েছে। তাদের মূল অধিকারগুলো এখনও উপেক্ষিত। গৃহকর্মীর চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই, কীভাবে তাদের বেতন-ভাতা নির্ধারিত হবে তারও কোনো উল্লেখ নেই।
শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য তাসলিমা আক্তার লিমা বলেন, গৃহশ্রমিকদের এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা বেতনের কোনো ঠিক নেই। শুধু শ্রম অধ্যাদেশে স্বীকৃতি পাওয়ায় গৃহকর্তার সঙ্গে দরকষাকষিতে কিছুটা সুবিধা পেতে পারেন।
এদিকে সুরক্ষা নীতি এক দশকেও কার্যকর না হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক দলের উদাসীনতা ও নীতিনির্ধারকদের মানসিক সংকটকে বড় কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এ প্রসঙ্গে শ্রম অধিকার বিশেষজ্ঞ সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, যারা আইন করেন, তারা ধরেই নিয়েছেন এমন কোনো আইনের প্রয়োজন নেই বা একে রেগুলেট করা সম্ভব নয়। ঘরে ঘরে গিয়ে পরিদর্শন করা কঠিন—এই মানসিক বন্ধ্যাত্বের কারণেই নীতিনির্ধারকরা গৃহকর্মীদের আইনি অধিকার দিতে পিছপা হন। তাদের ধারণা, আইনি অধিকার দিলে মামলার সংখ্যা বেড়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, গৃহকর্মীরা সংগঠিত না হওয়ায় তাদের অধিকার নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কোনো আন্দোলন হয় না। বড় ধরনের নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেই শুধু খবরে আসে। প্রতিদিন নীরবে যে নির্যাতন হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা হয় না। চাপ প্রয়োগ না করলে আমাদের দেশে নীতিনির্ধারকরা কথা শোনেন না।
বর্তমানে গৃহকর্মী নিয়োগের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা রেগুলেটরি বোর্ড না থাকায় পুরো প্রক্রিয়াই চলছে মৌখিক চুক্তির ভিত্তিতে। গৃহশ্রমিক ইউনিয়নের উপদেষ্টা শাখারভ হোসেন সেবক বলেন, ‘চুক্তির অভাবে অনেক গৃহকর্মী যেমন বিনা নোটিশে ছুটি কাটান, তেমনি নিয়োগকারীরাও তাদের খেয়াল-খুশিমতো গৃহকর্মীদের চাকরিচ্যুত করেন। এক্ষেত্রে একটি মনিটরিং সেল বা রেগুলেটরি বোর্ড থাকা জরুরি। আর বৈষম্য দূর করতে হলে সরকারের অবিলম্বে একটি মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে।
এদিকে সুরক্ষা নীতির ৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছিল, নীতি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে কেন্দ্রীয়ভাবে এবং সিটি করপোরেশন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মনিটরিং সেল থাকবে। গত এক দশকেও যা বাস্তবায়ন হয়নি।
গৃহ শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের আবুল হোসাইন বলেন, আগের সরকারের আমলে দুই-একটি বৈঠক হলেও পরে আর আলোর মুখ দেখেনি।
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে সুরক্ষা নীতির সবশেষ পরিস্থিতি জানতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল পর্যায়ে সম্প্রতি যোগাযোগ করে স্ট্রিম। তবে এসব কর্মকর্তাদের কেউ বিষয়টি জানেন না বলে জানান।
সব মিলিয়ে সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, সমস্যা সমাধান করতে হলে কাজ শুরু করতে হবে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গৃহকর্মীদের নিবন্ধনের আওতায় এনে তাদের একটি পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে। আর সরকারি একটি প্রতিষ্ঠান থাকা প্রয়োজন যেখানে গৃহকর্মীরা অভিযোগ জানাতে পারবেন এবং বিচার পাবেন।

রাজধানীর একটি বাসায় ৯ বছর ধরে গৃহকর্মীর কাজ করেন ভোলার নদীভাঙন কবলিত এলাকার বাসিন্দা নাজমা আক্তার। তবে ঈদ সামনে রেখে আকস্মিক তাকে ছাঁটাই করেছেন গৃহকর্তা। নাজমা অন্য যে বাসায় কাজ করতেন সেখানেও একই অবস্থা। দুই নিয়োগকর্তারই এমন সিদ্ধান্তে ঈদের আগে অথই সাগরে পড়েছেন নিম্ন আয়ের এই নারী।
নাজমা স্ট্রিমকে বলেন, ‘এক বাসায় আমাকে ৬ তারিখে কাজ থেকে মানা করেছে, আরেক বাসায় ৭ তারিখে। তারা এখন দেশে যাবে। আমাকে বলেছে— তুমি এখন যাও, পরে এলে আবার তোমাকে কাজে রাখব। আমি বললাম, এটা আবার কেমন কথা! আমার এক মাসের বেতন দেওয়া উচিত। তারা বলল, এক মাসের বেতন কেমনে দেব? তুমি কি কাজ করছো?’
উৎসবের আগে এমন আকস্মিক চাকরিচ্যুতি কেবল নাজমার নয়, রাজধানীর লাখো গৃহকর্মীর নিত্যদিনের বাস্তবতা। অথচ ২০১৫ সালে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি’র ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে চাকরি থেকে অপসারণ বা অবসানের ক্ষেত্রে উভয়পক্ষকে ন্যূনতম এক মাস পূর্বে পরস্পরকে অবহিত করতে হবে। যদি তাৎক্ষণিকভাবে গৃহকর্তা গৃহকর্মীর চাকরির অবসান ঘটায়, তাহলে ৩০ দিনের মজুরি প্রদান করে চাকরির অবসান ঘটাতে হবে।’ তবে বাস্তবে এই নীতির প্রয়োগ দেখা যায় না।
নীতি থেকে অধ্যাদেশে ৪ স্বীকৃতি
দীর্ঘ এক দশক পর গত বছর পাস হওয়া শ্রম (সংশোধিত) অধ্যাদেশে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতির কয়েকটি মূল বিষয় আইনি রূপ পেয়েছে। এর মধ্যে চারটি মূল নীতি এই অধ্যাদেশে স্থান পেয়েছে। প্রথমত, সুরক্ষা নীতির ৫.২ ধারায় গৃহকর্মীর যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছিল, শ্রম আইনের ২ ধারায় সেই সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এই সংজ্ঞায়নের মাধ্যমে গৃহকর্মীরা প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক শ্রমিক হিসেবে আইনি স্বীকৃতি পেয়েছে। তৃতীয়ত, নীতির ৭.৯ ধারায় কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের যে বিধান রাখা হয়েছিল, অধ্যাদেশে নতুন ধারা যোগ করে ‘এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম ফান্ড’ গঠনের মাধ্যমে সেই দাবি আংশিকভাবে পূরণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সুরক্ষা নীতিতে অভিযোগের ক্ষেত্র কেবল মনিটরিং সেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে অধ্যাদেশে গৃহকর্মীদের শ্রম আইনের আওতায় আনার ফলে এখন সরাসরি শ্রম আদালতে মামলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে আইনি এই অগ্রগতির পরও নীতিতে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো—ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, বাধ্যতামূলক নিয়োগপত্র, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং ১৬ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটির বিধান এই অধ্যাদেশে নেই।
কর্মঘণ্টা ও মজুরিতে শোষণ
গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতির ৭.৪ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক গৃহকর্মীর কর্মঘণ্টা এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যেন তিনি পর্যাপ্ত ঘুম, বিশ্রাম, চিত্তবিনোদন ও প্রয়োজনীয় ছুটি পান। ৭ তারিখের মধ্যে আগের মাসের বেতন পরিশোধের বিধানও রয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। রাজধানীর দারুস সালাম এলাকার আয়শা বেগম দুই বাসায় কাজ করে মাসে পান ৫ হাজার টাকা পান, যা দৈনিক হিসাবে ১৫০ টাকারও কম। আবার তাসনুর নামে আরেক গৃহকর্মী দিনে ৫ ঘণ্টা কাজ করে মাসে পান মাত্র দুই হাজার টাকা। ভোলা থেকে আসা নাসিমা বেগম সকাল ৬টা থেকে রাত ৮–৯টা পর্যন্ত কাজ করে আয় করেন ৮ হাজার টাকা। কিন্তু মাসে ছুটি মেলে মাত্র দুই দিন।
অন্যভাবে গৃহকর্মীদের ঠকানো হয়। এক গৃহকর্মী জানান, রোজার ক্লান্তির কারণে ফ্যান মুছতে না পারায় ১২০০ টাকা বেতন থেকে ২০০ টাকা কেটে রেখেছেন তার নিয়োগকর্তা। কল্যাণপুর পোড়া বস্তির রুজিনা বেগম জানান, এক বাসায় ১৪ মাস রান্নার কাজ করেছেন মাসে ১ হাজার টাকায়। তবে কোনোদিন বোনাস পাননি। সম্প্রতি তাকে কাজ থেকে বাদ দিয়ে ৫০০ টাকা চুক্তিতে আরেকজনকে নেওয়া হয়েছে।
সুরক্ষা নীতির ৭.৭ ধারায় বলা হয়েছে, অসুস্থ গৃহকর্মীকে কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে এবং নিয়োগকারী নিজ ব্যয়ে তার যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন। তবে এটিও মানেন না নিয়োগকর্তারা।
উৎসবের দিনেও ছুটি নেই, বাড়ে কাজের চাপ
উৎসবের দিনে বোনাস দূরে থাক, ছুটিও পান না অনেক গৃহকর্মীরা। ঈদের ছুটি নিয়ে কল্যাণপুরের ছকিনা বেগম বলেন, ‘৩০ দিনই কাজ করি। শুক্রবার-শনিবারও যেতে হয়। ঈদে এখনও বাড়তি টাকা বা যাকাত পাইনি। আগে পুরোনো শাড়ি বা খাবার পাওয়া যেত। তাও এখন মানুষ দেয় না।’
গৃহ শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী আবুল হোসাইন বলেন, ঈদে গৃহকর্মীদের বাস্তবতা এমনই। সারা বছরের চেয়ে ঈদের দিনগুলোতে পরিবারগুলোতে কাজের চাপ অনেক বেশি থাকে। ফলে বিশ্রামের বদলে উৎসবের দিনগুলোতে গৃহকর্মীদের আরও বেশি শ্রম দিতে হয়।
ছুটির বিষয়ে শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বোঝাপড়ার মাধ্যমে কাজ করলে সমস্যা নেই। কেউ ঈদের দিন কাজ করে পরে ২ দিন ছুটি পেতে পারে। কিন্তু সমস্যা হয় তখন, যখন বিষয়টা চাপিয়ে দেওয়া হয়।’
আইনি স্বীকৃতি বনাম বঞ্চনার বাস্তবতা
গৃহকর্মীদের অধিকার রক্ষায় দীর্ঘ ১০ বছরেও সুরক্ষা নীতি কার্যকর না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন অধিকারকর্মীরা।
গৃহ শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের আবুল হোসাইন বলেন, ‘সুরক্ষা নীতিতে চমৎকার সব কথা থাকলেও আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না। অধ্যাদেশের ফলে গৃহকর্মীরা অন্তত শ্রম আইনে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে মাত্র ৪টি ধারা গৃহকর্মীদের জন্য রাখা হয়েছে। তাদের মূল অধিকারগুলো এখনও উপেক্ষিত। গৃহকর্মীর চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই, কীভাবে তাদের বেতন-ভাতা নির্ধারিত হবে তারও কোনো উল্লেখ নেই।
শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য তাসলিমা আক্তার লিমা বলেন, গৃহশ্রমিকদের এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা বেতনের কোনো ঠিক নেই। শুধু শ্রম অধ্যাদেশে স্বীকৃতি পাওয়ায় গৃহকর্তার সঙ্গে দরকষাকষিতে কিছুটা সুবিধা পেতে পারেন।
এদিকে সুরক্ষা নীতি এক দশকেও কার্যকর না হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক দলের উদাসীনতা ও নীতিনির্ধারকদের মানসিক সংকটকে বড় কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এ প্রসঙ্গে শ্রম অধিকার বিশেষজ্ঞ সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, যারা আইন করেন, তারা ধরেই নিয়েছেন এমন কোনো আইনের প্রয়োজন নেই বা একে রেগুলেট করা সম্ভব নয়। ঘরে ঘরে গিয়ে পরিদর্শন করা কঠিন—এই মানসিক বন্ধ্যাত্বের কারণেই নীতিনির্ধারকরা গৃহকর্মীদের আইনি অধিকার দিতে পিছপা হন। তাদের ধারণা, আইনি অধিকার দিলে মামলার সংখ্যা বেড়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, গৃহকর্মীরা সংগঠিত না হওয়ায় তাদের অধিকার নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কোনো আন্দোলন হয় না। বড় ধরনের নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেই শুধু খবরে আসে। প্রতিদিন নীরবে যে নির্যাতন হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা হয় না। চাপ প্রয়োগ না করলে আমাদের দেশে নীতিনির্ধারকরা কথা শোনেন না।
বর্তমানে গৃহকর্মী নিয়োগের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা রেগুলেটরি বোর্ড না থাকায় পুরো প্রক্রিয়াই চলছে মৌখিক চুক্তির ভিত্তিতে। গৃহশ্রমিক ইউনিয়নের উপদেষ্টা শাখারভ হোসেন সেবক বলেন, ‘চুক্তির অভাবে অনেক গৃহকর্মী যেমন বিনা নোটিশে ছুটি কাটান, তেমনি নিয়োগকারীরাও তাদের খেয়াল-খুশিমতো গৃহকর্মীদের চাকরিচ্যুত করেন। এক্ষেত্রে একটি মনিটরিং সেল বা রেগুলেটরি বোর্ড থাকা জরুরি। আর বৈষম্য দূর করতে হলে সরকারের অবিলম্বে একটি মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে।
এদিকে সুরক্ষা নীতির ৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছিল, নীতি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে কেন্দ্রীয়ভাবে এবং সিটি করপোরেশন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মনিটরিং সেল থাকবে। গত এক দশকেও যা বাস্তবায়ন হয়নি।
গৃহ শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের আবুল হোসাইন বলেন, আগের সরকারের আমলে দুই-একটি বৈঠক হলেও পরে আর আলোর মুখ দেখেনি।
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে সুরক্ষা নীতির সবশেষ পরিস্থিতি জানতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল পর্যায়ে সম্প্রতি যোগাযোগ করে স্ট্রিম। তবে এসব কর্মকর্তাদের কেউ বিষয়টি জানেন না বলে জানান।
সব মিলিয়ে সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, সমস্যা সমাধান করতে হলে কাজ শুরু করতে হবে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গৃহকর্মীদের নিবন্ধনের আওতায় এনে তাদের একটি পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে। আর সরকারি একটি প্রতিষ্ঠান থাকা প্রয়োজন যেখানে গৃহকর্মীরা অভিযোগ জানাতে পারবেন এবং বিচার পাবেন।

রাজধানীতে শুক্রবার দুপুর থেকে ছিল বৃষ্টি। এতে ঈদের আগের দিন বিভিন্ন মার্কেট ও শপিংমলগুলোতে আশানুরূপ ক্রেতার দেখা মেলেনি। রাজধানীর বসুন্ধরা শপিংমল, এলিফ্যান্ট রোড ও নিউ মার্কেট এলাকায় দেখা গেছে এমন চিত্র।
১ ঘণ্টা আগে
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধ এবারও ঈদের আগে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বুধবার ভোর রাতে উপজেলার বিছট গ্রামের জহুর আলী মোড়লের বাড়ির সামনে বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। সকালে গ্রামবাসী জোড়াতালি দিয়ে সংস্কার করলেও প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় আছে বিছট, বল্লভপুর, আনুলিয়াসহ ৫ গ্রামের বাসিন্দারা।
৩ ঘণ্টা আগে
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিহত প্রবাসীর বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) কার্ড থাকলে তাঁর পরিবার অতিরিক্ত ১০ লাখ টাকা করে পাবেন বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
৩ ঘণ্টা আগে
কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে পবিত্র ঈদুল ফিতরের ১৯৯তম জামাতের নিরাপত্তায় ৫ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। শুক্রবার (২০ মার্চ) ৩১ বিজিবি নেত্রকোণা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তৌহিদুল বারীর সইয়ে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
৩ ঘণ্টা আগে