জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

সংসদ ভবনের সামনেও মূত্রত্যাগ, কী বলছে কর্তৃপক্ষ?

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

স্ট্রিম গ্রাফিক

জাতীয় সংসদ ভবনের আশপাশে বলিউড সিনেমা ‘পিকে’-এর পোস্টারে আমির খানের দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে প্রকাশ্যে মূত্রত্যাগ করছেন পথচারী। কাক যেভাবে খাবার বা সাবান লুকিয়ে মনে করে কেউ তাকে দেখছে না, তেমনি এক শ্রেণির ‘কাক মানুষ’ রাস্তার যেখানে-সেখানে মূত্র বিসর্জন চালিয়ে যাচ্ছেন।

জাতির গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণের কেন্দ্র জাতীয় সংসদ ভবন, যেখানে বিদেশি কূটনীতিক ও ভিআইপিদের নিয়মিত যাতায়াত থাকে, সেখানে এমন অশোভন দৃশ্য এবং তীব্র দুর্গন্ধে জনমনে চরম ক্ষোভ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সংসদ ভবনের আশপাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকলেও এ ধরনের আচরণ ঠেকাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই।

সংসদ ভবন এলাকায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য ফিরোজ ‘স্ট্রিম’কে বলেন, ‘এটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। ওপর থেকে কঠোর কোনো নির্দেশনা না আসায় আমরা বড় কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছি না। মাঝে মাঝে টহল পুলিশ ধাওয়া করলে তারা পালিয়ে যায়, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।’

সংসদ ভবনের সামনে প্রকাশ্যে মূত্রত্যাগ করছেন পথচারীরা। স্ট্রিম ছবি
সংসদ ভবনের সামনে প্রকাশ্যে মূত্রত্যাগ করছেন পথচারীরা। স্ট্রিম ছবি

পথচারী শশাঙ্ক বরণ রায় বলেন, ‘মানিক মিয়া এভিনিউয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়কে এমন দৃশ্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। এটি আমাদের নগর ব্যবস্থাপনার নাজুক চিত্র তুলে ধরে।’ সংসদ ভবনের পার্শ্ববর্তী এলাকা মনিপুরী পাড়ার বাসিন্দা নাহিদ হক বলেন, ‘বিব্রতকর পরিবেশ ও তীব্র দুর্গন্ধে সংসদ ভবনের আশপাশ দিয়ে যাতায়াত করা দায়। দ্রুত পাবলিক টয়লেট নির্মাণ ও কঠোর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন।’

শুধু রাজধানী নয়। দেশের জেলা-উপজেলা শহরেও প্রসাবের এ ধরনের চিত্র অহরহ দেখাতে পাওয়া যায়। ‘দেয়ালে প্রসাব করবেন না, করলে ১০০ টাকা জরিমানা’, ‘এখানে প্রসাব করা নিষিদ্ধ’—এই ধরনের কথা লেখা থাকলেও মানুষ তা কানে নিচ্ছে না।

কেন মানুষ রাস্তায় প্রস্রাব করে

মানুষ কেবল টয়লেটের অভাবেই রাস্তায় এমন কাজ করে না। এর পেছনে জটিল মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

মনোবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট বান্দুরার ১৯৭৭ সালের সোশ্যাল লার্নিং থিওরি অনুযায়ী, মানুষ অন্যকে দেখে শেখে। বান্দুরার ‘বোবো ডল’ পরীক্ষায় দেখা গেছে, মানুষ সামাজিক পরিবেশ থেকে আচরণ অনুকরণ করে। কোনো এলাকায় নিয়মিত প্রস্রাব করতে দেখলে নতুনরাও তাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়।

এছাড়া অনেকের মধ্যে তাৎক্ষণিক শারীরিক স্বস্তিকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা থাকে। যাদের ‘সেলফ কন্ট্রোল’ কম, তারা দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ফলাফল না ভেবেই তাড়নাবশত মূত্র বিসর্জন করে বলেও মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। আবার কারও কারও মতে, নাগরিকদের মধ্যে ‘সিভিক সেন্স’ বা নাগরিক দায়িত্ববোধ না থাকায় এমন ঘটনা ঘটছে।

সংসদ ভবনের সামনে এমন দৃশ্য লজ্জাজনক। স্ট্রিম ছবি
সংসদ ভবনের সামনে এমন দৃশ্য লজ্জাজনক। স্ট্রিম ছবি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের সাইকোলজিস্ট শুভাশীষ কুমার চ্যাটার্জী বলেন, ‘রাস্তার পাশে প্রস্রাব করার পেছনে শারীরিক ও মানসিক উভয় কারণ থাকতে পারে। প্রিফ্রন্টাল করটেক্স অপরিপক্ক থাকলে আবেগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয় না। এছাড়া শৈশবে টয়লেট ট্রেনিংয়ের অভাব, ‘‘সুপার ইগো’’র ঘাটতি, এমনকি ব্যক্তিগত হতাশা থেকে ‘‘এন্টি-এস্টাবলিশমেন্ট’’ মাইন্ডসেট তৈরি হতে পারে, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মূত্রত্যাগের মাধ্যমে।’

বেসরকারি সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ’-এর তথ্যমতে, ঢাকার আড়াই কোটি মানুষের জন্য পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ৭০টি (যার ১৫টি বন্ধ) এবং উত্তর সিটিতে ১১৬টি পাবলিক টয়লেট রয়েছে। এই অপ্রতুল সংখ্যার কারণে পুরো শহরই যেন পাবলিক টয়লেটে পরিণত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ সতর্ক করে বলেন, ‘টয়লেটের অভাবে বাধ্য হয়ে মানুষ যত্রতত্র মূত্রত্যাগ করছে। এর ফলে কলেরা, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিসের মতো সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ছে এবং জনস্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।’

সংসদ ভবন এলাকায় পথচারীদের প্রস্রাবের ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) মো. ছাদেকুর রহমান বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে আবগত নই। বর্জ্যসহ যত ধরনের আর্বজনা আছে তা ডিএনসিসির উদ্যোগে পরিষ্কার করা হয়, কিন্তু এ ধরনের কোনো সমস্যার কথা আমি আগে শুনিনি। এখন যেহেতু জানলাম, আমি দেখছি বিষয়টা।’

একই ধরনের মন্তব্য করেন শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম মনির। তিনি বলেন, ‘সংসদ ভবনের সামনে প্রসাব করা হয় কিনা, আমি জানি না। যদি এ রকম কিছু হয়, অতি দ্রুত আমরা ব্যবস্থা নেব।’

সম্পর্কিত