আনু মুহাম্মদের কলাম
দশকের পর দশক ধরে সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যার ঘটনা ঘটছে। প্রতিবাদ, দ্বিপাক্ষিক আলোচনা কিংবা সরকারি পর্যায়ে নানা প্রতিশ্রুতি—সবই হয়েছে। সীমান্ত হত্যা ‘শূন্যের কোঠায়’ নামিয়ে আনার গালভরা প্রতিশ্রুতি ভারত বারবার দিলেও, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।
আনু মুহাম্মদ

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। বাণিজ্য, রাজনীতি, কূটনীতি এবং সংস্কৃতির নানা সুতোয় গাঁথা এই সম্পর্ক। তবে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কে জটিলতা তৈরি হয় ভারতের আধিপত্যের ভূমিকার কারণে। পানি সমস্যা ছাড়াও সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং বেদনাদায়ক যে বিষয়টি বারবার আলোচনার কেন্দ্রে আসে, তা হলো—সীমান্ত-হত্যা।
দশকের পর দশক ধরে সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যার ঘটনা ঘটছে। প্রতিবাদ, দ্বিপাক্ষিক আলোচনা কিংবা সরকারি পর্যায়ে নানা প্রতিশ্রুতি—সবই হয়েছে। সীমান্ত হত্যা ‘শূন্যের কোঠায়’ নামিয়ে আনার গালভরা প্রতিশ্রুতি ভারত বারবার দিলেও, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। সীমান্তে লাশের সারি দীর্ঘ হয়েছে, কিন্তু আমরা এর কোনো টেকসই সমাধান পাইনি। এই অচলাবস্থার পেছনে ভারতের আধিপত্যবাদী মানসিকতা যেমন দায়ী, তেমনি আমাদের অতীত সরকারগুলোর কূটনৈতিক মেরুদণ্ডহীনতাও কম দায়ী নয়।
প্রথমেই যে প্রশ্নটি সামনে আসে তা হলো, ভারত কেন এই হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত রেখেছে? চোরাচালান বা অবৈধ অনুপ্রবেশের অজুহাত দিলেও এর কারণ মূলত রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক। ভারতের এই আচরণ তাদের আধিপত্য বজায় রাখার এবং ক্ষুদ্র প্রতিবেশীর প্রতি ঔদ্ধত্য প্রকাশের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিককে সীমান্তে গুলি করে মারা যে সেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমের ওপর আঘাত, ভারত সরকার সেটিকে কোনো গুরুত্বই দিচ্ছে না।
চোরাচালান কখনো একতরফা হয় না; এতে উভয় পক্ষেরই অসাধু চক্রের অংশগ্রহণ থাকে। কেউ যদি অবৈধভাবে সীমান্ত পার হতে চায় বা চোরাচালানে যুক্ত থাকে, তবে তাকে আইনের আওতায় এনে গ্রেপ্তার করা যেতে পারে, বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা যেতে পারে। কিন্তু কোনোভাবেই তাকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করা যায় না। পৃথিবীর অন্য কোনো গণতান্ত্রিক দেশের সীমান্তে এমন নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্ত বিরল। এমনকি চরম বৈরী সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ভারত-পাকিস্তান সীমান্তেও সাধারণ নাগরিকদের এভাবে গুলি করে মারার ঘটনা ঘটে না।
আদতে এটি ভারতের নীতিনির্ধারক ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কোনো সমন্বয়হীনতা নয়, বরং এটি তাদের অঘোষিত রাষ্ট্রীয় নীতি। বর্তমান ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার নিজেদের ক্ষমতার রাজনৈতিক বৈধতা ধরে রাখার জন্য ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে একটি কাল্পনিক ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। তারা প্রচার করে যে, বাংলাদেশ থেকে সন্ত্রাসীরা ভারতে প্রবেশ করছে, অনুপ্রবেশকারীরা ভারতীয়দের কর্মসংস্থান কেড়ে নিচ্ছে।
এই প্রচারণার একটি সুস্পষ্ট সাম্প্রদায়িক চরিত্রও রয়েছে। অর্থাৎ, সীমান্ত হত্যাকে বিজেপি সরকার একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্র যেমন নিজেদের নিরাপত্তার অজুহাত তুলে ছোট রাষ্ট্রগুলোর ওপর আগ্রাসন চালায়, ভারতও ঠিক একই কায়দায় নিজেদের নিরাপত্তার ধুয়া তুলে সীমান্তে এই বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
সীমান্ত-হত্যা বন্ধ না হওয়ার পেছনে বাংলাদেশের দিক থেকেও বড় ধরনের দায় রয়েছে। বিশেষ করে গত ১৫-১৬ বছরের হাসিনা আমলে সরকারের দিক থেকে এ বিষয়ে কোনো জোরালো প্রতিবাদ বা কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। সেই সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জনমতের চেয়ে ভারত, চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের ওপর বেশি নির্ভরশীল ছিল। ফলে ভারতের যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
সম্প্রতি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও বিষয়টি নিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আলোচনা বা জোরালো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তবে বর্তমান যে নির্বাচিত সরকার দায়িত্বে আছেন, তাদের অবশ্যই এই ইস্যুকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সামনে আনতে হবে। একটি নির্বাচিত বা জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের প্রধান শক্তি হলো জনগণ। সেই শক্তির জোরে তাদের কণ্ঠস্বরে জোর থাকতে হবে, দাবিতে দৃঢ়তা থাকতে হবে এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।
আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে, ভারতের সঙ্গে কেবল দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা চুক্তির মাধ্যমে কোনো বড় সমস্যার সমাধান পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তারা আলোচনায় প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু বাস্তবে গুলি চলতেই থাকে। তাই সীমান্ত-হত্যার মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি এখন জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফোরামে জোরালোভাবে উত্থাপন করা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
বহুপাক্ষিক বা আন্তর্জাতিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে গেলে যে সমাধান আসে, তার একটি বড় প্রমাণ হলো ভারতের সাথে আমাদের সমুদ্রসীমা জয়। এই বিষয়টি যদি আমরা কেবল দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখতাম, তবে আমাদের সার্বভৌম অধিকার কখনোই এতটা প্রতিষ্ঠিত হতো না। আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে যাওয়ার ফলেই বাংলাদেশ সেখানে সাফল্য পেয়েছে।
একইভাবে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানি কনভেনশনে বাংলাদেশের স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন (র্যাটিফিকেশন) করা উচিত। আন্তর্জাতিক ফোরামে পানিবণ্টন বা সীমান্ত হত্যার বিষয়টি তুললে ভারতের ওপর বৈশ্বিক চাপ তৈরি হবে, যা আদতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাকেও ফলপ্রসূ করতে বাধ্য করবে। সীমান্ত হত্যা সম্পূর্ণভাবে একটি মানবাধিকার ইস্যু এবং এটিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ইস্যুতে পরিণত করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
ভারত সবসময় 'প্রতিবেশী প্রথম' (Neighborhood First) নীতির কথা বলে। অথচ বাস্তবতা হলো, কোনো প্রতিবেশীর সঙ্গেই তাদের সম্পর্ক ভালো নয়। বাংলাদেশের মানুষের মনে ভারতের প্রতি যে তীব্র ক্ষোভ ও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, তার অন্যতম কারণ ফেলানীর মতো অগণিত সীমান্ত হত্যার ঘটনা।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের ভারতের শাসকশ্রেণি এবং সাধারণ জনগণকে আলাদা করে দেখতে হবে। ভারতের শাসকগোষ্ঠী সাম্প্রদায়িকতা ও নিরাপত্তার ভুয়া বয়ান তৈরি করে যে আধিপত্য বজায় রাখছে, তার বিরুদ্ধে খোদ ভারতের জনগণও লড়াই করছে। ভারতের ভেতরে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী এবং অধিকারকর্মীদের সংহতি ও যোগাযোগ বাড়াতে হবে।
পাশাপাশি একটি বড় কাজ করতে হবে গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে। গত শাসনামলে বলা হয়েছিল বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ‘অনন্য উচ্চতায়’ পৌঁছেছে, অথচ ভারতে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো টেলিভিশন চ্যানেল বা গণমাধ্যম প্রবেশাধিকার পায়নি। ভারতের জনগণ কেবল তাদের মিডিয়ার ছড়ানো বাংলাদেশ-বিরোধী প্রোপাগান্ডাই দেখতে পায়।
এই সরকারের উচিত ভারতে বাংলাদেশের মিডিয়ার সম্প্রচার নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা। ভারতীয় নাগরিকরা যদি বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ, আমাদের জনগণের ক্ষোভ এবং ভারতের মিথ্যাচারের অন্তঃসারশূন্যতা বুঝতে পারে, তবে ভারতের ভেতরেই সরকারের বিরুদ্ধে একটি চাপ তৈরি হবে।
সীমান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য অনেকেই ভারত-বাংলাদেশ যৌথ অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। ধারণাটির গুরুত্ব থাকলেও, এটি একটি যৌথ কর্মসূচি, যার জন্য ভারতের সদিচ্ছা প্রয়োজন। ভারতের সেই আগ্রহ কতটা আছে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তাই ভারতের মুখাপেক্ষী না থেকে বাংলাদেশের উচিত নিজস্ব উদ্যোগে পদক্ষেপ নেওয়া।
সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ কেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারতে যায়? এর মূল কারণ ওই অঞ্চলগুলোতে চরম দারিদ্র্য ও বেকারত্ব। কাজের সন্ধানে বা সামান্য চোরাচালানের বাহক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তারা বিএসএফের গুলির নিশানা হয়। আর পর্দার আড়ালে থাকা বড় চোরাকারবারিরা সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়।
এই সমস্যার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান হলো বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ব্যাপকভিত্তিক শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ গ্রহণ করা। যদি সীমান্ত এলাকায় পর্যাপ্ত কলকারখানা গড়ে ওঠে এবং মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, তবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ সীমান্ত পার হতে যাবে না। পরবর্তী সময়ে যদি ভারতের দিক থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়, তবে বাংলাদেশের স্বার্থ ও কর্তৃত্ব নিশ্চিত করে যৌথ অর্থনৈতিক জোনের মতো কর্মসূচিও হাতে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রাথমিক উদ্যোগ বাংলাদেশকেই নিতে হবে।
সীমান্ত-হত্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমের ওপর প্রতিনিয়ত আঘাত এবং চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। এই আগ্রাসী আক্রমণ বন্ধ করতে হলে নতজানু কূটনীতির খোলস ছেড়ে বাংলাদেশকে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে হবে। দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জোরালো জনমত ও চাপ সৃষ্টি করতে হবে। মেধা, বুদ্ধিবৃত্তি, গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক আইনের সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমেই কেবল ভারতের এই আধিপত্যবাদী আচরণের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব। একটি আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার কোনো নাগরিকের রক্ত আর সীমান্তে ঝরতে দিতে পারে না।
আনু মুহাম্মদ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। বাণিজ্য, রাজনীতি, কূটনীতি এবং সংস্কৃতির নানা সুতোয় গাঁথা এই সম্পর্ক। তবে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কে জটিলতা তৈরি হয় ভারতের আধিপত্যের ভূমিকার কারণে। পানি সমস্যা ছাড়াও সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং বেদনাদায়ক যে বিষয়টি বারবার আলোচনার কেন্দ্রে আসে, তা হলো—সীমান্ত-হত্যা।
দশকের পর দশক ধরে সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যার ঘটনা ঘটছে। প্রতিবাদ, দ্বিপাক্ষিক আলোচনা কিংবা সরকারি পর্যায়ে নানা প্রতিশ্রুতি—সবই হয়েছে। সীমান্ত হত্যা ‘শূন্যের কোঠায়’ নামিয়ে আনার গালভরা প্রতিশ্রুতি ভারত বারবার দিলেও, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। সীমান্তে লাশের সারি দীর্ঘ হয়েছে, কিন্তু আমরা এর কোনো টেকসই সমাধান পাইনি। এই অচলাবস্থার পেছনে ভারতের আধিপত্যবাদী মানসিকতা যেমন দায়ী, তেমনি আমাদের অতীত সরকারগুলোর কূটনৈতিক মেরুদণ্ডহীনতাও কম দায়ী নয়।
প্রথমেই যে প্রশ্নটি সামনে আসে তা হলো, ভারত কেন এই হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত রেখেছে? চোরাচালান বা অবৈধ অনুপ্রবেশের অজুহাত দিলেও এর কারণ মূলত রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক। ভারতের এই আচরণ তাদের আধিপত্য বজায় রাখার এবং ক্ষুদ্র প্রতিবেশীর প্রতি ঔদ্ধত্য প্রকাশের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিককে সীমান্তে গুলি করে মারা যে সেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমের ওপর আঘাত, ভারত সরকার সেটিকে কোনো গুরুত্বই দিচ্ছে না।
চোরাচালান কখনো একতরফা হয় না; এতে উভয় পক্ষেরই অসাধু চক্রের অংশগ্রহণ থাকে। কেউ যদি অবৈধভাবে সীমান্ত পার হতে চায় বা চোরাচালানে যুক্ত থাকে, তবে তাকে আইনের আওতায় এনে গ্রেপ্তার করা যেতে পারে, বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা যেতে পারে। কিন্তু কোনোভাবেই তাকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করা যায় না। পৃথিবীর অন্য কোনো গণতান্ত্রিক দেশের সীমান্তে এমন নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্ত বিরল। এমনকি চরম বৈরী সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ভারত-পাকিস্তান সীমান্তেও সাধারণ নাগরিকদের এভাবে গুলি করে মারার ঘটনা ঘটে না।
আদতে এটি ভারতের নীতিনির্ধারক ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কোনো সমন্বয়হীনতা নয়, বরং এটি তাদের অঘোষিত রাষ্ট্রীয় নীতি। বর্তমান ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার নিজেদের ক্ষমতার রাজনৈতিক বৈধতা ধরে রাখার জন্য ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে একটি কাল্পনিক ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। তারা প্রচার করে যে, বাংলাদেশ থেকে সন্ত্রাসীরা ভারতে প্রবেশ করছে, অনুপ্রবেশকারীরা ভারতীয়দের কর্মসংস্থান কেড়ে নিচ্ছে।
এই প্রচারণার একটি সুস্পষ্ট সাম্প্রদায়িক চরিত্রও রয়েছে। অর্থাৎ, সীমান্ত হত্যাকে বিজেপি সরকার একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্র যেমন নিজেদের নিরাপত্তার অজুহাত তুলে ছোট রাষ্ট্রগুলোর ওপর আগ্রাসন চালায়, ভারতও ঠিক একই কায়দায় নিজেদের নিরাপত্তার ধুয়া তুলে সীমান্তে এই বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
সীমান্ত-হত্যা বন্ধ না হওয়ার পেছনে বাংলাদেশের দিক থেকেও বড় ধরনের দায় রয়েছে। বিশেষ করে গত ১৫-১৬ বছরের হাসিনা আমলে সরকারের দিক থেকে এ বিষয়ে কোনো জোরালো প্রতিবাদ বা কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। সেই সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জনমতের চেয়ে ভারত, চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের ওপর বেশি নির্ভরশীল ছিল। ফলে ভারতের যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
সম্প্রতি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও বিষয়টি নিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আলোচনা বা জোরালো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তবে বর্তমান যে নির্বাচিত সরকার দায়িত্বে আছেন, তাদের অবশ্যই এই ইস্যুকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সামনে আনতে হবে। একটি নির্বাচিত বা জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের প্রধান শক্তি হলো জনগণ। সেই শক্তির জোরে তাদের কণ্ঠস্বরে জোর থাকতে হবে, দাবিতে দৃঢ়তা থাকতে হবে এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।
আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে, ভারতের সঙ্গে কেবল দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা চুক্তির মাধ্যমে কোনো বড় সমস্যার সমাধান পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তারা আলোচনায় প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু বাস্তবে গুলি চলতেই থাকে। তাই সীমান্ত-হত্যার মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি এখন জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফোরামে জোরালোভাবে উত্থাপন করা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
বহুপাক্ষিক বা আন্তর্জাতিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে গেলে যে সমাধান আসে, তার একটি বড় প্রমাণ হলো ভারতের সাথে আমাদের সমুদ্রসীমা জয়। এই বিষয়টি যদি আমরা কেবল দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখতাম, তবে আমাদের সার্বভৌম অধিকার কখনোই এতটা প্রতিষ্ঠিত হতো না। আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে যাওয়ার ফলেই বাংলাদেশ সেখানে সাফল্য পেয়েছে।
একইভাবে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের ক্ষেত্রেও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানি কনভেনশনে বাংলাদেশের স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন (র্যাটিফিকেশন) করা উচিত। আন্তর্জাতিক ফোরামে পানিবণ্টন বা সীমান্ত হত্যার বিষয়টি তুললে ভারতের ওপর বৈশ্বিক চাপ তৈরি হবে, যা আদতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাকেও ফলপ্রসূ করতে বাধ্য করবে। সীমান্ত হত্যা সম্পূর্ণভাবে একটি মানবাধিকার ইস্যু এবং এটিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ইস্যুতে পরিণত করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
ভারত সবসময় 'প্রতিবেশী প্রথম' (Neighborhood First) নীতির কথা বলে। অথচ বাস্তবতা হলো, কোনো প্রতিবেশীর সঙ্গেই তাদের সম্পর্ক ভালো নয়। বাংলাদেশের মানুষের মনে ভারতের প্রতি যে তীব্র ক্ষোভ ও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, তার অন্যতম কারণ ফেলানীর মতো অগণিত সীমান্ত হত্যার ঘটনা।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের ভারতের শাসকশ্রেণি এবং সাধারণ জনগণকে আলাদা করে দেখতে হবে। ভারতের শাসকগোষ্ঠী সাম্প্রদায়িকতা ও নিরাপত্তার ভুয়া বয়ান তৈরি করে যে আধিপত্য বজায় রাখছে, তার বিরুদ্ধে খোদ ভারতের জনগণও লড়াই করছে। ভারতের ভেতরে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী এবং অধিকারকর্মীদের সংহতি ও যোগাযোগ বাড়াতে হবে।
পাশাপাশি একটি বড় কাজ করতে হবে গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে। গত শাসনামলে বলা হয়েছিল বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ‘অনন্য উচ্চতায়’ পৌঁছেছে, অথচ ভারতে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো টেলিভিশন চ্যানেল বা গণমাধ্যম প্রবেশাধিকার পায়নি। ভারতের জনগণ কেবল তাদের মিডিয়ার ছড়ানো বাংলাদেশ-বিরোধী প্রোপাগান্ডাই দেখতে পায়।
এই সরকারের উচিত ভারতে বাংলাদেশের মিডিয়ার সম্প্রচার নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা। ভারতীয় নাগরিকরা যদি বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ, আমাদের জনগণের ক্ষোভ এবং ভারতের মিথ্যাচারের অন্তঃসারশূন্যতা বুঝতে পারে, তবে ভারতের ভেতরেই সরকারের বিরুদ্ধে একটি চাপ তৈরি হবে।
সীমান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য অনেকেই ভারত-বাংলাদেশ যৌথ অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। ধারণাটির গুরুত্ব থাকলেও, এটি একটি যৌথ কর্মসূচি, যার জন্য ভারতের সদিচ্ছা প্রয়োজন। ভারতের সেই আগ্রহ কতটা আছে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তাই ভারতের মুখাপেক্ষী না থেকে বাংলাদেশের উচিত নিজস্ব উদ্যোগে পদক্ষেপ নেওয়া।
সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ কেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারতে যায়? এর মূল কারণ ওই অঞ্চলগুলোতে চরম দারিদ্র্য ও বেকারত্ব। কাজের সন্ধানে বা সামান্য চোরাচালানের বাহক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তারা বিএসএফের গুলির নিশানা হয়। আর পর্দার আড়ালে থাকা বড় চোরাকারবারিরা সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়।
এই সমস্যার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান হলো বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ব্যাপকভিত্তিক শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ গ্রহণ করা। যদি সীমান্ত এলাকায় পর্যাপ্ত কলকারখানা গড়ে ওঠে এবং মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, তবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ সীমান্ত পার হতে যাবে না। পরবর্তী সময়ে যদি ভারতের দিক থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়, তবে বাংলাদেশের স্বার্থ ও কর্তৃত্ব নিশ্চিত করে যৌথ অর্থনৈতিক জোনের মতো কর্মসূচিও হাতে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রাথমিক উদ্যোগ বাংলাদেশকেই নিতে হবে।
সীমান্ত-হত্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমের ওপর প্রতিনিয়ত আঘাত এবং চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। এই আগ্রাসী আক্রমণ বন্ধ করতে হলে নতজানু কূটনীতির খোলস ছেড়ে বাংলাদেশকে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে হবে। দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জোরালো জনমত ও চাপ সৃষ্টি করতে হবে। মেধা, বুদ্ধিবৃত্তি, গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক আইনের সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমেই কেবল ভারতের এই আধিপত্যবাদী আচরণের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব। একটি আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার কোনো নাগরিকের রক্ত আর সীমান্তে ঝরতে দিতে পারে না।
আনু মুহাম্মদ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

‘ইউটোপিয়া’ টার্মটি সাধারণত নেতিবাচক অর্থে কাল্পনিক বা অবাস্তব বা আকাশকুসুম হিসেবে বেশি প্রচলিত। যে কারণে আমরা এর ইতিবাচক অর্থ ‘আনন্দলোক’ ব্যবহার করতে ভুলেই গেছি! জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সর্বার্থে-সর্বান্তকরণে তার সকল সন্তানের জন্যে ইউটোপিয়াই বটে। মেয়েদের জন্য তো আরও বেশি।
২ ঘণ্টা আগে
গঙ্গা ব্যারাজের বদলে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নাম একটি ভূ-রাজনৈতিক ভুল। কারণ এর মাধ্যমে গঙ্গা নদীতে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অধিকারকে ছেড়ে দেওয়া হয়, যা ভারতের জন্য সুবিধাজনক। ভৌগোলিকভাবে, গোয়ালন্দে যমুনার সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত নদীটি 'গঙ্গা' নামেই পরিচিত।
৩ ঘণ্টা আগে
ভোট-পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের পরাজয়ে বামপন্থীদের আত্মসন্তুষ্টি ও রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা দেখা যাচ্ছে। যুক্তিতর্ক ও শালীনতা বিসর্জন দিয়ে তারা কেবল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ব্যক্তি-আক্রমণে ব্যস্ত। বর্তমান প্রজন্মের একাংশের কাছে বামপন্থা আজ আর কোনো আদর্শ বা জনমানুষের লড়াই নয়, বরং সোশ্যাল মিডিয়া বা টিভিতে..
২০ ঘণ্টা আগে
ঢাকার একটি আদালত। সেখানে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন এক বৃদ্ধা মা। তার ছেলের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা। অথচ ঘটনার দিন ছেলেটি ছিল হাসপাতালে শয্যাশায়ী। আদালতে সেই কাগজও জমা হয়েছে। তবু জামিন হয়নি। কয়েক মাস পর খবর এল—কারাগারে অসুস্থ হয়ে তার ছেলে মারা গেছে। দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের পর এ ধরনের গল্প এখন আর...
১ দিন আগে