জ্বালানি সংকট: প্রতিদিন ‘সামান্য’ পেট্রোল পাচ্ছে গুটি কয়েক পাম্প

রাজধানীর অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনেই সকাল থেকে বেরিকেড দেওয়া। স্ট্রিম ছবি

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার জেরে সারা দেশে প্রায় এক মাস ধরেই জ্বালানি তেলের সংকট চলছে। রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে (পাম্প) ঝুলছে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও খালি হাতে ফিরছেন গ্রাহকেরা। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহে ঘাটতি নেই। তবে ডিপো থেকে তেল বিতরণের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। প্রতিদিন রোস্টারিংয়ের ভিত্তিতে পেট্রোল বরাদ্দ পাচ্ছে গুটি কয়েক ফিলিং স্টেশন (পাম্প); যা মোট চাহিদার তুলনায় সামান্যই।

সারা দেশে জোনভিত্তিক তেল সরবরাহ করে সরকারি তিন প্রতিষ্ঠান ‘পদ্মা অয়েল পিএলসি’, ‘মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড’ ও ‘যমুনা অয়েল কোম্পানী লিমিটেড’। এই তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পদ্মা ও মেঘনার ঢাকা জোনের জ্বালানি তেল বিতরণ করা হয় নারায়ণগঞ্জ থেকে।

এ দুটি প্রতিষ্ঠানের ঢাকা জোনের ডিপো নেটওয়ার্কের মধ্যে ঢাকা ছাড়াও আছে, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও নরসিংদী জেলা। এসব জেলায় পদ্মা অয়েল জ্বালানি তেল বিতরণ করে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপো থেকে। আর মেঘনা বিতরণ করে নারায়ণঞ্জের গোদনাইল ও ফতুল্লা ডিপো থেকে।

প্রতিষ্ঠান দুটির গোদনাইলের দুই ডিপোর সাম্প্রতিক তেল বিতরণের বরাদ্দের তথ্য স্ট্রিমের হাতে এসেছে। সরকারি বরাদ্দের এই নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তালিকায় নাম থাকলেও অধিকাংশ পাম্পই পেট্রোল বরাদ্দ পাচ্ছে না।

এই দুটি ডিপো থেকেই পেট্রোল বা মোটর স্পিরিট (এমএস) ছাড়াও অকটেন বা হাই-অকটেন ব্র্যান্ডিং কম্পোনেন্ট (এইচওবিসি) এবং ডিজেল বা হাইস্পিড ডিজেল (এইচএসডি) বিপণন করা হয়। এরমধ্যে পেট্রোল সাধারণত হালকা যানবাহন যেমন- মোটরসাইকেল, কার, মাইক্রোবাস, বেবিটেক্সিতে পেট্রোল ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর অকটেন সাধারণত কার, মাইক্রোবাস ও জিপে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আর ডিজেল লঞ্চ, জাহাজ, রেলগাড়ি, ট্রাক, বাস এবং সেচের ইঞ্জিনে জ্বালানি হিসেবে ব্যাপক ব্যবহার হয়।

পদ্মা অয়েলের গোদানাইল ডিপো
পদ্মা অয়েলের গোদানাইল ডিপো

পদ্মা ও মেঘনার দুটি ডিপোর গত ২৪ থেকে ২৮ মার্চের বরাদ্দের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা জোনের জেলাগুলোর পাম্পগুলোর মধ্যে পেট্রোল পেয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ থেকে ১২ দশমিক ০৭ শতাংশ পাম্প। এরমধ্যে ঢাকা জেলার পাম্পগুলো কিছুটা পেলেও বাইরের জেলাগুলোর বেশিরভাগ পাম্পই কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি পাচ্ছে না।

পেট্রোল দিতে পারছে না পদ্মা অয়েল

২৮ মার্চের সর্বশেষ সরবরাহ অনুযায়ী, ঢাকা জেলায় ৫৮টি পাম্পের মধ্যে অকটেন পেয়েছে ২৪টি, যা মোট পাম্পের দশমিক ৪১ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং পেট্রোল পেয়েছে সাতটি, যা তালিকার মোট পাম্পের দশমিক ১২ দশমিক ০৭ শতাংশ। আর সব জেলা মিলিয়ে সার্বিকভাবে এদিন তালিকাভুক্ত ১১৩টি পাম্পের মধ্যে অকটেন পেয়েছে ৩২টি, যা মোট পাম্পের দশমিক ২৮ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং পেট্রোল পেয়েছে ২৫টি, যা মোট পাম্পের দশমিক ২২ দশমিক ১২ শতাংশ।

একইদিনে নারায়ণগঞ্জে ১২টি পাম্পের মধ্যে অকটেন পেয়েছে দুটি, যা মোট পাম্পের দশমিক ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং পেট্রোল পেয়েছে একটি, যা মোট পাম্পের দশমিক ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। মুন্সীগঞ্জ ও শেরপুরের কোনো পাম্পেই এদিন অকটেন বা পেট্রোল সরবরাহ করা হয়নি। জামালপুরে তিনটি পাম্পের সবকটিতে পেট্রোল জুটলেও অকটেন পায়নি কোনোটিই।

পদ্মা অয়েলের একদিনের বরাদ্দের চিত্র
পদ্মা অয়েলের একদিনের বরাদ্দের চিত্র

২৭ মার্চের বরাদ্দপত্রে দেখা যায়, এদিন সার্বিকভাবে ৯২টি পাম্পের মধ্যে অকটেন পেয়েছে ২৯টি, যা মোট পাম্পের দশমিক ৩১ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং পেট্রোল পেয়েছে ১৪টি, যা মোট পাম্পের ১৫ দশমিক ২২ শতাংশ। ঢাকায় ৫১টি পাম্পের মধ্যে অকটেন পেয়েছে ২৩টি, যা মোট পাম্পের দশমিক ৪৫ দশমিক ১০ শতাংশ হলেও পেট্রোল পেয়েছে মাত্র ২টি পাম্প, যা বরাদ্দ তালিকায় থাকা মোট পাম্পের দশমিক ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ।

২৫ মার্চের বরাদ্দেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এদিন ৭৮টি পাম্পের মধ্যে অকটেন পেয়েছে ৩১টি, যা মোট পাম্পের ৩৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং পেট্রোল পেয়েছে ৭টি, যা তালিকায় থাকা মোট পাম্পের দশমিক প্রায় ৯ শতাংশ। এদিন শিল্পঘন নারায়ণগঞ্জ পাম্পগুলো কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি থেকে বঞ্চিত হয়। নারায়ণগঞ্জে ১৮টি পাম্পের মধ্যে মাত্র একটি অকটেন পেয়েছে, যা মোট পাম্পের দশমিক ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং কোনো পাম্পই পেট্রোল পায়নি, অর্থাৎ মোট পাম্পের দশমিক শূন্য শতাংশ।

এদিন ময়মনসিংহ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদীসহ সাতটি জেলার কোনো পাম্প ২৫ মার্চ অকটেন বরাদ্দ পায়নি।

২৪ মার্চের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা জেলায় ৪৭টি পাম্পের মধ্যে অকটেন পেয়েছে ১২টি, যা মোট পাম্পের দশমিক ২৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং পেট্রোল পেয়েছে ৪টি, যা মোট পাম্পের দশমিক ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ।

মেঘনা ডিপোতেও পেট্রোল পেয়েছে মাত্র ৬ শতাংশ পাম্প

অন্যদিকে মেঘনার গোদনাইল ডিপো থেকেও ৩১টি পাম্পের মধ্যে অকটেন পেয়েছে ১৪টি, যা মোট পাম্পের দশমিক ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং পেট্রোল পেয়েছে মাত্র দুটি, যা মোট পাম্পের দশমিক ৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ। কিন্তু গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের কোনো পাম্পই অকটেন পায়নি। মানিকগঞ্জ ও নেত্রকোনার অবস্থা ছিল সবচেয়ে করুণ, যেখানে এই দুই জেলার কোনো পাম্প এদিন অকটেন বা পেট্রোল—কোনো জ্বালানিই বরাদ্দ পায়নি।

পদ্মা ডিপোর মতো প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের গোদনাইল (নারায়ণগঞ্জ) ডিপো থেকে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও। বরাদ্দের তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, এখানেও রাজধানী ও এর বাইরের পাম্পগুলোর মধ্যে বরাদ্দের ব্যবধান প্রকট এবং পেট্রোল সরবরাহে ভয়াবহ সংকট বিরাজ করছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ওই ডিপোর আওতাধীন ৩১টি ডিলারের মধ্যে গতকাল অকটেন পেয়েছে ১৪টি বা ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ পাম্প। অন্যদিকে পেট্রোল প্রাপ্তির হার আরও শোচনীয়। পুরো তালিকা থেকে মাত্র দুটি বা ৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ পাম্প পেট্রোলের বরাদ্দ পেয়েছে।

মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের একদিনের বরাদ্দের চিত্র
মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের একদিনের বরাদ্দের চিত্র

অকটেনের বরাদ্দের পরিমাণ পর্যালোচনায় দেখা যায়, সিংহভাগ বরাদ্দই গেছে রাজধানীর পাম্পগুলোতে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার লিটার অকটেন বরাদ্দ পেয়েছে রাজধানীর নিকুঞ্জ মডেল সার্ভিস সেন্টার। এরপরই রয়েছে শাহবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার, যারা পেয়েছে ১৫ হাজার লিটার। ঢাকার বাইরে কেবল নারায়ণগঞ্জের কেওঢালার সিয়াম ফিলিং স্টেশন ৬ হাজার লিটার এবং তারাবোর সেকান্দর ফিলিং স্টেশন ৩ হাজার লিটার অকটেনের বরাদ্দ পেয়েছে। এছাড়া রাজধানী ও এর আশপাশের আরও ১০টি পাম্প ৪ হাজার ৫০০ লিটার করে অকটেন পেয়েছে। এগুলো হলো—নীলক্ষেতের কিউ জি সামদানী, মাতুয়াইলের রাজধানী ফিলিং স্টেশন, সাভারের এস আই চৌধুরী ফিলিং স্টেশন, সিটিজেন সিএনজি ফিলিং স্টেশন, সাদি ফিলিং স্টেশন, আসমা আলী সিএনজি ফিলিং স্টেশন, রাসেল সিএনজি ফিলিং স্টেশন, সেবা গ্রিন ফিলিং স্টেশন এবং রোজা ফিলিং স্টেশন।

পেট্রোল বরাদ্দের ক্ষেত্রে বঞ্চনার চিত্রটি সবচেয়ে স্পষ্ট। তালিকাভুক্ত ৩১টি পাম্পের মধ্যে কেবল নীলক্ষেতের কিউ. জি. সামদানী এবং আগমন সিএনজি ফিলিং স্টেশন—এই দুটি পাম্প মাত্র ৪ হাজার ৫০০ লিটার করে পেট্রোল পেয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পুরো তালিকার মধ্যে কেবল ৩ দশমিক ২৩ শতাংশ বা একটিমাত্র পাম্প (নীলক্ষেতের কিউ জি সামদানী) একই সঙ্গে অকটেন ও পেট্রোল—উভয় জ্বালানির বরাদ্দ পেতে সক্ষম হয়েছে।

পাম্প-সংম্লিষ্টরা বলছেন, ‘সরবরাহ কম’

পাম্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকটের মূল কারণ প্যানিক বাইং নয়—সরবরাহ কমে যাওয়া। রাজধানীর তালিকাভুক্ত একটি পাম্পের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মী জানান, ঈদের পর প্রায় ৮ থেকে ১৫ দিন অপেক্ষার পর তারা অকটেন পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘রিকুইজিশন ছাড়া ডিপো থেকে কোনো গাড়ি ঢুকতে দেওয়া হয় না। মন্ত্রণালয় থেকে লিস্ট পাঠানো হয়, সেই লিস্টে নাম থাকলেই তেল আনতে যেতে পারি।’

রাজধানীর আরেকটি পাম্পের ডিলার জানান, গত বছর মার্চে যে পরিমাণ অকটেন নিয়েছিলেন, এখন সেটা কমেছে। তিনি বলেন, ‘ডিপোতে তেলের মজুদ কমে গেছে। তাই কোম্পানিগুলো একসঙ্গে বেশি তেল ছাড়ছে না, যাতে কেউ অবৈধভাবে মজুদ করতে না পারে।’

বর্তমানে পাম্পগুলোতে সরকারি নির্দেশনা মানা সম্ভব হচ্ছে না জানিয়ে এক পাম্পকর্মী বলেন, ‘সরকারিভাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে—কিন্তু গ্রাহকের চাপ ও দীর্ঘ লাইনের কারণে ৫০০ টাকার তেল দিতে বাধ্য হচ্ছি। ট্যাংকি ফুল দিলে দুই ঘণ্টায় তেল শেষ হয়ে যেত।’

তিনি আরও জানান, অনেক গ্রাহক এক পাম্প থেকে তেল কিনে ট্যাংক খালি করে আবার আরেক পাম্পে এসে তেল নিচ্ছেন। কেউ মজুত করছেন, কেউবা আবার অবৈধভাবে বিক্রিও করছেন। যার ফলে পাম্পে তেল আসার অল্প সময়ের মধ্যেই তা ফুরিয়ে যাচ্ছে।

তেল নিতে আসা একজন গ্রাহক জানান, আড়াই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পেয়েছেন, তবে চাহিদামতো পাননি। শেরাটন মোড় ও মৎস্য ভবন এলাকার কিছু পাম্পে ৫০০-৬০০ টাকায় পাঁচ লিটার এবং কোথাও কোথাও ট্যাংকি ফুল করে দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। তালুকদার পাম্পসহ কিছু জায়গায় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে বলে গ্রাহকেরা জানিয়েছেন।

এদিকে রাজধানীর রানা পাম্পে দেখা গেছে এক ভিন্ন চিত্র। সেখানকার এক গ্রাহক বলেন, ‘প্রায় ২ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ফুল ট্যাংক তেল নিতে পেরেছি। পাম্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখানে তেল যতক্ষণ আছে সবাই ফুল ট্যাংক নিতে পারবেন।’

ফুল ট্যাংক তেল বিক্রি নিয়ে পাম্প কর্তৃপক্ষ নিজেদের অক্ষমতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘মানুষের সাথে মারামারি করবে কে? তেল আনলোড হচ্ছে কাস্টমারের জন্য, তাদের যেহেতু সহমর্মিতা নাই, আমাদের কী করার আছে?’

আল মামুন গ্রুপের একজন ডিলার জানান, বিপিসির রাতের বৈঠকে ঠিক হয় কোন পাম্প কতটুকু তেল পাবে—কিন্তু তা আগে থেকে পাম্পকে জানানো হয় না। তিনি বলেন, ‘সকালে গাড়ি পাঠালে জানতে পারি কতটুকু দেবে। ডিপোতে এখন সেনাবাহিনী থাকায় কিছু বলার সুযোগ নেই।’

অন্য একজন পাম্প মালিক অভিযোগ করেন, অনেক পাম্প তেল মজুদ রেখে দাম বাড়ার অপেক্ষায় বিক্রি করছে না। তিনি বলেন, ‘যারা বলে পাম্পে তেল নেই, কেউ চাইলে পুলিশ নিয়ে তাদের আন্ডারগ্রাউন্ড রিজার্ভ ট্যাংক চেক করে দেখতে পারেন।’

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘তেলের কোনো সমস্যা নেই। পেট্রোল পাম্পে সারা দিনে যে পরিমাণ তেল বিক্রি হতো, সেটা এখন দুই ঘণ্টায় বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এরপর পাম্প বন্ধ হলে মানুষ বলছে পাম্প বন্ধ।’ দুর্নীতি ও ব্ল্যাক মার্কেটিংয়ের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি জনগণকে সহযোগিতার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম (অমিত) গতকাল জানিয়েছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা সত্ত্বেও সরকার জ্বালানির দাম না বাড়িয়ে প্রতিদিন ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী বর্তমান সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলেও আমাদের চাহিদা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে প্রতিদিন গড়ে ডিজেলের চাহিদা ছিল ১২ হাজার টন এবং পেট্রোল-অকটেনের চাহিদা ছিল ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টন। কিন্তু ঈদের আগে প্রতিদিন ২৪ থেকে ২৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করতে হয়েছে।’ আগামী এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানি চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা সরকারের রয়েছে এবং আগামীতে ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করার কাজ শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান।

সংকট সামাল দিতে গত ২৬ মার্চ অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে মোট ৩ লাখ টন ডিজেল কেনার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এপ্রিল মাসে সমুদ্রপথে ১৪টি জাহাজে এবং পাইপলাইনে এই জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর চূড়ান্ত সম্মতি এখনো পাওয়া যায়নি।

তেলের মজুদ ও সরবরাহ স্বাভাবিক আছে, দাবি জ্বালানি বিভাগের

এদিকে দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ ও সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। শনিবার (২৮ মার্চ) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ বিষয়ে জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল কেনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিভাগ থেকে জানানো হয়, পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ। এসব জ্বালানি তেল অনিয়ন্ত্রিতভাবে মজুদ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিপজ্জনক। তাই অবৈধভাবে জ্বালানি তেল সংরক্ষণ না করার জন্য নাগরিকদের সতর্ক করা হয়েছে। নিজে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি অন্যদেরও সচেতন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি জেলায় এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অবৈধ মজুদ প্রতিরোধে সবাইকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সরকার এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করেনি বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই অতিরিক্ত মুনাফার আশায় কেউ যাতে অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুদ না করে, সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ আরও জানিয়েছে, দেশের চাহিদা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল আমদানি করা হচ্ছে।

সম্পর্কিত