গণতন্ত্রকে বিবেচনা করা হয় জনগণের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিফলন হিসেবে। জনগণের ম্যান্ডেট বা জনসমর্থনই হলো গণতান্ত্রিক ক্ষমতার মূল উৎস। কিন্তু একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে এই দৃশ্যমান ক্ষমতার সমান্তরালে এক অদৃশ্য শক্তির সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যাকে বলা হয় ‘ডিপ স্টেট’ বা ‘রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাষ্ট্র’। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নীতি নির্ধারণ ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণের এই ছায়া শক্তি আজ বৈশ্বিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে।
একদিকে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি, আর অন্যদিকে রাষ্ট্রের স্থায়ী ও প্রভাবশালী আমলাতান্ত্রিক এবং নিরাপত্তা বলয়, এই দুইয়ের সংঘাত আজ গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে এক গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
‘ডিপ স্টেট’ ধারণাটির আদি উৎস লুকিয়ে আছে তুরস্কের রাজনৈতিক বিবর্তনের গভীরে। তুর্কি শব্দ ‘ডেরিন ডেভলেট’ থেকে এই ধারণার উদ্ভব। বিশ শতকের শেষভাগে ঠান্ডা যুদ্ধ চলাকালে তুরস্কে কমিউনিজম প্রতিরোধের নামে সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং অপরাধী চক্রের একটি ‘গোপন নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক’ গড়ে উঠেছিল, যাদের মূল লক্ষ্য ছিল কামাল আতাতুর্কের আদর্শ রক্ষা এবং প্রয়োজনে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা। ১৯৯৬ সালের ‘সুসুরলুক’ কেলেঙ্কারির মাধ্যমে এই চক্রের অস্তিত্ব বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ‘ডিপ স্টেট’ শব্দটি ২০১০ এর দশকে জনপ্রিয় হয়, বিশেষ করে ট্রাম্প যুগে (২০১৬-এর পর), যখন সিআইএ, এফবিআই এর মতো সংস্থা এবং স্থায়ী ব্যুরোক্রেসিকে এই নামে অভিহিত করা হয় এবং এই বিষয়টি তখন বৈশ্বিক আলোচনায় আসে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পিটার ডেল স্কটের মতে ডিপ স্টেট হলো এমন এক ব্যবস্থা, যা সরকারের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে অবস্থান করে প্রকৃত ক্ষমতা চর্চা করে।
ডিপ স্টেট কোনো নির্দিষ্ট একক ব্যক্তি বা সুনির্দিষ্ট দল নয়; বরং এটি একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক। একে একটি বহুস্তরীয় ক্ষমতা কাঠামো হিসেবে দেখা হয়, যার কেন্দ্রে থাকে গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা যাদের হাতে রাষ্ট্রের গোপন তথ্য ও নজরদারির ক্ষমতা থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে সিআইএ, যুক্তরাজ্যে এমআইসিক্স এবং ইসরায়েলে মোসাদ এর মতো সংস্থা শুধু নিরাপত্তা নয়, বরং বৈদেশিক নীতি ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, শীতল যুদ্ধকালে সিআইএ-এর গোপন অপারেশনের (যেমন ইরানে ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান) কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।
দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে স্থায়ী আমলাতন্ত্র যারা নীতিনির্ধারণের কারিগরি দিক নিয়ন্ত্রণ করে এবং সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যাদের হাতে প্রত্যক্ষ সশস্ত্র ক্ষমতা থাকে।
তৃতীয় স্তর হলো আর্থিক অভিজাত ও কর্পোরেট শক্তি যেমন বড় ব্যাংকিং পরিবার বা বহুজাতিক কর্পোরেশন গোষ্ঠী, যারা রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ করে।
চতুর্থ স্তর হলো মিডিয়া ও তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান। সিএনএন, বিবিসির মতো আন্তর্জাতিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা অনেক সময় পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে সমালোচিত হয়।
পঞ্চম স্তরে থাকে বিচার বিভাগের নির্দিষ্ট অংশ যারা আইনি ব্যাখ্যার মাধ্যমে রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখে। সবশেষে, রাজনৈতিক লবি ও থিংক-ট্যাঙ্কগুলো নীতিনির্ধারণে ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে কাজ করে।
এই পুরো কাঠামো মিলেই একটি ‘অদৃশ্য কিন্তু কার্যকর’ ক্ষমতা নেটওয়ার্ক গঠিত হয়।
ডিপ স্টেট সাধারণত সরাসরি ক্ষমতা দখল না করে পর্দার আড়াল থেকে কাজ করে। তাদের প্রধান হাতিয়ার হলো ‘জাতীয় নিরাপত্তা’। এই নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে তারা অনেক সংবেদনশীল তথ্য গোপন রাখে এবং বিশাল বাজেটের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এখানে বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া তাদের প্রধান সহায়ক হিসেবে কাজ করে।
ডিপ স্টেট সমর্থিত থিঙ্কট্যাঙ্ক বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন একদল বুদ্ধিজীবী তৈরি করা হয়, যারা তাদের নীতিগুলোকে তাত্ত্বিকভাবে বৈধতা দেয় (ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট)। মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ তৈরি করে এবং নির্বাচিত সরকারকে চাপের মুখে রাখে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ডিপ স্টেট গঠনের মূল বীজ বপন করা হয়েছিল ঔপনিবেশিক আমলেই। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের লিগ্যাসি এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হামজা আলভি দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে ‘অতি-বিকশিত রাষ্ট্র’ তত্ত্বের অবতারণা করেছেন। তাঁর মতে, ব্রিটিশ শাসকরা এদেশ শাসন করার জন্য এমন এক শক্তিশালী আমলাতান্ত্রিক ও সামরিক কাঠামো তৈরি করেছিল যা জনগণের কাছে নয়, বরং কেন্দ্রীয় শক্তির কাছে দায়বদ্ধ ছিল। স্বাধীনতার পরও এই ‘ঔপনিবেশিক লিগ্যাসি’ বা উত্তরাধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে।
যখন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থাকে, তখন এই ‘অতি-বিকশিত আমলাতন্ত্র’ শূন্যস্থান পূরণ করে এবং নিজেদের ‘রাষ্ট্রের প্রকৃত অভিভাবক’ মনে করতে শুরু করে। ১৯২৩ সালের ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’-এর মতো ঔপনিবেশিক আইনগুলো আজও ডীপ স্টেটকে গোপনীয়তার আড়ালে কাজ করার আইনি ভিত্তি প্রদান করে।
প্রবল জন-আকাঙ্ক্ষা যখন পরিবর্তনের দাবি তোলে, ডিপ স্টেট তখন বহুমুখী ফিল্টার হিসেবে কাজ করে। তারা রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে কোন্দল লাগিয়ে দলগুলোকে দুর্বল করে রাখে অথবা ‘কিংস পার্টি’ তৈরি করে রাজনীতিকে অকার্যকর করে দেয়।
কোনো গণ-আন্দোলন যদি তাদের স্বার্থের পরিপন্থী হয়, তবে তারা সেই আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে, সহিংসতা উসকে দেয় অথবা বিভাজন তৈরি করে সেটিকে বিতর্কিত করে। জন-আকাঙ্ক্ষাকে ‘ম্যানেজ’ করা বা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য। তারা নিশ্চিত করে যে, পররাষ্ট্রনীতি বা প্রতিরক্ষা বাজেটের মতো বিষয়গুলো যেন জন-আলোচনার বাইরে থাকে।
ডিপ স্টেট এবং সুপার পাওয়ারগুলোর সম্পর্ক মূলত পারস্পরিক স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে। বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো সরাসরি কোনো দেশের সরকারের চেয়ে সেই দেশের ডীপ স্টেটের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক বজায় রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এবং এজন্য তারা সিআইএ, এফএসবি বা মোসাদকে ব্যববহার করে।
যদি কোনো নির্বাচিত সরকার সুপার পাওয়ারের স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করে, তবে বিদেশি শক্তিগুলো স্থানীয় ডিপ স্টেটকে ব্যবহার করে সেই সরকারকে চাপে রাখে বা অভ্যুত্থানের পরিবেশ তৈরি করে। পরাশক্তিগুলো উন্নয়নশীল দেশের ডিপ স্টেট বা সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখে যাতে বড় বড় প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো নিশ্চিত হয়। জ্বালানি সম্পদ বা গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সুপার পাওয়ারগুলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ডিপ স্টেটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, যাতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ অক্ষুণ্ণ থাকে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ডিপ স্টেটের কার্যক্রমের কিছু উদাহরণ উলেখ করা যেতে পারে। তুরস্কের সুসুরলুক কেলেঙ্কারি (১৯৯৬), ডিপ স্টেট ধারণার আধুনিক ভিত্তি এই ঘটনাটি। ১৯৯৬ সালে তুরস্কের সুসুরলুক এলাকায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় একই গাড়িতে একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা, একজন সংসদ সদস্য এবং একজন কুখ্যাত পলাতক অপরাধীকে (যে খুনের দায়ে ওয়ান্টেড ছিল) মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার দোহাই দিয়ে গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ এবং অপরাধী চক্রের এক বিশাল ‘ছায়া নেটওয়ার্ক’ গড়ে উঠেছে। এরা নির্বাচিত সরকারের সমান্তরালে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করত এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বা মাদক ব্যবসায় লিপ্ত ছিল। এটিই ছিল আধুনিক বিশ্বের প্রথম প্রমাণিত ‘ডিপ স্টেট’ কাঠামো।
মিশরের ডিপ স্টেট পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী। ২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থানে হোসনি মোবারকের পতনের পর ২০১২ সালে জনগণের ভোটে মোহাম্মদ মোরসি ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু মিশরের সামরিক বাহিনী ও বিচার বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ডীপ স্টেট মোরসি সরকারকে কাজ করতে দেয়নি। তারা কৃত্রিম জ্বালানি সংকট তৈরি করে এবং প্রশাসনিক অসহযোগিতার মাধ্যমে জনমনে অসন্তোষ তৈরি করে। অবশেষে ২০১৩ সালে জেনারেল সিসির নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে।
দেখা যায়, মিশরের ডীপ স্টেট কেবল একটি প্রশাসনিক শক্তি নয়, বরং তারা দেশটির অর্থনীতির প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যা তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের প্রধান উৎস।।
দক্ষিণ এশিয়ায় ডীপ স্টেটের সবচেয়ে পরিচিত নাম পাকিস্তানের ‘এস্টাবলিশমেন্ট’। ১৯৪৭ সাল থেকেই পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা (আইএসআই) এবং সামরিক বাহিনী দেশটির পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ন্ত্রণ করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইমরান খানের প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ এবং পরবর্তীতে ক্ষমতাচ্যুতি ডিপ স্টেটের ভূমিকার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
যখনই কোনো নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ডিপ স্টেটের রেড লাইন (যেমন: ভারতের সাথে সম্পর্ক বা গোয়েন্দা প্রধান নিয়োগ) অতিক্রম করার চেষ্টা করেন, তখনই বিচার বিভাগ বা সংসদের অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পাকিস্তানে ‘ডিপ স্টেট’ মূলত রাষ্ট্রের মূল নিয়ন্ত্রক এবং রাজনৈতিক দলগুলো সেখানে কেবল ক্রীড়ানক।
ইরানের প্রেক্ষাপটে ডিপ স্টেট একটি আদর্শিক রূপ নিয়েছে। সেখানে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট থাকলেও প্রকৃত ক্ষমতা থাকে ‘সুপ্রিম লিডার’ এবং আইআরজিসির হাতে। তারা রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং অর্থনীতির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। অনেক সময় নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বিদেশি শক্তির সাথে সমঝোতা করতে চাইলেও ডিপ স্টেট তাদের নিজস্ব মিলিশিয়া বা গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে সেই প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করে দেয়। এটি প্রমাণ করে যে, ডিপ স্টেট অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক কাঠামো রক্ষার দোহাই দিয়ে জনগণের ম্যান্ডেটকে উপেক্ষা করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক শাসনের ফলে রাষ্ট্রের কাঠামোয় সিভিল ও মিলিটারি আমলাতন্ত্রের অবস্থান সুসংহত হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বা অলিগার্কদের প্রভাব ও আমলাতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান নীতিনির্ধারণী ভূমিকা, ডিপ স্টেট কাঠামোরই বহিঃপ্রকাশ। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার অভাবের সুযোগ নিয়ে অনির্বাচিত প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গণতান্ত্রিক সংকটের সময় এই অদৃশ্য শক্তিগুলোই ক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্রে আবির্ভূত হয়।
২০০৭ সালের ১/১১ এ বাংলাদেশে যে সেনাবাহিনী-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছিল, তাকে ডিপ স্টেটের ভূমিকার একটি স্থানীয় সংস্করণ হিসেবে অভিহিত করা যায়। এই সরকারের নেপথ্যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাষ্ট্রের স্থায়ী কাঠামোর (সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থা) প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমান ছিল। নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে আমলাতন্ত্র এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা এবং নতুন রাজনৈতিক দল তৈরির প্রচেষ্টা ছিল ডিপ স্টেটের একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক কৌশল। সে সময়কার সরকার পরিচালনায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা ছিল নজিরবিহীন, যা ভয় ও তথ্যের ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজ ও রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণের একটি ক্ল্যাসিক ডিপ স্টেট কৌশল। ১/১১-এর সময়ও পরাশক্তিগুলোর এক ধরনের মৌন বা প্রত্যক্ষ সমর্থন বিদ্যমান ছিল, যা তাদের স্থায়িত্বকে দীর্ঘায়িত করেছিল।
সামগ্রিকভাবে, ১/১১ ছিল এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে রাষ্ট্রের অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলো ‘গণতন্ত্র উদ্ধার’ বা ‘সুশাসনের’ দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে রাষ্ট্র পরিচালনার লাগাম নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল, যা ডিপ স্টেটের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
ডিপ স্টেটকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক লড়াই। প্রথমত, সামরিক ও গোয়েন্দা বাজেট এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত নীতিগুলো অবশ্যই সংসদের বিশেষ কমিটির কাছে জবাবদিহিমূলক হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, একটি স্বাধীন বিচার বিভাগকে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে হবে যাতে 'জাতীয় স্বার্থের' দোহাই দিয়ে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে না পারে।
তৃতীয়ত, শক্তিশালী সিভিল সোসাইটি ও মুক্ত গণমাধ্যম নিশ্চিত করতে হবে, যারা ডীপ স্টেটের প্রোপাগান্ডা নস্যাৎ করে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করবে।
সবশেষে, নির্বাচন ব্যবস্থার শুদ্ধিকরণ অপরিহার্য, যাতে সরকার প্রকৃত জনম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসে সাহসী সংস্কার করতে পারে।
ডিপ স্টেট ও গণতন্ত্রের সংঘাত মূলত স্বচ্ছতা বনাম অন্ধকারের লড়াই। গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে হলে একে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ঔপনিবেশিক আমল থেকে প্রাপ্ত ‘অতি-বিকশিত আমলাতন্ত্র’ এবং নিরাপত্তা সংস্থাকে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধীনে এবং জবাবদিহিতার কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।
জনসচেতনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারই হতে পারে ‘রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাষ্ট্র’ ভেঙে ফেলার একমাত্র হাতিয়ার। ক্ষমতার প্রকৃত উৎস যখন গোপন কোনো কক্ষ থেকে সরে এসে জনগণের হাতে থাকবে, তখনই কেবল গণতন্ত্র ও ডিপ স্টেটের এই অসম সংঘাতের অবসান ঘটবে। একটি শক্তিশালী ও টেকসই রাষ্ট্র গঠনের জন্য ডিপ স্টেটের এই অদৃশ্য জাল ছিঁড়ে ফেলা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক