তিন বছরেও হয়নি রাঙ্গাবালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ, ২ লাখ মানুষের ভোগান্তি

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী)

প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬, ১০: ৪৪
অসমাপ্ত অবস্থায় এভাবেই পড়ে আছে রাঙ্গাবালী উপজেলা স্বাস্থ্য-কমপ্লেক্সের ভবন। ছবি : স্ট্রিম

ঠান্ডা-জ্বর আক্রান্ত তিন মাসের শিশুকে নিয়ে পটুয়াখালীর এক হাসপাতালে গিয়েছিলেন বেল্লাল গাজী ও সুমাইয়া আক্তার। অসুস্থ সন্তান নিয়েই পরদিন দুপুরেই বাড়ি ফেরেন রাঙ্গাবালী উপজেলার এই দম্পতি। যাতায়াতে দুবার উত্তাল আগুনমুখা নদী পাড়ি দেন তারা।

কোড়ালিয়া লঞ্চঘাটে আক্ষেপ করে এই দম্পতি জানান , হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরে ভর্তি করতে বললেও রোগীর চাপে শিশু আরও সুস্থ হওয়ায় ফিরে এসেছেন। এখন বাড়িতেই সন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।

বেল্লাল-সুমাইয়া দম্পতি নদীপথের ভোগান্তির পোহায়ে সন্তানকে হাসপাতালে নিলেও তা পারেননি উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামের রাসেল মাহমুদ। ঠান্ডা-জ্বর ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ৫ মাসের সন্তানকে তিনি নিয়েছিলেন রাঙ্গাবালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। তবে চিকিৎসক না থাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা ও পরামর্শের ওপরও ভরসা রাখতে বাধ্য হচ্ছে তিনি।

রাসেল স্ট্রিমকে বলেন, পুরো উপজেলায় কোনো সরকারি হাসপাতাল নেই। ইউনিয়নে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও নেই চিকিৎসক। এতে ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন উপজেলার বাসিন্দারা।

স্থানীয়রা জানান, রাঙ্গাবালীতে তিন বছর আগে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজে শুরু হলেও তা এখনও শেষ হয়নি। এতে অসুস্থ হলে নদ ও সাগর পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী উপজেলা বা জেলা শহরে যেতে হয় তাদের। উপজেলা ঘোষণার ১৪ বছরেও কাটেনি চিকিৎসা সংকট।

রাঙ্গাবালীর তিনদিকে বুড়া গৌরাঙ্গ, তেঁতুলিয়া ও আগুনমুখা নদী এবং একদিকে বঙ্গোপসাগর। জেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন এই উপজেলায় ৬টি ইউনিয়ন। এর মধ্যে চারটি ইউনিয়ন আবার উপজেলার সদর থেকে বিচ্ছিন্ন। দুর্গম এই চরাঞ্চলের বাসিন্দা প্রায় দুই লাখ মানুষ।

প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাঙ্গাবালীকে উপজেলা ঘোষণা হয়। এর এক দশক পর ২০২৩ সালের জুলাইয়ে সেখানে ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নির্মাণ শুরু হয়।

জেলার স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাঙ্গাবালীতে ৫ একর জমির ওপর ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের দরপত্র প্রকাশ করে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম লটে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ২০২৩ সালের ১০ এপ্রিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবুল কালাম আজাদ— প্রাইম কনস্ট্রাকশনকে (একেএ-পিসি) কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় ১২ কোটি ৬৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা।

পটুয়াখালী স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, বরাদ্দ না থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ শেষ করতে পারছে না তারা। এতে পার্শ্ববর্তী গলাচিপা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় থেকে পরিচালিত হচ্ছে রাঙ্গাবালী উপজেলার স্বাস্থ্য কার্যক্রম।

পদ থাকলেও চিকিৎসক শূন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্র

গলাচিপা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, রাঙ্গাবালীর ৬টি ইউনিয়নের মধ্যে একমাত্র চালিতাবুনিয়াতে একটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া একটি করে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে রাঙ্গাবালী, ছোটবাইশদিয়া, বড়বাইশদিয়া ও চরমোন্তাজ ইউনিয়নে। তবে উপজেলার মৌডুবি ইউনিয়নে কোনো স্বাস্থ্য কেন্দ্র নেই।

উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে পদ রয়েছে পাঁচটি। এখানে চিকিৎসক ছাড়াও একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা, ফার্মাসিস্ট, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা ও একজন অফিস সহায়ক থাকার কথা। তবে সেখানে শুধু সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা এবং পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা কর্মরত রয়েছেন। তবে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটির ভবন ব্যবহারে অনুপযোগী হয়ে পড়ায় প্রায় এক বছর আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

এদিকে চারটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেডিকেল কর্মকর্তার চারটি পদই শূন্য রয়েছে। অন্য তিনটি পদে পদায়ন আছে। তবে উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন চর মোন্তাজ ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পদায়ন হওয়া লোকবল না যাওয়ায় সব কার্যক্রম বন্ধ পড়ে রয়েছে।

গলাচিপা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক মেজবাহউদ্দিন জানান, রাঙ্গাবালী বিচ্ছিন্ন একটি উপজেলা। তাঁরা চিকিৎসা কর্মকর্তা পাঠিয়ে দ্বীপবাসীর কাছে সেবা পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় সেখানে কর্মরত ব্যক্তিরা পার্শ্ববর্তী অন্যের বাড়ির আঙিনায় সেবা দিচ্ছেন।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেই প্রয়োজনীয় ওষুধ

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, রাঙ্গাবালী থেকে জেলা সদর ও আশপাশের উপজেলায় যাতায়াতে প্রধান ভরসা ট্রলার ও লঞ্চ। তবে সন্ধ্যার পর নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে সংকটাপন্ন রোগীকে অন্য উপজেলায় নেওয়ার পথও বন্ধ হয়ে যায়। তখন ইঞ্জিন চালিত ছোট নৌকা ও অনেক সময় স্পিট বোর্ডে পার্শ্ববর্তী গলাচিপা ও কলাপাড়া উপজেলাতে নিয়ে যেতে হয়। এতে উত্তাল নদীতে জীবনের ঝুঁকি থাকলেও কোনো বিকল্প থাকে না।

এদিকে উপজেলায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে নেই প্রয়োজনীয় ওষুধ। বিশেষ করে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ওষুধ সরবরাহ নেই। সামান্য জ্বর, ডায়রিয়াসহ নানা রোগে ফার্মেসির ওষুধ বিক্রেতা ও ঝাড়ফুঁকের ওপরই ভরসা করতে হয় স্থানীয়দের।

কোড়ালিয়া গ্রামের টুম্পা রানী বলেন, জরুরি চিকিৎসা নিতে গিয়ে পথেই অনেক প্রসূতি মা ও গর্ভের সন্তান মারা যাওয়ার এখানে নিয়মিত ঘটনা।

পুনরায় নির্মাণ শুরুর অপেক্ষায় সংশ্লিষ্টরা

পটুয়াখালী পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম জানান, রাঙ্গাবালীতে চিকিৎসক ও লোকবলের সংকট রয়েছে। তাদের একটি কেন্দ্র বন্ধও রয়েছে। জরুরি প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ পর্যাপ্ত নেই। তবে সংকট নিরসনের চেষ্টা চলছে।

পটুয়াখালী সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, রাঙ্গাবালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাজ শুরুর এক বছরের মধ্যেই নানা জটিলতা ২০২৪ সালে বন্ধ হয়ে যায়। বাকি কাজ দুটি লটে ২০২৭ সালের মধ্যে শেষ হবে। এর মধ্যে লট-১-এ মূল হাসপাতালের ভবনের নতুন ঠিকাদারের দরপত্র প্রকিয়াধীন আছে।

পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, কয়েকটা কমিউনিটি ক্লিনিক ছাড়া রাঙ্গাবালীতে কোনো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গড়ে উঠেনি। এটা আসলেই দুই লাখ মানুষের জন্য খুবই কষ্টকর ব্যাপার। তবে আশার কথা হচ্ছে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বন্ধ কাজ শীঘ্রই শুরু হতে যাচ্ছে। লট-১ মূল হাসপাতালের ভবনটার কাজ এক মাসের মধ্যে শুরু হবে আশা করা যায়। দুই লটে ২০২৭ সালের মধ্যে কাজ শেষ হবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত